একটা সময় ছিল, যখন সিনেমা থেকে শুরু করে গোয়েন্দা কাহিনি সবেতেই ছিল চিনেদের বিরাট দাপট। গুন্ডাদের সর্দার বা প্রায়ান্ধকার ভাইস ডেন এ রিভলভিং চেয়ারে বসে থাকা বস মানেই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বর্ণিত ‘দুর্ধর্ষ চৈনিক দস্যু’। এখন পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকার জমানায় তা প্রায় নেই বললেই চলে। বাণিজ্যে, বিজ্ঞানে, শক্তিতে চিন এখন এক মহা শক্তিধর রাষ্ট্র। তবে এখনও নানা গোলমেলে ব্যাপারে বারবার জড়িয়ে যায় চিনের নাম। তার ব্র্যান্ড ভ্যালু খুব একটা বাড়েনি। চিনের ইমেজটা এখনও বেশ গোলমেলে। চিন যে একটা প্রাচীন সভ্যতা তা তাদের কাজকারবার দেখে বোঝা দায়!
এই দেখুন না, আমাদের জমি কব্জা করার বাসনায় ভারতের সীমান্তের ভেতরে চিন বানিয়ে ফেলেছে দস্তুরমত একটা গ্রাম! স্যাটেলাইটের কল্যাণে জনমানবহীন সেই নির্মীয়মাণ গ্রামের ছবি গোটা পৃথিবী দেখে ফেলেছে। তবুও চিন তা মানতে নারাজ। সর্বভুক চিনাদের পশু বাণিজ্যের হাট থেকে করোনা ছড়িয়েছে বলে বিশ্বের বহু রাষ্ট্র অভিযোগ করেছে। কোনকালেই বা চিন কোন অভিযোগ মেনেছে! বিষয়টি সরজমিন অনুসন্ধান করতে হু’র একটি প্রতিনিধি দল চিনে গেছেন। তাদের সঙ্গে চিন কোন সহযোগিতা করছে না বলে প্রতিনিধি দলটি অভিযোগ তুলেছিলেন। অবশেষে চাপে পড়ে একটু নরম হয়েছে চিন।
একদা বিপ্লবের পীঠস্থান চিন এখন বাণিজ্যে সবার সেরা। দুনিয়ায় কেউ তাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছে না। বাঘ থেকে বাদুড়, সবকিছু নিয়ে চিনে ব্যবসা হয়। বেআইনি বন্যপ্রাণ বাণিজ্যে চিন সবথেকে এগিয়ে। বাঘের অণ্ডকোষ থেকে শুরু করে তক্ষকের দেহরস সবই চিনাদের বাণিজ্য উপকরণ। এবার তাদের ব্যবসা শুরু হয়েছে ভারতের ঠাকুরদেবতা নিয়েও। মেড ইন চায়না স্টিকার মারা আমাদের বিঘ্নবিনাশক গণেশের মূর্তি ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে। ভারতের ব্যবসায়ীদের দেবতা গণেশ যে কোন বিদেশি রাষ্ট্রের, যাকে বলে, জটায়ু বর্ণিত ‘সেলিং লাইক হট কচুরিস’ মার্কা ব্যবসার উপকরণ হতে পারে তা চিনাদের না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না!

সিদ্ধিদাতা গণেশের দুনিয়াজোড়া ব্যবসায় এখন সিদ্ধিলাভ করেছে চিনারা। নরেন্দ্র মোদির ভাষায়, আমরা গণেশের পুজো করি আর চিনারা বলে আমরা গণেশকে নিয়ে ব্যবসা করি। এই ব্যবসার আকারপ্রকার দেখে রাজ্যের যেসব ঝুপড়িবাসী মৃৎ শিল্পীরা গণেশের ছোট বড় মূর্তি বানান, তাদের অবস্থার কথা কল্পনাও করা যাবেনা। তবে চিনাদের বুদ্ধির তারিফ করতেই হবে। স্যালুট করতে হবে বাণিজ্যের উপকরণ হিসেবে গণেশকে তাদের নির্বাচন করা নিয়ে।
মাথাটা হাতির অথচ শরীরটা মানুষের। এমন একটা অবয়বধারী দেবতা এমনিতেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গণেশ দেখতেও খুব মজার, ভুঁড়িওয়ালা নাদুসনুদুস গণেশ ঠাকুরকে দেখলে আদর করতে ইচ্ছে করে। আবার দেখুন, তাকে ঘরে রাখলে ব্যবসা বাণিজ্য থেকে শুরু করে সব কাজে সিদ্ধি মেলে বলে মানুষের বিশ্বাস। গণেশ মূর্তিতে একইসঙ্গে রয়েছে নান্দনিক এবং বাণিজ্যসফল উপাদান। চিনেদের বুদ্ধির কোন জবাব নেই। ভিয়েতনাম থেকে ভেনিস নানা জায়গাতেই গণেশ তৈরি হয়। কিন্তু তার সঙ্গে চিনাদের গণেশ বাণিজ্যের কোন তুলনাই হয়না। বালি থেকে ব্যাঙ্কক এখন চিনা গণেশের জয়জয়াকার। একইসঙ্গে তা শো পিস এবং উপাসনার বিগ্রহ।
প্রায় ৩০-৪০টা চিনে সংস্থা এখন উদয়াস্ত গণেশ বানিয়ে চলেছে। বিপুল তাদের ব্যবসা, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনা গণেশের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। দামে সস্তা, ঝকঝকে প্রোডাকশন, অর্ডার দিলে চমৎকার মোড়কে স্বল্প সময়ে গণপতি বাপ্পা হাজির হবেন আপনার বাড়িতে। আমাদের বৌদ্ধিক সম্পত্তি সংক্রান্ত কপিরাইট আইন খুবই ঢিলেঢালা। চিনারা এর সুযোগ নিয়েছে। দিনকাল যা পড়েছে তাতে মনে হচ্ছে একসময় হয়তো আমাদেরই চিনা গণেশ কিনতে হবে। গণেশের উপাসক ভারতীয় ব্যবসায়ীরা গণপতির এই বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বুঝতেই পারেননি! চিন সুপার পাওয়ার এমনি এমনি হয়নি! আর ক’দিন পর হয়তো চিনারা ইতিহাস- ভূগোল ঘেঁটে দাবি করতে শুরু করবে গণেশ আদতে একটা চৈনিক দেবতা। ভারতের জনগণেশরা কিনবেন চিনা গণেশ!
চিনা আগ্রাসন বরাবরই ছিল। ব্যবসায়ী বেনের জাত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।