মাঝে মাঝে অনেকেই বলেন, খুব ডাউন লাগছে। লো লাগছে। ডিপ্রেসড লাগছে। যারা বলেন, তাদের বেশিরভাগের জীবনেই ‘সবকিছু’ আছে। অভাবের অভাব আছে বরং। মানছি, তার পরেও এমন মনে হতেই পারে। কিন্তু ভেবে পাই না, একটা মানুষের যদি বাইরের বিলাসের সাথে অন্তরের যোগ থাকে, ঠিক মানুষদের সাথে সংযোগ রেখে যদি সে চলে তাহলে তার কেন এমন হবে? বুঝি, বড় দ্রুত জিতে যেতে চাইছে আমার প্রজন্ম, আমার সময়, জীবনটা এদের কাছে একটা ট্রফি জেতা যেটা রাতজাগা ফুটবলের মতোই হুল্লোড়ময়। তাই পুতুপুতু কাব্য লেখা ও ন্যাকান্যাকা গান গাওয়া এফোর্ড করেন এরা আর দুঃখ মারান। আমাদের লাজুজ লাজুক কবিতা আর আমাদের পুতুপুতু সিনেমা-আহারে! আসলে, এরা চান কিছু একটা হতে কিন্তু জানেনই না, কি হতে চান..তাই লেজ থেকে নিজেকেই খেয়ে চলেন অবলীলায়…
মন অস্থির হলে বিভূতিভূষণ পড়ি। বিশেষ করে ওঁর ডাইরিগুলো। স্মৃতির রেখা, অভিযাত্রিক। অনন্ত সবুজের সাম্রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া। হারাতে হারাতে নিজেকে খুঁজে পাওয়া৷ এমন একটা সময় দিয়ে আমাদের যেতে হচ্ছে যখন কারও কোনও ক্ষতি না করলেও লোকজন এসে ছুরি চালিয়ে দিচ্ছে পেটে বা পিঠে। ল্যাম্পোস্টে যেভাবে চোরকে বেঁধে মারে, সেভাবেই কাছে এসে বন্ধু সেজে রক্তাক্ত করে চলে যাচ্ছে সবাই, অকারণে। রাস্তা পার হওয়ার সময় প্রায়ই মনে হয় ধাক্কা মারবে গাড়ি। মারা যাব যে কোনওদিন। এমনই অজানা ভয়ে ভয়ে জুলাই মাসের বিকেল নামে। তখন আঁকড়ে ধরি বিভূতিভূষণ। দেখি একজন অপুর কল্পনা কীভাবে নরলোক ছাপিয়ে দেবলোকে চলে যাচ্ছে। পাঁচ হাজার বছর আগের ও পরের সময়ের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করছেন বিভূতিভূষণ। কীভাবে কষ্ট পাচ্ছেন দুর্গার মারা যাওয়ার মূহূর্ত লেখার সময়ে। পাতায় পাতায় সবুজের সাথে যৌনতায় কীভাবে নিজেকে খুঁজছেন, খুঁজছেন জীবন দেবতা। কী অপার শুশ্রূষা রেখে যাচ্ছেন এভাবেই তিনি আগামীর জন্য, যখন তাঁর কল্পনায়, কলকাতা নামের জনপদ মাটির নীচে চাপা পড়বে আর মনুমেন্টর মাথাটা শুধু উঠে থাকবে মাটির উপর…

ঠিক এ রকমই একটা অনুভূতি হয়েছিল আমার রবি ঠাকুরের ছিন্নপত্র পড়ে। যেন সংসারের অন্ধকারে অস্থির এক আত্মা পরম প্রকৃতির কাছে আশ্রয় খুঁজছেন। এবং প্রকৃতি তাঁকে সেই এম্প্যথি ফিরিয়েও দিচ্ছে। জুন-জুলাই-অগস্ট মাস কেন যেন বরাবর নানা মনখারাপ নিয়ে আসে। গরম আর মেঘলা দিন দ্বন্দ্বে ভোগায়। তার সাথে কোভিডের নানা প্যানিক। তাই, আমাকে ধরেন এসময়ে বারবার বিভূতিভূষণ বা ছিন্নপত্র বা নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়র বাজনা। এক রকম মনোবিদের ওষুধ যেন এসব। এখানে রাখা আছে অনেক শুশ্রূষাদানা। ব্যথার পর ব্যথা দিয়ে যে দেওয়াল তোলা জীবনের, তা থেকে অনন্ত ছুটি দেয় এসব নিজের জগতে। সত্যিই কেউ যদি বিপন্ন হন, তিনি এখানে আশ্রয় পাবেন। তাঁকে অষ্টাবক্র গীতা বা বামপন্থী ইতিহাসের ধারা না জানলেও চলবে, আমাদের উপনিষদ বা পুরাণকেন্দ্রিক যে জীবন অভিজ্ঞতা বিভূতিভূষণ বা রবি ঠাকুরে-তা আমাদের পার করে দিতে পারে অশ্রুনদীর সুদূরপারে। সেখানে পুতুপুতু কাব্য নেই। সেখানে নেই লাজুক লাজুক কবিতা৷ ন্যাকান্যাকা সিনেমা। সেখানে সদর্থে অনিশ্চয়তা আছে। যে অনিশ্চয়তার সাথে ঘর করতে করতে ভয় রিপুটাই উড়ে যায় শিল্পীর। তখন তার চোখ ভ্যান গখের মত হয়ে যায়। তখন তার মনে ঘুরে বেড়ায় অসম্ভব সব গান। একটা চুল্লির মত বারুদ তখন তার শিরায় শিরায়। তখন সম্পর্ক ভাঙলেও সে হাসে, হাতে পেরেক ফোটালেও বলে এদের তুমি করুণা কোরো ঈশ্বর। এরা জানে না এরা কি করছে…
জাগতিক দুঃখ, বিষাদ, বারবার অনিশ্চয়তা অনিবার্য। তা আপনি কাটিয়ে উঠতে পারছেন কি না ও কীভাবে কাটাচ্ছেন, সেখানেই প্রমাণ আপনি আসলে কতটা বড়, আদৌ আপনার মেধা ব্যাতিক্রমী কি না। তাই ক্রাইসিস এক ধরণের জলবিভাজিকা যা একজনকে আরণ্যক বা ছিন্নপত্র লেখায় আর যারা দ্রুত ধান্দা করে জিততে চায়, ও বারবার ধ্যাড়ায়, তাদের বলে-তোরা মর, মর মর…
২.
সেদিন অশোক মিত্র মশাইয়ের ইন্টারভিউতে পড়লাম, পথের পাঁচালি ছবির নানা ডিটেলিং-এ কমলকুমারের অবদান ছিল। কথাটা বেশ ক দিন খুব ভাবালো। যে লোকায়তের শেকড় পথের পাঁচালি আমাদের দেখায়, তা তো আসলে কমলকুমারের লেখার জগত। ছবি বিশ্বখ্যাতি পাওয়ার পরে তিনি আর যোগাযোগ রাখেননি পরম বন্ধু সত্যজিতের সাথে। সত্যজিত নিজে অনেকবার চেষ্টা করলেও, লাভ হয়নি। এই দূরত্ব কি এ জন্য যে একজন লেখকের সিগ্নেচার আসলে তাঁর সম্পদ। লোকে তাঁকে কপি করতেই পারে, করতে পারে অনুমতি নিয়ে ব্যবহারও কিন্তু তাঁর আত্মাকে ধরা অত সোজা না। বারেবারেই তাই নানা প্রেডিক্টেবল অবস্থান থেকে তিনি হারিয়ে যাবেন, সামনের রাস্তার বাঁক থেকে কোনদিকে ঘুরবেন খুব কাছে গিয়েও অনুমান করা যাবে না। কমলকুমারের জীবনজুড়ে নেওয়া এমন নানা আড়ালের অবস্থান আমাকে একটা আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে গিয়ে ফেলে বারে বারে, যেখানে একজন সত্যিকারের শিল্পীর হাসি চেনা দুদে গোয়েন্দাদেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে…
আমার লেখায় অবচেতনের কিছু ইমেজের স্মৃতির একটা জার্নি আসে। আবার, তার পাশেই আসে রোজকার দিনযাপনের নানা লড়াই থেকে উঠে আসা চিন্তা আর ভাষা। এবং আসে নিত্য ভোগবাদের এক আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় রাজনীতি। এই তিন এসে মোহানায় মেশে, মেশে আমার শরীরে ও মনে। আমি লেখার ধ্যানের ভেতর দিয়ে আত্মদীপে পৌঁছই। লেখা তারপর আমাকে লেখে এবং কখনও আমি লেখাকে; এ এক রকম ডুয়েল, নিরাকার ব্রহ্মের সাধনা। অমিয়ভূষণের মতে, লেখকের এই পর্যায়টা আসলে বাইরের দুনিয়া থেকে পালানো, যেখানে বহির্জগৎ থেকে পালিয়ে অন্তর্জগৎ-এ তলিয়ে যান ক্রমশ একজন লেখক, তারপর তৈরি করেন নিজের ঘরানা। নিজের সাথেই কথা বলতে বলতে একদিন লিখে ফেলেন সময়ের ইতিহাস অজান্তে তারপর।
অমিয়ভূষণ রেনেসাঁসকে প্রশ্ন করেছেন শহর থেকে দূরে দাঁড়িয়ে। আর, কমলকুমার ক্রমশই শহরের পথে পথে লোকায়ত স্তরে নেমে গেছেন নিজের ছন্দে। দেবেশ রায়ের সমাজ-ইতিহাস আবার সমাজতাত্ত্বিক একটা দর্শন থেকে বিরাট কালখণ্ডের তত্ত্বতালাশ। এই তিন জন লেখক তিন ভাবে একটা সময়কে এড্রেস করছেন। তিন ঘরানাই তিন জনের নিজস্ব অর্জিত শৈলী। কোন গোপন প্রাণের টানে তা তাঁরা অর্জন করলেন, তা আমাদের জানা হবে না। আমরা শুধু অনন্তের চিঠি পাব সনাতন পাঠক হিসেবে বারবার আর বিস্মিত হয়ে অনুমান করে নেব সত্যজিৎ আর কমলকুমারের এই দূরত্ব আসলে ভিন্ন দুই ঘরানার শিল্পীর এক দ্বন্দ্ব যা যত না বন্ধুত্বের কারণে তার চেয়ে অনেক বেশি ভিন্ন মেরুর শিল্পের কারণে…
খুব ভালো লেখা।
খুব ভাল লেখা। পড়ে শান্তি পেলাম। ভালবাসা জানবেন।