আমি চোর, কিন্তু অশিক্ষিত নই। ক্লাস এইট পাশ। এইট পাশ হলে অফিস আদালতে পিওনের চাকরি পাওয়া যায়। পিওন বেয়ারার চাকরি যারা করে লোকে তাদের ভদ্দরলোক বলে। আমাদের পাড়ার অলোকবাবু, ফাংশনে সভাপতি হয়ে রজনীগন্ধার মালা গলায় বক্তৃতা দেন, কিন্তু সবাই জানে অলোকবাবু কলকাতার একটা অফিসের পিওন। অলোকবাবুর ঠাটবাট দেখলে মেজাজ ব্যোমকে যাবে। অলোকবাবু বিদেশি সেন্ট মাখেন, সপ্তায় দু’দিন খাসির মাংস খান, ইংরিজি খবরের কাগজ রাখেন বাড়িতে। অলোকবাবুকে ভদ্দরলোক বললে হিসেবমত আমাকেও বলা উচিত। ক্লাস এইট থেকে নাইনে পাশ করেই উঠেছিলুম। ইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই বুঝতে পারি দু’নম্বরি কাজে আমার বেশ ন্যাক আছে। মাস্টারদের সই নকল করতে, অপরের ব্যাগ থেকে পেন পেন্সিল তুলে নিতে কিংবা টুকলি করতে ওস্তাদ ছিলুম। এক বার ছাড়া কখনও ফেঁসে যাইনি, সেটা সেই এইটের ফাইনাল পরীক্ষার সময়। অন্য সাবজেক্টগুলো বেশ পরিপাটি টুকলি করলুম; কিন্তু কেলোটা হল ইতিহাসের দিন। ক’দিন আগেই ইস্কুলে এক জন নতুন স্যর এসেছেন; গার্ড দিচ্ছেন আমাদের ঘরে। স্যর একটু ঘোরাঘুরি করে খবরের কাগজ পড়তে লাগলেন চেয়ারে বসে। স্যরের মুখটা কাগজে ঢাকা। এমন চান্স আলেকালে মেলে। আমিও নিশ্চিত মনে পকেট থেকে মালপত্তর বের করেছি। স্যরটা মাইরি যন্তর মাল! খবরের কাগজে ছোট একটা ফুটো করে নজরদারি করছিলেন। একেবারে ক্যাচ কট কট। পকেট টকেট সার্চ করে আমাকে একেবারে ছেঁকে নিয়ে ছেড়ে দিলেন। অন্য সাবজেক্টে আমার কিছু কিছু ফাণ্ডা থাকলেও ইতিহাসে আমি একেবারে পয়মাল। বাবর কার বাপ কিংবা শিবাজি কার নাতি সব গুবলেট হয়ে যায় আমার। চোতা ছাড়া ইতিহাসে একটা আঁচড়ও কাটতে পারব না। বসে বসে পেন চুষছি, হঠাৎ মনে হল একেবারে সাদা পাতা জমা দেওয়াটা প্রেস্টিজের মামলা। পাশে একটা ক্লাস সেভেনের ছেলে বসেছিল। বেপরোয়া হয়ে তার খাতা দেখেই আমারটা ভরাট করলুম। কিন্তু মার্কশিট পেয়ে দেখি, কেলেঙ্কারিয়াস ব্যাপার, ইতিহাসে চল্লিশ পেয়ে গেছি। কী করে পেলুম ইতিহাসের স্যরই বলতে পারবেন; আমার জ্ঞানবুদ্ধি মতো সেভেন আর এইটের প্রশ্ন যেহেতু আলাদা উত্তরও আলাদা হবে। তা সেই ফুটোওলা স্যর বলতে গেলে আমার জীবনের প্রথম দীক্ষাগুরু। তাঁর সেই শিক্ষা আমার জীবনে ব্যাপক কাজে লেগেছে। এখনও অপারেশনে নামার আগে অনেক তলিয়ে ভাবি, পাতি নিরীহ জিনিসও ভাল করে বাজিয়ে নিই।
তবে লেগে থাকলে আমিও বি এ, এম এ পাশ করে যেতে পারতুম। কিন্তু নাইনে ওঠার পরই ধান্দায় লেগে যেতে হল। বাপটা ছিল টিকরমবাজ টাইপের। বিস্তর লোকের থেকে টাকা নিয়ে গাপ করে দিত। নেশাভাঙ, মেয়েমানুষ সব দিকেই গ্র্যাজুয়েট। পাওনাদারদের খিস্তির তোড়ের সামনে উদাস মুখে কুঁচকি চুলকোতে চুলকোতে বিড়ি ফুঁকত। মায়ের সঙ্গে দিনরাত খচামচি। বাপ এক দিন হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেল। গেল তো গেলই, আজও ফেরেনি। আমরাও খুব একটা খোঁজ পাত্তা লাগাইনি। বাপ যাওয়াতে লস তো কিছু নেই, বরং বেশ শান্তিতে আছি। পাওনাদারদের তাগাদা নেই, হল্লাহাটি নেই, শুধু ইস্কুলের পাটটা চুকে গেল আমার।
প্রথমে একটা কাপড়ের দোকানে কাজ নিলুম। কিছু দিনের মধ্যেই একটা কাপড়ের গাঁটরি সরিয়ে কেটে পড়লুম। তার পর একটা হার্ডওয়্যারের দোকানে, সেখানেও ক্যাশ বাক্স ভাঙলুম মাসখানেকের মাথায়। তার পর আর কাজকম্মের ধান্দা করিনি, পুরোপুরি লাইনে নেমে গেলুম। তখন মাঝে মাঝে খালপাড়ের ঝুপড়িতে যাই নেশা করতে। সেখানে টকাদার সঙ্গে মোলাকাত। টকাদা বলল, তোর এমন চাবুক শরীর, বুকে এত দম, তুই তো লাইনে নামলে সোনা ফলাবি রে! টকাদারও এক সময় হাতযশ ছিল এ লাইনে; বুকের রোগ ধরায় লাইন ছেড়ে দিয়ে চাটের দোকান দিয়েছে। টকাদা কিছু কায়দা শিখিয়ে দিল, কী করে লিভার দিয়ে তালা ভাঙতে হয়। ল্যাচ খোলে কী ভাবে, মাস্টার কি কোথায় পাওয়া যায়, এই সব। বলল, গুরুকে ভুলিসনি কিন্তু, মাঝে মাঝে কিছু দক্ষিণা দিস।
শিক্ষিত চোর বলে একটু বাড়তি সম্মান মনে মনে দাবি করি আমি। কিন্তু দেয় কে? আমি জানি রাতে ঘরের খিল দেবার সময় লোকের মনে এক বার আমার মুখটা ভেসে ওঠে। ঝিঙ্কি আমায় কী চোখে দেখে, কে জানে? ঝিঙ্কি খুব চাপা টাইপের মেয়ে; ওর মনের কথা বের করা খুব মুশকিল। আমার সঙ্গে নয় নয় করেও তিন চারটে সিনেমা দেখেছে, রেস্টুরেন্টে খেয়েছে, কিন্তু ও আমার থেকেও পিচ্ছিল মাল, ঠিক পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে। শুধু মাঝে মাঝে বায়না জোড়ে, বাপিদা তুমি ও লাইন ছেড়ে দাও; খুব বিপদের কাজ। আমি বোঝাই এখন সব লাইনে রিস্ক; টিভিতে তো মাঝে মাঝেই দেখায় ডাক্তাররা মার খাচ্ছে, মাস্টারদের ঘেরাও করে রেখেছে। এই লাইনের মতো সুখের লাইন কমই আছে। আমার ঘরে কালার টিভি, টেপ, পকেটে মোবাইল, সবই লাইনের দান। আমি কি শালা ছিঁচকে চোর, ছেঁড়া গামছা, তোবড়ানো হাঁড়ি, ভাঙা সাইকেল টানব বাড়ি বাড়ি থেকে? আমার রোজ দিন বেরোবার দরকার হয় না। যে দিন বের হই টেপ টিভি সিডি প্লেয়ারঘড়ি কিছু ম্যানেজ করতে পারলে কাজ মিটে যায়। রাতে আমার নাক কান চোখ সব চাবুক হয়ে যায়। বেড়ালের মতো কান খাড়া হয়, কুকুরের মতো গন্ধ পাই; চোখগুলো জ্বলে। লোকজনের একটু নড়াচড়া, সামান্য বিপদের গন্ধ ঠিক চলে আসে আমার কাছে।
এত কিছু ঝিঙ্কি বুঝতে চায় না। আমিও খুব বেশি ঘাঁটাই না ওকে। মুখে বলি, ঠিক আছে, ভাল লাইন পেলে ছেড়ে দেব। ঝিঙ্কি চটে গেলে মুশকিল। ঝিঙ্কির পেছনে লম্বা লাইন। অটোওলা হারু আছে, মিনিবাসের ড্রাইভার বিকাশ আছে; আর আছে রণজয়, আশুবাবুর ছোট ছেলে। বিকাশ, হারু এদের নিয়ে ভাবি না; কিন্তু রণজয়টা খচ্চর। বহুত মেয়ের সর্বনাশ করেছে। ঝিঙ্কিকে ও থোড়ি বিয়ে করবে। ঝিঙ্কির চামকি ফিগার, ফর্সা রং,
কাটাকাটা চোখ মুখ দেখে শালার লাল পড়ছে। ফুর্তি করে কেটে পড়বে আমিও শিওর। তবে মাঝে মাঝে আমার সন্দেহ হয় ঝিঙ্কিরও একটু আশকারা আছে। আশুবাবুর বাড়িতে বাচ্চা সামলানোর কাজ করে ঝিঙ্কি। সকাল দশটা থেকে সন্ধে ছটা পর্যন্ত ডিউটি। কিন্তু প্রায় দিনই এখন বেশ রাত পর্যন্ত ওদের বাড়ি থাকে। এত আঠা কীসের? তোকে তো আর ওভারটাইম করায় না। এক দিন দেখি রণজয় ওদের নীল গাড়িটা চালাচ্ছে, আর পেছনের সিটে বসে আছে ঝিঙ্কি। সে দিনই রাত্তিরবেলা ঝিঙ্কিকে ধরলুম। সন্ধে সাতটা থেকে বসেছিলুম ওদের বাড়ি। ঝিঙ্কির মাটা আবার আমাকে ঠিক গিলতে পারে না। ঝিঙ্কির বাবা নেই, বাড়িতে প্রাণী বলতে দুটো মেয়েছেলে, তাই বোধহয় মুখের ওপর কিছু বলে না আমায়। ঝিঙ্কির মা হ্যারিকেন জ্বেলে ঠোঙা বানাচ্ছিল; আমাকে দেখেই ব্যাজার করে নিল মুখটা। আমি বললুম, ঝিঙ্কি ফেরেনি এখনও?
না। ঘাড় নাড়ল ঝিঙ্কির মা।
এত দেরি হয় কেন?
এ কথাটার কোনও উত্তর দিল না ঝিঙ্কির মা। একমনে কাগজে আঠা লাগাতে লাগল। ঝিঙ্কি ফিরল রাত প্রায় দশটা। চোখেমুখে ফুর্তি জমজম করছে। ঝিঙ্কিকে নিয়ে মোড়ের মাথায় চলে এলুম। বললুম, কোথায় গিয়েছিলি?
কেনাকাটা করতে।
কার জন্যে?
বাবাইয়ের।
তোর কাজ বাচ্চা সামলানো; তুই অন্য ব্যাপারে থাকিস কেন?
শোনো, আমার যেখানে খুশি সেখানে যাব, তোমার কী! ঝিঙ্কি সপাটে বলল।
রণজয় মাল কিন্তু ভাল নয়, তোর বিপদ হবে।
আমার বিপদের কথা তোমায় ভাবতে হবে না। ঝিঙ্কির গলায় বেশ ঝাঁঝ।
আমি ভাবব না তো কে ভাববে! তুই ওদের বাড়ি কাজ ছেড়ে দে।
খাব কী?
আমি খাওয়াব, তোকে বিয়ে করব। দুম করে বলে দিলুম আমি।
ঝিঙ্কি তীব্র চোখে তাকাল আমার দিকে। বলল, বিয়ে করে খাওয়াতে পারবে? আগে ভদ্দরলোকের মতো রোজগারের ধান্দা করো। আর দাঁড়াল না ঝিঙ্কি। ঠরঠর করে চলে গেল। ক’দিন ধরে আমার মটকা গরম। ঝিঙ্কি একদম পাত্তা দিচ্ছে না আমাকে। ঝিঙ্কির সাজের বাহার বেড়েছে। চুল কাটিয়েছে পার্লারে গিয়ে। ছোট ছোট চুলগুলো যখন কপালের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে ঝিঙ্কিকে ডিটো প্রীতি জিন্টার মতো দেখায়। কিন্তু ঝিঙ্কি আমাকে দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে নেয়। রাগে আমার শরীর চিড়বিড় করে। হারামির বাচ্চা রণজয় ঝিঙ্কিকে ছিবড়ে করে ছেড়ে দেবে। কী পেল ও রণজয়ের মধ্যে! ওই তো শুয়োরের মতো পেটমোটা চেহারা! আমার দু’নম্বরি রোজগার মেনে নিচ্ছি, কিন্তু ওদের কারবারও আগমার্কা নয়। এক বার জাল ওষুধ ধরা পড়েছিল ওদের ওষুধের দোকান থেকে। আর এক বার চোরাই মাল বেরোল সিমেন্টের গোডাউন থেকে। পয়সা আর পার্টির জোরে বেরিয়ে এসেছে।
সে দিন পাড়ায় হোল নাইট ফাংশন। দুর্গাপুজোর পর প্রতি বছর আমাদের পাড়ায় এই মোচ্ছবটা হয়। রণজয় আবার ক্লাবের পাণ্ডা; হেবি ব্যস্ত। সুযোগের অপেক্ষায় ছিলুম আমি। রণজয়দের বাড়িতে ঢুকলুম। রণজয়ের ঘরটা খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না। ঘরটা ফিটফাট সাজানো। দামি সোফাসেট, বিছানায় তুলতুলে নরম গদি। শালা এই বিছানায় ঝিঙ্কিকে টানে না কি? কিছু ক্যাশ পাওয়া গেল আর একটা দামি ক্যামেরা।
আসার আগে পেচ্ছাপ করে দিয়ে এলুম বিছানায়। পর দিন ভোরবেলা পুলিশ আমাকে তুলল। পুলিশকে একেবারেই মেহনত করতে হল না, সরাসরি দোষ স্বীকার করে নিলুম। ওসি নতুন এসেছে। পুলিশ লাইফে এত অবাক বোধহয় কোনও দিন হয়নি। কনস্টেবলকে বলল, তুই ভুল লোককে তুলে আনিসনি তো? এর তো মনে হচ্ছে মাথার ডিফেক্ট আছে। মেজবাবু কিন্তু বেশ করে সাইজ করল আমাকে। চুরি কবুল করে নেওয়ার পর এত মারের কথা নয়; তবুও মারল। বুঝলুম, রণজয়ের কথাতেই মারছে। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলুম। মারতে মারতে বেদম হয়ে মেজবাবু থামল।
দুই
এ বার মনে হয় গরমটা খুব পড়বে। বৈশাখ মাস পড়েনি কিন্তু সকাল থেকে উৎকট গরমে চার পাশ ঝাঁ ঝাঁ করছে। গরমের সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংও বাড়ছে। গরম কালে বেশি লোডশেডিং হলে আমার বড় অসুবিধে হয়। মানুষ জনের ঘুম কমে যায়। কাল ছাড়া পেয়েছি জেল থেকে। মা বাজার যেতে বলছে। হাতে আপাতত কিছু পয়সা আছে। জেলের রোজগার। কিছু দিন চলবে; তার পর আবার ধান্দায় নামতে হবে। ছাড়া পাওয়ার সময় জেলার সাহেব বহুত জ্ঞান দিয়েছে। ‘ভাল ভাবে থাকবি’, ‘সৎ পথে রোজগারের চেষ্টা করবি’, এই সব ফালতু বাত। আরে শালা, জ্ঞান দিতে হলে তোর নিজের লোকেদের দে। জেলের ভেতরকার চুরিচামারি, দু’নম্বরি দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে।
এখন ক’দিন রাস্তাঘাটে লোকে আমার দিকে আড়চোখে তাকাবে, ফিসফাস আলোচনা করবে। কিছু দিন বাড়তি সতর্কও থাকবে। তার পর আস্তে আস্তে সব নর্মাল হয়ে যাবে। এই সময়টায় এলাকায় কিছু করা যাবে না, বাইরে ধান্দা করতে হবে।
বাড়ি থেকে বেরোবার মুখে ধাক্কা খেলুম। ঝিঙ্কি। কাল থেকে ঝিঙ্কির কথা কয়েক বার মনে পড়েছে; কিন্তু মনটাকে শক্ত করে নিয়েছি। ঝিঙ্কিকে শিওর ঝেড়ে ফেলব মন থেকে। স্বেচ্ছায় যদি কেউ গাদায় যেতে চায় আমি আর কী করতে পারি! ঝিঙ্কিকে দেখে মনটা শক্ত করে নিলুম। ঝিঙ্কি বলল, তোমার সঙ্গে একটা কথা ছিল বাপিদা।
আমার সঙ্গে! ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলুম।
হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে। তুমি কাল ফিরেছ খবর পেয়েছি।
‘ফিরেছ’ কথাটা শুনতে বেশ লাগল। যেন কোনও জরুরি কাজে বাইরে ছিলুম। কাল যখন ফিরছি বাজারের মোড়ে সাট্টা বিশুর সঙ্গে দেখা। বিশু গাঁদা ফুলের পাপড়ির মতো হলদে দাঁতগুলো কেলিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী রে, কবে ছাড়া পেলি? কথাটা কেমন যেন লেগেছিল।
আমি চোখমুখ শক্ত করে বললুম, বলে ফেল কী বলবি।
ভেতরে চলো না, এখানে দাঁড়িয়ে বলা যাবে না।
ঘরে বসে ঝিঙ্কিকে ভাল করে লক্ষ করলুম। একটু যেন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। চোখের কোলগুলো বসা। বেমক্কা হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল ঝিঙ্কি। এর পর ঝিঙ্কি যা বলল শুনে একটুও অবাক হলুম না। এ রকম কিছু একটা আন্দাজ করেছিলুম। ঝিঙ্কির পেটে বাচ্চা। রণজয়ের বাচ্চা। কিন্তু হলে কী হবে, রণজয় অস্বীকার করছে।
আমি বললুম, আমাকে এ সব বলছিস কেন? আমি কী করব?
ঝিঙ্কি বলল, তুমি ক্লাবের ছেলেদের বলে ওকে চাপ দাও।
তোর তো অনেক নাগর; হারু, বিকাশ ওদের বল না।
হারুদাকে বলেছিলুম; কিন্তু হারুদাকে টাকা খাইয়ে ম্যানেজ করে ফেলেছে। ঝিঙ্কি ফোঁপাতে লাগল।
চুপ করে বসে ঝিঙ্কিকে দেখছি আর ভাবছি, এ-ও কি সম্ভব। এ তো সিনেমার গল্প। আমার নসিবে শালা এত কিছু লেখা ছিল। বললুম, তুই এখন বাড়ি যা; ভেবে দেখি কী করা যায়। বাড়িটার দিকে যত এগোচ্ছি, তত যেন টান ধরছে হাঁটায়। মনে হচ্ছে, ওই বাড়িটা জেলখানা। সামনেই সাদা দোতলা বাড়ি। বাইরে রংচটা সাইন বোর্ডে লেখা, সেবা নিকেতন। ভোরবেলা ঝিঙ্কিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি বাড়ি থেকে। তার পর ঘণ্টাখানেক বাসে করে এসে নেমেছি নাজিরগঞ্জে। বাসস্ট্যাণ্ড থেকে মিনিট দশেক হেঁটেই সেবা নিকেতন। নামেই নার্সিং হোম, এখানে শুধু বাচ্চা খালাসের কেস হয়।
একেই বলে বরাত। কেলেঙ্কারি থেকে আমার কিছু ফায়দা এল। ঝিঙ্কিকে বোঝালুম, তুই রণজয়ের আশা ছাড়, বরং এই তালে চাপ দিয়ে কিছু ঝেঁপে নে। ঝিঙ্কিও রাজি হয়ে গেল। ঝিঙ্কির দাদা সেজে ফোনে রণজয়কে হুমকি দিলুম। পেট খসাবার খরচার সঙ্গে বাড়তি বিশ হাজার টাকা দেবে রণজয়। নাজিরগঞ্জের এই নার্সিং হোমটার সঙ্গে ব্যবস্থা করে ফেললুম। ঝিঙ্কি আমাকে দুই দেবে; আমার তদ্বিরের চার্জ। নার্সিং হোমের রেটও কিছু বাড়িয়ে বলেছিলুম; সেখান থেকেও কিছু থাকবে।
খুব সকালবেলা ঝিঙ্কি এল আমার বাড়িতে। ওর সেই ধসে যাওয়া চেহারাটা আর নেই। একটু সেজেছে। মালকড়ি অনেকটা ব্লটিং পেপারের মতো; ছোটখাটো দুঃখটুঃখগুলো শুষে নেয়। ঝিঙ্কির এখন পকেট গরম। আমার টাকাটা আমি বুঝে নিয়েছি। নার্সিং হোমের চার্জটাও বেরোবার আগে নিয়ে নিয়েছি ঝিঙ্কির কাছ থেকে। বাসে আসতে আসতে এক বার মনে হয়েছিল টাকাগুলো নিয়ে কেটে পড়ি। ঝিঙ্কির চোখ পিছলে বাস থেকে নেমে যাওয়াটা কোনও ব্যাপার নয়। তার পর ভাবলুম, থাক; ঝিঙ্কি এখন বড়লোক, ওর থেকে পরে ধান্দা করে আরও কিছু বাগাতে হবে।
ভাঙাচোরা সরু পিচ রাস্তা। অটো বা রিকশা গেলে রাস্তার একেবারে ধারে সরে যেতে হচ্ছে। আগে-পিছে হাঁটছি দু’জনে। আমার পকেটে টাকা। রণজয়ের দেওয়া টাকায় রণজয়ের মাল খালাস করাতে হচ্ছে আমাকে। শালা রণজয়! পুলিশ লেলিয়ে ক্যামেরাটা উদ্ধার করেছিলি!
পকেটে হাত দিয়ে টাকাগুলো ছুঁয়ে দেখলুম এক বার। টাকাগুলো যেন খলবল করে আঙুলগুলো ধরতে চাইল। হারামির বাচ্চা রণজয়, আর একটু টাইম পেলে ক্যামেরাটা আর কাড়তে পারতিস না।
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পড়লুম। শ্বাস নিলুম বড় করে। আমাকে হঠাৎ দাঁড়াতে দেখে ঝিঙ্কি অবাক। বলল, কী হল তোমার শরীর টরির খারাপ নাকি?
না। মাথা নাড়লুম আমি।
তা হলে; দাঁড়ালে যে!
বলছিলুম কী, চল বাড়ি ফিরে যাই।
ঝিঙ্কি বলল, বাড়ি ফিরে যাব; এটাই তো নার্সিং হোম বলে মনে হচ্ছে!
বললুম, ঝিঙ্কি বাচ্চাটা থাক বুঝলি; খালাস করে কাজ নেই।
তার মানে! ঝিঙ্কি বেশ জোরে বলে উঠল, তোমার মতলবটা খুলে বলো তো; টাকাগুলো ঝেড়ে দেবার ধান্দায় আছ মনে হচ্ছে! আমি মাথা নাড়লুম। হাসলুম একটু। ভাল করে ঝিঙ্কিকে এক বার দেখে নিয়ে বললুম, আচ্ছা ধর, আমি যদি তোকে বিয়ে করি?
প্রথম প্রকাশ : আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪১৪ রবিবার ৯ ডিসেম্বর ২০০৭