| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ভাগ্যবান চিনু শাঁখারি লিখেছেন প্রণবেশ চক্রবর্তী

Reporter
প্রণবেশ চক্রবর্তী / ১৬২০ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৬ আগস্ট, ২০২১

‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে’ (উদ্বোধন সংস্করণ) আমরা দু’বার চিনু শাঁখারির উল্লেখ দেখতে পাই। দু-বারই স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর বাল্যসখার কথা আমাদের শুনিয়েছেন। কামারপুকুরের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন (প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৬৭৬) ‘কি অবস্থা সব গেছে! দেশে চিনে শাঁখারি আর আমাদের সমবয়সীদের বললাম, ওরে তোদের পায়ে পড়ি, একবার হরিবোল বল! সকলের পায়ে পড়তে যাই! তখন চিনে বললে, ওরে তোর (শ্রীরামকৃষ্ণের) এখন প্রথম অনুরাগ তাই সব সমান বোধ হয়েছে। প্রথম ঝড় উঠছে যখন ধূলা ওড়ে, তখন আমগাছ, তেঁতুল গাছ সব এমন বোধ হয়! এটা আমগাছ এটা তেঁতুল গাছ চেনা যায় না।’

অর্থাৎ, প্রথম অনুরাগে সবকিছু সমান হয়ে যায় — পার্থক্য বলতে কিছু থাকে না। শ্রীরামকৃষ্ণের বাল্যলীলা দেখে পরম বৈষ্ণব চিনু শাঁখারির মনে সেই সমদর্শিতার কথাই স্মরণে এসেছে। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে ভৈরবী ব্রাহ্মণী যোগেশ্বরী শ্রীরামকৃষ্ণকে ‘অবতার’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেই ঘোষণার বহু আগে কামারপুকুরে চিনু শাঁখারি তাঁর ভক্ত হৃদয়ের প্রেমদৃষ্টিতে শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে নবযুগের অবতারকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

‘কথামৃত’ দ্বিতীয় খণ্ডে (উদ্বোধন সংস্করণ) আরেক চিনু শাঁখারির উল্লেখ দেখতে পাই ৮৭৯ পৃষ্ঠায়। সেদিন ছিল ১৮৮৫ সালের ৭ মার্চ, শনিবার। তখন বেলা তিনটা দক্ষিণেশ্বরের আনন্দসভায় রাখাল (স্বামী ব্রহ্মানন্দ), নরেন (স্বামী বিবেকানন্দ), বাবুরাম (স্বামী প্রেমানন্দ) প্রমুখ উপাধি ঠাকুরের জন্য মোহিনী মোহন সন্দেশ এনেছেন। ঠাকুর প্রণব উচ্চারণ করে সেই সন্দেশ স্পর্শ করলেন এবং নিজে কিঞ্চিৎ গ্রহণ করে প্রসাদ করে দিলেন। তারপর সেই প্রসাদ ভক্তদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে থাকেন। কি আশ্চর্য ছোট নরেনকে (নরেন্দ্রনাথ মিত্র— কথামৃতকার মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের ছাত্র) ও দু-একজন ছোকরা ভক্তকে নিজে খাইয়ে দিচ্ছেন।

কেন বিশেষ কয়েকজনকে নিজে খাইয়ে দিচ্ছেন, সেটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, ‘এর একটা মানে আছে। নারায়ণ শুদ্ধাত্মাদের ভিতর বেশি প্রকাশ। ও যে (কামারপুকুরে) যখন যেতুম ওইরূপ ছেলেদের কারু কারু মুখে নিজে খাবার দিতাম। চিনে শাঁখারি বলত, ‘উনি আমাদের খাইয়ে দেন না কেন?’

স্বামী সারদানন্দ ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলা প্রসঙ্গ’-এ (প্রথম খণ্ড, পৃঃ ১৪০) লিখেছেন, ‘আবার এই বয়সেই বালক (গদাধর) পরিণত বয়স্কের ন্যায় বুদ্ধি ধারণ করায় তাঁহাদিগের (কামারপুকুরের সাধারণ মানুষ) মধ্যে অনেকে নিজ নিজ সাংসারিক সমস্যা-সকলের সমাধানের জন্য তাঁহার (গদাধরের) পরামর্শ গ্রহণ করিতেন। ধার্মিক ব্যাক্তি এইরূপে তাঁহার পূত স্বভাবে আকৃষ্ট হইয়া এবং ভগবৎ নাম ও কীর্তনে তাঁহার ভাবসমাধি হইতে দেখিয়া তাঁহার পরামর্শ গ্রহণ পূর্বক নিজ গন্তব্যপথে অগ্রসর হইতেছে! শুনা যায়, শ্রীনিবাস শাঁখারি প্রমুখ কয়েকজন যুবক শ্রীযুক্ত গদাধরকে (বালক অবস্থাতেই) এখন হইতে দেবতাজ্ঞানে ভক্তি ও পূজা করিত।’

আসল নাম শ্রীনিবাস, শাঁখ সংক্রান্ত কাজকর্ম ছিল তাঁদের জাতব্যবসা। সেই শ্রীনিবাসই একদিন প্রাকৃতিক নিয়মে ‘চিনিবাস’ হয়ে গিয়েছিল এবং ‘চিনিবাস’ থেকেই ‘চিনু’ ‘চিনে’ নাম।

অক্ষয়কুমার সেনের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথিতে’ বারবার আমরা চিনু শাঁখারির প্রসঙ্গ লক্ষ্য করি। কিন্তু কে এই চিনু শাঁখারি? ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথিতে’ বলা হয়েছে—

‘চিনু নামে একজন শাঁখারির জাতি।

দরিদ্র তাহাতে বৃদ্ধ গ্রামেতে বসতি।।

ব্যবসায় অল্প আয় কষ্টে গুজরান।

কিন্তু তাঁর গদাধরে ছিল বড় টান।।’

শ্রীরামকৃষ্ণের বাল্যসখা এই চিনু শাঁখারি বংশে জন্মগ্রহণ করলেও স্বীয় অপার ভক্তি ও নিরলস সাধনায় এক উন্নত চরিত্রের জীবন ও বিভূতির অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন। পরম বৈষ্ণব চিনুর সঙ্গে গদাধরের এক পরম আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন, অবতার যখন আসেন, তখন অন্তরঙ্গ ভক্ত ছাড়া সাধারণ লোকে জানতে পারে না, গোপনে আসেন। রাম পূর্ণ ব্রহ্ম, অবতার, একথা বারোজন ঋষি ছাড়া আর কেউ জানতো না। ….তিনি ভক্তের জন্য দেহধারণ করে আসেন, তখন তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ভক্তরাও আসেন, কেউ অন্তরঙ্গ, কেউ বহিরঙ্গ, কেউ রসদদার। চিনু শাঁখারি ছিলেন একান্তই অন্তরঙ্গ— তাই তিনি অবতারের স্বরূপ প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি’তে বলা হয়েছে—

‘ভক্তবর শ্রীনিবাস শাঁখারির জাতি।

ভগবৎ ভক্ত তেঁহ প্রভু পদে মতি।।’

‘পুঁথি’ অনুসরণ করে জানতে পারি—

‘আপ্তসাঙ্গ চিনিবাস দৃষ্টি বহুদূর।

বুঝে সকলের সার গদাই ঠাকুর।।’

সৌম্য দর্শন পরম বৈষ্ণব চিনু গদাধরকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতেন— ‘ওরে গদাই, তোকে দেখে আমার গৌরাঙ্গ মনে হয়।’ গদাধর যে সত্যি বিষ্ণুর অংশে জন্মগ্রহণ করেছেন— এ ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ছিলেন চিনু।

কামারপুকুরে বাস করতেন চিনু— তাঁর একটা ছোট মুদিখানা দোকান ছিল। আবার সময় ও সুযোগমত জাত-ব্যবসাও করতেন। দারিদ্র্যের সঙ্গে যেমন তিনি প্রতিনিয়ত লড়াই করতেন, তেমনি লড়াই করতেন দুর্ভাগ্যের বিরুদ্ধেও। তবু সরলপ্রাণ এই মানুষ ধর্মের পথ থেকে কখনও বিচ্যুত হননি, ঈশ্বরে বিশ্বাস ছিল তাঁর অদম্য। তাঁর যখন মাত্র পঁচিশ বছর বয়স (জন্ম আনুমানিক বাংলা ১২২৬ সাল) তখনই একমাত্র কন্যা বিলাসিনীকে রেখে তাঁর পত্নী ইহলোক ত্যাগ করেন। চিনুর পিতা ছিলেন গোপাল শাঁখারি। শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর বয়সের ব্যবধান ছিল পনেরো বছরের মত। তবু এই দুই অসম বয়সের মানুষ নিবিড় আত্মিক সম্পর্কে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন।

এই পার্থিব সংসারে সব বন্ধনই মায়ার বন্ধন। পরম বৈষ্ণব চিনু এই সত্য অনুধাবন করেছিলেন। তাই আর বিয়ে করেননি। চিনুর আবাস ও দোকান ছিল গদাধরের বাড়ির একটু দূরে— পূব দিকে। আর তাঁর বাড়ির কাছেই নদেপাড়ায় ছিল বৈষ্ণবদের এক আখড়া। চিনু নিয়মিত সেই আখড়ায় যাতায়াত করতেন। শেষপর্যন্ত সেই আখড়ার মোহান্তের কাছেই চিনু দীক্ষা গ্রহণ করেন। কন্যা বিলাসিনীর বিয়েও দিয়েছিলেন নিজের সাধ্যানুসারে। কিন্তু বিলাসিনীর জীবনে স্বামী-সুখ ছিল নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী। স্বামীকে হারিয়ে তিনি আবার ফিরে আসেন পিতার কাছেই।

দুঃখের আগুনে পুড়িয়েই ভগবান চিনুকে খাঁটি সোনায় পরিণত করেছিলেন। কন্যাকেও তিনি বৈষ্ণব মন্ত্রে— দীক্ষিত করেন। নিজের বাড়িতেই তিনি গৌর-নিতাই ও রাধা গোবিন্দের মন্দির তৈরি করেন এবং সেই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন নিম-কাঠের গৌর-নিতাই মূর্তি ও মৃন্ময় রাধা-গোবিন্দের মূর্তি। ভজন-পূজন ও জীব-সেবার মাধ্যমেই তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনকে পূর্ণতার লক্ষ্যে নিয়ে যান। তিনি কখনও সঞ্চয় করতেন না, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবকিছুই তিনি দুঃখীজনের মধ্যে বিতরণ করে দিতেন। নিয়মিত করতেন সাধু-সেবা। ঈশ্বরই বস্তু, আর সবই অবস্তু— এই ধারণাকে সম্বল করে তিনি তাঁর জীবনকে করে তুলেছিলেন ঐশ্বর্যময়।

চিনু শাঁখারি যেমন আনন্দময়, তেমনি বিস্ময়কর। তাঁর আরাধ্য দেবতাকে তিনি শুধু হৃদয়ে স্থান দেননি, সেই দেবতাকে তিনি প্রত্যক্ষ করার সাধনায়ও সিদ্ধিলাভ করেছেন।

একদিন চিনু স্বীয় ইষ্টদেবতাকে সাজাবার জন্য আপন মনে মালা গাঁথছেন। কোনও দিকেই তাঁর খেয়াল নেই। হঠাৎ সেদিন তাঁর সামনে এসে হাজির হলেন বালক গদাধর। গদাধরকে দেখা মাত্র তাঁর মধ্যে এক অদ্ভূত ভাবান্তর হল। তাঁর মনে হল, যে দেবতার জন্য তিনি মালা গাঁথছিলেন সেই দেবতাই জীবন্তরূপ ধরে তাঁর সামনে উপস্থিত।
ভক্ত-হৃদয় ভগবানেরই বৈঠকখানা। চিনু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কর্তব্যকর্ম স্থির করে ফেললেন। মালা গাঁথা বন্ধ রেখে তিনি ছুটলেন কাছের একটা দোকানে। একটা পরম মুহূর্তে ভগবানকে যখন হাতের কাছে পেয়েছেন, তখন কি তিনি হেলায় সে সুযোগ হারাতে পারেন? তাড়াতাড়ি দোকান থেকে কিছু ফল ও মিষ্টি কিনে নিয়ে তিনি ফিরে এলেন। তারপর ইষ্টদেবতার জন্য গাঁথা মালা দিয়ে গদাধরকে মনের মত করে সাজালেন, দেবতাজ্ঞানে বালককে পূজা করলেন, স্তুতি করলেন, খাওয়ালেন ফল ও মিষ্টি। তারপর করজোড়ে বললেন, ‘বাবা গদাই, আমি ভজনহীন দীন কাঙাল, এ পৃথিবী থেকে হয়ত অল্পদিনের মধ্যে চলে যাব, কিন্তু তুমি জগতের কল্যাণের জন্য ভবিষ্যতে অনেক কাজ করবে— তা’ দেখার সৌভাগ্য আমার হবে না।’ কথা বলতে বলতে চিনুর দু-চোখ দিয়ে নেমে এল তপ্ত অশ্রুধারা। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে চিনু তাঁর জীবন্ত ইষ্টদেবতা গদাধরের কাছে প্রার্থনা জানালেন, ‘আমার শেষ প্রার্থনা, তুমি যেন আমাকে ভুলো না।’

সুখ নয়, শান্তি নয়, ধন নয়, মানও নয়— শুধু ভগবানের করুণা লাভের জন্য তীব্র আকুতি ধ্বনিত হয়ে থাকে নিষ্কাম ভক্ত চিনু শাঁখারির কণ্ঠে। প্রকৃতপক্ষে চিনু গদাধরকে চিনেছিলেন, বুঝেছিলেন তাঁর প্রবল অবতার-রূপ— তাই এমন নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।

ভাগবত ও অন্যান্য শাস্ত্রগ্রন্থ, বিশেষ করে বৈষ্ণবীয় ধর্মগ্রন্থ চিনু খুব ভালোভাবে পড়েছিলেন। শুধু বালক অবস্থাতেই নয়, পরবর্তীকালেও শ্রীরামকৃষ্ণ যখনই কামারপুকুরে আসতেন, তখন প্রায়ই তিনি চিনুর বাড়িতে গিয়ে হাজির হতেন। দু-জন বিভিন্ন শাস্ত্র আলোচনায় ডুবে যেতেন। ওদের কখনও কখনও দু-জনের মধ্যে লেগে যেত তর্কযুদ্ধ। চিনুর মধ্যে মাঝে মাঝে বিভূতির প্রকাশ ঘটত। শ্রীরামকৃষ্ণ কিন্তু এইসব সিদ্ধার্হ পছন্দ করতেন না। কারণ, চিনু ছিলেন শুদ্ধ-আত্মা, ভক্তিপথের পরম সাধক। তাই, চিনু যাতে সিদ্ধার্হ-এর আকর্ষণে নিজের সাধনপথ থেকে সরে না যান, সে-ব্যাপারে শ্রীরামকৃষ্ণ অনেক উপদেশ দিয়েছিলেন।

যদিও চিনু বয়সের পরিমাপে শ্রীরামকৃষ্ণের চাইতে অনেকাই বড় ছিলেন, কিন্তু দু-জনের মধ্যে সম্পর্কটা ছিল গভীর। চিনু মনে করতেন, শ্রীগৌরাঙ্গই গদাধর রূপ ধারণ করে আবির্ভূত হয়েছেন। আবার শ্রীরামকৃষ্ণও চিনুকে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন— বিশেষ সম্মান দিতেন। অক্ষয়কুমার সেন এই প্রসঙ্গে লিখেছেন—

‘বলরাম অবতার ভক্ত চিনিবাস।

‘দাদা’ শব্দে শ্রীপ্রভুর আছিল সম্ভাষ।।

দাদা বলে ডাকিলে গলিয়ে যেত চিনু।

পরম উল্লাসে মন গদগদ তনু।।’

শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথিতে দু-জনের স্বর্গীয় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে —

‘প্রভুরে দেখিয়া চিনু এত মত্ত হত

কাঁধেতে চড়ায়ে তাঁর প্রচুর নাচিত।।’

চিনুর ছোট দোকান, অল্প আয়। সেই দোকানে শ্রীরামকৃষ্ণ যখনই আসতেন, তখনই যেন চিনুর মনে হত, সব দুঃখের অবসান হয়ে গেছে, সব অন্ধকার গেছে আলোর বন্যায় ভেসে। চিনুর দোকানে একটু বেশি কেনাকাটা হলেই সেই অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে মিষ্টি কিনে তিনি তাঁর ইষ্টদেবতার সেবা করতেন। সে সময় দোকানে ক্রেতা এলেও সেদিকে তাকাবার মত সময় তাঁর থাকতো না। তিনি তখন তদ্‌গত, তন্ময়।

একটা কথা এ প্রসঙ্গে অবশ্যই স্মরণীয়। বাল্যলীলায় একজন অবতারকে চেনা বা বোঝা কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ভগবানের বিশেষ করুণা এবং নিজের বহুজন্মের শুদ্ধ সংস্কারের ফলেই তা’ সম্ভব। শ্রীরামকৃষ্ণের বাল্যলীলায় প্রথম পরম অনুরাগী ভক্তই শুধু নয়, অবতারের স্বরূপ সাধারণের কাছে প্রথম তুলে ধরার কাজ চিনু শাঁখারিই করেছিলেন। আর সেইজন্যই শ্রীরামকৃষ্ণ-মহাজীবনের লীলাসঙ্গীরূপে চিনু শাঁখারিও চিরকালের জন্য শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত।

চিনু শাঁখারি সম্পর্কে অনেক অদ্ভূত কাহিনী শোনা যায়। শোনা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণের পরিচিত কয়েকজন একবার চিনুর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন। এতে চিনু পরম আনন্দিত হয়ে সাধ্যমত তিনি অতিথি সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু সব যখন ঠিকঠাক চলছিল, তখন হঠাৎই বিপত্তি ঘটালেন অতিথিদের মধ্যে একজন। যদিও তখন আমের সময় নয়, তবু সেই অতিথি ‘চিনুদাদার’ কাছে আমের টক দিয়ে মৌরলা মাছ খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।

চিনু পড়লেন মহা সঙ্কটে। একে অতিথি নারায়ণ, তার উপর আবার শ্রীরামকৃষ্ণের পরিচিত। কিন্তু মৌরলা মাছ জোগাড় হলেও সেইসময় আম জোগাড় হবে কিভাবে। চিনু ভেবে কোনও পথ খুঁজে পান না। অথচ অতিথিকে তৃপ্ত না করেও রেহাই নেই। শেষপর্যন্ত নিরূপায় চিনু করজোড় গলায় কাপড় দিয়ে তাঁর বাড়ির কাছে একটা আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে নিজের বিপদের কথা জানাতে থাকেন। তিনি আমগাছকে তাঁর ত্রাণকর্তা হিসেবে বেছে নিলেন, বললেন, ভগবান যেমন অতিথির বেশ ধরে ভক্তকে ছলনা করতে আসেন আমার বাড়িতেও তাই এসেছেন। তাঁর মত একজন দীন কাঙাল ভক্ত এখন, এই অসময়ে আম পাবেন কোথায়? অতিথিকে তুষ্ট করতে না পারলে সেটা যে অপরাধ হবে। তাঁর এই বিপদ দেখেও কি বিপদতারণ ভগবানের দয়া হবে না?

ভগবান ভক্তের অধীন। ভক্তের কান্নায় ভগবানেরও আসন টলে যায়। এক্ষেত্রেও ঘটল এক বিস্ময়কর কাণ্ড। হঠাৎ কয়েকটা কাঁচা আম সেই গাছটা থেকে টুপটাপ মাটিতে পড়ল। চিনু নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ভগবানের অপার করুণায় তিনি চিত্রার্পিতের মত সেই আমের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

অতিথিরা শুধু সেদিন চিনুর বাড়ি থেকে তৃপ্ত হয়েই ফিরে যাননি, এমন অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তাঁরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। পরে দক্ষিণেশ্বরে এসে তাঁরা এই অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা শ্রীরামকৃষ্ণকেও বলেছিলেন। সবকিছু শুনে ঠাকুর সেদিন বলেছিলেন, ‘যে ঠিক ভক্ত, সে চেষ্টা না করলেও ঈশ্বর তার সব জুটিয়ে দেন।’ অবশ্য শ্রীরামকৃষ্ণ কোনওদিনই এইসব সিদ্ধার্হকে সমর্থন বা স্বীকার করতেন না। চিনু শাঁখারির ক্ষেত্রেও সমর্থন করেননি।

‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ’ অবলম্বনে স্বামী তেজসানন্দ যে ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ জীবনী’ রচনা করেন, তাতে আমরা দেখি, দক্ষিণেশ্বর থেকে ‘১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে মে মাসে শুভ মুহূর্তের উদয় হইলে ঠাকুর জন্মভূমি সন্দর্শনে (কামারপুকুর) যাত্রা করিলেন। হৃদয় ও ভৈরবী ব্রাহ্মণী তাঁহার সঙ্গে যাইলেন।’ এর আগে প্রায় আট বছর শ্রীরামকৃষ্ণ কামারপুকুরে যাননি। তাঁকে পেয়ে গোটা গ্রামে যে আনন্দের হাট বসে গেল। জননী সারদামণি তখন জয়রামবাটিতে অবস্থান করছিলেন। বিয়ের পর নববধূর ভাগ্যে একবার মাত্র স্বামী সন্দর্শন লাভ হয়েছিল। এবার সারদাদেবীকেও কামারপুকুরে নিয়ে আসা হল। সেই সময় চিনু শাঁখারি ও ধনী কামারনী (ঠাকুরের ধাত্রী মাতা) সর্বক্ষণ তাঁর কাছে উপস্থিত থাকতেন। অবশ্য আরও অনেকেই সারাদিন সেখানেই কাটিয়ে দিতেন।

এই সময়ে একদিন চিনু শাঁখারি শ্রীশ্রী রঘুবীরের (ঠাকুরের কুলদেবতা) প্রসাদ পাওয়ার জন্য ঠাকুরের কাছে আসেন। স্বামী তেজসানন্দ লিখছেন, ‘মধ্যাহ্নকাল পর্যন্ত নানা ভক্তিপ্রসঙ্গে অতিবাহিত হইল এবং শ্রীশ্রী রঘুবীরের ভোগরাগাদি সম্পূর্ণ হইলে শ্রীনিবাস প্রসাদ পাইতে বসিলেন। ভোজনান্তে প্রচলিত প্রথামত তিনি আপন উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করিতে প্রবৃত্ত হইলে ব্রাহ্মণী তাঁহাকে নিষেধ করিলেন এবং বলিলেন, ‘আমরাই উহা করিব এখন।’ শ্রীনিবাস অগত্যা নিরস্ত হইয়া নিজ বাটিতে গমন করিলেন।’ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেদিন এক বিপত্তি দেখা দিয়েছিল এবং শেষপর্যন্ত ভৈরবী ব্রাহ্মণী ওই কাজ করা থেকে বিরত থাকেন।

প্রসঙ্গত স্মরণীয়, দীর্ঘজীবনের অধিকারী চিনু শ্রীরামকৃষ্ণের বিবাহ-অনুষ্ঠান দেখেছিলেন। তাঁর বিষয়-সম্পত্তি বেশি না থাকায় তিনি মন-প্রাণ ঈশ্বরে সমর্পণ করেছিলেন। ঈশ্বরীয় আলোচনা ও পূজা-পাঠ নিয়েই তিনি তন্ময় থাকতেন। তাঁর সংস্পর্শে এসে অনেক বিপথগামী মানুষও সত্যপথে ফিরে আসেন।

যতদূর জানা যায়, বাংলা ১২৯৬ থেকে ১২৯৮ সালের মধ্যে কোনও এক সময় তিনি পরম শান্তিতে দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ মুকুন্দপুরে বুড়োশিব মন্দিরের পশ্চিমদিকে সমাধিস্থ করা হয়। এই অঞ্চলে তাঁর অনুরাগী ও ভক্তের সংখ্যা কম ছিল না। তাঁরাই উদ্যোগী হয়ে সমাধির উপর এক মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ মহাসাগরে আত্মনিবেদিত চিনু শাঁখারির পবিত্র জীবনধারা আজ এক অবিনশ্বর পুণ্যপ্রবাহ।

আপনার মতামত লিখুন :

2 responses to “ভাগ্যবান চিনু শাঁখারি লিখেছেন প্রণবেশ চক্রবর্তী”

  1. Swami Nityananda Puri says:

    খুব ভাল তথ্যপূর্ণ লেখার জন্য ধন্যবাদ।

  2. Manoj Bhattacharyya says:

    Ei dharaner mulyoban tathya jante pere khubi triptilab korlam. Tathya pradankari ke antorik shroddha janai.
    Jay Ramakrishna

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev