মান্না দে-র কাকা সংগীতাচার্য কৃষ্ণচন্দ্র দে ছিলেন প্রধানত তাঁর শিক্ষক। তবে যে সময় মান্না দে বড়ো হন, সেটা ছিল একেবারেই গানের যুগ। কলকাতার বনেদি বাড়িগুলোতে দোল, দুর্গোৎসব, লক্ষ্মী-সরস্বতী পুজো ইত্যাদি অনুষ্ঠানে গানের আসর বসতো এবং ভারতবর্ষের মার্গসংগীত জগতের নক্ষত্ররা সংগীত পরিবেশন করতেন। ভুপেন্দ্র ঘোষের বাড়িতে হয়তো এসছেন ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁ, আবার শোভাবাজারের নাটমন্দিরে হয়তো এসেছেন সে সময়ে তরুণ ওস্তাদ আমীর খাঁ। মান্না দে নিজেও ওস্তাদ দবীর খাঁ, ওস্তাদ সালাম খাঁ প্রমুখ শিল্পীদের কাছে মার্গসংগীত চর্চা করেছিলেন।
শচীন দেববর্মণ তাঁকে বলতেন— দেখ মানা, বেশি কালোয়াতি রাখিস না। মান্না দেও মিড় মুড়কির বা তানকারির সঙ্গেই স্নিগ্ধতাকে খুব গুরুত্ব দিতেন। হয়তো রাগেশ্রীতে গাইলেন, ‘কওন আয়া মেরে মন কে দোয়ারে’ বা ‘অভিমানে চলে যেও না’, এর পাশাপাশি ‘তু পেয়ার কা সাগর হ্যায়’, আবার আহিরভৈরোঁতে গাইছেন, ‘পুছো না কেয়সে মেয়নে রেয়ন বিতায়ি’। সেই সঙ্গে ভাবুন, রামপ্রসাদি গাইছেন, ‘কাজ কী সামান্য ধনে’ কিংবা ‘আয় মন বেড়াতে যাবি কালীকল্প তরুমূলে’। এ ছাড়া কাকার কাছ থেকে পাওয়া কীর্তন গানে তো তাঁর ছিল রীতিমতো দাপট। সেই সঙ্গে ভাবা যায়, উত্তমকুমারের লিপে ‘শঙ্খবেলা’(১৯৬৬) ছবির জন্যে ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’— বিপরীতে গাইছেন লতা মঙ্গেশকর— এই রোম্যান্টিক গানের আবেদন আজও অমলিন। এর এক বছর পর ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গী’(১৯৬৭)-তে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়র সঙ্গে তো রীতিমতো গানের ঝরনা। ‘আমি যে জলসাঘরে বেলোয়ারি ঝাড়’ কিংবা ‘চম্পা চামেলি গোলাপেরই বাগে’। এর কাছাকাছি সময়ই গেয়েছেন ‘ছদ্মবেশী’ ছবিতে ‘বাঁচাও কে আছো মরেছি যে প্রেম করে’। আর ছিল বেসিক রেকর্ডের গান- ‘এই তো সেদিন তুমি আমাকে বোঝালে’ কিংবা ‘চাঁদের আশায় নিভিয়ে ছিলাম যে দীপ আপন হাতে’। সলিল চৌধুরীর সুরে ‘মানবো না বন্ধনে’, ‘এই দেশ এই দেশ’ বা ‘ও আলোর পথযাত্রী’র মতো গানও গেয়েছেন।
১৯৪২-এ ‘তমন্না’ ছবিতে সুরইয়ার বিপরীতে তাঁর প্লেব্যাক গান শুরু। তবে ১৯৫০ সালে শচীন দেববর্মণের সুরে ‘মশাল’ ছবির জন্য তাঁর গান ‘উপর গগন বিশাল’ ভারতজোড়া সাড়া পায়। আর লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে গাওয়া রাজ কপুরের ‘শ্রী ৪২০’ ছবির জন্য ‘পেয়ার হুয়া ইকরার হুয়া’— এই গানটি ভারতীয় ছবিতে এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে প্রেমের গানের আইকন হয়ে উঠেছে।
মোহাম্মদ রফি বলতেন— আপনারা শোনেন আমার গান, আর আমি শুনি মান্না দা-র গান। মান্না দে নিজে বলতেন, রফি সাহাব, তালাত মেহমুদ- এঁদের সবার জন্যে নোটেশন করেছি, এবং শচীনকর্তার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে এঁদের গান তুলিয়েছি। সবসময়ই ইচ্ছা থেকেছে যে নিজের সুরে এঁদের গাইতে বলব। সেই গানের সংখ্যা খুব কম— এটা মান্না দে-র একটা অপ্রাপ্তি। কিন্তু মান্না দে’র গান শোনা মানে আমাদের কানে-প্রাণে সুর আর সুর।
মান্না দে কিন্তু রীতিমতো সংগ্রাম করে বম্বেতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। প্রথম দিকে কাজ করেছেন কৃষ্ণচন্দ্র দে, শচীন দেববর্মণ, অনিল বিস্বাস- এঁদের মতো বড়ো মাপের সুরকারদের সঙ্গে। সে সময় বম্বেতে রয়েছেন মহঃ রফি, মুকেশ, তালাত মামুদ প্রমুখ। কিশোর কুমারেরও প্রবেশ ঘটছে কিছু দিন পরেই। আর কলকাতা থেকে প্রায়শই বম্বে এসে তাঁর দেবদুর্লভ কণ্ঠ নিয়ে মাত করছেন হেমন্ত কুমার। এর মধ্যে দিয়ে নিজের স্বাতন্ত্র্যকে প্রতিষ্ঠা করেছেন মান্না দে। এটা বড়ো কম কথা না। আর বাংলা সংগীত জগতে রয়েছেন অখিলবন্ধু ঘোষ, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, জগন্ময় মিত্র, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায় এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। এঁরা এক একজনই এক একটি প্রতিষ্ঠান। তালাত মামুদও তপন কুমার নামে দারুণ জনপ্রিয়। এসবের মধ্যে মান্না দে-র সুবিস্তৃত সাংগীতিক প্রেক্ষাপট তাঁকে সহজেই স্থান করে দিলো রসজ্ঞ শ্রোতার হৃদয়ে।
তাঁর গানের জনপ্রিয়তা আজও এতটুকু কমেনি। পাড়ার জলসায় হিন্দি-বাংলা গান গাওয়ার একটা রেওয়াজ এখনও আছে। তবে মান্না দে’র গান গাইতে হলে ধ্রুপদী সংগীত, কীর্তন, এমনকি লোকসঙ্গীতও জানতে হবে। ওয়েস্টার্ন পপও বাদ যাবে না। তালিকা দীর্ঘ না করে শুধু রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল- এঁদের গানের কথা উল্লেখ করতেই হবে। অনেকেই খুব সীমিত ক্ষমতা নিয়ে মান্না দে-র গান গাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। হয়তো এঁরা নিজেদের সীমাবদ্ধতা বুঝেও ভালোবাসার টানে গেয়ে ফেলেন। তাই মান্না দে-র জনপ্রিয়তাতে ভাটা পড়েনা। বাংলা গানের প্রায় সবকটি ধারায় অবলীলায় বিচরণ করতে পারতেন মান্না দে। ১৯১৯ সালের ১ মে তাঁর জন্মদিন। চিরদিনের গান আর সুর নিয়ে মান্না দে আমাদের চিরসঙ্গী।