| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

চোখ জ্বলছে : ছোট গল্প লিখেছেন প্রশান্ত মৃধা

Reporter
প্রশান্ত মৃধা / ৭৯৬ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

আমার চোখ জ্বলছে! চোখ খুলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু সিএনজি অটোরিকশার সামনে ড্রাইভারের বাম পাশে বসে না তাকিয়ে উপায় আছে! চোখ বন্ধ করে রাখি কীভাবে? রাস্তা সরু কিন্তু সমতল। জানি একটুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখলেই ঝিমুনি আসবে। এই অচেনা বাঁকা রাস্তায় মাঝেমধ্যে দুই-একটি ছোটো টিলার ভেতরের সরু পথ দিয়ে যেতে যেতে আমি চাইলেই কি চোখ খুলে রাখতে পারি? এই পথ আমার অপরিচিত। সকালে এই পথে শিবপুর ফেরিঘাট এসেছিলাম। এখন ফিরে যাচ্ছি।

জ্বলতে থাকা সরু চোখ দুটো খুলে চারপাশ দেখি। সামনে গোপালগঞ্জ… না, না, না, না, সামনে গোলাপগঞ্জ। গোলাপগঞ্জ নেমে কোনও একটা রেস্টুরেন্টে চোখে পানির ঝাপটা দেবো। তাতে নিশ্চয়ই চোখের জ্বালা করা কমবে। হয়তো কমবে না। কাল সারারাত ঘুমাইনি। ঘুমানোর সুযোগ ছিল না। রাজবাড়ি হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় এসেছিলাম। সেখান থেকে নাইট কোচে সরাসরি সিলেট। সিলেট নেমে তারপর ঠাকইকে এসএমএস দিলাম। কারণ এতক্ষণ আমি সিম পালটেছি। ঠাকই মানুষের নাম হয় এটা আমার জানা ছিল না। কাল সন্ধ্যায় ভাঙ্গা থেকে ঢাকাগামী বাসে ওঠার পর জাজিরার কাছাকাছি আসতে আসতে প্রথম জানলাম ঠাকই একজন মানুষের নাম। সে সিলেটে থাকে। কিন্তু সিলেটের কোথায় থাকে তা আমার জানা নেই। সিলেট দেখতে কেমন, সিলেটে কোথায় বাস থামে এসব কিছু তখনও আমার জানা ছিল না। আবার নিজের এতদিন ব্যবহৃত সিম দিয়ে কাউকে ফোন করব সে উপায়ও আর নেই। আমাকে শুধু বলে দেওয়া হয়েছে, আমি যেন এখনই সিলেট চলে যাই। সিলেটে ঠাকই আমাকে জানাবে এরপর কী করতে হবে। আর ঠাকইর দুটো ফোন নাম্বার একটি সিগারেটের বাক্সোর খোসায় লিখে আমার হাতে দেয় মুন্না। সঙ্গে এ-ও জানায়, আমার নতুন সিমে ঠাকইর ফোন নাম্বার দুটো এসএমএস করে দিচ্ছে। পথে নেমে এই সিগারেটের প্যাকেটেই নতুন সিগারেট কিনে ভরে নিতে হবে। কোনওভাবেই প্যাকেটটা হাতছাড়া করা যাবে না। কেননা, ওই সিম যদি কোনওভাবে কাজ না-করে তাহলে আমি ঠাকইর নাম্বার পাবো কোথায়?

আমি মুন্নাকে তখন বলেছিলাম, ঠাকই আবার মানষির নাম হয় নিকি? শুনে মুন্না হেসেছিল। বলল, হয়। সিলেটে লেবু কলা এইসবও নাম হয়। তাছাড়া আমি আগে কখনও সিলেট আসিনি। মুন্না এসেছে। গোলাপগঞ্জের ঠাকইর কাছেই এসেছিল। ফলে মুন্নার কথা মেনে না নিয়ে উপায় ছিল না। অনুমান করে নিয়েছিলাম, সত্যি সত্যি ঠাকই নামে একজন মানুষ আছে।

কিন্তু সেই ভোররাতে সিলেট বাসস্ট্যান্ডে নেমেই আমি ভেবেছিলাম, আমি ঠাকইর দেখা পাবো। নতুন সিম দিয়ে ঠাকইকে ফোন করতে করতে ভেবেছি, সে নিশ্চয়ই কাছেপিঠে কোথাও থাকে। কিন্তু সেই সকালে ঠাকই জানায়, আমাকে গোলাপগঞ্জগামী কোনও সিএনজিতে উঠতে হবে। বাসে যেন কোনওক্রমে না উঠি। বাস পথে পথে দাঁড়াবে। সিএনজি পাওয়া যাবে বান্ধের কাছে। একটা রিকশা নিয়ে আমাকে বান্ধ পর্যন্ত আসতে হবে। এই জায়গাগুলো যেমন বান্ধ, হেতিমগঞ্জ-এ প্রথম আমার শোনা। গোলাপগঞ্জ জায়গাটার নাম আমি আগে শুনেছি মুন্নার কাছে। সেটা অবশ্য বারবার গোপালগঞ্জ হয়ে যাচ্ছিল। মুন্না জাজিরায় নেমে যাওয়ার আগে বলেছে, একটা জেলার নাম এই কাছেই, অন্যটা সিলেটের একটা থানা। তো ঠাকই বলেছে, বান্ধ থেকে সিএনজিতে উঠে সরাসরি গোলাপগঞ্জ নামতে। পথে সিএনজি হেতিমগঞ্জ থামলেও থামতে পারে। কোনওভাবেই আমি যেন রিজার্ভ সিএনজিতে না উঠি। অবশ্যই আমাকে লাইনের সিএনজিতে উঠতে হবে।

সিএনজিতে উঠে আমি ডান পাশের সিটে বসেছি। তখন ড্রাইভার আমার কাছে জানতে চায়, কই যাইতা? কথাটা শুনেই বুঝে উঠতে পারিনি আমি। প্রায় ঠোক্কর খাওয়ার দশা। অথচ ঠাকই বলেছে, বান্ধে যে সিএনজি পাই তার একটায় উঠতে। এগুলো হয়তো বিয়ানীবাজার বিয়ানীবাজার বলে ডাকবে, অথবা ডাকবে গোলাপগঞ্জ গোলাপগঞ্জ বলে। আমি যে কোনওটায় উঠে যাবো। তারপর গোলাপগঞ্জ এলে যেন নেমে যাই। ড্রাইভার ওই কথা জানতে চাইলে আমি বলি, গোলাপগঞ্জ। সে বলে, তাহলে যেন ওই সামনেরখানে যেয়ে উঠি। সামনের সিএনজিতে ততক্ষণে চার জন উঠে গেছে। আমি ড্রাইভারের ডানে উঠি। ভেবেছিলাম পিছনে বসে চোখ দুটো একটু বুঝব। সে উপায় হলো না। সারা রাত কোনওভাবেই চোখের দুপাতা এক করিনি। এখনও সে সুযোগ হলো না। বাস আসতে দেরি করেছে। মাওয়া ঘাটে আটকে ছিল অনেকক্ষণ। জাজিরায়ও ফেরির অপেক্ষায় ছিল। সেই সময় বাসের ধারে-কাছে যাইনি। বাস এপারে এসে চলতে শুরু করলে সুপারভাইজারের পেছনে পেছনে লাফিয়ে উঠেছি। আর ভেবেছি কতক্ষণ বাস ঢাকা ছাড়িয়ে সিলেটের রাস্তায় পড়ে। কিন্তু নরসিংদী আসার পরে ফোনে মুন্নার মেসেজ আসে। ঠাকইকে এসএমএস দেয়ার জন্য। কিন্তু আমি ঠাকইকে এসএমএস দেবো কি উলটো ঠাকই এসএমএস দিয়ে জানায়, সাবধান। পথে কারও সাথে আলাপ করার দরকার নেই। আমি ওকে লেখার পর আবার মেসেজ আসে। যে হোটেলেই থামুক না কেন, আমি যেন ভেতরে না ঢুকি। তখন বেশ খিদে পেয়েছিল। কিন্তু আমি কিছু খাইনি। ওই শেষরাতে হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে পর পর তিনটে সিগারেট টেনেছি। হাতের ছোট্ট বোতলের পানিটুকু শেষ করে একবার ভেবেছিলাম, ভেতরে ঢুকে এক বোতল পানি কিনি। পরে কী মনে করে তা-ও কিনিনি। এবারও বাস প্রায় রাস্তার কাছাকাছি এলে তারপর সুপারভাইজারের সঙ্গে উঠে নিজের পেছনের দিকে সিটে বসে চোখ বুঝি। আর তখন আবার ঠাকইর এসএমএস, ঘুমাতে মানা। লোকটা যেন আমার সঙ্গে সঙ্গে চলছে।

ঠাকইর নির্দেশমতো গোলাপগঞ্জ নেমে আমি একটা ইলেকট্রিসিটি খাম্বার গোড়ায় দাঁড়াই। আর খেয়াল করি কোন খাম্বার নীচে দুটো ভিত্তিপ্রস্তর আছে। পেয়ে যাই। তারপর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে ডান হাতে নেই। তখনই আমার পাশে এসে একটা মোটরবাইক দাঁড়ায়। আমার কাছে জানতে চায়, শেষ চার নাম্বার। প্রথমে মনে আসছিল না। সিমটা কাল সন্ধ্যায় হাতে পেয়েছি। মনে থাকার কোনও কারণ নেই। তবু বারকয়েক ভেবে শেষ তিন ডিজিট বলি : ফোর থ্রি ফোর! মোটরসাইকেল ওয়ালা সন্দেহের চোখে তাকাতে তাকাতে বলে, তার আগেরটা? আমি সিগারেটের প্যাকেট থেকে ধামইর নাম্বার দেখাই। বলি, ঠাকই পাঠিয়েছে? সে-ও বলে, হ্যাঁ, ঠাকই। না, তা-ও না, ক/খ-এর পাশাপাশি। তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনি, কলা? বলেই হাসি। আগে মানুষের নাম লেবু শুনেছি, কলা কখনও শুনিনি। কলা আমাকে তার মোটরসাইকেলের পেছনে বসতে বলে। যদিও মুন্না বলেছিল, সিলেটে সে কলা নামের একজনকে দেখেছে। আমার হাসিটা কলা বোঝে। আমি তার মোটরবাইকের পেছনে বসামাত্র বলে, কলা নাম আমার বাড়ির লোকজন রাখেনি, পাড়ার লোকজন রেখেছে। এইটুকু বলামাত্র আমার আর পরের প্রশ্ন করা হয় না। এই মুহূর্তে সে সুযোগও ছিল না। কেননা, কলাই আমার কাছে জানতে চায়, আমি আখনি কি খাব, পরোটা না সেঁকা রুটি? আখনি শব্দটা এই প্রথম শুনলাম। আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। ফলে তা নিয়ে কিছু না বলে আমি বলি, পরোটা হলেই ভালো। তারপর একটা রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়ায়। আমি রেস্টুরেন্টার নাম পড়ি। নীচে গোলাপগঞ্জ লেখা দেখি। কলা ভেতরে ঢুকে আমার জন্য তিনটে পরোটা আর একটা ডিমের অর্ডার দেয়। তারপর সেগুলো একটা পলিথিনের ব্যাগে নিয়ে বেরিয়ে এসে আবার মোটরবাইক স্টার্ট দেয়। আমি শুধু জানতে চেয়েছি, কোথায় যান। কলা বলে, শিবপুর।

এখন শিবপুর থেকে ফিরছি। সব মিলে প্রায় ঘণ্টা চারেকের জন্য শিবপুর যাওয়া। শিবপুর ফেরিঘাট এলাকায় পৌঁছে বুঝলাম, জায়গাটাকে কেউ কেউ শিকপরও বলে। আমি এখানে একটা ছোট্ট টংঘরে বসেছিলাম। সামনে ডাব বিক্রি করে। দাম জানতে চাইলাম। যা দাম চাইল, তা যশোর-কুষ্টিয়ার চেয়ে একটু বেশি। এ তো ডাবের এলাকা নয়, দাম বেশি হবে, তা-ই স্বাভাবিক। কিন্তু এই দাম জিজ্ঞাসা করায় একটা সমস্যা হলো। আমার কাছে একজন জানতে চাইল, আমার বাড়ি কোথায়? আমি যশোর বলার পরে ফেরিঘাটে শসা বিক্রি করে একটা ছেলে বলল, ঠাকই ভাইর মেহমান। তারপর কলার নাম করে কীসব বলল। এত দ্রুত যে কথা আমি বুঝতে পারলাম না।

এখানে পৌঁছোতে পৌঁছোতে প্রায় সকাল ১০টা। আমি মোবাইলে সময় দেখলাম। কলা যে আমার জন্য নাস্তা কিনেছিল আল আমিন হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট থেকে, সেগুলো তার মোটরবাইকের হ্যান্ডেলেই ঝুলানো রয়ে গেছে। কলা আমাকে নামিয়ে দিয়ে কোথায় গেল ঠিক বুঝতে পারলাম না। আর এই টের পেলাম গোটা রাত্তির জাগরণে এখন আমার চোখ জ্বলছে।

একটু বাদেই সেই শসাওয়ালা ছেলেটি আবার আসে। যে-টংঘরটায় আমি বসে আছি তার সামনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হাত নেড়ে বলে, ও ভাইসাব, আমরার লগে আউক্কা। এ কথায় আমি ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। ও ভাইসাব আর আমরার এই দুটো কথার অর্থ আমি বুঝতে পেরেছি। ছেলেটি আবারও বলে আউক্কা। তারপর হাত নাড়ে ও হাসে। এক হাতে তার শসার ডালা।

আমি উঠে ছেলেটার পেছন পেছন যাই। একটা রাস্তা ফেরিঘাটের দিকে নেমে গেছে। এর অপর দিক দিয়ে আর একটি রাস্তা, পিচঢালা ও সরু। ছেলেটি সেই পথ ধরে এগিয়ে যায়। একটু এগোলে একটা মুদির দোকান। তারপর ভাতের হোটেল। ভেতরের দিকে একটি টেলিভিশন, ওপারে সবাই প্রায় উলটো ঘুরে সেই দিকে চোখ দিয়ে আছে। এত জোরে টেলিভিশনটি চলছে যে রাস্তা থেকেই সংলাপ শোনা যায়।

আমি শসাওয়ালা ছেলেটার পেছন পেছন ওই পর্যন্ত পৌঁছোতেই কলা ওই হোটেল থেকে বেরিয়ে আসে। হয়তো আমার ব্যাপারে কোনও আলাপ করতে ঢুকেছিল। শসাওয়ালা ছেলেটি চলে যায়। কলা হোটেলের কাকে যেন গলা তুলে ডাকে। তারপর সে কলার সঙ্গে আসে। এরপর হোটেলের সঙ্গে পেছনের দিকে একটি ছোটো ঘর খুললে, চারদিকে একবার তাকিয়ে কলা আমাকে নিয়ে সেখানে ঢুকে পড়ে। হোটেলের লোকটা দরজা বাইরে থেকে টেনে দিয়ে চলে যেতে লাগলে কলা বলে, প্লেট লাগত।

একটু বাদে প্লেট আসে। সঙ্গে পানির বোতল। কলা প্লেটে পরোটা ও ডিম ভাজি বাড়ে। তারপর আমাকে খেতে বলে। আমি বলি, একটু হাত-মুখ ধোয়া লাগত। কলা মোবাইল টেপে। হোটেলের লোকটা আসে। তারপর কলা খাটের ও-মাথায় টয়লেট দেখিয়ে জানতে চায়, ওখানে পানি আছে কি না। আমি খাটের পাশের সরু পথ দিয়ে ওই টয়লেটে যাই। ঢুকেই পানির ঝাপটা দিই। চোখ জ্বালা করা কমে। টের পেয়েছি, সারা রাত্তির জাগরণে আর জার্নির ক্লান্তিতে আমার খিদে লাগছে না, কিন্তু আমাকে খেতে হবে। খেতেই হবে। খুব ভালো হয় যদি খাওয়ার পরে এক কাপ চা খেতে পারি। কলাকে বললে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করবে। একবার ভাবলাম, কোনও প্রকার নিম্নচাপের উদয় হচ্ছে না কেন? টেনশনে। নাকি জার্নিতে? সামনে কমোড। সেদিকে তাকিয়ে থাকি। অপরিষ্কার! নোংরা। কিন্তু দুর্গন্ধ নেই। কে থাকে এই ঘরে? নিশ্চয়ই এই হোটেলের কেউ। নাকি ঠাকই-কলা আর এদের সাঙ্গোপাঙ্গরা এখানে মৌজমাস্তি করে? চোখে আবার পানি দিই। ঘাড়েও ভেজা হাত বোলাই। তারপর টয়লেট থেকে বেরিয়ে আসি।

এই ঘরে কোনও গামছা নেই। পকেটে রুমালও নেই আমার। হাত ঝাড়তে ঝাড়তে কলার সামনে থেকে পরোটা প্লেট নিই। এই সময় কলা (নিশ্চয়ই/সম্ভবত ঠাকইকে) কাকে যেন ফোনে জানায়, কোনও সমস্যা নাই। আউক্কা একটু বাদে—

কলা আমার কাছে জানতে চায়, চা খাইতানি?

আমি বুঝি সে জানতে চেয়েছে চা খাবো কি না? বলি, সিলেট আসলাম, আর চা খাবো না?

কলা বলে, ইতা চা সবই একই। গোলাপগঞ্জ চা বাগান নাই। কলা মোবাইল টেপে।

আমার মনে হয়, ঠাকই এখনও এলো না কেন? মুন্না বলেছে, ঠাকই আমাদেরই বয়সি। এর আগে মুন্না যখন একবার এসেছিল, ঠাকইর কাছে ছিল, এই গোলাপগঞ্জে। এ সময় কলা পাশের একটা জানালা খোলে। এতক্ষণে বুঝলাম ঘরটা বেশ উঁচু জায়গায়। এখান থেকে নীচে নদী দেখা যায়। পানি একদম তলানিতে। এই দিকের জানালার বেশ নীচে জমি। কেউ নীচ থেকে জানালা দিয়ে তাকাতে পারবে না। অথচ এই জানালা দিয়ে নীচের সবই দেখা যাবে। এই নদীর নাম কুশিয়ারা, মুন্না বলেছিল, ফেরি দেখা যায়। ফেরি এখন ওপারে। এই দিকের নদীতে নাকি জোয়ার-ভাটা হয় না। মুন্নার কাছে এই কথা শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম। নদী তাতে জোয়ার-ভাটা হয় না, এমন কোনও দিন শুনিনি। একবার নদীটাকে দেখতে পারলে হতো। কিন্তু আমি তো জানি না, আমাকে ঠাকই এখান থেকে বাইরে বের হতে দেবে কি না।

না, আমি ঠাকইর হাতে বন্দি নই, ওর অনুমতি দেওয়া না দেওয়ায় কিছু আসে যায় না। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি ঠাকইর জিম্মায়। ও যা ভালো বুঝবে নিশ্চয়ই তাই করবে। এটা নিরাপত্তার প্রশ্ন।

কলা জানায়, না কোনও অসুবিধা নেই। আমার কাছে সিগারেট লাগবে কি না জানতে চায়। তারপর মোবাইলে মিসড্ কল দেয়। হোটেল থেকে একটা ফোন আসে। কলা চা দিতে বলে আর তার কথা বলে কোনও এক সুলতানের দোকান থেকে এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট আনতে বলে। আমি বলি, গোল্ডলিফ। পরোটার শেষ টুকরাটা মুখে দিতে দিতে খাটের ওপর রাখা গোল্ডলিফের প্যাকেট দেখাই।

একটু বাদে চা আসে। চায়ে চুমুক দিয়ে আমি সিগারেট জ্বালাই। আর সঙ্গে সঙ্গে পেটের ভেতরে মোচড় দেয়। আমি বুঝি, আমাকে টয়লেটে যেতে হবে।

ওদিকে কলাও উঠল। সে চলে যাবে। আমাকে রেস্ট নিতে বলে সে ওঠে। বলে যায়, কেউ আসলে যেন দরজা না খুলি। ঠাকই আসলেও না। ঠাকইকে বলতে হবে, আমার ফোনে কল দিতে, তারপর দরজা খুলব। এইসব কলা আমাকে মনোযোগসহ শেখায়। আমি ভাবি, এই সবই আমার জানা আছে। তবু, কলার সিলেটি কথা শুনতে আমার ভালো লাগছিল। সাথে সাথে আমাকে বোঝানোর জন্য সে একটু বইয়ের ভাষায় কথা বলতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু তা শুনে আমি হাসিনি। কলা দরজা আটকে দিতে বলে বেরোনোর সময় জানায়, ঠাকই বারোটার দিকে আসবে। জকিগঞ্জের দিকে গেছে আমার জন্য। আমি ভেতর থেকে দরজা আটকে মোবাইলে দেখি বাজে দশটা আটতিরিশ। তারপর টয়লেটে যাই।

আমি জানতাম, অথবা জানতাম না, কিন্তু টয়লেটে গেলেই তা ঘটল, আমি কেন এখানে, সেই পেছনের কথাগুলো মনে পড়তে শুরু করে। কিন্তু আমি ঠিক করে রেখেছিলাম, এইসব কিছুই ভাবব না। যদিও জানি সে সবই আমাকে তাড়া করে ফিরছে। ফলে চাইলেই এর কোনও কিছুই মাথা থেকে নামিয়ে দেওয়া যায় না। আমার মুন্নার ছোটো ভাই মাসুদের মুখ মনে পড়ে। শেষ বিকালে আমাকে গাংনী যাওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু গাংনী আর যাওয়া হয়নি। আমরা টেগর লজের সামনে দাঁড়িয়ে। মাসুদ মোটরবাইক নিয়ে কোথায় যেন গেল। একটু পরই মুন্না আসে।… এই পর্যন্ত ভাবতেই হোটেলের টিভির সাউন্ড বাড়ে। কলা বলেছিল ওদের বলে যাবে, টিভির সাউন্ড যেন কমিয়ে দেয়। এভাবে টিভি চললে এখানে চোখের পাতা কোনওক্রমে এক করা যাবে না। কলা যাওয়ার পরে কিছুক্ষণ সাউন্ড কমই ছিল। এইমাত্র বাড়ল। গান বাজছে : হানড্রেড পারসেন্ট লাভ লাভ লাভ…। গানটা আগে শুনেছি। ইন্ডিয়ার বাংলা সিনেমার। এই ছোটোখাটো একটা ফেরিঘাটেও ডিশ আছে? সিলেটে থাকবেন। এটা খুবই ধনী এলাকা। মুন্না বলেছিল, বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জের মানুষ খুবই ধনী। হঠাৎ হঠাৎ বড়ো বড়ো দালান। প্রায় কেউ থাকে না। এখানকার অনেক মানুষ লন্ডনে থাকে। এই রুমটার সামনে রাস্তার ওপাশে একটা পরিত্যক্ত প্রায় ও-শেপড্ মার্কেট। এমন মার্কেট আমাদের ওদিকে জেলা সদরেও খুব বেশি নেই। আর এখানে এই ফেরিঘাটেও কেউ একদিন এমন একখানা মার্কেট বানিয়েছিল, হয়তো চলেনি তাই পরিত্যক্ত।

টয়লেট থেকে বেরোতে বেরোতে বুঝলাম, ওই গানটা এখনও আরও জোরে বাজছে। মনে হয় হোটেলে খদ্দের বেশি। পেছনের দিকে শুনতে পায় না বলে সাউন্ড বাড়িয়েছে। কিন্তু টিভি তো একদিকে টিনের বেড়ার উপরের দিকে। ফলে এই ঘরে ওই শব্দে টেকা দায়। আমি আর একটা সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে গুনগুনাই, হানড্রেড পারসেন্ট লাভ লাভ লাভ… শুয়ে পড়ি… চোখ বুজতে চেষ্টা করি, কিন্তু হয় না।

জানি না, এখন যদি তন্দ্রা আসে তো কতক্ষণ ঘুমোতে পারব। ঠাকই তো যে কোনও সময় চলে আসতে পারে। কী করছে কে জানে। যাই করুক… মুন্না বলেছে ঠাকই ওস্তাদ লোক… কোনও সমস্যা হবে না। আমারও ঠাকইর ওপর ভরসা হচ্ছে। এই পর্যন্ত আমি নিরাপদ। জানি না আর কতক্ষণ নিরাপদ থাকব। মাথার একদম ভেতরে ভোঁ ভোঁ করতে শুরু করেছে। এই রোগটা মাঝেমধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আসলে ঘুম ঠিক না হলে এটা বাড়ে। এক কাপ চা খেতে পারলে হতো। কলা যাওয়ার সময়ে ঘুমোতে বলে যায়নি, বলেছিল, রেস্ট নিন, তার মানে ঠাকই যে কোনও সময়ে আসবে।

এ সময় পাশের হোটেলের টিভির সাউন্ড আবারও কমে যায় যেন, নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে গানটার একটি পঙ্‌ক্তি গাওয়া শুনি। হয়তো এই গানটার জন্য এমনিতেই সাউন্ড কমে গেছে। ঠান্ডা গান। মা এই গানটা গাইত… তখন আমি ছোট্ট। নিরালা হোটেলে চা খাওয়ার সময় একবার শুনতে শুনতে মুন্না বলেছিল গানটা বন্ধ করতে, ও মিঠুদা, এই ঠান্ডা গান বন্ধ কইরে কিশোরকুমার লাগাও… সে যেন আমার পাশে আজও বসে আছে। শ্রাবণী তখন ইন্ডিয়ায় চলে গেছে। মুন্না সারা দিন কিশোরকুমারের এই গানটা শুনত। নিরালা হোটেলে চা খেতে এলে ম্যানেজার মিঠুদাকে বলত ওই গানটা বাজাতে। কিন্তু এখন নিশিরাতের এক কলি বাজতে না বাজতেই গানটা থেমে যায়, নাকি চ্যানেল বদল হলো? জীবন মানে জি বাংলা। আর দরজায় টোকা। আমি বলি, কে? সঙ্গে সঙ্গে যেন সেই শসাওয়ালা ছেলেটার গলা, চা। আমি টিনের দরজার নিচ থেকে ঠেলে দিতে বলি। কলা বলে গেছে দরজা না খুলতে।

চায়ের কাপ নিয়ে বিছানায় বসে কাপে ঠোঁট ছোঁয়াতেই আবার দরজায় টোকা। আর মোবাইলে মিসড্ কল। ঠাকই। আমি দরজা খুলি।

এতক্ষণে ঠাকইকে দেখলাম। বলে, ঘুম আছলা নি? আমি একটুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করি। তারপর বুঝি, জানতে চেয়েছে, ঘুমে ছিলাম কি না? অথবা ঘুম এসেছিল কি না?

আমি ঠাকইর দিকে তাকিয়ে থাকি। যথেষ্ট বলবান মানুষ সে। একেবারেই পাকানো শরীর, কিন্তু একটু মোটার ধাত আছে। মাথাটা শরীরের তুলনায় ছোটোই, নাকি চুল খুব ছোটো করে কাটিয়েছে। ঠাকই বিষয়টা হয়তো বোঝে যে, আমি তাকে দেখছি। বলে, দেখো কি তা?

আমি এর উত্তরে কিছু বলি না। তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে জানতে চাই, আছেন ভালো?

আপনে কও কেনে? ঠাকই বলে, তুমি মুন্নার বন্ধু লাগো না?

কথাটা এত দ্রুত ঠাকই বলল যে, আমার বুঝতে এটু দেরি হলো। বললাম, আচ্ছা।

ঠাকই সঙ্গে সঙ্গে বলল, একেবারে ভুঁড়ি উড়ি ফাঁসাইয়া দেলা

আমিও সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখের দিকে তাকালাম। কিন্তু কিছু বললাম না। এ বিষয়ে এই মুহূর্তে কথা বলতে ভালো লাগছিল না। আসলে আমার মাথার ভেতরে ভোঁ ভোঁ করা ভাবটা যাচ্ছে না। মুখটা এখনও একটু বিস্বাদ লাগছে, ভেবেছিলাম নাস্তা খেলে যাবে, যায়নি। আমি জানি ঠাকই আশা করেছে, আমি এখন ওর সঙ্গে কথা বলি। ঠাকইর দিকে সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিই। আর লাইটারটা তার পাশে রাখি।

কিন্তু ঠাকই জানায়, সে সিগারেট খায় না। গলা তুলে জানালা দিয়ে বাইরে দেখে। তারপর বলে, ফেরি ওপার। ভরি গেছে। ছাড়বে।

বুঝলাম না, ঠাকই এ কথা কেন বলল। অবশ্য এরপর আমাকে জানায়, এখন বেরোতে হবে। ফেরি এপারে আসলে সহজে সিএনজি পাওয়া যাবে।

আমাকে যেতে হবে লাইনের সিএনজিতে। ফেরিতে পার হবে এমন অনেকেই এখান থেকে সিএনজিতে উঠে গোলাপগঞ্জ যাবে।

ঠাকই দরজা খোলে। আমরা বাইরে বের হই। রোদ এতক্ষণে চড়ে গেছে। সূর্য মাথার ওপর থেকে একটু পশ্চিমে হেলেছে। আমি অবশ্য তাকাইনি। নিজের ছায়া দেখে বুঝলাম। ছায়া ছোটো কিন্তু হেলানো। এখন চোখ খুবই জ্বলছে। একেবারে জ্বালা করছে বলা যায়। খুলতে ইচ্ছে করছে না। রোদের দিকে চোখ দিতেও ইচ্ছে করছে না। আমি ইচ্ছে করেই মাথা নিচু করে রেখেছি। সেই শসাওয়ালা ছেলেটি কাছে দাঁড়িয়ে আছে। এই দিক থেকেও একটা পথ নীচে নেমে গেছে। সেদিকে ফেরিঘাট। এখানে দাঁড়ালে পন্টুনের এক কোনা দেখা যায়। নদীর পানি একেবারে তলানিতে। তাই মনে হয় যেন ফেরিঘাট কত দূরে!

ঠাকই এক সিএনজিওয়ালার সঙ্গে কথা বলে। একেবারে নিখাদ সিলেটিতে সে-কথা। আমি প্রায় কিছুই বুঝি না। শুধু ফেরি শব্দটা বুঝতে পেরেছি। ভারী অথচ খুব জোরে ধাতক ঘটাং শব্দ হলে আমিসহ সবাই ফেরিঘাটের দিকে তাকাই। ফেরিটা ঘাটে ভিড়ল। ভেড়ামাত্র কোনও গাড়ি নামার আগে সামনের লোকেরা পন্টুনে উঠে পড়ছে দেখতে পাই। সেদিকে তাকিয়ে থাকি। বুঝি, এই সিএনজিগুলো লাইনের। লোক ভরলে ছাড়বে। এখনই লোক আসবে। এগুলোর সিরিয়াল আছে। ঠাকই একেবারে সামনেরটার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারকে বলেছে, সামনের বাম দিকে তার লোক বসবে। আমি ঠাকইর পাশে দাঁড়ানো। বলি, মুন্নার সঙ্গে কখন কথা হয়েছে?

ঠাকই বলে, এইমাত্রর… এইখানে আসার সুম… সময়

ও।

ঠাকই স্পষ্ট করে বলে, কোনও অসুবিধা নাই। যেখানে নামচো, তার কান্দায় মানে কাছে কলা থাকবে… নিয়ে যাবে, জকিগঞ্জ।

আমি ঠাকইর চোখে তাকাই। সে আমার মুখে একটু যেন অসহায়ত্ব দেখে। আসলে এই মুহূর্তে আমি অসহায়। জানি না সামনে কী আছে। ঠাকই জকিগঞ্জ বলে যে জায়গার নাম বলল, এর আগে কখনও আমি এই জায়গার নাম শুনিনি, শুনলেও কেন শুনেছি মনে নেই। কিন্তু এখন বুঝলাম, ওই দিকে নিশ্চয়ই কোনও সীমান্ত, বর্ডার ইত্যাদি আছে। মুন্নাও একবার মনে হয়, এই জায়গার নাম বলেছিল, কিন্তু তখন সেভাবে খেয়াল করিনি।

এখন ঠাকই গলা নিচু করে বলে, সকালের সেই জায়গায় কলা মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়ানো থাক্‌পো—

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একবার ভাবলাম, তাহলে এই পর্যন্ত আসলাম কেন? কিন্তু প্রায় মুহূর্তেই মনে হলো, ততক্ষণে ঠাকই হয়তো সব কিছু গুছিয়ে উঠতে পারেনি। হয়তো, সে সময়ে আমার যাওয়ার জন্য ঠিক সময় ছিল না। হয়তো, এইটুকু ভাবতেই ফেরি থেকে উঠে আসা মানুষরা ঢাল বেয়ে উপরে ওঠে। এখানে সিএনজির কাছে চারজন-পাঁচজন, কেউ একজন, কেউ দুজন এমনভাবে দাঁড়ায়। এদিকে পাশের রাস্তা দিয়ে গাড়ি সামনের দিকে যাচ্ছে। এই রাস্তায় উঠবে, সামনের দিকে। আমি সেদিকে দেখি। ফেরিঘাটে এই হয়, আমার জানা আছে। কিন্তু দেখতে দেখতে বুঝি, আমি আসলে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছি।

একসঙ্গে চারজন, ঠাকইর পাশে দাঁড়ানো সিএনজিওয়ালাকে বলল, আমরা চারজন সিএনজিওয়ালা বলল, আসেন। ঠাকই তখন পাশ থেকে সরে দাঁড়াল। আমাকে ইঙ্গিতে সামনের বাম দিকের সিটে উঠতে বলে। আমি সেখানে বসামাত্র আবার গলা নিচু করে জানায়, কোনও সমস্যা নাইকা। যাও—দোস্ত এর পর জোর বাড়ায় ড্রাইভারের দিকে, যারে, ভাই—

পেছন থেকে একজন বলে, দাঁড়ান, দাঁড়ান, সিটের এই কোনায় কী যেন একটা।

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে লোকটাকে দেখি। মনে হলো, আমাদের ওই দিকের মানুষ, গলার স্বর আর উচ্চারণে অনেক মিল।

ড্রাইভার বলে, ইতা কিচু না, স্যার—

তবু লোকটা নামে। তার সহযাত্রী দুজন সে নামার পরে জায়গাটা ভালো মতো দেখে। ড্রাইভারের ডান পাশের জন বলে, বুজইন না, নতুন প্যান্ট—

পেছনের দুজন হাসে। সেই লোকটিও। এরা পরস্পর পরিচিত। কথায় বোঝা যায়। নিশ্চয়ই কাছে কোথাও চাকরি করে। সহকর্মী নাকি সবাই। অফিসার হবে। কিন্তু এখন বাজে মোটে একটা, এখন তো কোনও অফিস ছুটি হওয়ার কথা না। ড্রাইভার ডাকল, স্যার। এই পথে নিশ্চয়ই এরা নিয়মিত যাতায়াত করে। আমি বুঝতে চেষ্টা করি। আবার চেষ্টা করিও না। সামনে দু-পাশে ফাঁকা মাঠ। সেখানে রোদ একেবারে ঝকমকে। যত দূরে চোখ যায়, রোদ আর রোদ। ডান দিকে আস্ত পাহাড়। অনেক দূরে। সেখানে আকাশের গায়ে কিছু মেঘ। কিন্তু তাতে বৃষ্টির নিশ্চয় কোনও সম্ভাবনা নেই। ওই মেঘে রোদ আটকায় না। ওই পাহাড়ই নিশ্চয়ই মেঘালয় পাহাড়। শুনেছি, না বইয়ে পড়েছি আজ আর মনে নেই। এই মুহূর্তে সেসব কিছুই আমি সত্যি মনে করতে চাই না।

মনে করার যেন কোনও কারণও নেই। কী হবে মনে করে। এই রোদে চোখ খুলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। চোখ জ্বলছে। কিন্তু ড্রাইভারের এই পাশের সিটে বসে চোখ বন্ধ করে রাখা ঠিক না। বাম হাতে ভর, উপরে ধরে আছি। তন্দ্রা এলে হাত আলগা হয়ে যেতে পারে। তাহলে আর রক্ষা নেই।

আমি এই পর্যন্ত ভেবেছিলাম। এর মধ্যে সহযাত্রীদের কথায় কান লাগাই। ড্রাইভারের ডান পাশের জন মাথাটা একটু বাম দিকে ঘুরিয়ে বলে, নতুন প্যান্টের কাফফারা পাইলাম না।

আমার ঠিক পেছনের জন তখন বলে, কী আইজকে হবে নিকি?

আগে গোলাপগঞ্জ তো যাই

পেছনের মাঝখানের জন বলে, তুমি তো কুষ্টিয়া আছলা। দেখচো কুষ্টিয়ায়

ওদিকে অমন হয়।

ড্রাইভারের ডান পাশের জন বলে, খালি কুষ্টিয়ার দোষ, ওদিকের দোষ, এদিকে যেন হয় না।

পেছনের মাঝখানের জন জানতে চায়, কী হইচে?

আমার পেছনের জন, আরে বন্ধু, বন্ধুরে, সামান্য তর্কাতর্কিতে খুন করছে। কয়েকটা কয়েকটা কাগজে ডিটেইল আছে—

সে আরও জানতে চায়, কী জন্য?

কমুনে, প্যান্টের কাফফারা পাই, খাইতে খাইতে—

সামনের জন মাথা ঘুরিয়ে পেছনের জনকে বলে, আপনি তো কয়দিন আগে কুষ্টিয়ায় ছিলেন, কাউকে চেনেন নাকি?

না, না। আমি নিউজটা ডিটেইল দেখি নাই। আর আমি ওই কলেজে ছিলাম না।

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে লোকটিকে দেখি! দেখেছি কি তাকে কখনও কুষ্টিয়া শহরে? মনে পড়ে না। একবার মনে হয় জানতে চাই, আপনি কোন কলেজে ছিলেন? এরা সব কলেজের প্রফেসর?

এই সময় সে বলে, কী আছে ওই নিউজে।

আমি মনে মনে ভাবি, বলি যে, আমি জানি কী আছে ওই নিউজে।

আমার পেছনের জন বলে, না, আপনার কথা নাই। থাকতে পারত। কাগজের অফিসে ফোন করে বলেন, আপনি ছিলেন তাহলে আপনার নাম দিয়ে দেবে।

সে জানতে চায়, আসামিরা সব পলাতক?

তা ছাড়া কী? সামনের জন বলে, ডাক্তার আসিবার পূর্বে রুগি মারা গেল। কেন, সিনেমায় দেখেন না?

আমি ড্রাইভারের পাশ থেকে লোকটাকে দেখি। হাসছে, পুলিশ আসিবার পূর্বে অপরাধীরা পালাইয়া গেল।

লোকটা হাসতেই পারে। আসলেই সবাই পালিয়েছে। আমারও হাসি পায়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ওই দুপুরের রোদে শেষবারের মতন মাসুদের ক্ষুব্ধ মুখটা মনে পড়ে। মাসুদের সাহস আছে। মুন্নার মতো না। মুন্নাটা একটা ভীতু। শ্রাবণীর জন্য এখনও কান্দে। সে যেন আমার পাশে আজও বসে আছে। মাসুদ সে তুলনায় অনেক ডেয়ারিং। লোকটার মুখটা দেখতে দেখতে এইটুকু মনে পড়ল। কিন্তু তার পরই রোদে চোখ…। ওদিকে ভীষণ রোদ চোখ জ্বলছে।

পেছন থেকে একজন, সম্ভবত ওই ডান পাশের জন বলল, আছে নাকি পেপার, কোন কলেজের স্টুডেন্ট…।

আমার পেছনের জন বলে, নামলে দেখি আমরা। প্যান্টের কাফফারাসহ—

আমার হাসি পায়। লোকগুলোর দারুণ রস আছে। একসঙ্গে চাকরি করে নিশ্চয়ই, না হলে পরস্পরকে এত খোঁচা দিয়ে কথা বলে কেন?

তখন পেছনের ডান পাশের লোকটি বলে, ক-দিন আগে আসলাম। নিউজটা দেখতে হবে।

দু-পাশের ফাঁকা প্রান্তর রেখে সিএনজি এখন গ্রামের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। পাশের বাড়িগুলো উঁচুতে। চোখে রোদ পড়ছে না। রাস্তার ওপর গাছের ছায়া। তখনই পেছনের ডান পাশের লোকটি কথা বলেছে। আমি ভাবি নিউজটা… মাসুদের জন্যই। রাঙা দৌড়ে এসেছিল। আমি একপাশে দাঁড়ানো। পেছনে টেগোর লজ। মাসুদ বলল, ধরেন। আমি বুঝিনি। রাঙাকে ধরেছিলাম। শুধু ধরেছিলাম। মাসুদও রাঙাকে ধরে। আমিও রাঙাকে ধরি। মেহেরপুর যাইনি। রাঙাকে এখানে পাবো ভাবিওনি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, রাঙা মাসুদের জিনিসটা কোথায়। কিন্তু ততক্ষণে মাসুদ, প্রায় কিছুই বুঝতে না দিয়ে রাঙার বাম দিকের পাঁজরে প্যান্টের পকেট থেকে ছুরি বের করে ভরে দেয়।

আমি রাঙার পেছন দিকে, রক্ত গায়ে লাগেনি। ছেড়ে দিয়ে সরে আসি। বুঝতে পারিনি কী করব। সামনে তাকিয়ে দেখি মাসুদ উধাও। রাস্তার উল্টো দিক দিয়ে পরপর দুটো বোমা এসে পড়ে। আমি পালাতে পারি।

মুন্না হঠাৎ আমার পাশে মোটরবাইক নিয়ে হাজির হয়। তারপর রাজবাড়ির দিকে। তারপর ভাঙ্গা… তারপর… মুন্না বলে কী করতে হবে… আমি আসলে ওই নিউজটা বাকিটুকু জানি না। তারপরে কী হয়েছে। পত্রিকা কী লিখেছে।

আবার রাস্তার দু-পাশে ফাঁকা জায়গা। একটু বাদে রাস্তা ঘেঁষে দালান। বুঝি সামনেই গোলাপগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড। সকালে এখানে নেমেছিলাম রাস্তার উল্টো দিকে। বাঁয়ে হোটেল আল আমিন। সিএনজি থেকে নামি। ঠাকই ভাড়া দিয়ে দিয়েছে। সামনের রাস্তার উল্টো পাশে যেতে হবে। একটা বাস দাঁড়ানো। পেছনে কলা, মোটরসাইকেলসহ। ওই চার যাত্রীর একজন ভাড়া দিতে দিতে বলে, কই পেপারটা দেন। এইটুকু শুনে অমি রাস্তা পার হই। আমার আর চোখে পানি দেওয়া হয় না। কলা আমাকে দেখে স্টার্ট দিয়ে বাসটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। পেছন দিকে সূর্য। আমি কলার পেছনে বসি। বুঝি সিলেটের দিকে যাচ্ছি না। মোটরসাইকেল চলতে শুরু করে। চোখে সরাসরি সূর্য পড়ছে না, কিন্তু রাস্তায় খুব রোদ। আমার চোখ জ্বলছে…।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev