গতকাল ছিল মহালায়া, মহালায়া মানে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব শারদীয় উৎসবের প্রাক সন্ধিক্ষণ। বাঙালি সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকে দুর্গা উৎসবের চার দিনের জন্য। সমস্ত কষ্ট দুঃখ ভুলে আপামর জনসাধারণ উৎসবের দিন গুলিতে আনন্দে মেতে ওঠে।
প্রতিটি বনেদি বাড়ি ও বারোয়ারি পুজো কমিটি গুলোতে চলছে শারদ উৎসবের জন্য সব রকমের প্রস্তুতি। হাতেগোনা আর কটা দিন তাই পুজো কমিটি গুলো জোর কদমে প্রস্তুতি নিচ্ছে। শরতের পেঁজাতুলোর আকাশ, কাশ ফুলের গন্ধ বলে দিচ্ছে মা আসছেন আমাদের সমস্ত কষ্ট দুঃখ ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য।
ধর্মীয় স্থান নবদ্বীপ ধামে স্বরুপগঞ্জ এলাকার পোস্ট অফিস পড়ার অন্তর্গত বারোয়ারি পুজো কমিটি এবারে তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো দুর্গাপূজা করছে। প্রতিবছর তারা একচালা মূর্তিতে মায়ের আরাধনা করেন। কিন্তু এবার তারা অন্যরকম চিন্তা ভাবনা নিয়েছেন। মা দুর্গা এখানে নয়টি রূপে পূজিত হবে। এই নয়টি রুপের মধ্যে আছেন—১) শৈলপুত্রী ২) ব্রহ্মচারিণী ৩) চন্দ্রঘন্টা ৪) কুষ্মাণ্ডা ৫) স্কন্ধমাতা ৬) কাত্যায়নী ৭) কালরাত্রী ৮) মহাগৌরী ৯) সিদ্ধিধাত্রী (নবদুর্গার বর্ননা নিচে দেওয়া হলো)। একমাত্র মহানগরী কলকাতায় গিরিশপার্কের কাছে মায়ের নটি রূপকে পূজিত হতে দেখা যায়।
ওই পূজা কমিটির সভাপতি এই বিষয় জানিয়েছেন কলকাতা বাদ দিয়ে অন্য কোথাও মা নয়টি রূপে পূজিত হন না। মায়ের এই নয়টি রূপ-এর পূজা দেখতে নবদ্বীপ শহরের মানুষ বঞ্চিত হয় প্রতিবছর। তাই ছোট শহর নবদ্বীপ-এর জন সাধারণ যাতে মায়ের নয়টি রূপের পুজো দেখতে পারেন সেই জন্য তারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন।
দেবী দুর্গার সকল নয়টি রূপ এবার পূজিত হবে নবদ্বীপ ধামের অফিসপাড়া অন্তর্গত বারোয়ারি ক্লাবটিতে। এর সঙ্গে থাকবে রামচন্দ্রের অকাল বোধন এর পূজিতা মা দুর্গা ।
প্রতি বছর-এর তুলনায় এই বছর ওই পূজামণ্ডপটিতে আরম্ভর অনেক বেশি। কারণ এই বছর মা দুর্গার দশটি রূপ পূজিত হবে সেখানে। নবদ্বীপ শহরের মানুষের মধ্যে এই বিষয় নিয়ে উন্মাদনা তুঙ্গে। মায়ের মোট দশটি মূর্তির পূজা হবে তাই দায়িত্ব অনেক বেশি। সেই কারণে এইবার মোট চারজন পুরোহিতকে পূজা করবার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এই বছরেও সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিদিন জনসাধারণের জন্য ভোগ প্রসাদের ব্যাবস্থা থাকবে বলে জানানো হয়েছে ওই ক্লাব কমিটির পক্ষ থেকে।
প্রসঙ্গত সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত টানা তিন দিন নিরামিষ খাওয়ানো হলেও, দশমী পূজার পর ঘট বিসর্জন হওয়ার পর সকলকে মৎস্যমুখ করার রীতি রয়েছে এই পূজা কমিটির এবং তারপর মায়ের বিসর্জন দেওয়া হয়।
করোনা মহামারী থেকে নিষ্কৃতি পাক আপামর জনসাধারণ এই বিষয় এর সাথে একটু অন্যরকম ভাবে এই বার দুর্গাপূজা করার চিন্তা ভাবনা করছেন ওই ক্লাব কমিটির সদস্যরা।
মায়ের নবরূপ, নবশক্তি তথা নবরাত্রি! আসুন, এখন আমরা সবাই নবদুর্গার নয়টি রূপতথ্য ও রূপের শক্তি সম্বন্ধে জেনে নিই—
শৈলপুত্রী : নবদূর্গার প্রথম রূপ শৈলপুত্রী, হিমাবন গিরি রাজের কণ্যা বলে তিনি শৈলপুত্রী নামে খ্যাত হন। ইনি বৃষভ বাহনা। ইনি দ্বিভূজা হাতে ত্রিশূল আর পদ্ম। নবরাত্রী পূজায় অর্থাৎ মহালয়ার পর প্রতিপদের দিন মায়ের এইরূপের ধ্যান করা হয়। তবে আমাদের দেশে ষষ্ঠি থেকেই মার বন্দনা শুরু হয়।
ব্রহ্মচারিণী : এটি মায়ের দ্বিতীয় রূপ, মা এখানে নিজেই সাধিকা ব্রহ্মচারিণী রূপে প্রকাশিত এবং এইরূপেও মা দ্বিভূজা, হাতে অক্ষমালা এবং কমন্ডুলু। দ্বিতীয়াতে এই মায়ের ধ্যান ও পূজা করার নিয়ম। ইনি বৈরাগ্য, সদাচার, সংযম ভক্তকে দান করেন।
চন্দ্রঘন্টা : এইটি নবদূর্গার তৃতীয় রূপ, ইনি কল্যাণী রূপে আবির্ভূত এবং তিনি তাঁর ভক্তদের বা সন্তানদের কল্যাণ দান করেন। এই রূপে মায়ের দশ হাত এবং মা বাঘ্রবাহনা। তৃতীয়াতে মায়ের এই রূপের বন্দনা ও পূজো করার নিয়ম।
কুষ্মাণ্ডা : মায়ের চতুর্থ রূপ কূষ্মান্ডা, এই রূপে মায়ের অষ্টভূজা এবং মা বাঘের উপর সমাসীন। চতুর্থীতে মায়ের এই রূপের আরাধনা ও পূজো করা হয়। এই রূপে মা ভক্ত ও সন্তানদের ব্যাধি থেকে মুক্ত করে ইহলৌকিক ও পরলৌকিক সমৃদ্ধি দেন।
স্কন্ধমাতা : নবদুর্গার পঞ্চম রূপ স্কন্ধমাতা! দেব সেনাপতি কুমার কার্তিকের মাতা, তাই তিনি স্কন্দমাতা। মাতা এই রূপে চতুর্ভূজা ও সিংহ বাহনা। কোলে কার্তিককে নিয়ে মাতা বিরাজমান এবং পঞ্চমীতে মায়ের ধ্যান ও পূজো করার নিয়ম। এই রূপে মাতা বাঞ্চাকল্পতরু।
কাত্যায়নী : ঋষি কাত্যায়নের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মা আদ্যাশক্তি তার ঘরে আসেন, তাই তাঁর নাম কাত্যায়িনী! এই রূপেও মা সিংহবাহনা এবং চতুর্ভূজা। এই রূপে মাতা মানুষকে নিজ নিজ উপাস্য বা ইষ্ঠ ভগবানের পথে মতি প্রদান করেন। বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ মাতা কাত্যায়নী ব্রত ও পূজো করেছিলেন এবং ব্রজের গোপীদের কাত্যায়নী করতে বলেছেন। দুর্গাপূজার ষষ্ঠ দিনে কাত্যায়নী ধ্যান ও পূজা করা হয়।
কালরাত্রি : এইরূপে সপ্তমীতে মায়ের পূজা করা হয় কিন্তু এইরূপে তিনি ভয়ঙ্কররূপী অন্ধকারবর্ণা এবং চতুর্ভূজা ও গর্বভবাহনা। ভয়ঙ্কররূপী অন্ধকারবর্ণা হলেও মা কখনও দুঃখ দানকারী নন। তাই এইরূপেও তিনি সবার মঙ্গল করেন এবং কালরাত্রি মঙ্গলদায়িনী নামে খ্যাত হন। সপ্তমীতে মায়ের এইরূপের ধ্যান ও পূজা করা হয়।
মহাগৌরী : এইটি মায়ের অষ্টম রূপ। এইরূপে মায়ের গৌর বর্ণের, চতুর্ভূজা এবং বৃষভ বাহনা, অষ্টবর্ষা অভেদ গৌরী। তাই এখানে মায়ের আটবছর বয়সী মানা হয়! ইনি অপ্রাপ্ত বয়স্কা বালিকা রূপী। এই রূপ থেকেই মহা অষ্টমীতে কুমারী পূজার আবির্ভাব ও প্রচলন এসেছে। এমনকী চন্ডীতে বলা হয়েছে “স্ত্রিয়ঃ সমস্তাঃ সকলাজগৎসু” অর্থাৎ জগতের সকল স্ত্রী তোমার অংশ স্বরূপ। যদিও সকল স্ত্রীজাতি সম্মানের। তাই অষ্টমীতে দেবীর সামনে অষ্টমবর্ষীয় বালিকাকে বসিয়ে যথার্থ উপাচারে দেবী জ্ঞানে বন্দনা করা হয় এবং স্ত্রীজাতিকে এর চেয়ে বৃহৎ সম্মান বোধ হয় কেউ দেয়নি।
সিদ্ধিধাত্রী : মাতা নবদূর্গার নবম রূপশক্তি সিদ্ধিদাত্রী নামে পরিচিত, এইরূপে মায়ের চতুর্ভজ ও পদ্মাসনে বিরাজমান। মাতা এইরূপে ভক্তদের সর্বপ্রকার সিদ্ধি দান করেন। দূর্গা পূজার নবমীতে মায়ের আরাধনা ও পূজো করা হয়।
অপরাজিতা : প্রতিপদ হইতে নবমী পর্যন্ত মায়ের অলৌকিক ও মঙ্গলদায়িক নয়টি রূপের অর্থাৎ নবদুর্গার পূজো শেষ করে, দশমীতে অপরাজিতা পূজো করে মায়ের পূজোর অবসান তথা বিসর্জন প্রক্রিয়া করা হয়। এর মধ্যে দিয়ে নবদুর্গা বা নবরাত্রি পূজোর সমাপ্তি ঘটে কিন্তু অপরাজিতা পূজো নবদুর্গার তালিকায় আসে না বা পড়ে না! এই পূজো শুধুমাত্র বিসর্জন প্রক্রিয়াকরণের জন্য, তবে এইটুকু জানা যায় দশমী পূজো অপরাজিতা বলা হয় এইজন্যই কেননা মা অজিত! বিসর্জন দেওয়া শুধুমাত্র মায়ের রীতির ইতি দেওয়া কেননা মা সর্বদা সর্বত্রই বিরাজিত তাই তিনি অপরাজিতা।