“খৃষ্টের জনমদিন, বড়দিন নাম।
বহু সুখে পরিপূর্ন, কলিকাতা ধাম।।…
জমকে পোশাক করি/গাড়ি আরোহনে /চার্চে যান সুরূপসী/শ্রীমতির সনে।”
কবি ঈশ্বর গুপ্তের লেখা বড়দিন কবিতা থেকে বোঝা যায় একালের মতো সেকালেও গোটা কলকাতায় সাজো সাজো রব উঠতো বড়দিন আসার অনেক আগে থেকেই। শোনা যায়, কলকাতায় প্রথম বড়দিন উদযাপিত হয় ১৬৬৮ সালে। সেই সময় মোঘল সেনাদের তাড়া খেয়ে জব চার্নক প্রানের ভয়ে পালাচ্ছিলেন হুগলি ছেড়ে বালেশ্বরের দিকে। ২৭ মাইল পেরোতেই তার চোখে পড়লো বন জঙ্গলে ঢাকা গ্রাম–সুতানুটি। সেখানেই টানা দু-মাস থাকার পর তার খেয়াল হলো বড়দিন এলো বলে। সেই সুতানুটিতেই লুকিয়ে থাকার সময় চার্ণক পালন করলেন বড়দিন।
ইতিহাস চাকা ঘুরতে থাকে। গোবিন্দপুর আর কলকাতা গ্রাম মিলে ধীরে ধীরে তৈরি হল শহর কলকাতা। পলাশি ও বক্সার যুদ্ধ জিতে সেই সময় দেশে পুরোদমে শাসন কায়েম করেছিল ব্রিটিশ। ক্রমে রাজধানী কলকাতায় ভিড় জমালেন বিলেত থেকে আসা সাহেব মেমসাহেবরা। দুর্গা পূজার মতো কলকাতার বড় উৎসব হয়ে উঠল বড়দিন।

দুর্গাপুজোর পর থেকেই নাকি, ইংরেজটোলার পুরনো ঘরবাড়িগুলি মেরামত, চুনকাম-রঙ করা হতো। দরজার দুপাশের মত পোতা হত কলাগাছ। বাড়ির থামগুলো সাজানো হতো ফুলের তোড়া, বেলুন আর রংবেরঙের কাগজে। কলকাতার ডালহৌসি ও চৌরঙ্গীপাড়ায় প্রায় সব সাহেব বাড়িতেই ঝুলতো নীল-লাল-হলুদ বর্ণের কাগজের শিকলি, দেবদারু গাছের ডাল, ফুল, লতা-পাতা। শহরের রাস্তা হয়ে উঠতো ঝাঁ-চকচকে। গির্জাগুলিতেও পড়তো রংয়ের পোঁচ। শুরু হয়ে যেত বড়দিনের কবিতা আর গান রচনার পালা।
এখনকার দিনের মতো সেই সময় ক্রিসমাস কার্ডের প্রচলন ছিলনা। বাঙালিদের মতো দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর চিঠি পত্র আদান প্রদানের মতো, সাহেব মেমরাও ছবি ও নকশা করা কাগজে চিঠি পত্র লিখে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে প্রীতি শুভেচ্ছা বিনিময় করতো। চিঠিতে থাকতো প্রভু যীশুর উদ্দেশ্যে লেখা ছোট ছোট ছড়া আর কবিতা।
সেকালের বড়দিনের উৎসবে আত্মীয়-স্বজন পাড়াপড়শি বন্ধুদের মধ্যে উপহার বিনিময়ের বিশেষ রেওয়াজ ছিল। শুধু তাই নয়, সাহেববাড়ীর ভৃত্যরাও তাদের মনিবদের উপহার দিতো। এই উপহার কে বলা হয় ‘ডলি’। সম্ভবত ‘ডালি’ শব্দ থেকেই সেটি এসেছে। ডলির মধ্যে থাকতো ফলমূল, কেক, মিষ্টি থেকে শুরু করে মাছ, মাংস ইত্যাদি। অনেক বাঙালি বাবুও এইসব উপহারের সাথে সাহেবদের দিতো পিপে পিপে মদ। মূলত এটি সাহেবদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার একটি বাহানা।

ডলির পালটা হিসেবে মনিবরাও ভৃত্যদের পার্বণী দিত। পার্বণীর মূল্য ডলির বেশি না হলে সাহেব মেমদের মান থাকত না। অনেকে এটিকে কিসমিস-বকশিশ (ক্রিসমাস বক্সেস) নাম দিয়েছিলেন। তবে এর জ্বালাও ছিল সাহেবদের কাছে। যে কর্মচারী এই ডলি দিত, তাকে ডলির মূল্যের বেশি দামের ফিরতি টাকা বা পার্বণী দেবার নিয়ম ছিল।
বড়দিনের আগের দিন সন্ধ্যায় সাহেব-মেমরা একে অপরকে আলিঙ্গন করতেন। মধ্যরাতে গীর্জায় গীর্জায় উপাসনা হতো। গড় থেকে হতো তোপধ্বনি। বন্দরে বেজে উঠত জাহাজের ভেঁপু। জমকালো পোশাকে সেজে সাহেব-মেমরা গির্জায় ক্যারল গানে যোগ দিত। আবার কোথাও কোথাও রঙিন কাগজের শিকলী ও ক্রিসমাস ট্রির সঙ্গে গোশালা তৈরি করা হতো। কারণ তাদের দেবদূত যীশুখ্রীষ্ট গোয়াল ঘরেই মা মেরির কোলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
মূল উপাসনা ২৫ ডিসেম্বর সকালে শুরু হতো। নতুন পোশাক পরে সকল উপাসকেরা গির্জায় আসতো। মানব মুক্তির জন্য প্রভুর আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করা হতো। এমনকি বড়দিনের ভোরে অভিনব নগরকীর্তনের মত খ্রীষ্ট সংগীত গাইতে গাইতে নগর পরিক্রমায় বের হতেন।

উপাসনা শেষে উপাসকদের দেওয়া হতো রুটি ও দ্রাক্ষারস; কারণ প্রভুর ভোজ রুটি ও দ্রাক্ষারস যীশুর রক্তের প্রতীক। উপাসনা শেষে শুরু হতো করমর্দন কোলাকুলি ও অনাথ আতুরদের মধ্যে খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ।
বড়দিনের উৎসবের আসল আকর্ষণ ছিল পারিবারিক মহাভোজ। ফিরিঙ্গি সমাজে খানাপিনার উপকরণের মধ্যে প্রধান ছিলো শুয়োরের মাংস। এছাড়া টার্কি ডাক রোস্ট, কেক, কিসমিস, পুডিং, বাদাম, কমলালেবু ইত্যাদি। এক একটা কেকের ওজনই হতো প্রায় ১০০ থেকে দেড়শ কেজি আর পানীয় হিসেবে থাকতো অজস্র আঙুরের মদ।
সেকালের কলকাতার অভিজাত মহলের ক্রিসমাসের মিলন কেন্দ্র ছিল গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের একতলার হলঘরটি। বড়দিনের সন্ধ্যার আলোক উজ্জ্বল হোটেলে একতলার হলঘরটিতে শোভাপেত বিভিন্ন দেশের পতাকা। এদিন হল ঘর থেকে বলা হতো “হল অফ অল নেশনস”। কোচবিহার বর্ধমানের রাজা মহারাজেরাও এই মিলন কেন্দ্রে যোগ দিতেন। শুধু অভিজাত ইংরেজদেরই নয় তাদেরকেও এ মিলন কেন্দ্রে স্বাগতম জানাতেন বুড়ো সান্টাক্লজ।
বড়দিনের পুরনো কলকাতায় উল্লেখযোগ্য ভোজ হতো বড়লাট সাহেবের প্রাসাদে। এদিন উচ্চপদস্থ ইংরেজ রাজকর্মচারিদের সঙ্গে সুবে বাংলার সমস্ত উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীরা বড়লাট সাহেবের প্রাসাদে নিমন্ত্রণ পেতেন। ইন্দ্রপুরীর মতই আপাতমস্তক আলোকউজ্জ্বল ও নানান সুখাদ্য সুপানীয় গন্ধে প্রাসাদ আমোদিত হতো।
তবে লর্ড কর্নওয়ালিস ছিলেন এই ফূর্তির ঘোর বিরোধী। তিনি মনে করতেন পবিত্র এই দিনে উপাসনা ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো উচিত। তার আমলে লাটভবনে বড়দিনের এই উৎসব বন্ধ ছিলো। কর্নওয়ালিস বিলেতে চলে গেলে আবার এই উৎসব চালু হয়।

সাহেবদের খুশি করতে সে যুগে সম্ভ্রান্ত বাবুরাও নিজেদের বাগানবাড়িতে আয়োজন করতেন উৎসবের। ফুল দিয়ে সাজিয়ে, বাতি জ্বালিয়ে পিপে পিপে মদের ফোয়ারা উড়িয়ে, শরীরে চন্দনের সুগন্ধ ছড়িয়ে, ইয়ারবন্ধু মোসাহেবদের সঙ্গে নিয়ে বাইজি নাচিয়ে আর নানা রকম সুখাদ্যকে খেয়ে বড়দিন উদযাপিত হতো।
অপেরা, থিয়েটার, ক্রিকেট, ঘোড়া দৌড় সবকিছুর ব্যবস্থা ছিল। ঘোড়া দৌড় হতো এলেনবরা কোর্স, খিদিরপুরের আখড়ার মাঠে তারপরে আজকের রেসকোর্সে।
বাঙালি হিন্দু পরিবারের কর্তারা হগ মার্কেট থেকে কেক, কিসমিস, কমলালেবু কিনে এনে ছোটদের দিতেন। সন্ধ্যাবেলা বড়দের হাত ধরে সাহেবপাড়ায় ছোটরা আলো দেখতে যেতো। কলকাতায় বড়দিনের সময় প্রতি বছর বসতো নতুন নতুন সার্কাস ও যাত্রার আসর।
মোটকথা তখনকার কলকাতার বড়দিনের উৎসব প্রায় সার্বজনীন উৎসবের রূপ নিতো। বড়দিনের বয়ে আনা আশা আনন্দ আত্মনিবেদনের বাণী জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল শহরবাসীকে করে তুলতো মানবকল্যাণময়। হারিয়ে যাওয়া সেইসব সংস্কৃতির চল আজও বয়ে চলেছে এখনকার মানুষদের বড়দিন উদযাপনের মধ্যে।
তথ্যঋণ: ৩০০ বছরের কলকাতা পটভূমি ও ইতিহাস — ড. অতুল সুর এবং অন্যান্য।
Sotti I tai..onek purono smriti jaglo.
থ্যাংক ইউ ❤️
খুবই ভালো লাগলো। Happy বড়দিন।
ধন্যবাদ????❤️
⭐বড়দিন⭐ ইতিহাসের পর্দা সরিয়ে আরও বড়
হয়ে উঠলো আপনার প্রতিবেদনের মাধ্যমে।সমস্ত
উৎসবের পেছনেই কোনো না কোনো ইতিহাস থাকে,সাড়া বিশ্ব জুড়েই *যীশু*নামক মহামানবের
আবির্ভাব দিবস শান্তি স্বস্তি ভালোবাসা,প্রেম প্রীতি
মানবতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে বিশ্বজনকে
উৎসাহে উৎসবে মাতায়,কোলকাতা তার ব্যতিক্রম নয়। ভালোলাগা।
আপ্লুত ও অনুপ্রাণিত হই আপনার মতামত পেয়ে শ্রদ্ধেয়। ধন্যবাদ ????
চমকপ্রদ শুরু থেকে বর্ণাতিত সুন্দর লেখনীতে মুগ্ধ হলাম, ঐতিহাসিক কিছু তথ্য ও পেলাম, খুব ভালো লাগলো।
খুব খুশি হলাম। থ্যাঙ্কু ❤️
খুব সুন্দর লেখনী,,,,, একটু দেরি হলো পড়তে,,,,, অজানা তথ্য জানলাম
থ্যাংক ইউ বন্ধু ❤️