চা না চাইতেই দেয়। দোকানে বা রেস্তরাঁয় গিয়ে শুধু ‘চা’ বললেই চা দিয়ে দেয়। চাইতে বললেও কেউ চায় না। চা শুধু দেয়, বলেও কাউকে চাওয়ানো যায় না। উল্টো বলে, ‘বিস্কুট দেবো?’ সেখানেও না চাইতেই হাতে ধরিয়ে দেয়। চায়ের লেজুড়ে টা। এই টা’টা কামড়েকুমড়ে খাওয়া যায়। তাতে দাঁতেও লেগে থাকে কিছুটা। জল খেলেও যায় না। জিভেরও কসরত্ চলে। কিন্তু চা খাওয়াটা বেজায় বিপত্তি। জলের মতো নয়, দুধের মতো নয়, মধুর মতো তো নয়ই, চায়ের মতোই চা খেতে হয়। চুমুক দিয়ে নয়, চুমু দিয়ে। নিঃশব্দে বিপ্লব। আর একটু বেতাল শব্দ হলেই আড়চোখে কেউ গেঁয়ো ভাবতে পারে। সাধে কি আর চা খাওয়ার ইংরেজি take tea। চা যে নেওয়া যায়, খাওয়া যায় না।
অথচ সেই চায়ের নেশাতেও বাঙালির মৌতাত। চুমুর চুম্বকে চায়ের দোকান সরগরম। চুমু দিতে দিতেই ক্রিকেট থেকে রাজনীতি, ধর্ম থেকে মাছবাজারে অনায়াসে বিচরণ, ভাবা যায়। শুধু তাই নয়, এজন্য ইংরেজ আমলে মেছোবাজারের ক্রেতাদের মাছবিক্রেতাদের আমন্ত্রণ, take take, no take no take, একবার তো see। নেও-নেও, না নেও-না নেও, একবার তো দেখো। চায়েও সেই see ভাববিলাসী বাঙালির কাছে sea মানে সমুদ্র হয়ে ওঠে। সাধে কি আর শিবরাম চক্রবর্তী বলেছেন, চা খাও আর না-খাও একবার তো চাখাও। আবার চাখাতে গেলেও বিপদ!

শুধু চা’তেই হবে না, সঙ্গে টা-এর খরচ। আবার দুদণ্ড গল্পও চাই। অবশ্য কাউকে চা খাওয়ালে কষ্ট করে গল্প জমাতে হয় না, বরং তা শোনার ধৈর্য পরীক্ষা শুরু হয়ে যায়। চা মুখে গেলেই গল্পের তুবড়ি ছোটে। শুধু তাই নয়, অযাচিত প্রশংসা অকারণেই এসে পড়ে। চা দিয়ে খাতির করতে গিয়ে খ্যাতির রাস্তাও খুলে যায়। আকস্মিক দানপ্রাপ্তিতে প্রতিদানের বাকস্ফূর্তি একটু বেসামাল হয়ে পড়ে। কথা হচ্ছিল চাকরিতে দুরবস্থা নিয়ে, এসে পড়ে বাড়ির সবাই কেমন আছে। বৌদি ভালো থাকা নিয়ে নিশ্চয়তার বাড়াবাড়ি। যে কথাগুলো আগে শুনলে মধুর শোনায়, কথার মাঝে তা শুধু কটুই মনে হয় না, কানে বড় বাজে। তখন ঘরের কথাও পর মনে হয়। সেক্ষেত্রে চায়ের বন্ধুত্ব আপন হওয়াতেই শেষ হয়ে যায় না, খুশি করার প্রশংসার পথও ক্রমশ দুর্গম হয়ে ওঠে। দুইকে বাড়িয়ে চার করা যায়, শূন্যকে তো একও করা চলে না। অথচ প্রশংসায় সচলতায় চপ্পলকে এরোপ্লেন বানাতো শুধু সময়ের অপেক্ষা।
অবশ্য এক কাপ চা খাইয়েই লোকের কাছে খাতির পাওয়ার এরকম আদিখ্যেতার মধ্যেও রয়েছে শীতার্ত জীবনে চায়ের মতো ক্ষণিকের উষ্ণতাও। আধুনিক ভোগবাদী জীবনে যত ভোগের আয়োজন, তত বৈষম্যবোধ, ততই নিঃসঙ্গতার নির্জনতা। সেখানে আপন মনে কথা বলার ক্লান্তি তার চোখেমুখে, তার অবসাদের ছায়ায় হিমশীতল অবকাশে অন্ধকার নেমে আসে। দুদণ্ড চায়ের কাপের তুফানে ইচ্ছে করলে একটু উত্তেজনা নেওয়া যায়, তার ধোঁয়ায় ক্ষণিকের অতিথির উষ্ণতাও মেলে। হলই-বা তা কৃত্রিমতায় জড়ানো। যান্ত্রিক জীবনে তাই-বা কম কিসে! তা ক্ষুধা কমায়, কিন্তু মগজে পুষ্টি জোগায়। আবার তা খেতে হয় সোহাগ দিয়ে, আদর করে। চুমুতে চুমুতে তার ভালোবাসার আকাশ, চুমুকে চুমুকে তার সরস প্রকাশ। এজন্য ঘরেবাইরে তার অবাধ বিস্তার। চা খাওয়া না গেলেও চাখা, পান করা না গেলেও চা-পান। অথচ তাতে কেউ চাখোরও হয় না, বেশি খেলে মাতালও নয়।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪