মজবুত অর্থনৈতিক কাঠামো গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। সেই গ্রামীণ অর্থনীতিকে যদি তার নিজের পায়ে দাঁড় করানো না যায় তাহলে সমস্যা হবেই। তাই সমবায়ের চিন্তাভাবনা। সমবায়ের চিন্তাভাবনা কিন্তু আজকের নয়। ভারতবর্ষে ‘সমবায়’ শব্দটি আধুনিক হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ অতি প্রাচীন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে ‘ধর্মগোলা’ কিংবা মৌর্য যুগের কারিগরদের গিল্ড ব্যবস্থার মধ্যে সমবায় ভাবনার যৌথ অর্থনৈতিক কার্যকলাপের পরিচয় পাওয়া যায়।
সমবায়ের জনক হলেন রবার্ট আওয়েন। ১৮৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রচডেল শহরে ১৮ জন বেকার যুবকদের নিয়ে রবার্ট আওয়েন সমবায় আন্দোলনের যাত্রা শুরু করেছিলেন। সংস্থার নাম দিয়েছিলেন ‘রচডেল ইক্যুইটেবল পাইওনিয়ার্স সোসাইটি’। এঁদের মধ্যে ১৪ জনই ছিল তাঁত প্রযুক্তিবিদ্যা ডিপ্লোমাধারী। তাঁদের মূলধন ছিল মাত্র ২৮ পাউন্ড। তাঁরা সেই দিন ২৮ পাউন্ড দিয়ে মুদি ব্যবসা করেনি। সুতা-তাঁতকল রংয়ের সাথে সকলের লব্ধ প্রযুক্তিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে ইতিহাসে সমবায় আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। এর ঠিক ৪ বছর পর অর্থাৎ ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির পথ দেখাতে কমিউনিষ্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেন। যেখানে সাম্যবাদের পথ চলা শুরু।

সমবায়ও সেই একই কথা বলে। সকলের সমান অধিকার। আমাদের দেশেও জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী স্বরাজের দাবিতে গ্রামীণ ক্ষেত্রে ছোটো ছোটো কর্ম গোষ্ঠীর মাধ্যমে বহু মানুষের আয়ের সুযোগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন যা সমবায়েরই নামান্তর। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, ড্যানিয়েল হ্যামিলটন প্রমুখ মনীষীদের চিন্তায় ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই এই রাজ্যেও সমবায়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
সত্যি কথা বলতে কি, সমবায় আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এদেশের কৃষকদের আর্থিক ও সামাজিক মানোন্নয়ন হবে। তাই সমবায় আন্দোলনকে জোরদার করতে সকলকে সমবেতভাবে কাজ করতে হবে। কৃষি ও কৃষকের উন্নতি ঘটাতে গেলে সমবায়গুলিকে শক্তিশালী করতে হবে। নোটবন্দি-সহ কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন জনবিরোধী নীতি গ্রামের মানুষকে দুর্দশায় ফেলেছে। আজ দু-বছর হয়ে গেল অর্থনীতি সেইভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে? কিন্তু গ্রামের কৃষিজীবী, মৎসজীবী, তন্তুবায়ী-সহ বিভিন্ন কৃষিক্ষেত্রের সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সমবায় আজ তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এই রাজ্যে সমবায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

আমি হাউসফেডের (ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট কো-অপারেটিভ হাউসিং ফেডারেশন লিমিটিড) দায়িত্বে রয়েছি। এই সংস্থা ৫০ বছর অতিক্রম করেছে। ৫০ বছর পার করে দেওয়াটা খুব একটা কম কথা নয়। ১৯৬৫ সাল থেকে পথচলা শুরু করে আজ ৫৭ বছর অতিক্রান্ত। শৈশব, কৈশোর এমনকী যৌবন পেরিয়ে আজ হাউসফেড একটি সফল সমবায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বহু প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে আজ সাধারণ মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা আকাশচুম্বী। সত্তরের দশকের শেষ থেকে তিন দশক রাজ্যের সমবায় ছিল পরিবারতন্ত্র ও দলীয় রাজনীতির এক আখড়া।

২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দায়িত্ব নেওয়ার পর এদিকে নজর দেন। ২০১৬ সালের পর থেকে সমবায়ে একটা গতি আসে। সঠিক নেতৃত্ব ও কর্মচারী সংগঠনের কর্মমুখী কার্যকলাপের ফলে আজ ফেডারেশন একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বাজারে পড়ে থাকা ঋণ আদায়ের হার ক্রমশ উন্নত হচ্ছে। বিগত আর্থিক বছরে আমরা প্রায় ১২ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছি, প্রায় ৭ কোটি টাকা আবাসন বাবদ নতুন করে ঋণ দেওয়া হয়েছে। ২০২১-২২ অডিটও সম্পূর্ণ। অন্য দিকে আমরা যে রাজ্য সমবায় ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে থাকি তাদের পাওনা নির্দিষ্ট সময়ে আমরা পরিশোধ করি। তার পরিমাণ বার্ষিক ২ কোটি ৯৬ লক্ষ টাকা। মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ কোটি ৫০ যা এখন পরিশোধের পর ২ কোটি ৫১ লক্ষ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে সুদের হার ৭.৫৫ (ব্যক্তিগত ঋণের ক্ষেত্রে) ও ৭.২৫ (সমবায় সমিতির ক্ষেত্রে) যা অন্যান্য গৃহঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলির থেকে অনেকটাই কম।
তাই সহজে বলতে পারি যে সমবায়ই হলো রাস্তা, সমবায়ই হলো ভবিষ্যৎ, যা আগামী দিনে মানুষকে এক উন্নততর সমাজ উপহার দিতে পারে। আজ এক মুক্ত সমবায় হাওয়া বইছে সারা রাজ্যজুড়ে।
লেখক : চেয়ারম্যান, ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট কো-অপারেটিভ হাউসিং ফেডারেশন লিমিটেড, ভাইস চেয়ারম্যান, ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট কো-অপারেটিভ ইউনিয়ন।
যথাযথ নেতৃত্বই (Proper leadership ) সমবায়কে সাফল্যের শিখরে পৌছে দিতে পারে।
একটি শীর্ষ আবাসন সমিতি দাদন এবং লোন আদায়ে খুবই সফল। এর ফলে সদস্যরাও উপকৃত হবে।
আগামী দিনে এই ধারা বজায় থাকবে আশা করি।