সবাই জেগে দেখো,
ছবির রেণু ছড়িয়ে আছে, হৃদয়ে সব মেখো …
ছড়া-ছবির দেশে আমরা সেই রেণু খুঁজতেই নেমেছি। উপরের পঙক্তি দুটি লিখেছেন গদাধর সরকার, যিনি পরিচিত মালিপাখি নামে। মালিপাখি একজন বিশিষ্ট ছড়াকার — যিনি নিভৃতে বসে ছড়াকে আজও লালন করছেন যত্নে, পরম মমতায়। আমার সাথে তাঁর পরিচয়ের দিনটা আমার কাছে চিরদিনের জন্য স্মরণীয়। সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে আমি তাঁর কাছে চির – ঋণী। তিনি মনে মনে ভেবেছিলেন ছড়া নিয়ে আমাদের সাহিত্য-পত্রিকা কেন চিন্তাভাবনা করে না? ছড়া কি এতই ব্রাত্য? তাঁর সেই চিন্তাকে রূপ দিতেই প্রকাশ করেছিলাম বিশেষ ‘ছড়া সংখ্যা’। ছড়াকারদের নিয়ে প্রকাশ পাওয়া সেই পত্রিকায় তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় বুঝেছিলাম, একজন মানুষ ছড়ার জন্য নিবেদিতপ্রাণ। ঠাকুরমার কাছে গল্প – কাহিনি, গান, ছড়া শুনেছেন। ‘মৌমাছি মৌমাছি কোথা যাও নাচি নাচি’ — তাঁর মনের ভিতরে যে ঢেউ তুলেছিল, সেই ঢেউ আজও তাঁর মনে বইছে। যে মানুষটা ছোটবেলায় মাটির ঠাকুর গড়তে ভালোবাসতেন, যাদুকর হওয়ার বাসনা মনে জাগতেই যাদুবিষয়ক বই কিনে, যাদু শিখে সাথীদের দেখিয়েছেন, ওদের হাততালি পেয়ে উড়ান দিয়েছেন নীল আকাশে — সেই মানুষটাই তো পারেন সাদাপাতায় ছড়া ভাসাতে। তাঁর ন’কাকা রত্নেশ্বর সরকার ছিলেন কবি এবং অবশ্যই দিলখোলা সু-মানুষ। তাঁর কাছে আসতেন কবি সাহিত্যিকেরা। আসতো বই, পত্রিকা। মনে মনে কবিতা লেখার সাধ হয়। সেলেট পেন্সিল হাতে তুলে নিয়ে ছড়া লেখা শুরু। বৃহস্পতিবারের বসুমতীর ‘ছোটদের পাতায়’ মন থাকতো পড়ে। বসুমতীর ‘ছোটদের পাতায়’ প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ছড়া। সাময়িক পত্রিকার ক্ষেত্রে ‘রক্তগোলাপ’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয়। এর পর ধীরে ধীরে বহু পত্রিকায় তাঁর ছড়া প্রকাশ পেতে থাকে। বিভিন্ন সংকলনে স্থান পেতে থাকল তাঁর ছড়া। শারীরিক অসুস্থ এই মানুষটা মনেপ্রাণে জীবন্ত। তাঁর সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্পে মশগুল থেকে বুঝেছি, তিনিই পারেন ছোটদের জন্য এমন সুন্দর, সাবলীল ছড়া ছবি লিখতে। সরল সাদাসিধে এই মানুষটার ছড়াও সহজ সরল। ‘সে দাঁড়িয়েছে তার নিজস্ব বিশ্বাসের ভারসাম্যে, তাঁর নিজস্ব প্রকাশরীতির শক্তিতে’। তাঁর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত ছড়া নিয়ে এই গ্রন্থ। গদাধরদার এই বই সম্পাদনার কাজে যুক্ত হতে পেরে আমি ধন্য— আমি আনন্দিত, আপ্লুত। ডি.এম. লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই এরকম একটি গ্রন্থের সম্পাদনার ভার আমার উপর দিয়েছেন বলে। ডি.এম. লাইব্রেরি প্রকাশিত ‘আজগুবিয়াস’ ও‘শ্রেষ্ঠ ছড়া’ আমাকে নাড়া দিয়েছিল দারুণভাবে। আমরা কৃতজ্ঞ প্রকাশকের কাছে — আজও ‘আজগুবিয়াস’ পাঠক সমাজে সমানভাবে সমাদৃত। তাঁর ‘স্মৃতির শেতলপাটি’ (জীবনকুচি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ) হাতে পেয়ে শিশুসাহিত্যিকদের অনেকেই মুগ্ধ হয়েছেন। তাঁর এই গ্রন্থটি প্রশংসিত হয়েছে বিভিন্ন মহলে। ভবানীপ্রসাদ মজুমদার, কার্তিক ঘোষ কিংবা পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি মালিপাখির ছড়া তাঁদের কাছে আলাদা বার্তা দিয়েছে। তাঁর চিত্রকল্প নির্মাণ, ভাষা বিন্যাস, ছন্দ ছড়াকে অন্যমাত্রা দিয়েছে। গদাধর দা’র ‘ঘাসকুটো আরশুলো’ প্রকাশিত হয় প্রজ্ঞা প্রকাশন থেকে। আমরা কৃতজ্ঞ তাঁদের কাছেও। সেই বই-এর ভূমিকা লিখেছিলেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, গবেষক সুধীর চক্রবর্তী।
ড. সুধীর চক্রবর্তী লিখেছিলেন, —“… গদাধরের জীবনটা এত মসৃণ বা সুপরিকল্পিত নয়। তার শৈশব কৈশোর কেটেছে অসচ্ছল দুর্দ্বৈবে, দারিদ্রে এবং আশঙ্কায়। … তাকে যতটা জানি তার স্বভাব, তার জীবনযাপন আর তার কবিতা বা ছড়া সব এক ছন্দে বাঁধা। নিরুদ্বেগ, শানিত এবং প্রত্যাশী।… তার কবিতা আর ছড়া পড়ে মনে হয়েছে সেখানে কোনো খাদ নেই, কিন্তু শান আছে।”
লোকটা যেন পাগল বাতাস আপন ভোলা। ফুল হয়ে রোজ দোলায় যেন খুশির দোলা। লোকটা যেন চাঁদের মতো গানের বাড়ি। নরম স্বভাব। দেয় খালি ভাব। দেয় না আড়ি কেবল ভাবি। কেবল ভাবি। লোকটা যে কে, কে দিয়েছে পাতায় পাতায় ভুবন এঁকে?
আসলে লোকটার হৃদয় আকাশগামী, লোকটা এতোল বেতোল শেতল নদী, মেঘের মতো এদিক সেদিক ওড়ে, শিশির হয়ে ছড়ায় ঘাসে শীতের ভোরে, নাচতে নাচতে পাহাড় থেকে নামে, পাখির মতো নাড়ায় ডানা। লোকটার হদিশ আমি পেয়েছি — মালিপাখি নাম তার, যিনি তুলিতে ভুবন আঁকেন। তিনিও তো বলতে পারেন —
আমি রোজ জল ঢালি আর নিজে রোজ আপন মনে ভিজে যাই পাখির মতো তারাদের অলীক বনে।
কিংবা
ও আমার শিউলি সকাল ও আমার রাখাল পাখি
বোসো না চুপটি ক’রে তুলিতে ভুবন আঁকি।
জলঙ্গীর চোখের পাতায় নিজের হৃদয়কে রেখে, জলঙ্গীর অলীক আলোয় ভেসে বেড়ান মালিপাখি। রোজ এঁকে যান ফুল ফোটানোর স্বপ্ন ভালোবাসা। আকাশ, ফুল, পাখি, সাগর খোঁজ করে ফেরেন প্রতি মুহূর্ত।
বুকের ভিতর সাতটি তারা ভোর থেকে নাচে এবং সেই আতরেই ভিজে যান নেশায় আর কবিতা আঁকেন। উতল হাওয়ার যে জলছবিরা এদিক সেদিক উড়ে বেড়ায়, হারিয়ে যাওয়া সেই সুরগুলিকে একলাই তিনি জুড়ে দেন।
সাতনরি হার হাততালি দাও। একটু তাকাও ওই যে, বুকের ভিতর সকাল থেকে মেঘনা, কাঁসাই বইছে … এই যে আমার ঝুমঝুমি দেশ একমনে বেশ বাজছে … ঘর ছেড়ে তাই এখন আমি ফুলগুলি ফের গুনছি।
গদাধর সরকার পাতায় পাতায় ছড়িয়ে দিয়েছেন রং, দিয়েছেন খুশির ভুবন — সেখানে আমরা যেমন খুশি ঘুরতে পারি। তাঁর লেখা পড়লে মনে হয় বুকের দাওয়ায় পালকওড়ায় চুমকি রোদের গুঁড়ো। অলক চট্টোপাধ্যায়ের কথায় বলতে হয়— “মনের দরজা খুলে না রাখলে প্রকৃতি-মানুষ — শ্রুতিসুন্দর উপমারা এত সহজে আসা-যাওয়া কী করে করতে পারে! গদাধরের ছড়ারা চরিত্রে যেমন মুক্ত, তেমনই স্বপ্নরঙিন কল্পনার নিশ্চিত আশ্রয় যেন।”
তাঁর ছড়ায় জলবুড়ি রাত ভাসতে ভাসতে জুঁই পাখিদের ডেকে রূপকথা শোনায়, বাউল বাতাস একতারা বাজিয়ে মেঘনাদ্বীপের মাথায় ওড়ায় ফুরফুরে শুকতারা, আধফালি চাঁদ হাততালি দেয়, নতুন ঘাসের কুঁড়ি ভালোবাসায় নীল আকাশের মন চুরি করে নেয়। মালিপাখি ঘুরে বেড়ান আপন মনে হাজার তারার সাথে, উড়তে উড়তে সাগর দেখেন, পাহাড় দেখেন ভোরে কেননা এই ভুবন তাঁকে ডাকে আপন করে। পৃথিবীটা তাঁর বড় আপনার। আকাশ তাঁকে ভালোবাসে, আকাশ তাঁকে আদর করে, রোজ তারাদের দেয় তাঁর ঘরে। আকাশ তাঁকে ভালো থাকার কথা বলে ; যখন তাঁর খবর কেউ রাখে না। আর তাই মালিপাখি অলীক বনের পথিক হয়ে খোঁজেন রবি ঠাকুরকে আলোয় মাখা হৃদয়পুরের ঢেউগুলো গুনে দেখেন, রবি ঠাকুর হৃদয় আলো ছড়ান দু হাতে৷ সেই আলোতে মাদল বাজে রাঙামাটির দেশে। আর মালিপাখি লেখেন— “সে সব বুকে আঁকতে আঁকতে / অনেক অলিগলি / ছড়িয়ে দিলাম ছবির পালক / চমকে নদীর পলি … ”।
‘স্মৃতির শেতলপাটির’ কথামুখে আমি যে কথা লিখেছিলাম, তাঁর কিছুটা অংশ এখানেও উদ্ধৃত করছি —
“একা একা রাতভোর হেঁটে কবি রোজ প্রিয়ভাষাকে বুকে তুলে নেন, শোনান হৃদয়পুরের গল্প। তাঁকে হাতছানি দেয় রূপকথা আর তাল তমালের সারি। পথ কুড়িয়ে চোখের ভিতর ভুবনতরী বাইতে পারেন, খুশির দেশে ছুটে গিয়ে খোঁজেন পথের সারি। তাঁর পদ্য পাতায় মোড়া গানের সাঁকো, মেঘনা সানাই রূপকথা গাছ ধানের চারা। গদাধর সরকার এইভাবেই ছবিরভুবন এঁকে যান বাংলা ভাষায় আমাদের বিছিয়ে দেন স্মৃতির শেতলপাটি — হৃদয়পুরে ছড়িয়ে দেন মোহর আলো— বানিয়ে দেন আকাশপুরের পথ — পৌঁছে দেন। গাঁয়ের খবর। গদাধরের ছড়ার বিষয় যদিও বিচিত্র তবু এ বইয়ের বেশির ভাগ ছড়াই যেন জলছবি ভোর — স্বপ্নে হাঁটার সুখ — স্বপ্ন তুলির চর — শান্ত কোমল হাস্যময়ী এর প্রকৃতি আর তার উপর ভেসে বেড়ানো মেঘবালিকা কিংবা মেঘের কুচি। ”
‘ছড়া সংগ্রহ’-এর ছড়াগুলির বেশিরভাগ নেওয়া হয়েছে ‘আজগুবিয়াস’, ‘ঘাসকুটো আরগুলো’, ‘স্মৃতির শেতলপাটি’, ‘শ্রেষ্ঠ ছড়া’ গ্রন্থ থেকে। যদিও লিমেরিক এবং আটলাইনের মজার ছড়াগুলো এর আগে কোনো গ্রন্থভুক্ত হয় নি। এছাড়া অন্যান্য ছড়ার অনেকগুলিই পূর্বে কোনো গ্রন্থে ছিল না, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে কিংবা পায় নি।
গদাধরের ছড়াতে ফুল, পাখি, ফল, পাহাড়, সাগর, চাঁদ, নদী, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি, দারিদ্র, বিষণ্ণতা, ভূত, মজা, মানবতা, আলো, অন্ধকার, মেঘ, বৃষ্টি, অসংলগ্নতা, গাছ, সমাজ, ভাষাদিবস, পশু, কীটপতঙ্গ, গ্রাম ইত্যাদি সব কিছুই বিষয় হয়ে ওঠে অন্যরকম ভাষায়। নানা বিষয়কে অবলম্বন করে তাঁর ছড়া সাবলীল গতিতে এগিয়ে চলে ভবিষ্যতের দিকে। শব্দ ভেঙে ভেঙে নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি করে মিলের অভিনবত্বে পাঠককে আকৃষ্ট করে তাঁর ছড়া। তাঁর ছড়ায় আছে অন্ত্যমিলের চমক। তাঁর লেখার মধ্যে পাওয়া যায় ছড়া ও কবিতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। গদাধর ছোটদের ছবি দেখাতে ভালোবাসেন, বাস্তবের সাথে কল্পনা মেশানো ছবি। ‘ঘাসের উপরে শিশির মিশে থাকার মতো গদাধরের ছড়ার শরীরেও মিশে থাকে অলীক কাব্য গন্ধ’ —
একফালি মেঘ ফুল ফোটাতো বাউরি বাতাস চরে,
রোজ শেখাতো পদ্য লেখা বন্ধু চাঁদের ঘরে …। ‘
নিপুণ তাঁর ছন্দের হাত। কবি উত্তম দাশ-এর ভাষায় ‘টান টান ছন্দের ঠাস বুননে তৈরি ছড়াগুলি পাঠকের মনকে এক অনাস্বাদিত তৃপ্তি দেয়। ‘
অলোক চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘ছন্দ, মিল, শব্দদের চতুর্থ বন্ধু হিসেবে তাঁর মাথায় হাজির প্রাণবন্ত কৌতুক৷’
লিমেরিক রচনাতেও সিদ্ধহস্ত গদাধর। মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন লিমেরিক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘সাধারণ উদ্ভট ও খাপছাড়া চিন্তা এবং অন্ত্যমিলের অগতানুগতিকতাই হল লিমেরিকের প্রাণ। মালিপাখির লিমেরিক সম্পর্কে কথাগুলি সমানভাবে খাটে। এই বই-এর অন্যতম সম্পদ এই লিমেরিক। কল্পনার এমন বাঁধনছাড়া উচ্ছ্বাস, শব্দের এমন চাতুর্য, ছন্দের এমন নৈপুণ্য এবং উদ্ভট চিন্তনের পাশাপাশি গভীর মননের পরিচয় বহন করে মালিপাখির লিমেরিক।
সবমিলিয়ে মালিপাখির ছড়াসংগ্রহ বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হিসাবে বিবেচ্য হবে এই বিশ্বাস আমারও। তিনি এমন একজন ছড়াকার যাঁকে ঈর্ষা করে আঘাত করেন অনেকেই। ছড়ায় যে শব্দজাল নির্মাণ করেন, এমন চিত্রকল্প সাজিয়ে দেন — যার লোভ হয়তো সামলাতে পারেন না কেউ কেউ। আর তখনই মালিপাখির পূর্বে প্রকাশিত ছড়া অন্যের নামে প্রকাশিত হতে দেখে কষ্ট হয় আমাদের। মালিপাখির ছড়া মালিপাখিরই থাক — পাঠক সমাজে সমাদর পাক তাঁর ছড়া। কেউ যদি প্রশংসা পেতেই চান তো নিজের মতো করেই লিখুন না। ‘ছন্দ-মিল-মাত্রায়, শব্দচয়ন ও বিষয়বৈচিত্রে অপূর্ব, অভিনব’ মালিপাখির ছড়া ডানা মেলে উড়ে বেড়াক ছোটদের মনের আকাশে।
অমৃতাভ দে সম্পাদিত ডিএম লাইব্রেরি প্রকাশিত ‘মালি পাখির ছড়া সংগ্রহ’-এর ভূমিকা