অনেক দিন হয়ে গেল। করোনার নির্বাসিত জীবন ছেড়ে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার কথায় বিদ্যালয়ের মুক্ত পরিবেশের উন্মুক্ত হাতছানি জেগে উঠছে। দীর্ঘ নিদ্রার পর রিপ ভ্যান উইঙ্কলের নিজের গ্রামে ফেরার মতো ছাত্র-ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন আর বাস্তবে মোড়া রহস্যের পর্দা যেন উন্মোচিত হতে চলেছে। সেখানে অচেনা ভয়, অজানা রোমাঞ্চ, অনিশ্চিত আনন্দ জড়িয়ে থাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ওয়াশিংটন আরভিং-এর রিপ ভ্যান উইঙ্কল দীর্ঘ কুড়ি বছর পর ঘুম থেকে উঠে নিজের গ্রামে ফিরে গেলে তাঁকে কেউ চিনতে পারেনি, তিনিও কাউকে চিনতে পারেন না। সেদিক থেকে প্রায় দুই বছর পর স্কুলে ফেরা কচিকাচাদের মনে অচেনা-অজানা রিপ ভ্যানের মতো রহস্যময় হয়ে না উঠলেও একটা শূন্যতাবোধ সঙ্গী হয়ে ওঠে। তারপরেও নতুন করে জীবন শুরু করার সদিচ্ছা হাতছানি দেয়, কাটিয়ে ওঠার দুর্জয় প্রকৃতি সবুজ হয়ে ওঠে। কেননা জীবনকে সহজ করে নেওয়ার শক্তি তো শিক্ষা থেকেই মেলে, প্রতিকূলতাকে জয় করার সৎসাহস তারই পরতে পরতে। সেখানে পাঠশালা যে শুধু বইয়ের পাঠ দেয় না, জীবনের পাঠেও নিবিড় করে। দীর্ঘ অবকাশের পর আবার নতুন করে চলায় কত কৌতূহল, কত বিস্ময়, কত আনন্দ, কত আশঙ্কা ওত পেতে থাকে। এজন্য সবার প্রথমে শিক্ষার্থীদের মনে চাঁদে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলা জরুরি। আত্মবিশ্বাসী না হলে স্বপ্ন এসে ধরা দেয় না। স্বপ্ন যে শিশুমনের স্বাভাবিক জীবনের জিয়নকাঠি। তার ছোঁয়ায় কল্পনাপিয়াসী অপু-দুর্গারা নিজেদের খুঁজে চলে,স্বাভাবিকতা ফিরে পায়।

আসলে অভ্যাসে সবই সয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু রয়েও যায় অমলিন স্মৃতি। বলা হয়, বন থেকে জানোয়ার আনা যায়, কিন্তু জানোয়ারের মন থেকে বন সরানো যায় না। সেদিক থেকে ছোটদের বেড়ে ওঠা, গড়ে তোলা জীবনে স্কুলের স্মৃতিসুধা অবিস্মরণীয়। সেখানে তো শুধু পড়াশুনা হয় না, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অসংখ্য শিক্ষার্থীর সান্নিধ্যে ও সাহায্যে নতুন জীবনের হাতছানিও মেলে। আমাদের জীবনের বিকাশে তিনটি সত্তা ক্রমশ সক্রিয় হতে থাকে। সেখানে I am থেকে I know এবং শেষে I express অর্থাৎ আমার অস্তিত্ব ক্রমশ বিস্তৃতি লাভ করে জানার মধ্য দিয়ে। শুধু তাই নয়, নিজেকে প্রকাশের পরিসরও তাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিদ্যালয় সেই আপন হতে বাহির হওয়ার প্রথম সোপান। আমি থেকে আমরা’র চেতনায় উত্তরণের নবদিশা সেখানেই মেলে। মুক্ত জীবনানন্দের আস্বাদেই বিদ্যালয়ের অনন্য ভূমিকা। তাতে করোনার বন্ধন আপনাতেই মুক্ত হয়ে যাবে। এ নিয়ে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

অন্যদিকে দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছোটদের কেন, বড় শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যায়। কথায় বলে অনভ্যাসে বিদ্যা হ্রাস। যেখানে ধারাবাহিক শিক্ষা জরুরি, সেখানে সুদীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে তার সমূহ ক্ষতি। এতে শুধু ছন্দপতনই ঘটে না, মূল্যবোধেও সংকট দেখা দেয়। যে বয়সে যা শেখা জরুরি, সেই বয়সে তা না হলে তার পরিপুষ্টতার অভাব যেমন অনিবার্য, তেমনই তা একসঙ্গে গ্রহণ করাও অসমীচীন। সাতদিনের খাবার যেমন একবারে খাওয়া যায় না, তেমনই একদিনে সাতদিনের খাবার খেলে শরীরের পুষ্টির পরিবর্তে বিকারের প্রবল সম্ভাবনা। এজন্য স্কুল খোলার পর দীর্ঘ দিনের অসমাপ্ত সিলেবাস শেষ করার অস্থিরতা হিতে বিপরীত হতে পারে। সংযোগ রক্ষা করে ধীরে ধীরে অল্প করে তা সম্পন্ন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষার্থীর মনের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশই জরুরি। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই সেক্ষেত্রে লক্ষ্য হওয়া উচিত।
আবার অনেক দিন পর স্কুল খোলায় প্রাথমিক ভাবে কিছু সমস্যা হতে পারে। তবে তা অচিরেই কেটে যাবে। ইতিমধ্যে বাড়ির ঘরোয়া পরিবেশে যেখানে তার স্বরচিত পৃথিবীর স্বপ্ন হারিয়ে গিয়েছে, তাকে পুনরায় স্বাভাবিক করায় একটু সময় তো লাগবেই। ইতিমধ্যে যে ভয় বা আতঙ্ক তাকে পেয়ে বসেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। আর সেজন্যই স্কুলের আনন্দমুখর হাতছানি চাই। সেখানে ছোট ছোট শিক্ষার্থীর সঙ্গে সহজ বন্ধুত্ব অত্যন্ত জরুরি। ভালবাসার ভাষা শিশুরাও বোঝে। সেই ভাষায় নিজেকে খুঁজে পেলেই শিক্ষার্থীর হারানো আত্মবিশ্বাস আবার ফিরে পাবে। শিক্ষক মহাশয় বিশ্বাস জাগাতে পারলেই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ফিরে আসবে। ফিরে পাবে তার বাতিঘর,বাড়ি ফিরেও তার আলো তাকে হাতছানি দেবে নিরন্তর।

অন্যদিকে করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছাত্রছাত্রীদের দুশ্চিন্তার মূলে পড়াশোনা তথা সিলেবাস শেষ না হওয়া বা পরীক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়া। অথচ একবারও আমরা ভেবে দেখি না, তাদের মূল সমস্যা স্বাভাবিক শ্রীবৃদ্ধি না ঘটা। বাড়ির বেষ্টনী ছেড়ে যখন একটি শিশু তার মুক্তিপিয়াসী কল্পনার ডানা মেলে নতুন পৃথিবীর রঙিন হাতছানি পেয়ে স্বরচিত জগত তৈরি করে চলেছিল, সেই সময় তার সেই বাতিঘরের আলো নিভিয়ে করোনায় নির্বাসিত জীবন তাকে দুঃস্বপ্নে জীবনবিমুখ করে তুলেছে। এতে তার পড়াশোনার চেয়ে নিজেকে খুঁজেফেরার শক্তিই নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সেখানে সিলেবাস শেষ করার চেয়ে শিক্ষার্থীর কচিমনে আত্মপ্রত্যয় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। তার স্বরচিত পৃথিবী যে হারিয়ে যায়নি, তা স্নেহ ভালবাসায় জাগিয়ে তুলতে হবে। মনে চাপ দিয়ে নয়, মানসিক জোর বাড়িয়ে সিলেবাসের অজানা খনির পরশমণির হদিশ দিতে হবে। সেখানে পরীক্ষার জুজু বা ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার ভয় নয়, পরখ করার কৌতূহল ও জানার আগ্রহ জাগিয়ে তুললেই শিক্ষার্থী বয়সে ছোট হলেও মনে সহজেই বড় হয়ে উঠবে ও নিজেই নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে। এজন্য শিক্ষক-শিক্ষিকার সহানুভূতির চেয়ে সমানুভূতি বেশি জরুরি। অভিভাবকেরও শিক্ষার্থীকে সাহস জোগানো ও উৎসাহ প্রদান সুনিশ্চিত করতে হবে। যাতে একদিকে উৎসাহ জাগাতে হবে, অন্যদিকে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলবে। কোনো ভাবেই সিলেবাসের চাপ দেওয়া ঠিক হবে না। প্রতিকূলতাকে আপন করাতেই শিক্ষার অনন্য ভূমিকা। সেখানে করোনাকে বড় করে না দেখে তাকে জয় করার জন্য সৎসাহস জাগিয়ে তুলে এগিয়ে চলার বার্তাকে শিক্ষার্থীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি মনে হয়।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।