Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
ভূমিকা
শুরুতেই আমরা আলোচনা করব সাম্রাজ্য আমাদের জাতি বলতে কী বুঝিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইওরোপিয় সমাজ এবং রাষ্ট্র কাঠামোয় জাতির ধারণায় বহু বদল এসেছে [C. Bolt, Victorian Attitudes to Race (London: Routledge and Kegan Paul, 1971); এবং P. D. Curtin, The Image of Africa : British Ideas and Action, 178-1850 (Madison: University of Wisconsin Press, 1964)]। অষ্টাদশ শতকে ব্রিটিশ সমাজে জাতির কথা উঠলে বুঝতে হত, তারা জাতি অর্থে জনগণ অথবা রাষ্ট্র বোঝাচ্ছে। উনবিংশ শতকে জাতির ভৌগোলিক এবং কৃষ্টিগত বিশ্লেষণের জায়গা দখল নিল বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা, জাতিকে সংজ্ঞায়িত করা হল, জিনগত, জৈবিক এবং শারীরিক পর্যবেক্ষণের পরিভাষায় [N. L. Stepan, The Idea of Race in Science: Great Britain, 1800-1960 (London: Macmillan, 1982)]। সাম্রাজ্যবাদের ভৌগোলিক বিস্তার আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন ১৮৩৩-এ বিটিশ বিশ্বজুড়ে দাস ব্যবস্থা নিষিদ্ধ হলেও ব্রিটিশ জনজীবনে জাতিবাদের রমরমা্কে উপড়ে ফেলা যায় নি। সাম্রাজ্য যেহেতু এক্সক্লুসন আর অধীনতার রাজনীতিই বাস্তব জীবনে উপনিবেশিক জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা তৈরি করেছে, তাই সাম্রাজ্যপক্ষীয়দের পক্ষ থেকে বোঝানোর দরকার ছিল উপনিবেশে কারাই বা শাসন ব্যবস্থা চালানো শাসক আর কারাই বা শাসিতজন। সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে, প্রজাদের মধ্যে শ্রেণী পার্থক্য তৈরি করারর মৌল একক হয়ে উঠল জাতিবাদ এবং জাতিবাদ নির্ভর করে সাম্রাজ্যিক অসাম্য প্রতিষ্ঠা দেওয়া এবং সামাজিক অসাম্যই স্বাভাবিক ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করার ব্যবস্থা তৈরি করা হল।
জাতিতত্ত্বের সংজ্ঞা এবং কাঠমো তৈরি করার ইতিহাসচর্চার নাকাব উন্মোচন করার জন্যে ব্রিটিশেরা ‘অন্য’ বা ‘ওপর’কে যেভাবে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে বারবার অপকৃষ্ট জাতি হিসেবে তুলে ধরেছে সেই বিষয়টাও আমাদের মাথায় রাখা দরকার। সেম্যুর ড্রেশার বলছেন, উনবিংশ শতকের বৈজ্ঞানিক জাতিবাদের উদ্ভব ঘটলেও, বৈজ্ঞানিক জাতিবাদ জাতিতত্ত্ব বিষয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের মানসিকতায় বিরাট কিছু পরিবর্তন ঘটায় নি বরং শাসকেরা জাতিবাদী কাঠামোয় নিবদ্ধ থেকে নতুন ধরণের রেফারেন্স ফ্রেম তৈরি করতে পেরেছে (S. Drescher, “The Ending of the Slave Trade and the Evolution of European Scientific Racism,” Social Science Hisroy, 14, 3 (1 990), 4 15450)। উপনিবেশ উত্তর ব্রিটেন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে স্টুয়ার্ট হল বলছেন পার্থক্য তৈরি করার ক্ষেত্রে জাতিবাদীদের ‘যুক্তি দুটো’ ছিল প্রথমটা জৈবিক পার্থক্য এবং দ্বিতটা কৃষ্টিগত পার্থক্য [S. Hall, “Conclusion: The Multi-Cultural Question,” in B. Hesse (ed.), Unlsetrled Mulriculturalismst Diasporas, Enranglemenrs, Transruprions (London: Zed Books, 20001, p. 223)]। জন কোমারফ বলছেন উপনিবেশের অন্দরে নিয়মিত টানাপোড়েন তৈরি হওয়া সত্ত্বেও, সেই গতিশীলতা কোনওভাবেই সাম্রাজ্য শক্তিকে কম হিংসক, কম নিপীড়ক বানায় নি (Comaroff, “Symposium Introduction,” p. 306); অথবা উপনিবেশের অভ্যন্তরে তীব্র টানাপোড়েন সত্ত্বেও উপনিবেশিক শক্তি কম বেদনাদায়ক হয়ে ওঠেনি। আরও স্পষ্টভাবে বললে উপনিবেশিক ব্রিটিশ হত্যাকারীর হাতিয়ারে নিহত ভারতবর্ষীয়দের সেই হিংসক সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসন যতই কৃষ্টিগতভাবেই ন্যুন দেখুক অথবা জৈবিকভাবেই নিকৃষ্ট মনে করুক না কেন, তাতে সেই খুন হওয়া ব্যক্তির কিস্যু যায় আসে কী?
উপনিবেশিক ব্যক্তির চরিত্র অবশ্যই একমাত্রিক ছিল না। অথবা উপনিবেশিক বিশ্বে জাতিবাদের সীমান্ত খুবই সুরক্ষিত এবং স্বতঃপ্রমাণিতও হয়ে ওঠে নি (A. L. Stoler, “Making Empire Respectable: The Politics of Race and Sexual Morality in 20th-Century Colonial Culmres,” American Erhnologisr, 16, 4 (1989), 634-660)। এন স্টোলার এবং ফ্রেডরিক কুপার বলছেন, ‘উপনিবেশিক ব্যক্তির অনন্যত্ব যেমন বংশ পরম্পরায় আহৃত নয়, স্থায়ীও নয়; সেই মানুষটার ভিন্নতাকে সংজ্ঞায়িত করতে হয় এবং সেই ভিন্নতাকে বহন, পালনও করতে হয় (Cooper and Stoler, Tensions of Empire, p. 7)’। ব্রিটিশ আধিপত্যের ন্যায্যতা প্রতিপাদনের বিষয়টিও সময়ে সময়ে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে পাল্টেছে। ক্যাথেরিন হল উপনিবেশিক জামাইকা নিয়ে তাঁর অবিস্মরণীয় গবেষণা সিভিলাইজিং সাবজেক্টসএ বলছেন, দাস মালিক আর দাস ব্যবস্থা বিরোধীদের মধ্যে দাস ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া নিয়ে বিপুল মতপার্থক্য ছিল। ক্যাথরিন বলছেন, দুপক্ষের তীব্র মতপার্থক্য থেকে বিন্দুমাত্র প্রমান হয় না যে দাস মালিকেরা চরম জাতিবাদী ছিল আর দাস ব্যবস্থার বিরোধীদের তুলনামূলকভাবে কম জাতিবাদী অবস্থান ছিল। জামাইকার ব্রিটিশ ধর্মপ্রচারকেরা দাস ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিপুল প্রচার করেছেন সারা জীবন, কিন্তু তারা নিজেদের ‘পুত্র’কে ‘পুরুষতান্ত্রিক পরিবারের সদস্য’ হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন [C. Hall, Civilising Subjecrs: Merropole and Colony in the English Imaginarion, 183 & 1867 (Chicago: University of Chicago Press, 2002), p. 338)]। আমরা যেন ভুলে না যাই, মিশনারিরা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা থেকেই বিশ্বজোড়া অসাদা ভাগ্যহীনদের উদ্ধারকারী দেবদূত হিসেবে শ্বেতাঙ্গ সভ্যতা বিস্তারের দায় পালন করতেন।
ভারতবর্ষ উপনিবেশে বিভিন্ন কাজে আসা ব্রিটিশ প্রজারা একটা দিনের ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্যেও ভাবে নি যে ভারতীয় প্রজাদের সঙ্গে সদাচার করা হোক, এই ভাবনাটা তাদের মাথাতেই ছিল না। যদিও হয়ত তাদের কেউ কেউ ব্রিটিশদের হাতে ভারতীয়দের খুন হয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রকাশ্যে গলা তুলে তার বিরোধিতা করেছে, আবার কেউ হয়ত এই ধরণের ঘটনাকে সমস্যা হিসেবেই গণ্য করেন না। ১৮০৮-এর ১৪ মার্চ জনৈক বক্সি বেগমের ঘরে পিটার হে, জেমস রেইলি এবং জন রিড ঢুকে গলা চেপে ধরে। চৌকিদার মালকিনকে মুক্ত করতে এলে চৌকিদারকে মুগুর দিয়ে তিনবার মাথায় মারলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। ইওরোপিয় জুরিরা তিনজন হত্যা চেষ্টায় অভিযুক্ত ইওরোপিয়কে হত্যার অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিলেও, বিচারপতি হেনরি রাসেল মামলার রায়কে কলঙ্কিত বিষয় বলে অভিহিত করলেন এবং ক্ষোভে ফেটে পড়ে বললেন, ‘একে কীভাবে তোমরা হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিচার করলে না, বুঝতেই পারলাম না। পিটার ফে’র দুষ্কর্মটি হয় হত্যাকাণ্ড, নয় তো কিছুই নয়, স্রেফ ধাপ্পা … দেশিয় মানুষেরা নিরাপত্তার জন্যে আমাদের সাম্রাজ্যের আইনের দ্বারস্থ হয়েছিল। আমরা তাদের নিরাপত্তা দিতে প্রতিশ্রুত ছিলাম। আমরা এখানে তাদের সঙ্গে মিলেমিশে সৎভাবে আর নিরাপদে বসবাস। তারা আমাদের সেবা, আনুগত্য, সম্পদ উজাড় করে তুলে দিয়েছে – সর্বশক্তিমান না করুন, আমাদের হয়ত তাদের বলতে হবে আমাদের দেশের দুষ্কৃতিদের তুলনায় উপনিবেশিক জনগণের জীবনকে আরও কম মূল্যবান বলে মনে করি (BL, IOR, 01518)’। এক শতাব্দ পরে হেনরি কটন অথবা ভাইসরয় কার্জনের মত উচ্চপদস্থ আমলা একইভাবে, তাদের দেশ থেকে আসা আসামের চা বাগান মালিদের বিরুদ্ধে চা বাগানের কর্মীদের ওপর অকথ্য দৈহিক হিংসা নামিয়ে আনার বরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করবেন [C. Dowding, Coolie Nores (Dibrugarh, 1895), BL, IOR, L/PJ/6/832, File 3639]। রেভারেন্ড চার্লস ডাউনিং আসামের চা বাগানগুলোয় সাধারণ কর্মীদের ওপর নামিয়ে আনা দৈহিক হিংসা এবং অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেছেন। ডাউডিং, আসামের চা বাগান মালিক এবং তাদের হিংসার ব্যবস্থাপনাকে নিন্দা করে কার্জন সরকারকে চিঠি লিখলেও কিন্তু তিনি সেই নিন্দাবাদের চিঠিতে কোথাও বলেন নি সামগ্রিকভাবে সাম্রাজ্যভিত্তিক শাসনের ব্যবস্থাপনাই অনৈতিকতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। উলটে তিনি ‘আমাদের কুলিদের পক্ষে’ দাঁড়িয়ে আরও শক্তিশালী উপনিবেশিক সরকার তৈরির দাবি জানান এবং একই সঙ্গে উপনিবেশিক সরকারের কাছে বাগিচা মালিকদের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা দাবি করে বললেন, ‘সরকার আরও শক্তিশালী হোক যাতে বাগিচা মালিকদের কৃতকর্মের সীমানা বুঝিয়ে দেওয়া যায় এবং তাদের আরও বুঝিয়ে দেওয়া দরকার তারা যেন দেশিয় প্রতিবেশী মানুষদের মতই সাম্রাজ্যের আইন মান্য করে চলে (Letter from C. Dowding, February 25, 1902, BL, IOR, L/PJ/6/595, File 403)’। [ক্রমশ]