Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
ভূমিকা
ব্রিটিশ সাদা প্রজাদের চাপিয়ে দেওয়া হিংসা নিয়ে বিপুল পরিমান নথিকৃত তথ্য আমাদের বুঝতে সাহায্য করে অত্যাচারীর জাতিগত মনোভাব আর হিংসার উদ্দেশ্য। প্রাইভেট ফ্রাঙ্ক রিচার্ডস স্মৃতিকথায় লিখছেন ব্রিটিশ সেনাদের হাতে ভারতবর্ষীয়দের লাঞ্ছনা শুরু হত গালি দেওয়ার বর্ব থেকে, তারপরে আসত দৈহিক লাঞ্ছনা। তিনি একটি উদাহরণ তুলে বলছেন, জনৈক পাঙ্খাওয়ালা পাখা টানতে টানতে মাঝে ক্ষণিকের বিরতি নিলে ব্যারাক থেকে একটা রুক্ষ্ম গলা ভেসে আসত, ‘পাখা টান কালো বেজম্মার বাচ্চা, হাওয়া না পেলে বেরিয়ে এসে লাথি মেরে তোকে নরকে পাঠিয়ে দেব [(F. Richards, Old Soldier Sahib (London: Faber and Faber, 1936), pp. 239-240)’]। প্রায় প্রত্যেক ব্রিটিশ, প্রত্যেক ভারতীয়কে ‘কালো’ এবং ‘নিগার’ নামে ডাকত এবং তাদের সঙ্গে সেই মত লাঞ্ছনাকর আচরণও করত। উনবিংশ শতাব্দের মাঝামাঝি সময়ের এক ব্রিটিশ পর্যবেক্ষক লিখছেন, ‘নেটিভদের ওপর নেমে আসা হিংসায় অধিকাংশ সময়ে হত্যভাগ্যর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে। …লাঞ্ছনা শুরু হত প্রায় সর্বস্তরে ‘সাহেবের’ পক্ষ থেকে ‘নিগার’দের ওপর নিক্ষিপ্ত অশ্লীল কৌতুকে’ যেন বেচারা প্রাণহীন হতভাগ্য অসাদা প্রজার জন্মই হয়েছে অভিশপ্ত উপনিবেশিক দাসত্বের গলবন্ধ পরে প্রভু জাতের সেবা করার উদ্দেশ্যে, তার ভবিষ্যৎ রাস্তার হতভাগ্য কুকুরের বেশি নয় (তারিখহীন প্রবন্ধ Bombay Gazette উদ্ধৃত হয়েছে Mookheji, Selections, pp. 299-300)’।
১৮৭৪-এ হিন্দু প্যাট্রিয়টে জনৈক ডাক রানারকে রাস্তার ধারের খুঁটিতে বেঁধে চাবুক চালিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনায় বাগান মালিক জর্জ মেয়ারেসের বিরুদ্ধে ওঠা মামলা নিয়ে নিয়মিত সংবাদ এবং প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে ‘সাহেব এন্ড দ্য নিগার’ শীর্ষকে, কিন্তু এই দুঃসহ হত্যাকাণ্ডের প্রতিকার করা যায় নি (Hindoo Patriot, August-September 1874)।
উত্তর আমেরিকায় দেশিয় মানুষদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া ঘৃণাপূর্ণ আচরণের মত করে ‘ইন্ডিয়ানদের ওপর হত্যা’লীলা নামিয়ে আনা হয়েছে এবং এই ধরণের মামলা আদালতে উঠলে বলা হল ‘এই হত্যাকাণ্ডকে উপনিবেশিক শাসকেরা এক ধরণের খেলা হিসেবে নিয়েছে’ [(W. Churchill, Perversions of Justice: Indigenous Peoples and Angloamerican Law (San 70 Francisco: City Lights Books, 2003), p. 268)]। একই তুলনা উল্লেখ দেখি ভারতবর্ষের ‘ইন্ডিয়ানদের ওপর হত্যা’কাণ্ড বিষয়েও। জনৈক সাংবাদিক লিখছেন, ‘এই দেশে ব্রিটিশরা মনে করত তারা শাসক জাতি এবং ভারত দেশটি তাদের যথেচ্ছ অত্যাচার চাপিয়ে দেওয়ার ক্রীড়াক্ষেত্র। ভারতে ব্রিটিশাররা আসে অর্থ জমিয়ে বুড়ো বয়স আরামে কাটাতে, তার সেই কাজ করার জন্যে আনন্দ স্ফূর্তি আদায় করে কালা মানুষ হত্যা করে। ভারতবর্ষীয় উপনিবেশের বাঘ বা ভালুক মারাকে শৌর্য প্রকাশের উপযুক্ত খেলা হিসেবে ধরা হয় না; মাঝেমধ্যে নেটিভদের গুলি চালিয়ে হত্যা না করলে ব্রিটিশারদের কোনও খেলার আমোদই সম্পূর্ণ হয় না (Sulabh Dainik, July 6, 1893, BL, IOR, LR/5/148)’। পশু শিকারের সঙ্গে তুলনা টেনে উপনিবেশের নিকৃষ্ট ভারতীয় প্রজাদের ওপর আক্ষরিক অর্থে গুলি চালানোর থেকে বেশি জাতিবাদিতার প্রকাশভঙ্গী আর কীই বা হতে পারে?
অসরকারি ব্রিটিশদের অত্যাচার চাপিয়ে দেওয়ার খেলার মাত্রা এমন অবস্থায় পৌঁছেল যে, অকুতোভয় ব্রিটিশেরা স্বদেশিয় উচ্চপদস্থ আমলাকেও হত্যার হুমকি দেওয়ার জন্য রেয়াত করল না। ১৮৩০-র দশকে অসরকারি ব্রিটিশেরা উচ্চপদস্থ আমলা সাম্রাজ্য তাত্ত্বিক মেকলেকে পর্যন্ত প্রকাশ্যে দল বেঁধে খুন করার হুমকি দেয়, তিনি সাধারণ দেওয়ানি আদালতে ব্রিটিশদের বিচারের জন্যে আইন প্রণয়ণের ভাবনা ভাবছিলেন। মেকলে যে সংহিতা প্রণয়ণের পরিকল্পনা করছিলেন, সেটিকে তারা ‘কালা আইন’ নামে অভিযুক্ত করে। উত্তরে মেকলে কৌতুকে বলেন, ‘আমরা মুক্তির শত্রু, আমরা দাপুটে হাতে গোণা অভিজাত, লক্ষ মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করতে লজ্জা পাই না (Legislative Consultations of October 3, 1836, No. 5, BL, IOR. P/206/84)’। নৈতিকভাবে অধঃপতিত আমেরিকিয় দাস মালিকদের বিচার ব্যবস্থা এড়াতে চাওয়ার বিশেষ উদাহরণ দিয়ে ১৮৫০-এ নিজামত আদালতের বিচারক জে ডানবার বলেছিলেন, The obstinacy with which persons even of liberal education cling to the idea of an actual and indefeasible right , to exemption appears to be little less surprising than that perversion of mind which leads the white race in the Southern States of America to claim a right of property in their unhappy slaves (Minute, March 8, 1850, in the Legislative Consultations of May 10, 1850, No. 67, BL, 73 IOR, P/207/60)’। কুলিদের ওপর অত্যাচারের জন্যে কুখ্যাত চা বাগানের চা তৈরির কাজে লাগা চামড়ার নানান জিনিসপত্র বানানো জয়রামপুরের একটি কারখানার সংবাদ ছাপলেন হরিশচন্দ্র মুখার্জী ১৮৬০-এ, ‘আমরা বিশ্বাস করি এই চা উৎপাদনের সরঞ্জামগুলো সরকারের আওতায় যাবে এবং সেখান থেকে সেটি যাবে ইংলন্ডে সেই সব ভদ্রলোকেদের জন্যে যারা বিশ্বাস করেন ক্যালিফোর্নিয়ার তুলো চাষীদের থকে বাঙলার নীলকরেরা চরিত্রগতভাবে আলাদা (Hindoo Patriot, July 25, 1860)’।
১৯০৭-এ রেভারেন্ড চার্লস ডাউনিং আসামের চুক্তিবদ্ধ চাবাগানের শ্রম ব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার নামিয়ে আনার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ আর অবস্থা বিগড়োবার আশংকা প্রকাশ করে, শ্রম শর্ত লঙ্ঘনের জন্যে চাবাগান মালিকদের গ্রেফতারের দাবি জানালন এবং শ্রমিক জোগাড়কে ‘কুলি ধরে আনা’ (কুলি-ক্যাচার) হিসেবে অভিহিত করে মালিকদের আমেরিকার দাস মালিকদের সঙ্গে তুলনা করলেন (Dowdings many letters in BL, IOR, LPJ/6/417, File 575 and L/PJ/6/832, File 3639)। পালিয়ে যাওয়া শ্রমিককে ধরে দিলে শ্রমিক পিছু পাঁচ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির বিজ্ঞাপন স্থানীয় কাগজগুলো থেকে সংগ্রহ করে বললেন কীভাবে এই ব্যবস্থার জন্যে স্থানীয় অঞ্চলে মানুষ বন্দী হয়ে আছে। একটি বিজ্ঞাপন ছিল এইরূপ – ‘মহাশয় – দুজন মানুষ, একজন খুব ঢ্যাঙ্গা, ছয় ফুটের ওপরে, এক শিশু-সহ দুজন মহিলাকে ধরে রাখা হয়েছে, মনে হয় পালাচ্ছিল, তাদের দেখে পুরোনো কুলি বলেই মনে হয়, আপনি যদি কোনও বাগানের কর্তৃপক্ষকে চেনেন, যাদের বাগান থেকে ওপরের বর্ণনা অনুযায়ী কুলিরা পালিয়েছিল, তাহলে অতিশীঘ্রই বাগানের ব্যবস্থাপককে জানাবেন – আপনার বিশ্বস্ত’।
ডাউনিং এই ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলেন আমেরিকার দক্ষিণ অঞ্চল থেকে পালিয়ে যাওয়া দাসেদের অবস্থার সঙ্গে —
কি টু আঙ্কল টমস কেবিনের’ পাঠকেরা মনে করতে পারবেন নিশ্চই যুদ্ধ পূর্ব সময়ে দক্ষিণের রাজ্য থেকে পালিয়ে যাওয়া দাসেদের নিয়ে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের সঙ্গে এই বিজ্ঞাপনের কী অদ্ভুত মিল … ১৪ দিনের মধ্যে দাবি উত্থাপিত না হলে, রাহা খরচ-সহ এদের বিক্রি করে দেওয়া হবে … আসামের মানুষদের মুক্তি দুরস্ত (৭৩)।
এই ধরণের অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সমসাময়িক বহু মানুষ ‘নিচমনা সাদা’দের বিরোধিতা করেছে আমেরিকার দাসত্ব প্রথা বিরোধিতার সূত্রে।
জাতিবাদের আলোচনায় আবশ্যিকভাবে শ্রেণীর প্রশ্নটা উঠবেই। শ্বেত সন্ত্রাসের সঙ্গে জুড়ে থাকা মানুষরা মূলত ছিলেন বাগিচা মালিক, সেনা বা নাবিক। এরা মূলত ব্রিটিশ উপনিবেশিক সমাজের নিচু স্তরের মানুষ। এদের উপনিবেশিক প্রশাসকেরা ‘নিচমনা সাদা’ দাগিয়ে দিত, যে শব্দবন্ধ ব্যবহৃত হয়েছে আমেরিকার দক্ষিণের দাস মালিক সমাজ বিশ্লেষণে। সেখানে এই শব্দের মানে ছিল গরীব শ্বেতকায় বা ‘সাদা জঞ্জাল’ (BL, IOR, L/PJ/6/832, File 3639)। মাথায় রাখতে হবে এই শব্দের সঙ্গে জাতিবাদ এবং শ্রেণীভাবনা উভয়ই জড়িয়ে আছে। সপ্তদশ শতক থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে ব্রিটিশ পরিচয় নির্ধারিত হয়েছে জাতিবাদীভাবে অন্যদের (আদার) ওপর আবশ্যিকভাবে হিংসক আক্রমন নামিয়ে আনার চরিত্র অবলম্বনে। ব্রিটিশ রিচার্ড বসকোয়েন মন্তব্যে ‘একজন রোমককে পিটানো উচিৎ নয়’ উল্লেখ করে পিটার লাইনব এবং মারকাস রেডিকার বলছেন ‘এই শব্দবন্ধের মাধ্যমে বসকোয়েন বুঝিয়েছেন ব্রিটিশত্ব এমন একটা বিশ্বনাগরিকত্ব যা মালিকদের হিংসা থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে। যদি পার্লামেন্ট এই আবেদন বিষয়ে আইন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে ‘আমাদের জীবন নিগ্রোদের মত শস্তা হয়ে যাবে’। কোনও ব্রিটিশকে আফ্রিকিয়র পাশে কাজের জন্যে জুতে দেওয়া হবে বলতেই স্যর আর্থার হেসিলরিজ চোখের জল আটকাতে পারেন নি’ [(J. R. Gilmore, “The ‘Poor Whites’ of the South,” Harper’s New Monthly Magazine, 29 (1864), p. 115. 77 P. Linebaugh and M. B. Rediker, The Many-Headed Hydra: Sailors, Slaves, Commoners, and the Hidden History of the Revolutionary Atlantic (Boston : Beacon Press, 2001), p. 134)]’। অন্যভাষায় বলতে গেলে ব্রিটিশদের দায় হল আফ্রিকিয়দের পাশে কাজ করা নয়, তাদের ওপর প্রভুত্ব করা। ব্রিটিশারের আরেক উদ্দেশ্য মার না খেয়ে পাল্টা মার চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার রক্ষা। [ক্রমশ]