Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
ভূমিকা
জাতিবাদী হিংসা বিশ্লেষণে শ্রেণী ভূমিকার আলোচনায় আমরা আন্দাজ করার চেষ্টা করব সাম্রাজ্যের উপনবেশিক অর্থনীতি পরিচালনা গিয়ে সাম্রাজ্য ব্যবস্থাপকদের কী কী তীব্র ধরণের দৈহিক হিংসা নামিয়ে আনতে হয়েছে। নিম্ন বাঙলার নীল বাগিচা থেকে আসামের চা বাগান – প্রায় সব ধরণের উপনিবেশিক অর্থনীতিতে শ্রমিকদের ওপর হিংসা নামিয়ে আনাটাই ছিল উপনিবেশিক লুঠ ব্যবস্থা সচল রাখার একমাত্র উপায়। আশ্চর্যের কথা হল উৎপাদন ব্যবস্থায় চাপিয়ে দেওয়া হিংসার নাম দেওয়া হল শৃংখলা-রক্ষা। হিংসার প্রাবল্য ব্যবহার করা হত কর্মীদের ছুটি না দিয়ে – কাজের সময় না বেঁধে প্রায় সারাক্ষণ কাজে ডুবিয়ে রেখে, যেন তেন প্রকারে দাবিয়ে রেখে এমন চরম কী শাস্তিও দিয়ে। রেভারেন্ড ডাউনিংকে উদ্ধৃত করে বলতে পারি, রক্ষী বেশ পরা এক দল ঘোড়ায় চেপে চাবুক চালিয়ে শ্রমিক শ্রমের শেষ বিন্দুটুকু নিংড়ে কাজ করিয়ে নেবার জন্যে কুখ্যাত ছিল। আসামে তাদের দলের নিত্য নতুন আকারে অত্যাচার, হিংসা নামিয়ে আনার দক্ষতায় উপনিবেশিক পক্ষরা গর্ব করতেন [C Dowding, “Assam Coolie Recruiting,” in J. Buckingham, Tea-Garden Coolies in Assam; “Indian Churchman” প্রত্রিকায় প্রকাশিত হিংসা বিষয়ে একটি প্রবন্ধ, ভূমিকা আর উত্তরসহ নতুন করে ছাপেন Rev. Charles Dowding (London, 1894)]।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রভু ভৃত্যের সম্পর্ক রক্ষাকারী আইনগুলো কলোনিতে শ্রমিকদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখতে এবং শাস্তি দেওয়ার জন্যে বিখ্যাত ছিল। মেট্রোপলিটনের আইন আর প্রথা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল উপনিবেশিক শ্রম আইন [D. Hay and P. Craven (eds.), Masters, Servants, and Magisrrares in Britain and the Empire, 1562-1955 (Chapel Hill, NC: University of North Carolina Press, 2004)]। মেট্রোপলিটনের শ্রমিকেরা কর্মক্ষেত্রে আহত হলে এবং শোষণের শিকার হলে রাষ্ট্র তাদের উপযুক্ত সুরক্ষা দিতে নানান ধরণের রাষ্ট্রীয় আইন তৈরি করে। অন্যদিকে উপনিবেশিক চা বাগানের শ্রমিক শর্তাধীন চাকরির নিয়োগের আইনের বাঁধা। চাকরির শর্ত লঙ্ঘন করলে আইনবলে মালিকেরা শ্রমিকদের আদালতে না পাঠিয়ে নিজেরাই আদালত এবং আইন রক্ষাকারী হয়ে তাদের গ্রেফতার করতে পারত এবং শাস্তিও দিতে পারত। চাবুক দিয়ে পেটানো, বেত মারা, বন্দী করে রাখা চা বাগানের শ্রমিকদের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ছিল; ইওরোপিয় কর্তা আর কুলির সম্পর্ককে ‘মানুষ-মানুষের মধ্যে’ সম্পর্কের বাইরে সম্পর্ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে (P.G. Melitus, Secretary to the Chief Commission of Assam, “Report on Labor Emigration into the Province of Assam for the Year 1900,” BL, IOR, V12411223)। আমরা যেন মাথায় রাখি চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের মালিকদের হাতে দণ্ডবিধানের প্রক্রিয়াটি চা বাগানে চুক্তিশ্রম আইনের অর্ধ শতাব্দ পূর্বেই ব্রিটেনে বাতিল হয়ে গেছে।
শেষ অবদি আমরা আইনের ভূমিকা কী ছিল, সেই প্রশ্নের সামনে উপস্থিত হই। উপনিবেশের প্রাতিষ্ঠানিক আইন (যেমন আসামের চুক্তিবদ্ধ শ্রম আইন) কর্তৃপক্ষকে শ্রমিকের ওপর হিংসা চাপিয়ে দেওয়ার বৈধতা তৈরি করেছে। স্বাভাবিকভাবে কর্তৃপক্ষ তাদের স্বার্থে তৈরি সেই আইন ব্যবহার করেছে। তবুও বলা দরকার উপনিবেশিক ভারতে অধিকাংশ জাতিবাদী হিংসা আইনের আওতার বাইরে দাঁড়িয়েই অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপনিবেশিক আইন শ্বেত সন্ত্রাসের জনক না হলেও, কিন্তু একটা তথ্য পরিষ্কার করে দেওয়া দরকার, সার্বিকভাবে আইন দিয়ে ইওরোপিয় হিংসা রোখার কাজ চরম ব্যর্থ হয়েছে। বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গীতে বললে উপনিবেশে আইন ইওরোপিয়দের চাপিয়ে দেওয়া হিংসার পৃষ্ঠপোষণা করেছে। হিংসাকে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য করেছে। ইওরোপিয় হিংসা আইনের ওপরে স্থান পেয়েছে উপনিবেশে। উপনিবেশিক সময়ে ভারতে অপরাধী ব্রিটিশেরা স্পষ্ট জানত দণ্ড সংহিতার নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা, স্থানীয় শাসকদের শক্তিহীনতা এবং আদালতে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার ব্যর্থতার ধারাবিবরণী। সংক্ষেপে বললে তারা অবাধে হিংসা চাপানোর সাহস পেয়েই হিংসা নামিয়ে আনার কথা ভাবত। তারা জানত হিংসা করে পার পাওয়া যায়। জনৈক ভারতীয় লেখক বলছেন, ‘এই ধরণের বৃহত্তর অপরাধ করেও অপরাধীদের যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয় নি। ভারতবর্ষীয়রা পশুদেরও অধম এই ধারণা ছড়িয়ে যাওয়ায় ইওরোপিয়রা হিংসা চাপিয়ে দেওয়ার কাজে আরও বেশি করে প্রণোদিত হল (Surodaya Rakasika, January 7, 1903, BL, IOR, L/R/5/111)’।
অধ্যায়ের বর্ণনা
প্রথম অধ্যায়
উপনিবেশিক সমাজের খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বঞ্চিত তৃতীয় পক্ষ অসরকারি ব্রিটিশ বা ইওরোপিয় প্রজা, ১৭৬৬ থেকে (ব্রিটিশদের বাংলা শাসন ক্ষমতা অধিকার করার পরের বছর থেকে) নৈতিক, আইনি এবং রাজনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করল। এই হিংসা প্রক্রিয়া শেষ হবে ১৮৩৩এ (টমাস মেকলে আইন প্রণয়ন করার পরের সময়ে)। ভারতজুড়ে কোম্পানির শাসন দ্রুত বিস্তার ঘটার সময় অআমলা শ্বেতাঙ্গদের বেআইনি কাজকর্ম ভারত শাসনের ক্ষেত্রে ঝামেলাদার হয়ে উঠছিল। উপনিবেশের শুরুর সময়ে কেস ল’এর উদাহরণগুলোয় ইওরোপিয়দের অবাধ্যতা এবং আইনের অনুশাসন মান্য না করার প্রবণতা দেখি। এই সব পরিষ্কার উদাহরণ থেকে আমরা আন্দাজ করতে পারি সাম্রাজ্য বিস্তৃতি সত্ত্বেও উপযুক্ত আইনের অভাবে ইওরোপিয় হিংসা এবং অপরাধের প্রবণতা বাড়ছিল।
দ্বিতীয় অধ্যায়
ইওরোপিয় দুর্বৃত্তায়নের সরকারি প্রতিক্রিয়া হল আইন সংহিতাকরণের উদ্যোগ। লিখিত আইনের বিধি তৈরি করে নতুন উপনিবেশিক শাসকেরা চে’ষ্টা করল ভারতজুড়ে বাড়তে থাকা শ্বেতকায় বাসিন্দা, পুঁজিপতি এবং বাগিচা মালিক অর্থাৎ স্থানীয় ফৌজদারি আইনের আওতার বাইরে থাকা প্রজাদের আইনের আওতায় আনতে। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে উপনিবেশিক প্রশাসকদের মাথ্যা ব্যথার কারন হয়ে ওঠা, অসরকারি ইওরোপিয় সমাজ চাপ তৈরির গোষ্ঠী হিসেবে হিসেবে খুবই শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং দেশিয়দের ওপর ইওরোপিয়দের অত্যাচার নামিয়ে আনার অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বেসরকারি ইওরোপিয়রা আইন এবং সুবিচার দেওয়ার পদ্ধতি তৈরির প্রচেষ্টাকে স্বাগত তো জানালই না বরং সরকারকে চাপ দিয়ে সাধারণ প্রজার জন্যে তৈরি আইনের আওতা থেকে নিজেদের বাদ রাখতে সফল হল। দণ্ডসংহিতা আলোচনায় আমরা এটির প্রণয়ণের প্রেক্ষিত এবং প্রভাবটি বুঝতে চেষ্টা করব। প্রজাদের সমবিচার দেওয়ার জন্যে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই আইন বাস্তবে প্রযুক্ত হয়ে চরমতম অসাম্য প্রসব করে। প্রভাবশালী তৃতীয় পক্ষীয় বেসরকারি ইওরোপিয় দলের জন্যে বিশেষ আইনি সুবিধা এবং ছাড় দিয়ে যে নতুন আইন তৈরি হল, সেই আইন চলতি ইওরোপিয়দের চাপিয়ে দেওয়া হিংসা রোখার উদ্যম গভীর ব্যর্থতার খাদে ঠেলে দেয়। ভারতে থাকা ব্রিটিশরা হত্যা করেও কড়া শাস্তি থেকে বেকসুর খালাস পেতে থাকে।
আইনে জাতিবাদী প্রভেদ তৈরির ফলে সাম্রাজ্যের দেওয়া আইনি সামানাধিকারের প্রতিশ্রুতি শুধু লঙ্ঘিতই হল না, আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সামনে প্রভূত সমস্যা খাড়া করল। বাড়তে থাকা বিভিন্ন স্তরের শ্বেতাঙ্গ গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া বর্বর, হিংসক অপরাধ সামাল দিতে উপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যর্থ হল। ব্রিটিশদের বাড়তে থাকা বর্বরতা প্রশাসকদের মাথ্যা ব্যথার কারন হয়ে দাঁড়ালেও সেই বর্বরতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে তারা কার্যকর পদক্ষেপ করতে পারে না এবং সেগুলো প্রতিরোধ করতে খুব একটা চেষ্টাও কছে বলা যাবে না। আইনি সাম্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া উপনিবেশিক রাষ্ট্র উপনিবেশের বিশেষত্বকে মাথায় রেখে অসাম্যের আইনকে উপস্থাপিত করল আইনি সাম্য এবং যথাযথ বিচার দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে। বিচার দেওয়ার এই উপনিবেশিক বিপর্যয় সমালোচকদের দৃষ্টি এড়ায় নি। জনৈক ভারতীয় লিখলেন, ‘আদালতে আইনি নিপীড়নের উদাহরণ অবলম্বনে কী আমরা জিজ্ঞাসা করতে পারি না, হে মহামহিম ব্রিটিশ সরকার, আপনি কেন আদালতকে ধর্মাধিকারণ আখ্যা দিয়েছেন? আপনার বিচারকদের কেন ধর্মাধিকার হিসেবে সম্বোধন করব? আপনার আদালতজুড়ে তৈরি হওয়া অবিচারের বাজারকে কীভাবে আমরা ধর্মাধিকার নামে অভিহিত করব?’ (Sulabh Dainik, July 19, 1893, BL, IOR, LR/5119)। [ক্রমশ]