Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
অধ্যায়ের বর্ণনা
তৃতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখব, প্রশাসনের বাইরে থাকা ব্রিটিশ সমাজের মানুষদের বিশেষ আইনি সুবিধে পাওয়ার দাবিদাওয়ার আন্দোলন যেমন আইনি সাম্য তৈরির পদ্ধতিটিকে সার্বিক ব্যর্থতার কাণাগলিতে ঠেলে দিল, তেমনি দেশিয় মানুষদের নিয়ে উপনিবেশিক মিথ্যাচার, বিকৃত ধারণা, ভারতবর্ষীয়দের সঙ্গে ইওরোপিয়দের কৃষ্টিগত পার্থক্যর অজুহাত একজোট করে প্রমান সংক্রান্ত আইন – ল’ অব এভিডেন্স সংহিতাকরণের কাজ এগিয়ে চলল দ্রুত গতিতে। ভারতবর্ষে তৈরি প্রমান তত্ত্ব তৈরিই হল দেশিয় প্রত্যক্ষ্যদর্শীর বয়ান আর তার সাক্ষ্য অবিশ্বাস করার ধারণা থেকে [কলস্কি বলতে ভুলে গেছেন, উপনিবেশের মানুষদের শিশুর সঙ্গে তুলনা করা হত। উপনিবেশিক প্রশাসকেরা মনে করত শিশুর মানসিকতায় উপনিবেশের প্রজারা স্বাধীন চিন্তা করতে পারে না, তাদের রাস্তা দেখানো প্রশাসনের জরুরি কাজ – অনুবাদক]। এই অধ্যায়ে আমি আরও দেখাব উনবিংশ শতকে উপনিবেশিক প্রশাসকদের পক্ষ থেকে ভারতীয়দের সাক্ষ্যকে জালিয়াতি বলা হল, তাদের অর্থের বিনিময়ে পেশাদার সাক্ষ্যদাতা বলা হল। আইনি তৈরি করা পেশাদার পক্ষ মনে করত ভারতবর্ষীয়রা বাস্তবকে গল্পের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। এই অধ্যায়ে আমরা আদালতে সত্য বলানোর পদ্ধতি বিকাশের সময়টিকে ধরব। উপনিবেশ, বিভিন্ন অবিশ্বাসী মানুষদের বয়ান থেকে সত্য নিরূপণেরর জন্যে বিচারশালায় শপথ প্রক্রিয়া, ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রমান নির্ভর বিচার এবং মেডিকো-লিগ্যাল পেশাদারদের ব্যবহার করে নানান রকমের সত্য বলানোর প্রযুক্তি বিকাশের চেষ্টা করছিল। মৌখিক প্রমানের তুলনায় বৈজ্ঞানিক তথ্য অসীম নির্ভরযোগ্য, এই বিশ্বাসে ভর দিয়ে আইনে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যধিক গুরুত্ব পেল। উপনিবেশিক ফৌজদারি তদন্ত এবং কার্যক্রমে শারীরিক বা বাস্তব সংক্রান্ত প্রমান ব্যবহার করে মৌখিক প্রমান-সাক্ষ্যকে নস্যাৎ করার ব্যবস্থা হল। ভারতীয় জনগণ, তাদের দেহ এবং কৃষ্টি বিষয়ে উপনিবেশিক বদ্ধমূল ধারণা নির্ভর করে গড়ে উঠল মেডিকো-লিগ্যাল লেখাপত্র, ব্যবহৃত হল বিভিন্ন জাতিবাদী লব্জ, যা আদতে নৈর্ব্যক্তিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দাবির সরাসরি বিরোধী। হিংস্র শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে মামলায় এই পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ল। ভারতীয়দের দেহ বিষয়ক উপনিবেশিক ভাবনা নির্ভর নির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে চিকিৎসাশাস্ত্রীয় ব্যখ্যার আড়ালে বেকসুর পার পেয়ে যেতে শুরু করল ইওরোপিয় হিংস্র খুনির দল।
চতুর্থ অধ্যায়ে উপনিবেশিক আসামের চাবাগানের আইন, হিংসা এবং সাম্রাজ্যের মধ্যে টানাপোড়েন আলোচনা করব। ভারতে, বিশেষ করে আসামে উপনিবেশ তাদের মত করে উপনিবেশিক আইনের রাজনীতি এবং হিংসা সাজিয়ে নিয়েছিল খুল্লমখুল্লা আঙ্গিকে। উপনিবেশের উত্তরপূর্ব প্রান্তের অঞ্চল বলে আসামে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়েও উপনিবেশিক শক্তি খুব একটা গা লাগায় নি। উপনিবেশিক আসামে কর্তৃত্ব করত চা বাগানের মালিক আর কর্মচারীরা। তারা বাগানের কর্মীদের ওপর চুক্তিভিত্তিক বশ্যতা/দাসত্ব চাপিয়ে দিত। শ্রমিকেরা সামান্যতম শর্ত লঙ্ঘন করলে রাষ্ট্র মালিকদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছিল। মালিকদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করে বাগান অর্থনীতি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে উপনিবেশিক রাষ্ট্র তার শাস্তি দেওয়ার একচেটিয়া ক্ষমতাকে চাবাগান মালিকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেও দ্বিধা বোধ করে নি। বাগিচা মালিকদের তীব্র হিংসা নামিয়ে আনার ক্ষমতা থেকে আমরা আন্দাজ করতে পারি কীভাবে উপনিবেশে আইনকে উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ এবং নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছে। একই ভাবে আমরা দেখব কীভাবে চাবাগান শ্রমিকেরা চুক্তির শর্তগুলিকে তাদের মত করে নিজেদের স্বার্থে মাঝে মাঝে ব্যবহার করে উপনিবেশিক ক্ষমতাকে বিচ্যুত করার সুযোগ খুঁজে নিয়েছে।
পঞ্চম অধ্যায়ে আমরা দেখব উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের রাজনীতি সূত্রে কীভাবে হিংসা এবং আইনের মধ্য দ্বন্দ্ব সংঘাত তৈরি হচ্ছে, উনবিংশ শতকের শেষের দিকে বাগিচা মালিকদের হিংসার পরিমান আকাশ ছুঁয়েছে, বিভিন্ন কুখ্যাত মামলায় অভিযুক্তকে রাষ্ট্রের শাস্তি দেওয়ার ব্যর্থতাই অত্যাচারী সাম্রাজ্যের প্রতীক হয়ে উঠছে। ভারতবর্ষীয় সংবাদপত্র এবং জাতীয়তাবাদী সঙ্গঠনগুলির আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে জুড়ে ছিল আসামের চা বাগিচায় মালিকদের চাপিয়ে দেওয়া হিংসা আর উপনিবেশিক জুলমের বিস্তৃত বর্ণনা। আন্দোলনকারীদের কাছে এই হিংসাই ছিল উপনিবেশিক প্রশাসনের বিচার দেওয়ার অযোগ্যতার প্রমান। উপনিবেশ পরিচালনার মৌলিক ভিত্তি ছিল ‘কালো মানুষদের জন্যে এক ধরণের আইন আর সাদাদের জন্যে অন্য ধরণের’ আইনের ব্যবস্থাপনা (Legislative Council Member W. Bird’s Minute of August 26, 1844, NAI, Legislative Proceedings, October-December 1844, October 12, 1844, No. 4)। আইনি অধিকারের বিপুল অসাম্য সমাজুড়ে ছেয়েগিয়েছিল। জাতিবাদী বিচারকদের পক্ষপাতিত্ব তো ছিলই। আসামের ক্ষেত্রে মারাত্মক অপরাধ করেও স্থানীয় ফৌজদারি আদালত থেকে সহজেই মুক্তি মিলত। এই সব মিলে তৈরি হয়েছে পক্ষপাতমূলক আইনি সিদ্ধান্ত। উপনিবেশিক অসাদা জনসাধারণের বদ্ধমূল ধারণা ছিল ‘ইওরোপিয়রা দেশিয়দের বিরুদ্ধে শত অত্যাচার করলেও আমরা কোনও আদালতেই বিচার পাব না’ [R. G. Sanyal, Record of Criminal Cases as Between Europeans and Natives for the Last Hundred Years (Calcutta, 1896), pp. 159-160)]। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী এবং বিদেশে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের কর্মীরা জাতিবাদী মামলায়গুলোয় শ্বেতাঙ্গ বিচারপতিদের বিকৃত রায়গুলি নিয়ে দৈনিকভাবে প্রচার দিয়ে দেখাত, কীভাবে সাদা অভিযুক্তরা অক্লেশে ছাড়া পেয়ে যায়। উনবিংশ শতের শেষের দিকের ইওরোপিয় হিংসার প্রেক্ষিতে তৈরি হয় রেসিয়াল ডিসটিংশন কমিটি (১৯২১)। কমিটি ভারতীয় আইনকে জাতিবাদ মুক্ত করতে এবং বৃহত্তর উপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে ‘আইনের রঙ’ নিয়ে আলোচনা শুরু করে [G. W. O’Brien, The Color of the Law : Race, Violence, and Justice in the Post- World War II South (Chapel Hill, NC: University of North Carolina Press, 1999)]। [ক্রমশ]