Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
প্রথম অধ্যায়
সাদা কুলাঙ্গার — উপনিবেশের শুরুর সময়ে আইন, অরাজকতা
উপনিবেশ এবং আইনের অনুপস্থিতি
মফঃস্বলে বাসকরা ব্রিটিশ প্রজাদের ফৌজদারি দুষ্কর্ম নিয়ন্ত্রণে কোম্পানির বিচার বিভাগের কর্মচারীদের অধিকার ছিল না বললেই চলে। কর্মচারীদের বিচার করার এই অসহায় ক্ষমতাহীনতা, জনগণকে বিচার দেওয়ার ক্ষেত্রে যে চরম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছিল সেটা আমলাতন্ত্রের না বোঝার বিষয় ছিল না। কর্মচারীরা যে এ বিষয়ে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাত, কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট সেই অভিযোগনামায় কাজের কাজ হয় নি। ১৭৯৬-তে পাটনা হাইকোর্টের বিচারপতি চার্লস কিটিং কলকাতার কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখে জানালেন, সে সময়ের ফৌজদারি ‘আইন সুবিচার দিতে বাধা সৃষ্টি করছে’। এই চিঠি লেখার কিছু আগে বিচারপতি কিটিং, ত্রিহুতের জনৈক নীলকর রিচার্ড জনসনের মামলার বিচার করছিলেন। কিটিংএর আদালতে রিচার্ড অভিযোগ আমল, বেয়ারা ভৃত্য ভোলা আর তার স্ত্রী বুসিয়া মিলে কলমদানিতে রাখা ৪৮১ টাকা এবং ১২০০ পিস(?) চুরি করেছে(BL, IOR, 0/5/4)। বিচার চলাকালীন খোদ জনসনের বয়ানে একটা অদ্ভুত তথ্য উঠে এল — বোঝা গেল ত্রিহূতের একচ্ছত্র অধিপতি নীলকর সাহেব ‘অবাধ্য অহংকারে বিচার করার বেআইনি অধিকার নিজের হাতে তুলে নিয়েছে’। সাদা বাংলায় রিচার্ড, ভৃত্য ভোলা এবং ভোলার স্ত্রী বুসিয়ার ওপর অমানুষিক দৈহিক অত্যাচার নামিয়ে এনে তাদের চুরির মিথ্যে জবানবন্দী দিতে বাধ্য করেছে। জনসন ভোলার জবানবন্দী নিতে তার ওপর প্রবল অত্যাচার শুরু করে। প্রথমে তার হাতে একটি গরম লোহার দণ্ড ধরিয়ে দেয়, পরে সেই দণ্ডের ওপর তাকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখে। ভোলা তার নির্দোষিতা জানাতে থাকলে জনসন লোহার শিকলে তার হাত পা বেঁধে ফেলে একটি ত্রিভূজাকৃতি দণ্ডে ঝুলিয়ে ২৫ বার বেত মারে। ভোলার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে জনসন তার স্ত্রী বুসিয়াকে নগ্ন করায় এবং ভোলার সঙ্গে তাকেও লোহার শকলিতে বেঁধে তাদের স্টকসে (স্টকস হল একটি কাঠে তৈরি অত্যাচারের কাঠামো যেটা আমেরিকায় দাস ব্যবসায়ীরা, ভারতে নীলকরেরা দেনাদারদের থেকে অর্থ আদায় করা, সাক্ষ্য নেওয়া ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করত) আটকে গলায় লোহার ভারি দণ্ড ঝুলিয়ে দেয় এবং তার শিশুবাচ্চাটিকে জলে ছুঁড়ে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। জনসন তাদের মাথা নিচু করে পা ওপরে করিয়ে দেহটা গাধায় ঝুলিয়ে ঢোল বাজিয়ে গ্রাম ঘোরায়। তাদের ঘিরে বিপুল মানুষ তীব্র গন্ডগোল করতে করতে দৌডচ্ছিল। শেষে দুজনের গলায় বাঁশ বেঁধে থানেদারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগ নিরসনে জনসন নিজের সপক্ষে প্রমান দাখিওল করতে পারে না। প্রথমে দেওয়ানি মামলা শুরু হল। স্বাভাবিকভাবে অত্যাচারের চরিত্র উন্মোচিত হলে ক্রমশ ফৌজদারি মামলায় পরিণত হয়। মামলা কলকাতার সুপ্রিম কোর্টে পাঠিয়ে বিচারপতি কিটিং মন্তব্য লিখলেন মফস্বলে ভারতীয় প্রজারা ইওরোপিয়দের বিপক্ষে ফৌজদারি মামলায় যুক্তিযুক্ত বিচার পেতে প্রভূত ‘অপ্রতিরোধ্য বাধা’য় পড়ে। তাই ‘আপনার সম্মানিত আদালতে মামলাটি পাঠিয়ে দেওয়া পরম কর্তব্য বলে মনে করছি। এই দেশের অসহায় মানুষদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা আর বিকাশের দিকে দৃষ্টি দেওয়ার জন্যে আপনার কাছে আবেদন করে জানাচ্ছি যে আজকে বিচার ব্যবস্থা এমনভাবে থাকবন্দীনির্ভর করে অসহায়, যে দূরের জেলার মানুষদের প্রেসিডেন্সিতে গিয়ে ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অত্যাচারের অভিযোগ করে সেই মামলায় বিচার পাওয়া অকল্পনীয় ব্যাপার’ (Patna Court of Circuit Senior Judge Charles Keating to Sir John Short Baronet, Resident, and members of the Nizamut Adalat, April 28, 1796, BL, IOR, 0/5/4)।
কিটিং কলকাতার কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে মিনতি করে ইওরোপিয় দেশিয় প্রজাদের অত্যাচারের থেকে এদেশিয় প্রজাদের বাঁচানোর আন্তরিক আর্জি জানান। রিচার্ড জনসনের বিরুদ্ধে হিংসা চাপিয়ে দেওয়া মামলা চলল। বিচারের রায়ে তাঁকে ত্রিহুতে ঢোকার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি হল।
কোম্পানি রাজত্বের সরকারি নথি আন্দাজ করতে পারি কীভাবে সে সময় অনিয়ন্ত্রিত বেসরকারি ইওরোপিয় প্রজাদের হিংসাশ্রয়ী অপরাধের প্রকোপ ক্রমশ বেড়ে চলছিল। অমানবিক অসরকারি বৃদ্ধি পেতে থাকা হিংসা কোম্পানি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে যে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল এ তথ্য কর্তাদেরত অজানা ছিল না। আমলা নয় এমন ব্রিটিশ প্রজাদের ভারতবর্ষীয় প্রজাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হিংসার ফলে সভ্য সুন্দর ব্রিটিশ শাসকদের মুখ কালিমালিপ্ত হচ্ছে অথবা এই হিংসা দ্বর্থহীনভাবে ব্যতিক্রমী কিছু মানুষের অভব্যতার প্রকাশ, রকম বিষয় ভাবার কারন নেই — কারন ব্রিটিশ উপনিবেশিক আইনের কাঠামো ছিল হিংসা তৈরি করার মদদদাতা। আইনই রিচার্ড জনসনকে রেহাই দিয়েছে। এই উদাহরণ থেকে একটা বিষয় প্রমান হয়, মফঃস্বলে বাসকরা ব্রিটিশদের হিংসাগুলো আদালতের সুবিচার পেত না, অভিযুক্তরা একটু উদ্যমী হলে খালাস পেয়ে যাওয়া ছিল তুড়ির ব্যাপার। উপনিবেশিক আইনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করত প্রবল আইনহীনতার শূণ্যতা। এই আইনহীনতার কাঠামোটিকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশাসকেরা সন্তর্পণে রক্ষা করেছে। ব্রিটিশ প্রতিশ্রুত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সুবিচারের নীতি প্রবর্তন করে ঔপনিবেশপূর্ব সময়ের ‘তীব্র আইনহীনতা আর স্বৈরশাসন’এর অবসান ঘটানোর যে তত্ব বছরের পর বছর উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে উপনিবেশিক প্রচারযন্ত্রে সুললিত বয়ানে প্রচার পেয়েছে, সেটি সর্বৈব মিথ্যা। উলটে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারর ফলে সরকারি, বেসরকারি ব্রিটিশ প্রজারা ভারতজোড়া শহর গ্রামাঞ্চলে নিত্য নতুন পাশবিক হিংসা আর দুষ্কর্ম চাপিয়ে দিতে কসুর করে নি।
শ্বেতাঙ্গদের তৈরি আইনহীনতার পরিবেশ উপনিবেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকালে ইওরোপিয়দের গতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে কোম্পানি প্রশাসন লাইসেন্স ব্যবস্থা প্রণয়ন করে। বলা হল ব্রিটিশ প্রজাদের ভারতজুড়ে গতায়াত করতে কোর্ট অব ডায়রেক্টর্স-এর লিখিত অনুমতি প্রয়োজন। লাইসেন্স শর্তের উল্লঙ্ঘনকে বলা হল ‘তীব্র অপরাধ এবং অপকর্ম’ যার ফলে জরিমানা এবং বন্দীত্ব উভয়ই প্রযুক্ত হতে পারে। লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু ছিল ১৮৩৩ পর্যন্ত, যার মাধ্যমে সরকার তাদের ব্যবসায়িক এবং আইনি অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা ফ্রি-মার্চেন্ট, ইন্টারলোপার এবং দুঃসাহসী ব্যক্তিদের ওপর একধরণের নজরদারি চালানোর সুযোগ করে নিয়েছিল। ১৮১৪ থেকে ১৮৩১ কোর্ট অব ডায়রেক্টর্স ভারতজুড়ে ১২৫৩টি লাইসেন্সের আবেদন মঞ্জুর করে (Statement of the Number of Licenses to Proceed to and Reside in India,” Papers Relating to the Settlement of Europeans in India (1854), Appendix No. I, BL, IOR, V 3244)। বেসকরকারি ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজা, যারা প্রেসিডেন্সির ১০ মাইল বাইরের মফঃস্বলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে তাদের অন্য আরেকটি লাইসেন্স প্রয়োজন হত। [ক্রমশ]