Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
অনুবাদকের ভূমিকা
সাম্রাজ্যবাদী লুঠ ক্রিয়াশীল করার জন্যে বিদ্যাসাগর, রামমোহন, দ্বারকানাথদের যে তাত্ত্বিক কাঠামো দেওয়া হল [হকার কারিগর চাষী এবং অন্য গ্রামীন পেশাদারের তৈরি অর্থনৈতিক কাঠামো ধ্বংস এবং ফিজিক্যাল লাশের ওপর দাঁড়িয়ে উপনিবেশ এবং তার কাঠামো, ভদ্রবিত্তের পুনর্বাসনের পথ তৈরি হয়েছে। রামমোহন বিদ্যাসাগর, দ্বারকানাথ এবং অন্য ভদ্রবিত্তীয় কোলাবরেটরেরাও হিংসা-সর্বস্ব দক্ষিণ এশিয়ার উপনিবেশের আড়কাঠি হিসেবে, লুঠের সঙ্গী হিসেবে কাজ করেছেন, রোজগার করেছেন, বিখ্যাত হয়েছেন; রমেশ দত্ত ৬২০ মিলিয়ন উপনিবেশিক পাউন্ড লুঠ হওয়ার অঙ্ক কষেছেন এবং উতসা পট্টনায়েক তাকে সমর্থন করছেন, উপনিবেশের প্রথম দিকে এই লুঠ চালানোর যুগে সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করার অন্যতম আড়কাঠি এই তিনজন এবং স্বাভাবিকভাবে অন্যরাও]
দক্ষিণ এশিয়া লুঠ নির্ভর যুদ্ধ পুঁজিবাদী কেন্দ্রিভূত কারখানা ভিত্তিক উৎপাদন এবং বিশ্বজোড়া উপনিবেশে বাজার দখল নির্ভর দক্ষিণ এশিয়া বিকাশের তত্ত্ব জায়মান হয়েছে উপনিবেশে, আমলের কোম্পানি রাজ আমলেই। বেন্থামিয় উপযোগবাদের তত্ত্বটিকে কোম্পানি তাত্ত্বিক জেমস মিল, ধর্ম প্রচারক চার্লস গ্রান্ট, উইলিয়াম উইলবারফোর্স, জন কার্টরাইট, জন ব্রাউনিং, টমাস ম্যালথাস, ডেভিড রিকার্ডো ইত্যাদিদের সম্মিলিত প্রচারে সাম্রাজ্য ব্যবস্থাপনায় গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। উপনিবেশ সহ বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যতাত্বিক বেন্থামের গুরুত্বপূর্ণতম প্রচারক হয়ে ওঠেন কোম্পানির তাত্ত্বিক ব্যবস্থাপক মিল। এই তত্ত্ব প্রভাব তৈরি করল উপনিবেশিক বিচার, প্রশাসন ইত্যাদি কাঠামো তৈরি এবং উদ্দেশ্য প্রচারের কাজে।
এই তত্ত্ব ভারত সংস্কারে নিদান দিল। তারা বলল উপনিবেশিক ভারত আধুনিকপূর্ব সময়ে ছিল মধ্যযুগে। মুঘল এবং নবাবি আমলে ভারতবর্ষের অবস্থা ইওরোপের অন্ধকার সামন্ত যুগের থেকেও খারাপ ছিল। ভারতবর্ষীয় সমাজ কুসংস্কারে ডুবে আছে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষকে শোষণ করে বিশাল সংখ্যক রাজনেতা এবং ধার্মিক একচ্ছত্র সঙ্গঠনগুলো।
পুঁজিবাদী কেন্দ্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার স্বার্থরক্ষাকারী ক্ল্যাফাম গোষ্ঠী যেভাবে ইওরোপের সমাজকে স্বৈরাচারী হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে প্রগতিশীল পুঁজিবাদী উন্নয়নের নিদান দিয়েছিল, ইউটিলিটারিয়ানরাও ঠিক একইভাবে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে বলল ‘সুচতুর ব্রাহ্মণ্যবাদ’ ভারতের সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে মধ্যযুগীয় কাঠামোয় ধরে রেখেছে। ইভানজেলিক্সরা নিদান দিল ‘ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের’ হাত থেকে জনগনকে উদ্ধার করতে ইওরোপিয় খ্রিষ্টিয় সংস্কারের মত করে ভারতে ধর্মীয় সংস্কার করতে হবে — না হলে ব্রাহ্মণ্যবাদী শোষণে এবং কুসংস্কারের বদ্ধ জনগণের মুক্তি নাই। ইওরোপকে অর্গলমুক্ত করতে যেভাবে পশ্চিমের ধাঁচের ধর্ম সংস্কার এবং খ্রিষ্টিয় নৈতিকতা অবলম্বন করা হয়েছে, সেই পথে ভারতকে নিয়ে যেতে হবে। ইভানজেলিক্সদের প্রধান কাজ হল ইংরেজি শিক্ষার প্রচার প্রসার এবং ধর্ম পরিবর্তন।
ফলে লুঠ চালাতে সমাজকে দুমড়ে মুচড়ে নিতে মহাপুরুষ প্রয়োজন হল। লুঠকে স্থিতিশীল চেহারা দিতে ধর্মীয় সংস্কারে উঠে এলেন রামমোহন থেকে আর্যসমাজি থেকে রামকৃষ্ণ মিশনের মত নানান ব্যক্তি এবং সঙ্গঠন যারা উপনিবেশের কর্তাদের কুসংস্কারের অভিযোগের ভিত্তিতে সমাজ এবং ধর্ম সংস্কারের প্রবৃত্ত হবেন। মিশনারিদের মত ইউটিলিটেরিয়ানরাও সংস্কার সাধনে ইংরেজি পড়ানোর নিদান দিল – কিন্তু সে প্রভাবটিকে তারা বিস্তৃত করার চেষ্টা করল সামাজিক এবং পারিবারিক শিক্ষার মধ্যে দিয়ে। বেন্থামীয়রা এই কাজ করতে আইনের বিচার, প্রশাসনের বিস্তৃতি এবং করাধানের পরিকল্পনা করল পশ্চিম ইওরোপিয় সমাজ সংস্কারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। তারা বলল শিক্ষা প্রচার চলুক, কিন্তু সেটির প্রভাব খুবই ধীরগতির; তাই আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই জনগণের দুর্দশা দূর করতে হবে এবং তাদের জীবনে আনন্দ যোগান দিতে হবে। ইউটিলিটেরিয়ানরা বলল প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগেই একমাত্র সমাজে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সাধন হবে, জনগণ এবং সম্পত্তি রক্ষা করা যাবে। এই উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য আইন সংহিতাকারে লিখে ফেলা জরুরি।
বেন্থাম এবং মিল বললেন সরকার চালানো হল বিজ্ঞান [উপনিবেশের প্রথম পর্যায়ে লুঠেরা পুঁজিবাদী প্রযুক্তিকে বিজ্ঞান নামে বিস্তার দেওয়া হচ্ছে এবং এই বিজ্ঞান নামক প্রযুক্তি যে সর্বরোহগহর একটি বটিকা, এই বিশ্বাসটিকে প্রোথিত করা হচ্ছে জনগণের মনে, তাই সব জ্ঞানচর্চায়, সব কর্তব্যে বিজ্ঞান নামক উপসর্গ বা অনুসর্গ জুড়তে হচ্ছে] এবং দক্ষতার মিশেল – ভিত্তি হবে সংহতি, শৃংখলা এবং আত্মনিবেদন/অধীনতা – রাষ্ট্রকে তারা একটি প্রায়সামরিক সঙ্গঠন হিসেবে গণ্য করলেন। তারা বললেন সরকারের প্রধান কাজ যেহেতু কর্তৃত্ব করা তাই সরকারকে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে বেঁধে না রাখলে, তার স্বৈরাচারী হয়ে যাওয়ার বিপুল সুযোগ থাকে। ভোটের মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছেকে বাস্তবে রূপায়ন করতে তৈরি প্রতিনিধি সংগঠন [উপনিবেশের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট] যাতে বিচার বিভাগ এবং আইন বিভাগের প্রভাবের হস্তক্ষেপ ছাড়াই সে কাজ রূপায়িত করতে পারেন সেটা সুনিশ্চিত করা হল জনগণের প্রতিনিধি আর আমলাদের কাজে বিপুল স্বাধীনতা দিয়ে।
উভয় তাত্ত্বিকই কেন্দ্রিভূত রাষ্ট্র ব্যবস্থার পক্ষ নিলেন এবং তারা রাষ্ট্র পরিচালনার ভার দিলেন শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী প্রশাসকদের হাতে যারা কর্তৃত্বপূর্ণভাবে উপনিবেশিক প্রশাসন চালানোয় মাহিরতার প্রদর্শন করেছেন। রাষ্ট্রকে বর্ণনা করা হল অনেকটা হবস বর্ণিত লেভিয়াথানের আকারের একটি বৃহদাকার কাঠামো হিসেবে যার উদ্দেশ্য হবে কোনও রকম ব্যতিক্রম ছাড়াই সবার জন্যে সুখ উৎপাদন করা। তারা বললেন এই কাজ রূপায়ণের জন্যে প্রশাসনিক স্বৈরশাসনই একমাত্র পথ – প্রশাসনের কেন্দ্রে যে প্রশাসক বসে আছে [প্যানপটিকন মডেলের নজরদারির তত্ত্ব এই সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হয় উপনিবেশিক, সাম্রাজ্যবাদী প্রশাসক মহলে] — ভারতের ক্ষেত্রে গভর্নর জেনারেল এবং তাঁকে প্রশাসন চালাতে সাহায্য করা দল, যার নাম কাউন্সিল — তারা এক লক্ষ্যে স্বৈরতান্ত্রিকভাবে উপনিবেশিক প্রশাসন চালাবে। গভর্নর জেনারেলের কাজ হবে ‘redeem[ing] a people sunk in darkness and rais[ing] them in the scale of civilisation’, — অন্ধকারে নিমজ্জিত প্রজাদের উদ্ধার করা এবং সভ্যতার মাপকাঠিতে তাদের যোগ্য করে তুলে আনা — আদতে সভ্যদের দায়বদ্ধতার, সভ্যতা বিস্তারের যুক্তি — এবং এই প্রধান প্রসাসকই হবেন জ্ঞানী, ক্ষমা আর দয়ার প্রতিমূর্তি, কিন্তু পথ হবে স্বৈরতান্ত্রিকতা।
বেন্থাম এবং মিলের তত্ত্ব বাস্তবে উপযোগী করে রূপায়িত করার কাজের প্রশাসক হয়ে উপনিবেশে এলেন নেপোলিয়নের সঙ্গে সিসিলির যুদ্ধে প্রবল প্রতাপ দেখানো উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। বেন্থাম আর মিলের পছন্দের প্রশাসক ছিলেরন ডালহৌসিই; কিন্তু তার সে সময়ে প্রয়াত। বেন্টিঙ্ক বা ডালহৌসি কেউই মনেপ্রাণে ইউটিলিটেরিয়ান ছিলেন না কিন্তু ইউটিলিটেরিয়ান তাত্ত্বিকেরা তাঁদের খুবই পছন্দ করতেন — তাছাড়া অকল্যান্ড, এলিনবরো এবং হার্ডিঞ্জ উপযোগবাদী তাত্ত্বিকদের কাজ কোম্পানি আমলে এগিয়ে নিয়ে যান।
যাই হোক বেন্টিঙ্কের আমল সম্বন্ধে বেন্থামের মন্তব্য ছিল as if the golden ages of British India were lying before me, কেমন যেন মনে হচ্ছে ব্রিটিশ ভারতবর্ষের স্বর্ণযুগ আমার সামনে সোনার বরণ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কলকাতার একটি এজেন্সি হাউসের কর্মচারী জেমস ইয়ংকে বেন্থামীয় নীতিগুলি নতুন গভর্নর জেনারেলকে বোঝাবার নির্দেশ পাঠানো হল। কোম্পানি প্রশাসনে মিলের প্রভাব এতই প্রবল ছিল যে ভারতবর্ষে আসার সময় বেন্টিঙ্ক, তাঁর তাত্ত্বিক মিলকে বলেন, I am going to British India, but I shall not be the Governor General. It is you that will be the Governor General. আমি ব্রিটিশ ভারতবর্ষে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমি আপনার তাত্ত্বিক পাদুকা সামনে রেখে গভর্ণর জেনারেলগিরি চালাব।
সভ্য মানুষদের সভ্যতা রপ্তানির দায়বদ্ধতাপূরণ করা এবং সাম্রাজ্য লুঠের ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে উপনিবেশিক তাত্ত্বিকেরা দক্ষিণ এশিয়ায় আইন এবং শিক্ষা সংস্কারে উদ্যোগী হলেন বেন্টিঙ্কের সফল এবং কঠোর নজরদারিতে। বেন্টিঙ্ক আধুনিক ইওরোপের আত্মাকে ভারতে প্রথিত করতে দায়বদ্ধ ছিলেন। বেন্টিঙ্কের কুড়ি বছর পরের উত্তরসূরী ডালহৌসিও প্রশাসন পরিচালনায় একই তাত্ত্বিক অবস্থান নেবেন।
বেন্টিঙ্কের প্রশাসন সহায়ক হলেন মেকলে, তার আইনি উপদেষ্টা। তিনি পশ্চিমের রাষ্ট্র প্রশাসন পরিচালনার মত করে ভারতবর্ষে আইনের শাসন, universal science and philosophy of law, সার্বজনীন বিজ্ঞান এবং আইনের দর্শন অনুসারী শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনে উদ্যোগী হলেন। উপনিবেশে এসে তিনি দেখলেন a great people sunk in the lower depths of slavery and superstition বিপুল সংখ্যক মানুষ দাসত্ব ও কুসংস্কারের গভীরে নিমজ্জিত, এরা কেউই ইওরোপিয়দের মত রাজনৈতিক অধিকার অর্জন আর প্রয়োগের যোগ্য হয়ে ওঠে নি, তাই উপনিবেশের মুক্তির একটাই পথ ইওরোপমন্যতা অনুসরণ করা। তবেই উপনিবেশে আধুনিকতা আসতে পারে। তিনি ভারতকে দেখলেন the imperishable empire of our arts and morals, our literature and our laws ‘আমাদের শিল্প ও নৈতিকতার, আমাদের সাহিত্য এবং আমাদের আইনের অবিনশ্বর সাম্রাজ্য’ হিসেবে।[ক্রমশ]