Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
প্রথম অধ্যায়
সাদা কুলাঙ্গার — উপনিবেশের শুরুর সময়ে আইন, অরাজকতা
উপনিবেশ এবং আইনের অনুপস্থিতি
সমস্যা হল বাস্তব জীবনে কোম্পানি, নিজেরই তৈরি লাইসেন্স ব্যবস্থা, নিজেদেরই ব্রিটিশ প্রজার ওপরে ঠিকঠাকভাবে প্রয়োগ করতে প্রবল ঝামেলার মুখোমুখি হল। ঠিক যেমন সমুদ্র উপকূল এলাকায় বেসরকারি ব্রিটিশদের দুষ্কর্ম বন্ধ করা কোম্পানির প্রশাসকদের পক্ষে খুবই সমস্যার বস্তু হয়ে দাঁড়াচ্ছিল, ঠিক তেমনি কোম্পানির পক্ষে প্রেসিডেন্সির আওতা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া লাইসেন্সধারী এবং লাইসেন্সবিহীন ইওরোপিয়র স্বভাব আর গতায়াত নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ছিল। এর বড় কারন হল, ইওরোপিয়রা দ্বৈত আইনি ব্যবস্থাটা জানত বলেই সেই আইনের ফাঁক ব্যবহার করে প্রেসিডেন্সি এলাকায় দুষ্কর্ম করে প্রেসিডেন্সি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেত। ১৭৮৯-এ জনৈক মাইকেল ম্যাকনামারা তাঁর চাকরের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট স্যামুয়েল মিডলটন আবিষ্কার করলেন অভিযোক্তা ম্যাকনামারা একটি ‘অপদার্থ চরিত্রের মোদো মাতাল ভবঘুরে’। সে যে চাকরের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ এনেছে সেটা সর্বৈব মিথ্যে, চুরি যাওয়া কোনও কিছুই ম্যাকনামার নিজস্ব অধিকারে ছিল না। মিডলটন, ম্যাকনামারাকে বুঝিয়ে বললেন ‘এই মামলায় তাকে কোনওভাবেই সাহায্য করতে পারবেন না,’ সরকারের পক্ষে থেকে তাকে নিরাপত্তাও দিতে পারবেন না। বিচারপতি সরকারের কাছে আবেদন করলেন, ‘এই ধরণের তৃতীয় শ্রেণীর ইওরোপিয়রা দেশের অভ্যন্তরে গিয়ে যে সব কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে তার বিরুদ্ধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ করা দরকার। যেখানেই তারা যায় সেখানেই তারা লুঠ চালাতে শুরু করে (BL., IOR, 01512. 22 BL, IOR, 0/5/3)’। শেষ পর্যন্ত লাইসেন্স ব্যবস্থাও দুর্নীতির অন্যতম প্রধান আখড়া হয়ে উঠল। ১৭৯৪তে জনৈক রিচার্ড ম্যাথিউর নামে ১৭৯১তে জারি করা লাইসেন্স দেখিয়ে জনৈক উইলিয়াম হিলের মারাঠা দেশ থেকে পারস্য দেশ যাওয়ার চেষ্টা ধরাপড়ল হাতেনোতে। ‘কুখ্যাত দুষ্কৃতি ডক্টর হিল’কে ইওরোপে প্রত্যার্পণ করা হয়। হিল নতুন করে ভারতে উদয় হলে ১৭৯৯-তে তাকে আবার ইয়োরোপে পাঠানো হয়( BL, IOR, 01513)।
মিডলটনের মত কোম্পানি আমলারা, ম্যাকনামারার মত সাধারণ ইওরোপিয় প্রজাকে নিচু বা তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে যে শ্রেণী পক্ষপাত প্রকাশ করেছে, সেই প্রচেষ্টা পাঠকের মনে বিবমিষা উদ্রেক করলেও, পিটার মার্শাল জানাচ্ছেন, অষ্টাদশ শতাব্দের শষের দিকে অধিকাংশ কোম্পানি আমলা নিজেদের ‘ভদ্রলোক বা ভদ্রলোকের সন্তান’ (P. J. Marshall, East Indian Fortunes: The British in Bengal in the Eighteenth Century (Oxford: Clarendon Press, 1976), p. 13 এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক কাজে মার্শাল ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক সমাজের নানান প্রেক্ষিত আলোচনা করেছেন। তবে মার্শাল বৃহত্তর দৃষ্টিকোণে উপনিবেশে ব্রিটিশ অপরাধ এবং উপনিবেশিক আইন এবং নীতির ওপরে এর প্রভাবের আলোচনা সযত্নে এড়িয়ে গেছেন) হিসেবে বর্ণনা করছে — তাই প্রশ্নটা শুধু শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গী নয়, এই বিষয়টা আইনিও বটে। ডেভিড ওয়াসারব্রুক, ‘টু ফেসেস অব কলোনিয়ালিজম’ (Two Faces of Colonialism) প্রবন্ধে উপনিবেশিক আইনের শাসনটিকে ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে, যেখানে, ‘রাষ্ট্র প্রজাদের জন্যে আইন তৈরি করে, কিন্তু নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে পেশ করে এবং সেই আইন বলে সে নিজকে আইনের আওতার বাইরে রাখে’ [D.A. Washbrook, “India, 1818-1860: The Two Faces of Colonialism,” in A. Porter (ed.), Oxford History of the British Empire, vol. I11 (Oxford: Oxford University Press, 1999), p. 407)]। কিন্তু প্রশ্ন হল, উপনিবেশের তৃতীয় মুখ কী রিচার্ড জনসনের মত প্রজারা? জনসন এবং ভারত উপনিবেশে তার মত বহু ব্রিটিশ অপরাধী ভারতের নতুন রাজনৈতিক অব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অভিবাসিত হয়ে উপনিবেশের মুখ আর মুখোশের চরিত্রকে আরও জটিল করে তুলে উপনিবেশের ভেতর থেকেই দাঁড়িয়ে উপনিবেশকে ভয় দেখিয়ে উপনিবেশের স্থায়িত্বের ধারণাটিতে পরোক্ষে হুঁশিয়ারি তৈরি হচ্ছিল। যদিও উপনিবেশিক রাষ্ট্র মনে করত তারা সব ধরণের আইনের ঊর্ধ্বে, কিন্তু জনসনের মত তুচ্ছ সাধারণ ব্রিটিশ আইনের ঊর্ধ্বে কোনও দিনই ছিল না। জনসনের কাপুরুষোচিত ব্যবহার ব্রিটিশদের খুনে দিকটি ভারতীয়দের সামনে প্রকাশ করে সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছিল ক্রমশ। ১৭৯৩-তে মরিয়া হয়ে হেনরি ডান্ডাস লিখলেন, ‘ইওরোপিয়দের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা তৈরি করার ওপর আমাদের সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে (T. C. Hansard, The Parliamentary History of England from the Earliest Period to the Year 1803, vol. XXX (London, 1817), p. 676)।
জনসনের মত প্রজাদের বেআইনি হিংসাত্মক ফৌজদারি অপরাধ, প্রজাদের ওপর উপনিবেশিক কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যে বাধা তৈরি করছিল, সে বিষয়টা পরিষ্কার। আইন প্রয়োগের অধিকার নিজের হাতে তুলে নিয়ে জনসনেরা রাষ্ট্রের হিংসা আর ব্যথা দেওয়ার একচেটিয়া বৈধ অধিকারে নিয়মিতভাবে হস্তক্ষেপ করতে থাকে। রিচার্ড জনসনদের কর্মকান্ড আদতে ব্রিটিশ কর্তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিল, কোনও সমস্যাজনক ইওরোপিয়র হাতে কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার এবং সার্বভৌমত্বের ক্ষমতা কেন্দ্রিভূত হলে কী ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে। ওয়ারেন হেস্টিংস এই ধরণের মানুষদের কর্মকাণ্ড বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বললেন, আমরা যেহেতু এই দেশের প্রজাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বনেছি, তাই না চাইলেও এই ধরণের মানুষেরা ক্ষমতা দেখাবার জন্যে প্রজাদের ওপর হিংসামূলক কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিচ্ছে [(Hastings’ testimony before the Lords’ Committee on European Colonization and Settlement, cited in D. Basu, The Colonization of India by Europeans (Calcutta: 27 R Chatterjee, 1925), p. 31)]। হেস্টিংস মনে করতেন উপনিবেশের প্রজাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায় সরকারের।
১৮০৮-এ একদল সেনার বিরুদ্ধে কলকাতায় একটি কুঁড়েঘরে আক্রমন চালিয়ে, আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ দায়ের করা হল। এই মামলায় প্রত্যেকটি সেনাকে তাদের সামরিক সেবা থেকে পদচ্যুত করে নির্বাসন দিয়ে ইওরোপে প্রত্যার্পণ করা হয়। স্বেচ্ছায় এবং উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে আগুন লাগাবার অভিযোগে দলের মাথা জন গ্রান্টকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় (পরের দিকের বিচারে সাত বছর নিউ সাউথ ওয়েলসে নির্বাসনে পাঠিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড রদ করা হয়)। কলকাতার সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি হ্যারি রাসেল লিখলেন, আইন যেমনভাবে ধনীদের প্রাসাদ রক্ষা করে, তেমনি তার কাজ হল গরীব মানুষটার কুঁড়েঘরটিকে আরও দায়িত্বশীলভাবে রক্ষা করা। দেশিয়দের চরিত্র, সম্পত্তি এবং জীবন যদি আমরা রক্ষা করতে পারি, তাহলে তার বদলে তারা আমাদের আনুগত্য এবং ভালবাসা ফেরত দেবে; কিন্তু সর্বশক্তিমান না করুন, এরকম এমন দিনও যেন না আসে যেন আমরা তাদের নিরাপত্তা দিতে অস্বীকার করি, তাহলে আমরা তাদের থেকে যে আনুগত্য এবং ভালবাসা আশা করছি, সেটা তারা দিতে অনিচ্ছুক হয়ে উঠতে পারে (Case of Hardwick and others, BL., IOR, 0/5/8)।
ভারত ভূমিতে নানান ধরণের কাজে আসা তার নিজের দেশের প্রজার কর্মকাণ্ডকেই উপনিবেশিক সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে অপারগ হতে থাকলে, তার পক্ষে উপনিবেশে সার্বিক আইন এবং বিচারের ঝর্ণা ধারা হয়ে ওঠার বৃহত্তর দাবি পূরণ করার কথা ভুলে যান, উপনিবেশে তার শাসন কর্তৃত্বকে স্থির বুদ্ধিতে প্রয়োগ করার যোগ্যতা নিয়েই সন্দেহ দেখা দেওয়ার পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল। [ক্রমশ]