Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
প্রথম অধ্যায়
সাদা কুলাঙ্গার — উপনিবেশের শুরুর সময়ে আইন, অরাজকতা
ভারতবর্ষে প্রভূত্ব, আপন প্রজা শাসন
‘মফস্বলে যে সব ইওরোপিয় প্রজাকে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবজীবনে তাদের শেখাতে হবে কোম্পানি দেওয়া লাইসেন্স বলে তারা সেই ভূখণ্ডে থাকার যে অধিকার পাচ্ছে, সেই অধিকার পাওয়ার অঙ্গাঙ্গী শর্ত হল আইনের প্রতি সার্বিকভাবে স্পষ্ট আনুগত্য প্রকাশ’ — কোর্ট অব ডায়রেক্টর্স (১৮৩২) (Court of Directors to the Governor-General, April 10, 1832, Papers Relating to the Settlement of Europeans in India, BL, IOR, V 3244)
মুক্তবাণিজ্যের কাজে এবং ভারতবর্ষের ভূমিখণ্ডে শ্বেতকায় প্রজাদের স্থায়ী বাসস্থানের অধিকার তৈরির জন্যে আইন প্রণয়ন করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘকাল ধরে তীব্র বিতর্ক চলছিল মেট্রোপলিটনে। সেই বিতর্কের আঁচের উত্তাপ লাগছিল উপনিবেশেও। মাথায় রাখতে হবে এই ধরণের আইন প্রণয়ণের মৌল সমস্যা ছিল আমলাতন্ত্রের বাইরে থাকা ইওরোপিয় প্রজাদের ভারতবর্ষীয়দের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হিংসা নিয়ে প্রশাসনের উদ্বেগ এবং স্থানীয়স্তরে ইওরোপিয়দের দুষ্কর্ম রুখতে উপযুক্ত ফৌজদারি আইন প্রযুক্ত করার ব্যর্থতা। মেট্রোপলিটন আর প্রেসিডেন্সি – দুই ভূখণ্ডেই ১৭৬৪ থেকে ১৮১৩ অবদি কলোনাইজেশন প্রকল্প, অর্থাৎ ভারতবর্ষের মাটিতে জমি কিনে ব্রিটিশ প্রজাদের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার অধিকারের দাবিতে জনবিতর্ক ঘনিয়ে উঠেছিল প্রবলভাবে। কোম্পানি আর কোম্পানির সঙ্গে জুড়ে থাকা ব্যক্তি আর সঙ্গঠনগুলো সেই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছে। আন্দোলনকারীদের দাবির বিরুদ্ধাচরণ করে ১৭৯৪তে লর্ড কর্নওয়ালিস লিখলেন ‘ইওরোপিয়দের স্বার্থে এবং অপরিহার্য গুরুত্বের জন্যে বলা দরকার, তাদের ভারতবর্ষে জমি কিনে স্থায়ী বসবাস করার উদ্যমকে কঠোর হাতে প্রতিহত করতে হবে এবং তাদের এ বিষয়ে যতদূরসম্ভব অনুৎসাহিতও করতে হবে (Extract of letter from Cornwallis to Henry Dundas, November 7, 1794, ibid)’। ১৮১৮-য় জন বেব এবং জেমস প্যাটারসন বোর্ড অব কন্ট্রোলকে (পার্লামেন্টারি নজরদারি কমিটি) হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন ‘বিপুল সংখ্যায় ইওরোপিয় প্রজার (যারা রাজা বা কোম্পানির ভৃত্য নয়) ভারতবর্ষে বসবাসের অধিকার দেওয়া প্রশাসনিক ভুলপন্থা এবং এই উদ্যম কোম্পানির শাসনের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ হবে (Letter of February 27, 1818, ibid)’। চার্লস গ্রান্টের মত উচ্চপদস্থ আমলা কঠোর ভাষায় বললেন ‘[এর ফলে] বিপুল পরিমানে অভাবী এবং অলস… নিচ আর কামুক ও লম্পট’ স্বভাবের ব্রিটিশ প্রজা ‘দেশিয় মানুষদের ওপর তীব্র অত্যাচার নামিয়ে আনবে, তাদের বিপদে ফেলবে’ তাই শ্বেতাঙ্গ, ব্যবসায়ীদের ভারতে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে দেয়ার অধিকার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে (Basu, The Colonization of India by Europeans, p. 22)। এ বিষয়ে ইংলন্ড এবং ভারতবর্ষের উপনিবেশিক প্রশাসকদের মনোভাব হল, অসরকারি চাকুরেদের ভারতে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ করে দিলে তারা দেশিয়দের ওপর অত্যাচার নামিয়ে আনবে, দেশিয় প্রজাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানবে, অপরিমিত মদ্যপান সকলের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে সাম্রাজ্যের সম্মান ধুলোয় মেশাবে এবং ব্রিটিশ সরকারের ওপর স্থানীয়দের বিশ্বাস নষ্ট হবে।

মানচিত্র ১.১ ১৭৬৫র ব্রিটিশ ভারতবর্ষ
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, এক দিকে পক্ষে নতুন তৈরি সাম্রাজ্যের সীমান্ত সামল দেওয়া এবং একই সঙ্গে ভারতবর্ষজুড়ে অভিবাসিত হয়ে আসা বিপুল সংখ্যায় ইওরোপিয় প্রজাদের শৃঙ্খলামুক্ত, নিয়ন্ত্রণবিহীন চলাচল রোখার কাজে চরমতম ব্যর্থ হল (১.১ মানচিত্র দেখুন)। বাঙলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অধিকার কায়েম হওয়ার কিছুকাল পর ১৭৬৫-র মে মাসে ‘সব কোম্পানির সঙ্গে জুড়ে না থাকা বেসরকারি ব্যবসায়ী আর দেশের অভ্যন্তর, মফঃস্বলে বাস করা ইয়োরোপীয়দের’ এক মাসের মধ্যে কোম্পানির কর্তারা কলকাতায় তলব করে। কর্তাদের হয়ত মনে হয়েছিল একমাত্র এই উদ্যমের মধ্যে দিয়ে ‘তাদের[প্রজা] ওপর একই সঙ্গে সরকারি কর্তৃত্ব চাপানো এবং নিরাপত্তাবিধান দুটোই করা যেতে পারে’ (Order of May 14, 1765, in extract of letter from Bengal, November 28, 1766, cited in the case of Vernon Duffield, er d.,B L, IOR, O/5/1)। অসরকারি ব্রিটিশদের এদেশে কাজ পাওয়া রোখার কাজে তারা চুক্তি পর্যন্ত করেছিল। উপনিবেশে কোম্পানির ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে অসরকারি ইওরোপিয়দের দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া রুখতে কোম্পানি দেশিয়/স্থানীয় ক্ষমতাবানদের সঙ্গে চুক্তি করে দাবি জানায় অসরকারি ইওরোপিয়রা যাতে সেই সব রাজার এলাকায় কোম্পানি সরকারের অনুমতি ব্যতীত বসবাস না করতে পারে, চাকরি, ব্যবসা করতে না পারে সেটা যেন সেই ক্ষমতাবানেরা নজরদারি করে। ক্ষমতাবানদের কাছে কোম্পানির দাবি ছিল প্রয়োজনে তাদের সেবায় থাকা ইওরোপিয়দের বরখাস্ত করতে হবে এবং নতুন ইওরোপিয়দের শর্তহীনভাবে কাজে নেওয়া যাবে না। এই ধরণের সম্পাদিত চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘দেশিয় ক্ষমতাবানদের অধীনে কাজ করা ইওরোপিয়রা যদি কাজ ছেড়ে চলে যাওয়ার উপক্রম করে অথবা তারা কাজ ছেড়ে যেতে পারে মনে হয়, ক্ষমতাবানেরা যেন সেই সব শ্বেতাঙ্গ প্রজাকে কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে [দেখুন ১৭৭৫এর বাংলা সরকারের সঙ্গে অবধের নবাব আসফউদ্দৌলার মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্র, BL, IOR, 2440 Papers Relaring ro East India Affairs (1813)]’। এই চুক্তির বয়ান থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, রাজনৈতিক ভূখণ্ডের ওপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ তখনও পুরোপুরি সংজ্ঞায়িত হয় নি এবং তখনও তাদের সার্বভৌমত্ব, দেশিয় ক্ষমতাশালীদের হুমকির মুখে দাঁড়িয়েছিল।
৪০ এবং ৪১ পাতা নেই
ইওরোপিয় কলোনাইজেশনের সঙ্গে উঠে আসা অন্য বহু ইস্যু বিষয়ে তাদের মত, অমত জানতে চেয়ে ১৮৩২-এ ভাররবর্ষে কোম্পানি আমলাদের উদ্দেশ্যে এক নির্দেশপত্রে কতগুলো বিষয় সমীক্ষার জন্যে পাঠানো হল, যেমন ‘গত কয়েক বছর ধরে ভারতভূমিতে কলোনাইজশন বিষয়ে প্রচার বা ইওরোপিয়দের স্থায়ী বসবাস করার বিষয়টিকে নিরুৎসাহিত করা যাচ্ছে কি? কোন ধরণের মানুষকে ভারতবর্ষে বসবাসের অধিকার দেওয়া উচিৎ? যে সব ব্রিটিশ সেটলার্স ভারতে লাইসেন্স ছাড়া স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, তাদের জন্য কী ধরণের সুরকাকবচ নেওয়া দরকার এবং কোন কোন শর্তে ইওরোপিয়দের ভারতে বসবাসের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে ইত্যাদি [Circular from T. Hyde Villiers, Esq., Secretary to the India Board, February 11, 1832, Appendix to the Report from the Select Committee of the House of Comtnons on the Affairs of the East India Company, Appendix I(A)]’। সমীক্ষার উত্তর এল মেলানোমেশানো রকমের। জনৈক অনামা কোম্পানি আমলা লিখল, ‘সেখানে [উপনিবেশে] আমাদের সাম্রাজ্য রক্ষায় ইওরোপিয় প্রজাদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেওয়া উচিত বিন্দুমাত্র উচিৎ নয় [Letter to T. Hyde Villiers, Esq., Secretary to the India Board, February 1832, ibid., Appendix I (A), Answers to Circular (2), 3]’। অন্যদের বক্তব্য ছিল ভারতবর্ষের সরকার একমাত্র ‘অনুপযুক্ত প্রজাদের’ উপনিবেশে অভিবাসিত হয়ে আসা রোখার ব্যবস্থা তৈরি করে। কলোনাইজেশন আন্দোলনের উৎসাহীদের বক্তব্য ছিল সেই মুহূর্তে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাতে আর ইওরোপিয় প্রজাদের উপনিবেশে স্থায়ী বসবাস করার ক্ষেত্রে খুব বেশি বিপদ আসা উচিৎ নয়, কারন, ‘ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি সেখানে যাবে, স্বাভাবিকভাবে তার স্বার্থই হবে দেশিয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা [John Sullivan, Esq. of the Madras Civil Service, to T. Hyde Villiers, Esq., Secretary to the India Board, February 21, 1832, ibid., Appendix I (A), Answers to Circular (2)]।’ সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্য এবং কলোনাইজেশন আন্দোলনের অত্যুগ্র সমর্থক চার্লস মেটকাফের যুক্তি ছিল, মফঃস্বলের মানুষকে সভ্য করে তুলতে এবং সরকারকে খুব কম ব্যয়ে সম্পদ তুলে আনার কাজে সাহায্য করার জন্যে ভারতে ইওরোপিয়দের স্থায়ী বসবাস করতে দেওয়ার অনুমতি প্রদান করা আবশ্যিক দরকার। অতীতে তিনি ‘নিচু তলার’ ইওরোপিয়দের ভারতবর্ষে অভিবাসিত হওয়া বিষয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে বলেছিন, তারা ভারতবর্ষে এলে ভারতবর্ষীয়দের সম্মান লঙ্ঘিত হবে এবং সরকারের সম্মান ভূলুন্ঠিত হবে। নিজের সেই পুরোনো অবস্থানের বিপক্ষে গিয়ে এ সময়ে মেটকাফ বললেন, সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা এবং ভারতের বিকাশ নির্ভর করছে ইওরোপিয় জ্ঞান, নৈতিকতা, পুঁজি, দক্ষতা এবং ব্যক্তিমানুষের চলাচলের ওপর — ‘আমি আবারও সুনিশ্চিত হয়ে বলছি, যতক্ষণ না জনসংখ্যার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী মানুষ সাধারণ আগ্রহে এবং সমবেদনা সহকারে ভারতবর্ষের সরকারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে, ততক্ষণ ভারতের ওপর দখলদারি নিরাপদ হবে না। স্বদেশিয় জনগণকে ভারতবর্ষের ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করানোর জন্যে সম্ভাব্য প্রত্যেকটি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, এবং এই সংক্রান্ত সব বাধা দূর করতে হবে; এই কাজটা সফলভাবে করতে পারলে, আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি আমাদের শাসন স্থিতিশীল হবে এবং আমাদের কর্তৃত্বে থাকা ভূখণ্ডের জনগণের বিকাশ আরও বৃদ্ধি পাবে (Metcalfe, “Memorandum of European Settlement,” February 19, 1829, Papers Relating to the Settlement of Europeans in India, BL, IOR, V 3244)’। [ক্রমশ]