Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
প্রথম অধ্যায়
সাদা কুলাঙ্গার — উপনিবেশের শুরুর সময়ে আইন, অরাজকতা
ভারতবর্ষে প্রভূত্ব, আপন প্রজা শাসন
গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আগের সময় ভারতকর্তাদের অবস্থান ছিল ভারতবর্ষে অপ্রশাসনিক ইওরোপিয়দের বসবাসের সুযোগ সীমিত করা। সেই অবস্থান থেকে সরে এসে বেন্টিঙ্ক বলেন এদেশে যদি ইওরোপিয়দের বসবাস বৃদ্ধি পায় তাহলে ভারতের বিকাশ স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি বৃদ্ধি পাবে (William Bentinck, “Minute on European Settlement,” May 30, 1829, Papers Relating to the Settlement of Europeans in India, BL, IOR, V 3244)। ভারতে শ্বেতা ইওরোপিয়ঙ্গদের বসতি বৃদ্ধি পেলে দেশিয়দের ওপরে অত্যাচার বৃদ্ধি পাবে, জনগণ সরকার বিরোধী হবে এবং তার ফলে বিদ্রোহের অবস্থা তৈরি হবে — তার পূর্বের সময়ের কোম্পানি কর্তাদের এই ভয় অমূলক আখ্যা দেওয়া প্রথম বড় প্রশাসনিক কর্তা হলেন বেন্টিঙ্ক। তিনি বললেন সরকার যদি ইওরোপিয় পুঁজি, দক্ষতা এবং উদাহরণ এদেশে আনতে পারে তাহলে ‘এই দেশের উৎপাদন ক্ষমতার সর্বোচ্চস্তরে বিকাশ ঘটতে পারে’ (Ibid)। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়া, কোনও কোনও দেশিয় নেটিভ সমাজের যুদ্ধংদেহী চরিত্র এবং দেশিয়দের ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে দেশিয় ব্রিটিশদের মাথাব্যথা দূর করে বেন্টিঙ্ক বললেন, ‘[ইওরোপিয়রা এদেশে অভিবাসিত হয়ে এলে] অনিষ্টের বিপত্তি’র সম্ভাবনা খুবই কম (Ibid)। যে সব ব্রিটিশ ভারতে বসবাস করতে এসেছে তাদের প্রতি বেন্টিঙ্ক হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন ‘এদেশে বন্য দুঃসাহসিকতার জায়গা নেই’ (Ibid)।
শেষ বিষয়ে এসে তিনি কিছুটা অবস্তব দাবি করে বসেন। বিপুল ঐতিহাসিক তথ্য প্রমান দিচ্ছে এদেশে বহুকাল ধরে ইওরোপিয়রা জঙ্গুলে দুঃসাহসিকতা, ভয়ানক দুষ্কর্ম এবং অদ্ভুত দৈহিক হিংসা চাপিয়ে দিয়েছে। ভারতের সীমান্ত মুক্ত বাণিজ্যের জন্যে যখন খুলে দেওয়া হল, তখনও দেশের অভ্যন্তরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা কর্তৃত্বপূর্ণভাবে চালাতে কোম্পানির প্রশাসন চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটেরা একমাত্র ইওরোপিয়দের বিরুদ্ধে অনধিকারে প্রবেশ এবং হেনস্থা এই দুটি বিষয়ে বিচার করতে পারত। কিন্তু জঘন্য ধরণের হিংসক অপকর্মের মামলা একমাত্র চালানো যেত প্রেসিডেন্সির সুপ্রিম কোর্টেই। বাঙলার অসরকারী ইওরোপিয় জনগণের অপব্যবহার এবং দুর্ব্যবহার রুখতে কলকাতার কর্তাদের নরম মনোভাব আন্দাজ করে উদ্বিগ্ন বোর্ড অব কন্ট্রোল ১৭৭৬-এর পরে যে সমস্ত ইওরোপিয় এবং ‘ইওরোপিয় নামধারী মানুষ’কে ভারত থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে অথবা বহিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের দুষ্কর্মের বিশদ সমীক্ষা তালিকাভূক্ত করার নির্দেশ দেয় কোম্পানি কর্তারা। এর ফলে সরকারিভাবে বিশাল ২৫ খণ্ডের, ২০ হাজার পাতার হাতে লেখা ‘ইওরোপিয়ান মিসকন্ডাক্ট ইন ইন্ডিয়া ১৭৬৬-১৮২৪’ নামক একটি নথি তৈরি হল (এই নথি থেকে কয়েকটি উদাহরণ ব্যবহার করেছেন P. Spear, Nabobs: A Study of the Social Life of the English in 18th Century India (London: Oxford University Press, 1963), pp. 60-61 and 192-194)।
অপহরণকারী — উপনিবেশ শুরুর সময়ে ইওরোপিয় দুর্ব্যবহার
লিন্ডা কুলি তার গবেষণায় ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গড়ন আর তার সংজ্ঞা’ এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন (L Colley, Captives: Britain. Emptre, and the World, 1600-1850 (London: Jonathan Cape, 2002), p. i.)। প্রথমে তিনি আলোচনা করেছেন ড্যানিয়েল ডিফোর সাম্রাজ্যবাদী যোদ্ধা চরিত্র রবিনসন ক্রুসোকে নিয়ে, যিনি সাম্রাজ্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে দূর দেশের ভূমি দখল করেন এবং সে দেশের মানুষের ওপর উপনিবেশিক শাসন চাপিয়ে দেন। লিন্ডা দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে উপস্থিত করেন জোনাথন সুইফটের গ্যালিভার’স ট্রাভলসকে, যেখানে উপনিবেশিক চরিত্র নিজে বন্দী, অত্যাচারিত, আবদ্ধ এবং দেশিয়িদের অধীনে কর্তৃত্বাবদ্ধ (Ibid p. 2.)। দ্বিতীয় গল্প অবলম্বন করে লিন্ডা শুরু করলেন তার বই-এর আখ্যান, যখানে তিনি স্পষ্টভাবে বলছেন ‘সাগর পেরিয়ে দূর দেশ অভিযান শুধুই বিজয়, স্বচ্ছলতা বা সাধারণ সুখভোগের গল্প তৈরি করে না, বরং তার পাশে বয়ান করল সন্ত্রাস, দুর্বলতা এবং বারংবার বন্দীত্বের আখ্যান। আমি এখানে বলব, লিন্ডা যে দু ধরণের গল্প তুলে ধরেছেন আমাদের জন্যে, তার বাইরে উপনিবেশের তৃতীয় মুখও আমরা দেখি ভারতের ব্রিটিশ উপনিবেশের সংজ্ঞায়ন এবং তাকে গড়ে তোলার গল্পে। এখানে আমরা যে গল্প বলব, তার চরিত্রগুলো লিন্ডার চরিত্রের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান করছে, যারা বন্দী, কিন্তু বিজয়ী নয়। এই অধ্যায় শেষ করবে তাদের গল্প বলে।
‘ইওরোপিয়ান মিসকন্ডাক্ট ইন ইন্ডিয়া ১৭৬৬-১৮২৪’ এই সরকারি নথি আমাদের উপনিবেশ আমলে ব্রিটিশ ক্ষমতা আর অত্যাচারের অপরিচিত ছবি তুলে আনে (মাথায় রাখা দরকার বম্বে আর মাদ্রাজের কোনও হিংসা সমীক্ষা তথ্য পাঠানো হয় নি)। এই নথিতে আমরা দেখি ইওরোপিয় ভবঘুরে, অবাঞ্ছিত ব্যক্তি, চোর, ডাকাত, জালিয়াত, বাগিচা মালিক, নিষ্কর্মা, পালিয়ে যাওয়া বন্দী এবং সেনা কর্মী, সংক্রমিত অবস্থায়, পাগলামি নিয়ে, অসুস্থ শরীর নিয়ে, শহর কলকাতা বা শহরতলীতে নিয়মিত উপার্জন করতে পারছে না, শুধুই ঘুরে বেড়াচ্ছে, হতাশ এবং বেপরোয়া হয়ে জনগণের ওপর মারাত্মক হিংসা চাপিয়ে দিচ্ছে। তাদের ‘নিয়মিত ছ্যাঁচড়ামো, সারাক্ষণের মাতলামি, ব্যক্তিগত অসদাচরণ, এবং অসম্মানজনক ভবঘুরেমি’ এবং সরকারের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হওয়া, শাসন কর্তৃত্বকে অস্বীকার করা, জনগণের ওপর চালানো হত্যালীলা এবং তাদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করা, ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে এবং কোম্পানির সামনে বিপুল সমস্যার দেওয়াল তুলে দেয়। সরকার এই অসুস্থ মানুষদের সরকারি ব্যয়ে (আদতে বাংলা লুঠের অর্থে — অনুবাদক) বিচার চালাত, শাস্তি দিত এবং মেট্রোপলিটনে পাঠাবার ব্যবস্থা করত (BL, IOR, O/5/25)। এই মানুষজনের মধ্যে কয়েকজন মহিলাও ছিল। তারা বিচার ব্যবস্থা চালানো, বিচার দেওয়ার প্রশাসনিক কাঠামো, যেটা ব্যবস্থা আদতে সাম্রাজ্য-ক্ষমতা রক্ষার ভিত্তি ভূমিকেই নাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। [ক্রমশ]