Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
প্রথম অধ্যায়
অপহরণকারী — উপনিবেশ শুরুর সময়ে ইওরোপিয় দুর্ব্যবহার
প্রথম নির্বাসনের দশ বছর পরে ভারনন ডুফিয়েল্ড আবার ভারতবর্ষভূমিতে ফিরে আসে। ‘মুসলমানদের মত বেশ’ পরে সে আর অন্য দুই ইওরোপিয় আসফউদৌলার রাজত্বে প্রবেশ করতে গিয়ে ধরা পড়ে। তাদের গ্রেফতার করে কলকাতাগামী জাহাজে তোলার আগের ধাপ হিসেবে পাটনায় আনা হয়। তিনজনই একটি বাংলোয় নিজেদের বন্দী করে প্রকাশ্যে আত্মহত্যা করার হুমকি দেয়। পাটনা কুঠির প্রধান বুঝতে পারে, বাংলো থেকে বার করতে গেলে তাদের ওপর জোর খাটাতে হবে এবং সেটা তার আইনি অধিকারে পড়ে কী না সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে কৃতমর্ম জানতে চেয়ে কলকাতায় চিঠি লেখে।
কোম্পানির আমলারা শুধু যে ব্রিটিশ প্রজাদের আইনি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তার সরকারে আইনি অধিকার নিয়ে চরম বিভ্রান্ত ছিল তাই নয়, তারা আরও বেশি দিশাহারা ছিল অব্রিটিশ ইওরোপিয়দের ওপরে ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার নিয়েও। ১৭৬৭-তে কলকাতা অভিবাসিত হয়ে আসা জেসেফ নামক ব্রিটিশ প্রজার ভৃত্য হিসেবে ইতালিয় প্রজা জনৈক পাভিসি বিহারে গিয়ে ‘যেখানে সেখানে দেশিয়দের ওপরে দৈহিক হিংসা চাপিয়ে দিতে শুরু করে এবং জনগণের বিচার করার অধিকার নিজের হাতে তুলে নিয়ে দৈহিক নির্যাতন চালায় এবং নানা প্রকারের দুষ্কর্মও নামিয়ে আনে’। কোম্পানির স্থানীয় আমলা পাভাসিকে ‘পথভোলা ইওরোপিয় বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে গ্রেফতারের আদেশ জারি করে (বাংলা থেকে পাঠানো গোপন চিঠি January 15, 1776, BL, IOR, O/5/1)। ইতালিয় ভৃত্য পাভিসি ফরমান হাতে গ্রেফতার করতে আসা কোম্পানির কর্মচারীকে প্রকাশ্যে বেত দিয়ে প্রচণ্ড পেটায়। প্রভূত প্রচেষ্টায় ফোর্ট উইলিয়ামের বন্দীশালায় তাকে বন্দী হিসেবে পাঠানো হলে সে কলকাতা সুপ্রিম কোর্টে হেবিয়াস করপাস দাখিল করে ছাড়া পাওয়ার আবেদন করে। তার যুক্তি সে ব্রিটিশ রাজার প্রজা নয়, তার ওপরে ব্রিটিশ আইন প্রযুক্ত হওয়ার কথা নয়। আদালতে পাভাসি লাইসেন্স না থাকা অব্রিটিশিয় প্রজাদের নির্বাসন দেওয়ার কোম্পানির ক্ষমতা আর অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলে। কোম্পানির যুক্তি ছিল, ‘বেআইনিভাবে অভিবাসিত হয়ে আসা বিদেশি ভবঘুরেরা উপনিবেশিক ভূমিতে দেশিয় প্রজাদের ওপর অত্যাচার নামিয়ে আনলে তাদের নির্বাসন দেওয়ার ক্ষমতা আর অধিকার প্রত্যেকটি উপনিবেশিক সরকারের থাকার কথা’ কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট পাভাসির পক্ষে দাঁড়ায়, তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
তবে উপনিবেশের প্রথম দিকে কোম্পানির শাস্তি দেওয়ার আইনি কর্তৃত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানানোর সব থেকে আশ্চর্যজনক মামলাটি হল উইলিয়াম টাকারের। উইলিয়াম টাকার নামক মানুষটির ২০ বছরের অন্তত চারটে গভীর দুষ্কর্মের বয়ান ক্রমশ কোম্পানি প্রশাসনের নজরে আনা হয়। টাকার ১৮০১-য় আসাম অঞ্চলে গন্ডগোল বাধিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের লবন পরিবহন ব্যবসা প্রায় লাটে তুলে দেয়। তরোয়াল, গাদা বন্দুক, পিস্তল এবং সিপাহি বাহিনী নিয়ে সে গোয়ালপাড়া পার হওয়া মাল বোঝাই নৌকো লুঠ করত। তার অত্যাচারে স্থানীয় ব্যবসার পরিবেশ উথালপাথাল হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। কোম্পানির স্থানীয় আমলা বি ম্যাকালাম বাংলা সরকারকে টাকারের অত্যাচারের বিষয়ে বিশদ সমীক্ষা পাঠালেন ‘[টাকার] নিজেকে এতই ক্ষমতাশালী দেখাত যে কেউই তার কাজমর্মের বিরোধিতা করতে সাহস পেত না, খুশি মত সে নষ্টামি চালিয়ে যেত, এবং এই অঞ্চলে প্রত্যেকটি ক্ষমতাবান মানুষ তার অঙ্গুলি হেলনে উঠত বসত। সে হরবখত কোম্পানি সিপাই মার্ফত অসামরিক আমলাদের তার বেআইনি নির্দেশ পাঠাত এবং নির্দেশ অমান্য করা আমলাদের অপমান করতে ছাড়ত না …আমি আবারও বলছি, টাকারের জিঘাংসা দিনের পর দিন বাড়ছে, আপনারা যদি এখুনি তার অত্যাচার থামানোর ব্যবস্থা না করেন, আগামী দিনে গোয়ালপাড়া অঞ্চল জ্বলেপুড় খাক হয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না’।
১৮০২-তে টাকারকে কলকাতায় ডাকিয়ে নিয়ে এসে তার লাইসেন্স রদ করা হয় (BL, IOR, O/5/6)। পাঁচ বছর বাদে টাকারকে দিনাজপুরে নীলচাষের জন্যে নতুন লাইসেন্স দেওয়া হল। ১৮১০-এর মধ্যে তার বিরুদ্ধে লুঠ, অত্যাচার এবং জোর করে দাদনের চুক্তি করিয়ে রায়তদের নীল চাষ করতে বাধ্য করানোর মত ৬০টি অভিযোগ দায়ের হয়। তাছাড়া সে বিচারের অধিকার নিজের হাতে নিয়ে তলবি চিঠি আর ইলাসনামা (সরকারি চিঠি আর তলবি সনদ) জারি করে স্থানীয় মানুষদের তার কুঠিতে হাজির করিয়ে নীলকরদের কাছ থেকে নেওয়া ধার ইত্যাদি বিষয়ে জবাব চাইত। দিনাজপুরে তার থাকার লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হয় এবং আবার তাকে কলকাতায় ডাকিয়ে আনা হয় (BL, IOR, O/5/11)।
১৮২০-তে আবার টাকারের নাম উঠে এল। এবারে সে কেজরিতে (Kedgeree) আবির্ভূত হল ডাক বিভাগের কর্মচারীর বেশে। এই অঞ্চলে আগের তুলনায় চরম উৎসাহে জনগণের ওপরে অত্যাচার নামিয়ে আনতে থাকে। তার বিরুদ্ধে মারধোর, চাবুকমারা, কর্মীদের ওপর অত্যচার, ‘বেআইনি এবং যথেচ্ছ বিচারবিভাগীয় ক্ষমতার অপপ্রয়োগের’ বিরুদ্ধে প্রচুর আর্জি জমা পড়ে (BL, IOR, O/5/20)। দীর্ঘ অত্যাচারের তালিকা সত্ত্বেও তাকে শাস্তি দেওয়া গেল না। স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট আর ওয়ালপোল লিখলেন বিনা বিচারে সে মুক্তি পাওয়ার ফলে, ‘টাকারের অত্যাচার আরও বাড়তে শুরু করে এবং আইনের নাকের ডগায় তার অবৈধ দুষ্কর্মগুলি অবাধে চালাতে থাকা টাকার বুঝতে পারল, তার অত্যাচার এবং স্বেচ্ছাচারিতার শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা কোম্পানির আমলাদের নেই এবং সে স্বেচ্ছাচারী হয়ে যে কোনও অত্যাচার বাধাহীনভাবে চালিয়ে যেতে পারে’।
১৮২০-তে টাকারের সহকারী তিরিক্ষি মেজাজের জন উইলিয়ামসন, দুই বাঙালি লসকর হারু এবং গারেবুল্লাকে টাকারের বাড়ির থামে বেঁধে তাদের ওপর ঘুঁষি, লাথি এবং রাত্তান চাবুক মেরতে আধমরা করে দেয়। এরা দুজন কোম্পানি জাহাজের মাল্লা। তারা একটি সর্বসাধারণের পুকুর থেকে জল সংগ্রহ করছিল। পুকুরটি ট্রাকার বেআইনিভাবে নিজের অধিকারে রেখেছিল। ম্যাজিস্ট্রেট ওয়ালপোল নির্দেশ জারি করা সত্ত্বেও ট্রাকার বেঁধে রাখা লসকর, মাল্লাদের মুক্তি দিতে অস্বীকার করে। এক মাস পরে সে স্থানীয় এক নৌকো মালিক হরতনের তিন মাঝিকে পিটিয়ে বন্দী করে। স্থানীয় কোতোয়াল হরতনের চিঠি নিয়ে তাদের ছাড়াতে এলে বারান্দায় শুয়ে থাকা টাকার চিঠিটি না পড়েই সেটি কুচি কুচি করে ছিঁড়ে জানায় এদের ছাড়া হবে না, তারা যা খুশি করার করুক।
১৮২২-এ শেষ পর্যন্ত টাকারকে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার কাজে সক্ষম হল কোম্পানি প্রশাসন। তাকে প্রেসিডেন্সিতে তলব করানোর সনদ ছিড়ে, ইওরোপিয় প্রতিবেশিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে স্থানীয় দোকান লুঠ করে ফেলার পরে কোম্পানি বলপ্রয়োগ করে তাকে কলকাতায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। যদিও টাকারকে সুপ্রিম কোর্ট, আদালতের ক্ষমতার আওতার বাইরে না যেতে নির্দেশ দেয়, কিন্তু পরের বছর সে একটি মাছ ধরা কোম্পানির কাজ পেয়ে আবার কেজরিতে পৌঁছয়। ছমাসের মধ্যে স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট রিপোর্ট লিখল টাকার পিস্তল দেখিয়ে স্থানীয় ইওরোপিয়দের হুমকি দিচ্ছে আর বাজার থেকে মালপত্র লুঠ করছে (BL, IOR, 0/5/22)। [ক্রমশ]