Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
প্রথম অধ্যায়
অপহরণকারী — উপনিবেশ শুরুর সময়ে ইওরোপিয় দুর্ব্যবহার
২) অভিচার
১৮০২তে এলাহাবাদের এডজুট্যান্ট জেনারেল জে জেরারড কলকাতায় কোম্পানির পরিচালকদের কাছে পাঠানো চিঠিতে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করে জানালেন, স্থানীয় ইওরোপিয় প্রজা, যারা কোম্পানির ভৃত্য নয়, তাদের অভিচার অনাচার নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়ানি এবং ফৌজদারি আদালতের ক্ষমতা খুবই সীমিত। তিনি সরকারকে ইওরোপিয় প্রজাদের মফঃস্বলে বাস করার অধিকারের লাইসেন্স জারি করার সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন এবং সেই সব দুষ্কর্ম করা মানুষদের বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন — ‘এদের অধিকাংশই এতই খারাপ আচরণ করে এবং এদের বেলেল্লাপনা দেখে, উপনিবেশের সাধারণ মানুষের, সাধারণ ইওরোপিয় প্রজাদের সম্বন্ধে খুব খারাপ ধারণ তৈরি না হয়ে যায় না (Letter of February 10, 1802, in reference to the case of Redmond Malloy, BL, IOR, O/5/6)’।
উপনিবেশিক বাংলাজুড়ে, বিশেষ করে মেট্রোপলিটন কলকাতা এবং দেশের ভেতরে মফঃস্বল গ্রামেও ইওরোপিয় চোর, ভবঘুরে এবং কর্মহীন সাধারণ অসরকারি ইওরোপিয় প্রজার বিপুল উপস্থিতি নজর কাড়া ছিল (দেখুন আগের ১৮০১-এর মামলা Garatt Missett and Peter Ambrose, BL, ibid)। যে সব ইওরোপিয় প্রজাকে তথাকথিত ‘খারাপ চরিত্র’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাদের অধিকাংশ দিনের অধিকাংশ সময় মদ পান করে বেহেড হয়ে থাকত এবং তারা এতটাই অলস জীবন যাপন করত যে এদের দৈনন্দিনের ক্ষুণ্ণিবৃত্তি জোগাড় করা সমস্যার ছিল এবং অনেকেরই ইওরোপে ফেরৎ যাওয়ার আর্থিক সামর্থ থাকত না। এদের মধ্যে একটু উদ্যমী প্রজারা সাম্রাজ্যকে পরোক্ষে বাঁধা রেখে টাকা জোগাড় করত অর্থাৎ মাঝে মাঝেই কোম্পানির আমলাদের ধরে বেঁধে রেখে কোম্পানি থেকে ব্যক্তিগত স্বার্থপূরণে টাকা আদায় করত। এদের মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত ছিল টোপবিয়াস হেনরি ওয়াগনার, একটি জার্মান দস্যু দলের নেতা, মূলত আসাম সীমান্তে লাল কুর্তা পরা কোম্পানির আমলাদের অপহরণ করত আর স্থানীয় মানুষদের ওপর ডাকাতি চালাত, বেশুমার লুণ্ঠন চাপিয়ে দিত। আরেক জনৈক আরথার রেনলডস, ব্যাপক অভিচার নামিয়ে আনার অভিযোগে এবং নিজেকে কখনও ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রশাসনের আমলা অথবা কখনও নৌসেনার উচ্চপদস্থ আধিকারিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে জোর করে অর্থ আদায় করার অভিযোগে বহুবার কলকাতায় গ্রেফতার হয়েছে (ওয়াগনারের মামলাটি ১৭৯৬-এর BL, IOR, 0/5/5; রেনল্ডসের মামলাটি ১৭৯৮-এর BL, IOR, O/5/8)।
সব ইওরোপিয় প্রজা যদিও এতটা আর্থিক সম্বলহীন ছিল না, কিন্তু তাদের অধিকাংশই দুষ্কর্মের দায় এড়াতে এবং সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দিতে সাধারণত প্রশাসনিক আমলার ছদ্মবেশ ধারণ করত। ১৮২৩-এ মদ্যপ উইলিয়াম ডেভিডসনের ডাক নাম ছিল লেফটানেন্ট ডেভিডসন, ফারুকাবাদে ভারতীয় মহিলাদের জন্যে ঘেরাটোপ দেওয়া বাজারের দেওয়াল বেয়ে ওঠার সময় ধরা পড়া দুষ্কৃতি। বাজার করতে আসা মহিলাদের আত্মীয়রা তাকে আটকানোর চেষ্টা করলে ডেভিডসন আক্রমন করে তুমুল প্রহার করে। রাস্তার পাশে দাঁড়ানো এক ব্যক্তি তাদের মধ্যে ঝামেলা মেটানোর জন্যে এগোলে তাকেও ডেভিডসন আক্রমন করলে সে পুলিশ ডাকে। ডেভিডসনকে থানায় ধরে নিয়ে গেলে ‘সে এক পুলিশের কোমরে বাঁধা তরোয়াল কেড়ে শহরজুড়ে তাণ্ডব চালায় এবং প্রবল দৌড়োদৌড়ি করে রাস্তার ধারের গাছ এবং অন্য বস্তু নির্বিচারে হিংস্রভাবে কাটতে থাকে। এতে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সে একটি ষাঁড়কে ঈষদ আহত করে’। কর্তৃপক্ষ শীঘ্র তদন্ত চালিয়ে জানতে পারে ব্যক্তিটির নামে আরও বহু দুষ্কর্মের (আক্রমন এবং নরহত্যার) অভিযোগ নথিবদ্ধ রয়েছে। তাকে আদালতে না তুলেই, লাইসেন্স না থাকার অপরাধে ইংলন্ডে নির্বাসনে পাঠানো হয় (৮৬)।
আমাদের এই আলোচনায় উইলিয়াম ডেভিডসনের মামলার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার। কারন হল উপনিবেশিক ভারতীয় সমাজে সাধারণ ব্রিটিশ প্রজার ক্ষমতা এবং অধিকার বিষয়ে আমাদের প্রাথমিক ধারণা তৈরি করে আর চলতে থাকা অধিকার বিষয়ে বিতর্ককে হেঁটমুণ্ডঊর্ধপদ করিয়ে, সেই বিষয়কে নতুনভাবে দেখতে, বুঝতে সাহায্য করে। ডেভিডসন যেভাবে মহিলাদের জন্যে সংরক্ষিত বাজারে ইওরোপিয় আমলার ছদ্মবেশে হামলা করার মরিয়া চেষ্টা, অতীতে আমাদের সাম্রাজ্য সম্পর্ক বিষয়ে যেসব ধারণা তৈরি করা হয়, এই ঘটনা সেই সব ধারণা বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জ জানায়। এই ঘটনায় ভারতীয় মহিলারা তুলনামূলকভাবে ‘স্বচ্ছল’ এবং ব্রিটিশ পুরুষপুঙ্গব দৃশ্যত আর্থিকভাবে ‘অস্বচ্ছল’ এবং সাম্রাজ্য থাকবন্দীর নিচের তলায় পুরুষটির বাস। মদ্যপ ডেভিডসন যখন তরোয়াল ছিনিয়ে শহর জুড়ে হল্লা তৈরি করছে, সে তখন সক্কলের হাসির এবং উপহাসের পাত্র হয়ে উঠছে। কিন্তু মাথায় রাখা দরকার ডেভিডসনের মামলাটা বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রমী চরিত্রের ছিল না।
আরেকটা ঘটনা। ১৭৮৯এ চট্টগ্রামের কালেক্টর সহায়সম্বলহীন জনৈক এলেন নামক ব্রিটিশ প্রজাকে ‘উদ্দেশ্যবিহীনভাবে সওদাগরি ছদ্মবেশ পরে ঘুরে বেড়াতে দেখেন’। এলেন চট্টগ্রামে শুধু একজন মহিলাকে শারীরিকভাবে নিগ্রহই করে নি, তার গায়ে ‘গয়না কবচ সহ যত কিছু ছিল সমস্ত কিছু লুঠে নেয় এবং … উপকূল অঞ্চলে পালিয়ে যায়’। এরপরে তাকে গ্রেফতার করে কলকাতায় পাঠানো হয়। কলকাতার আদালত তাকে লাইসেন্সবিহীন ভবঘুরে হিসেবে বন্দী করার নির্দেশ দেয় (BL, IOR, O/5/2)। তিন বছর পরে ইসলামাবাদে তিন ইওরোপিয় জন ওরিলি, জন বারটন এবং টমাস ব্লাইথি, অরা মারগুযার্দ নাম্নী এক মহিলার বাগানে গাদাবন্দুক, মাস্কেট, তরোয়াল, পিস্তল এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে ঢুকে পড়ে। অরা ভয়ে আতঙ্কে যে ঘরটিতে নিজেকে বন্দী করে রেখেছিল সেটিকে তারা ভাঙার চেষ্টা করে। ঝামেলা শুনে বাগানে বেরিয়ে আসা ভৃত্যদের তিনজন ভয় দেখাতে থাকে এবং গুলিছুঁড়ে এক ভৃত্যকে আহত করে। হত্যা মামলা শুরু হওয়ার আগেই দুজন মারা যায় এবং একজন কারাগার থেকে পালিয়ে যায় (BL, IOR, O/5/3)।
আরেকটি ঘটনা। ১৮১৪-র ডিসেম্বরের রাতে মুসামাত মুনিয়ার কানপুরের বাড়িতে দুই ইওরোপিয় প্রজা দরজা ধাক্কায় এবং তাকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়ার দাবি জানায়। মুনিয়া তাদের কথা মানতে অস্বীকার করায় তারা প্রতিবেশীর চালে উঠে বাগান পেরিয়ে বারান্দায় নেমে এসে মহিলার মাকে প্রবল গালিগালাজ করতে থাকে। দুজনের একজনকে মুনিয়া চিনতে পারে কোম্পানির নিচু পদের সৈনিক, নাম টমাস গ্যালাঘার। গ্যালাঘার মুনিয়াকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঘরের বাতি নিভিয়ে গয়না লুঠ করে পালিয়ে যায়। পরে মুনিয়ার বাড়ির পাশের গলিতে গ্যালাঘারের সেনাবাহিনীর নীল টুপি উদ্ধার হলে তার বিরুদ্ধে বিচার চালানো হয়, শাস্তি হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট তাকে [অস্ট্রেলিয়ার] নিউ সাউথ ওয়েলসে সাত বছরের নির্বাসনে পাঠায় (BL, IOR, O/5/16)। টমাস গ্যালাঘারের মামলা থেকে আমরা একটা বিষয় আন্দাজ করতে পারি উপনিবেশের সাদা মানুষ আর উপনিবেশিত কালো মহিলার মধ্যে যে সামাজিক থাকবন্দীর একপেশে সম্পর্কটি ইওরোপিয় সমাজবিদ্যা তৈরি করেছিল, সেই জাতি-লিঙ্গ থাকবন্দী উপনিবেশ সময়ে কখনও কখনও হেঁটমুণ্ডঊর্ধ্বপদ হয়ে পড়ত। [ক্রমশ]