Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
প্রথম অধ্যায়
অপহরণকারী — উপনিবেশ শুরুর সময়ে ইওরোপিয় দুর্ব্যবহার
শ্রম হিংসা
ভারতবর্ষীয় প্রজাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক হিংসা চাপিয়ে দেওয়া ছিল উপনিবেশের স্বাভাবিক আর আবশ্যিক অভিজ্ঞতা। শ্রমিকদের ওপর চরমতম অর্থনৈতিক শোষণ চাপানোর পাশাপাশি অবিশ্রান্ত আকারে চলত দৈহিক হিংসার প্রাবল্য। এই অভিচারগুলো আখছার দেখা যেত চা আর নীল চাষের বাগিচাগুলোয়। ‘নিষ্ঠুর নীলকর’রা চাবকাত, বন্দী করে রাখত এমন কী শ্রমিকদের হত্যাও করতেও তাদের হাত কাঁপত না। কুলি/শ্রমিক/কর্মচারীদের ওপর চরম দৈহিক হিংসা নামিয়ে আনার জন্যে উপনিবেশিক আমলে তাদের শাস্তি দেওয়ার উদাহরণ নেই। অত্যাচারের গুণগত মান অথবা হিংসা ঘটানোর পৌনপুনিকতার হিসেব করা সমস্যাজনক প্রকল্প, কেন না ভারতবর্ষীয় প্রজাদের ওপর নামিয়ে আনা অত্যাচারের হিসেব কষার উদ্যমও চরম ব্যর্থ হবে কারন অধিকাংশ হিংসাকর্মে ব্রিটিশ প্রশাসনে কোনওপ রকমই অভিযোগ দায়ের হত না অথবা অভিযোগ করা হলেও প্রশাসনের পক্ষে হিংসা নামিয়ে আনা ব্রিটিশ/ইওরোপিয় প্রজাদের শাস্তি দেওয়া হত না। উপনিবেশিক পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতার নিরিখে বলা যায় যত পরিমান শ্রম-হিংসা ঐতিহাসিক নথিপত্রে নথিভূক্ত হয়েছে সেটা মূল হিংসা চাপিয়ে দেওয়া ঘটনার কয়েক ভগ্নাংশও নয়।
ভারতীয় শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দৈহিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিচার চাওয়ার বড় সমস্যা ছিল শ্রমিকদের প্রাপ্য তুচ্ছতম শ্রমমূল্য। সেই অর্থে জীবনধারণ করা প্রায় অসম্ভবের কথা ছিল। ১৮১০-এ কলকাতা সুপ্রিম কোর্ট যখন নীল চাষী আলির কাছে জবাবদিহি চাইল কেন সে নীলকর জে ডবলিউ কে লুকারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিধিবদ্ধভাবে আদালতে ঠিক সময়ে অভিযোগ জানায় নি, আলি উত্তর দিতে গিয়ে বলল তাকে এবং তার পুত্রকে স্টকসে ন’দিন নির্জলা উপবাস করিয়ে রাখা হয়েছিল। তার বলার কথা হল, যে মানুষটার পেটে এক দানাও খাদ্য নেই, সে কী করে এতদূরের আদালতের দরজায় বিচার চাইতে দাঁড়াবে (BL, IOR, 0/5/10)?
ভৃত্যদের ওপর মারাত্মক মৃত্যুমুখী অত্যাচারে গৃহস্বামীর আঘাতের অধিকারের সীমা এবং দৈহিক আঘাতের প্রমানের (medical ruminations) মাত্র বিষয়ে প্রশ্ন উঠল, ভারতীয় ভৃত্যদের দেহ ইওরোপিয় প্রভুর কত মাত্রায় নামিয়ে আনা অত্যাচার সহ্য করতে পারে? অধিকাংশ সময় চাকুরিদাতা প্রভুর করা আঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু ঘটত, না হয় ভৃত্যের দেহ আঘাত পাওয়ার পনের থেকে ত্রিশ মিনিটের মধ্যে হয়ত বা তারও কম সময়ে মৃত্যু ঘটত। এই প্রেক্ষিত অবলম্বন করে অত্যাচার করা ব্রিটিশ প্রভুরা বার বার একটাই কথা বলেছে, ভৃত্যের মৃত্যু ঘটেছে তাদের নামিয়ে আনা হিংসক আঘাতের জন্যে নয়, মৃত ভৃত্যের ভাল স্বাস্থ্যের অভাবের জন্যে। উনবিংশ শতকজুড়ে শক্তিহীন, রোগাক্রান্ত ভারতীয় দেহ নামক একদেহী বস্তাপচা ছেঁদো যুক্তি অবলম্বন করেছে ইওরোপিয় আঘাতকারীরা। তাদের অত্যাচারে মারে যাওয়া ভারতীয় প্রজাদের পক্ষে আত্মীয়রা উপনিবেশিক আদালতে বিচার চাইতে গেলেই, স্বাস্থ্য ছুতোর বয়ান অবলম্বন করে শাসক শ্রেণীর দুষ্কৃতিরা নিজেদের পক্ষে আইন টেনে এনে আদালতের শাস্তি থেকে বেঁচে এসেছে বরাবরের জন্যে (এ বিষয়ে তৃতীয় অধ্যায়ে বিশদ বর্ণনা আছে)।
আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, উপনিবেশের শুরুর দিকে উপনিবেশিক বাংলায় দেশিয় প্রজাদের ওপরে দৈহিক আঘাত করার দায়ে অভিযুক্ত ইওরোপিয় প্রজা অধিকাংশ ক্ষেত্রে খুনের অভিযোগ থেকে ছাড়া পেত খুন হওয়া মানুষের দৈহিক স্বাস্থ্য বিষয়ে চিকিৎসকের সমীক্ষাপত্রের জেরে নয়, নিজের সদাচারণের শংসাপত্র নির্ভর করে। ১৭৯৬-এর ১৫ জুলাই ফ্রান্সিস জোনস চট্টগ্রামের নুন কারখানার কর্মচারীকে হত্যার বিরুদ্ধে কারখানার সুপারিন্টেন্ডেন্টের বিরুদ্ধে কলকাতার আদালতে গুরুতর অভিযোগ আনা হল। জোনস ৩.৫ কিউবিট লম্বা এবং ৬-৭ ইঞ্চি গোলাকার একটি লাঠি দিয়ে তার কর্মচারীর মাথায় তিনবার আঘাত করে বাংলোর সিঁড়ি থেকে ফেলে দেয় এবং তার চোয়াল আর দাঁত ভেঙে যায়। লাঠির আঘাতে পড়ে গিয়ে তিনবার শ্বাস নিয়ে সেই মুহূর্তেই ভৃত্যটি প্রাণত্যাগ করে। বিচারের সময় জুরি, জোনসকে ‘সাধারণ সদাচারের’ মানুষ হিসেবে বর্ণনা করে বললেন, মৃতের ওপর তার ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না, তাই তাকে অনেক কম শাস্তির অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হল। জোনসের হাতে ছ্যাঁকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হল (BL, IOR, O/5/4)।
১৮১৬য় চট্টগ্রামের এক জাহাজ প্রস্তুতকারক ম্যালকম ম্যাকেঞ্জির বিরুদ্ধে জনৈক কর্মচারী আবদুল্লাকে প্রহার এবং বন্দী করে রাখার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে মামলা দায়ের করা হয়। ম্যাকেঞ্জি স্বীকার করে সে আবদুল্লাকে দশবার বেত দিয়ে আঘাত করার পরে তার পায়ে ১০ সেরের একটি বাটখারা বেঁধে রাখে এবং সারা রাত দিন তাকে বন্দীও করে রাখে। ম্যাকেঞ্জি তার অত্যাচারের চরিত্রর ন্যায্যতা প্রতিপাদন করার জন্যে বললে, আবদুল্লা তাকে না জানিয়ে, বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে আরেকটি কারখানায় কাজ করতে গিয়েছে বলেই সে বাধ্য হয়েছে তাকে উচিৎ শিক্ষা দিতে প্রহার করতে। মামলা কলকাতায় পাঠিয়ে চট্টগ্রামের ম্যাজিস্ট্রেট ডবলিউ পেচিলি ম্যাকেঞ্জির কাজকর্মকে ব্যাখ্যা করলেন, ‘হিংসাশ্রয়ী, বেহুদা এবং ইওরোপিয় এবং দেশিয়দের মধ্যে সম্পর্ক তৈরির যে প্রথা তৈরি হয়েছে তার বিরোধী; এবং ভারতে বিচার দিতে ব্রিটিশ সরকার যে আইন তৈরি করেছে তার আচরণ সেই আইন প্রয়োগের পরিপন্থী’। এই অত্যাচারের মামলায় ম্যাকেঞ্জিকে ১০০টাকা জরিমানা করা হল, যার মধ্যে ২০ টাকা বরাদ্দ করা হল আবদুল্লার ওপরে অত্যাচারের আঘাত প্রশমনের জন্যে (BL, IOR, O/5/17)।
তবে ইওরোপিয়দের মধ্যে সব থেকে ঝামেলাদার আইনভাঙার দলটি ছিল দক্ষিণ বাঙলার নীলকরেরা, নিজেদের মধ্যে তো তারা মারপিট করতই, তার সঙ্গে তারা কর্মচারীদের ওপর তীব্র অত্যাচার চাপিয়ে দিয়েছে এবং স্থানীয় বিচারক ম্যাজিস্ট্রেটদের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে মানতে অস্বীকার করেছে। নীল চাষ ব্যবস্থার শুরু থেকেই ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট ই ডি-লাতুরের ভাষায় নীলকরেরা ছিল ‘রক্তঝরানো ব্যবস্থা’র অংশ (J. Long, Strike but Hear! Evidence Explanaroly of the Indigo System in Lower Bengal (Calcutta, 1861), p. 68)। নীলকরদের অত্যাচার, লড়াই, দ্বন্দ্বের ঘটনাগুলো চার দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকলে ইওরোপিয় নীলকরদের সঙ্গে দেশিয় জমিদারের লড়াই, ইওরোপিয় নীলকরদের নিজেদের মধ্যে নানান বিষয়ে যুদ্ধ এবং ইওরোপিয় নীলকর বনাম তাদের অধীনে থাকা চাষীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে (W. Dampier, Superintendent of Police in the Lower Provinces, May 23, 1844, and G. F. Cockburn, Officiating Magistrate in Howrah, May 23, 1844, NAI, Legislative Proceedings, October — December 1844, October 12, 1844, No. 1)। [ক্রমশ]