Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
অনুবাদকের ভূমিকা
মেকলে আইন সংহিতাকরণের কাজ নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। সিসিলিতে দীর্ঘকালের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় বেন্টিঙ্ক একধরণের আইনের অস্তিত্ব দেখেছিলেন। বেন্টিঙ্ক ১৮৩৩এর সনদ অবলম্বনে, ভারতবর্ষে এডওয়ার্ড রায়ান, আলেজাণ্ডার রস এবং জেমস ইয়ংএর নেতৃত্বে আইন কমিশন তৈরি করলেন, এর নেতৃত্ব দিলেন মেকলে। তারা স্পষ্টতই নেপোলিয়নের কোড পেনালের ধারণায় তীব্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু সাম্রাজ্য প্রশাসকদের সমস্যা হল ১৮৩৬এর প্রণীত আইন রূপায়িত হল ১৮৬০এ।
আইন রূপায়নে ব্যর্থ হলেও মেকলে কিন্তু শিক্ষা সংস্কারের পিছপাও হলেন না, ব্যর্থও হলেন না। তার পরিকল্পনায় আধুনিকতার নামে ইওরোপমন্যতার শেকড় সরকারিভাবে থানা গাড়ল উপনিবেশজুড়ে। আজ দক্ষিণ এশিয়ায় যে রাষ্ট্র ব্যবস্থার আইন ও শিক্ষার কাঠামো দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল বেন্টিঙ্কের সময়ে, মেকলের উদ্যমে এবং তাত্ত্বিকতায়। বিদ্যাসাগর, দ্বারকানাথ ইত্যাদিরা এই ব্যবস্থার উপজাত ভদ্রবিত্ত। আজও সেই ঔপনিবেশিক তত্ত্ব দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতি, প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থায় সুতীব্রভাবে বিরাজমান। তবুও আমরা স্বাধীন।
আইন তৈরির এই প্রেক্ষাপটে অসামান্য এই বইএর শুরুতেই এলিজাবেথ কলস্কি বলছেন উপনিবেশিকতার মৌল ভিত্তি হল হিংসা। তিনি এক অসামান্য সন্দর্ভে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন কিভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় জুড়ে ইওরোপিয় হিংস্রতাকে সংহত করে সাম্রাজ্যের রথ অপ্রতিরোধ্য গতিতে চলেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাস চর্চায় এই অনবরত হিংসার প্রসঙ্গ খুব বেশি আসে নি। নীলকর, অস্বচ্ছল ইওরোপিয়, সেনা বাহিনীর সাধারণ সেনা থেকে জাহাজের নাবিক ভারতীয়দের ওপর অস্বাভাবিক হিংসার তরবারি নামিয়ে আনায় গোটা ভারত সাম্রাজ্য জুড়ে এই শ্বেতাঙ্গ প্রণোদিত হিংসা মহামারীর মত ছড়িয়ে পড়তে থাকে, উপনিবেশিক ক্ষমতা দৃঢ়বদ্ধ হতে থাকে, একই সঙ্গে প্রতিবাদও ঘনিয়ে ওঠে।
কলস্কি বলছেন হিংসা মূল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আইনের দর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। জন লকের সম্পত্তির অধিকারের দর্শন ভিত্তি করে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সম্পত্তির আইনের ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে উঠেছে। উপনিবেশে মেট্রোপলিটন থেকে অভিবাসিত হয়ে আসা যে মানুষ খেটেখুটে জমি চাষ করে, আইনত জমিটা তারই। কিন্তু দেশিয়রা যদি সেটির ওপর তাদের স্বাভাবিক, অর্জিত অধিকার ফলাতে আসে তাহলে তাদের ওপর হিংসা চাপিয়ে দেওয়া, তাদের পশুর মত হত্যা করা বেআইনি নয় – এই নিদান ঔপনিবেশিক দর্শনের মৌলস্বর।
এলিজাবেথ কলস্কি বলছেন ব্রিটিশর মুঘল পূর্ব সময়ের বিচারহীনতা, একচ্ছত্র মুঘল শাসনের বিপ্রতীপে সাম্রাজ্যের উপনিবেশিক আদালত তৈরি করে প্রজাদের বিচার দেওয়া এবং একই সঙ্গে আইনের চোখে সকলের সাম্যের উপনিবেশিক দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, অনৃত। কোলস্কি দ্বিধাহীনভাবে বলছেন ঔপনিবেশিক আইন ছিল ঔপনিবেশিক হিংসাশ্রয়ী শাসনের ভিত্তি।
সহিংস অত্যাচারই উপনিবেশ কর্তৃত্ব চালাবার ভিত্তি ছিল; তিনি অত্যাচারের যে সব মারাত্মক উদাহরণ তুলে এনেছেন সেগুলো কোথাও কোনও দিন সাম্রাজ্যিক ইতিহাসে চর্চিত হয় নি। সাম্রাজ্য সহযোগিতার রোমান্টিক বয়ান নিয়ে ডালরিম্পল ইত্যাদিরা বহু আলোচনা করেছেন, কিন্তু প্রায় অনালোচ্য উপনিবেশিক হিংসাকে কোলস্কি মারাত্মক প্রাধান্য দিয়ে তুলে আনছেন, অথচ প্রথাবদ্ধ ইতিহাসে তার এই আলোচনা ব্রাত্যই থেকে যায়। এতদিন প্রগতির ঘোমটায় সযত্নে লুকিয়ে রাখা ঔপনিবেশিক হিংসার দরজা খুলে দিচ্ছেন কোলস্কি।
কোলস্কির অসামান্য বই কলোনিয়াল জাস্টিস ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় মাঝে মাঝেই সূক্ষ্মভাবে ইওরোপমন্যতা ফুটে বেরিয়েছে। তার বক্তব্য উপনিবেশের প্রথম দিকে কোম্পানি যে সব ‘‘চরিত্রে উত্তম, সৎ এবং ভুল না করা’ বাছাই আমলা শাসন করার কাজে মূলত বাংলা, মাদ্রাজ আর বম্বেতে পাঠাত। তারা পুতি চরিত্রের ছিল। কিন্তু উপনিবেশের তৃতীয় মুখ, অসরকারি ব্যবসায়ী, নীলকর, চা বাগান মালিক-আমলা, সেনা, মাল্লা, চোর ডাকাত খুনে অসরকারি ব্রিটিশ ব্যক্তি শ্বেতাঙ্গর হিংসা এবং সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করতে পুতিচরিত্রের প্রশাসকেরা চরমতমভাবে ব্যর্থ।
কোলস্কি এই বইএর কয়েক জায়গায় বুঝে না বুঝে ২৫০ বছর আগেকার সাম্রাজ্যবাদী বার্কের স্বরে কথা বলছেন। পলাশীর পরে আমরা জানি কীভাবে ক্লাইভ আর হেস্টিংস এবং তার পরে ছিয়াত্তর বা তিরানব্বইতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রণয়ণ করে বাংলা দুয়ে, বিভিন্ন এলাকায় লুঠ আর পীড়ন চালিয়ে সাম্রাজ্য বাড়িয়েছে ইওরোপকে ধনী করেছে। এইসব আমলাকে বার্ক প্রায় দেবশিশু আখ্যা দিয়েছিলেন – যাদের পূর্বের কুচুটেরা ঘুষটুস দিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বানিয়ে দিচ্ছে। বার্ক বলছেন এই দুর্নীতিতে ডুবতে আমলাদের খুব একটা ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু কেল্টুদের প্রভাবে তারা দুর্ণীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বাংলা বা অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের কাছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসকেরা কেউই দেবশিশু ছিল না। অসরকারি শ্বেতাঙ্গ যাদের কোলস্কি উপনিবেশের তৃতীয় মুখ আখ্যা দিচ্ছেন, তারা যে হিংসা চালাত সেটাও ছিল সাম্রাজ্য প্রসারে দেশিয় মানুষদের ভয় দেখিয়ে রাখার একটি উপাদান। যে কাজ সরকারি আমলা বা পদাধিকারীর পক্ষে অনেক সময় করে ওঠা অসম্ভব ছিল, ব্যক্তিগতস্তরে হিংসা নামিয়ে আনা, সেটাই সাম্রাজ্য এইসব প্রাতিষ্ঠানিক বা ভবঘুরেকে দিয়ে করিয়ে আইনে ছাড় দিত। তাই তাদের হিংসা দুর্নীতিগুলি দেখেও দেখা হত না – বিচারের প্রশাসনিক ঢং রক্ষা করা হত শুধু – ইওরোপিয়দের ওপর ইওরোপিয়দের অত্যাচার কিছুটা বিচার পেত – দেশিয়দের ওপর ইওরোপিয় অত্যাচারের কোনও সুরাহাই হত না। অসরকারি ইওরোপিয়দের অত্যাচারের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা দেশিয়িদের বিচার না দেওয়াই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নীতি – আমলাদের যোগ্যতা অযোগ্যতা এখানে কোনও মানে দাঁড়াত না। কলস্কিই হোক বা তলোর বিশ্ব ইতিহাস লেখা স্বেন বেকার্টই হোক – ইওরোপিয় আমেরিকিয় ঐতিহাসিকদের ইওরোপমন্যতা থেকে বেরোনো খুবই কঠিন।
তবুও কলস্কি অসামান্য ব্যতিক্রম। তিনি বলছেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বড় হিংসা যেমন নানান যুদ্ধ, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং এই হিংসাকে আমরা ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখে সাম্রাজ্যের তথাকথিত প্রগতির চিহ্ন হিসেবে যেগুলোকে গণ্য করি, সেগুলোকেই প্রাধান্য দিয়ে ১৯০ বছরের পিঠ চাপড়ে এসেছি, ব্রিটিশদের মহান ভেবেছি, নবজাগরণকে মাথায় তুলেছি। কিন্তু সাম্রাজ্যের এই নৃশংস রূপটা এত খোলাখুলিভাবে উন্মুক্ত করার কাজ তাঁর মত কেউ করেন নি অথচ চোখের সামনে ১৯০ বছরের ইওরোপিয় ব্যক্তি হিংসার কী বিপুল নথি আজও ছড়িয়ে আছে মহাফেজখানাজুড়ে। উপনিবেশের অসরকারি ব্যক্তি – চাবাগানের মালিক, নীলকর, নাবিক, ভবঘুরে, সেনানী ইত্যাদি ব্রিটিশরা ভারতীয়দের ওপর উপনিবেশের জ্ঞাতসারে যে অমানবিক খুন আর দৈহিক হিংসা চাপিয়ে দিয়ে পুলিশি অভিযোগ আর আইন এবং আদালতের বিচারে বেকসুর ছাড় পেয়ে যেত ১৯৪৭ অবদি, তার অসামান্য অকথিত মর্মন্তুদ ইতিহাস লিখেছেন এলিজাবেথ কলস্কি। কলস্কি বলছেন এই ছোট ছোট বেসরকারি হিংসার বিপুল পরিমান নথি গবেষকদের হাতের সামনে পড়ে ছিল, কিন্তু তার আগে কেউ এই কাজটা করার কথা ভাবেন নি। এই কাজটা কোনও দক্ষিণ এশিয়র করা দরকার ছিল। কলস্কিকে হাজারো ধন্যবাদ দিয়েও নিজেদের অকম্মার দিকটি লুকানো যাবে না।
বইটি অনুবাদ করতে গিয়ে কী যে রক্তক্ষরণ হয়েছে বলার নয়। মাঝেমাঝে এতই উত্তেজিত হয়ে পড়তাম, অনুবাদের কাজ থামিয়ে দিয়ে কম্পিউটার বন্ধ করে চোখের জল সামলাতে হয়েছে। এক সময় কাজ বন্ধই করে দিয়েছিলাম। হার্ডডিস্ক নষ্ট হয়ে অনেকটা কাজ মুছেও গিয়েছিল। তবুও বইটা শেষ করাগেল।
আমার ভাল লাগছে এলিজাবেথ নিকোলাস ডির্ক্সের শিষ্যা, ডির্ক্স আবার বারনারড কোহনের ছাত্র। এর আগে আমি বারনারড কোহন অনুবাদ করেছি, এবার তাঁর শিষ্যের শিষ্যার বই অনুবাদ করলাম। গুরুর দয়া ছিল, বাবা-মা-স্ত্রী এবং কারিগর, হকার, চাষীদের মত আত্মীয় স্বজন আশীর্বাদ আর পথ নির্দেশ আছে, আর আছে পেজফোরনিউজের সম্পাদক আর পাঠকের অমিত প্রশ্রয়, ভালবাসা – সেই শক্তিতেই অমানুষিক এই কাজটা শেষ হল।
তথ্য সূত্র এরিক স্টোকস, ইংলিশ ইউটিলিটেরিয়ানস এন্ড ইন্ডিয়া এবং Nineteenth-Century Colonialism – Amit Kumar Gupta [ক্রমশ]