Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
প্রথম অধ্যায়
নীলকরদের হিংসা চাপানোর কয়েকটি উদাহরণ
এর আগের পর্বে বলেছি ১৮২৯এ সদর দেওয়ানি আদালতের বিচারক টার্নবুল, কোর্ট অব ডিরেক্টরদের সরাসরি জানালেন নীল উৎপাদন ব্যবস্থা ‘পুরোপুরি গেঁজে গেছে’ — ‘জমিতে হাল দেওয়া থেকে বিল লাগানো অবদি সামগ্রিক জেলাটা পুরোপুরি গেঁজে যাওয়ার অবস্থায় পৌঁছে গেছে। পুলিশ, এমন কী ম্যাজিস্ট্রেটকে দাঁড় করিয়ে সব থেকে ভয়ানক আইন বিরুদ্ধ কাজগুলি সঙ্গঠিত করা হচ্ছে। সব ধরণের আইন এবং সরকারি কর্তৃত্বকে বুড়ো আঙুল দেখয়ে বিশাল সংখ্যক সশস্ত্র বাহিনী দ্রুততার সঙ্গে একের পর এক চাষের জমি দখল নিচ্ছে’। হিংস্র মারামারি, বলা ভাল অসমযুদ্ধ শুরু হয় রক্তক্ষরণ আর নিয়মিত হত্যাকাণ্ড চালানোর মধ্যে দিয়ে। আমাদের পুলিশি ব্যবস্থা চরম দুর্নীতিগ্রস্ত এবং দারোগারা কুখ্যাতভাবে নীলকরদের অর্থে পালিত হয়, যাতে তাদের দপ্তরের কাজকর্ম নীলকরদের নিরাপত্তা বিধান করে… এই ধরণের উচ্চস্তরীয় শয়তানি রুখতে খুব তাড়াতাড়ি কিছু না কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ (Turnbull’s Minute of July 2, 1829, ibid)।
ইওরোপিয়দের বিরুদ্ধে বা দেশিয়দের বিরুদ্ধে উপস্থিত করলে বোঝা যাবে কেন বিচারপতি টার্নবুল নীলকর জেলাগুলিকে ‘গেঁজে যাওয়া জেলা’ অভিধায় অভিহিত করেছিলেন।
১৮০৫-এ শ্রীমতী এলিজাবেথ, কোম্পানি সরকারের কাছে জন গুরলির অত্যাচারের হাত থেকে সুরক্ষার আবেদন করলেন। তাঁর অভিযোগ গুরলি তার স্বামী টমাস কলফিল্ডকে হত্যা করেছে। কলফিল্ডও কিন্তু যশোরের নীলকর। ১৮০৫-এর ২৭ জুন কলফিল্ড দেখল গুরলি (পাশের জেমস গোল্ডফিল্ডের নীলকুঠির ম্যানেজার) ভৃত্যদের নিয়ে তার জমির নীল গাছগুলি কেটে নৌকোতে ভরছে। কলফিল্ড, গুরলির ‘খারাপ কাজ’টি করতে বাধা দিলে গুরলি তাকে ঘুষি মারে এবং তার তরোয়াল দেখিয়ে হুমকি দেয়। কলফিল্ড পিছু হটতে বাধ্য হয়। দুদিন পরে গুরুলি কয়েকটা নৌকো নিয়ে কলফল্ডের কুঠির কাছে এসে তাকে লিখিত নোট পাঠিয়ে ডাক পাঠায়। কলফিল্ড গুরলিকে উপদেশ দিয়ে বলে তার নিজের মাঠে ফিরে যেতে এবং সে যদি কলফিল্ডের কথা না শোনে, তাহলে তাকে আদালতে টেনে নিয়ে যাবে। এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে দোনলা বন্দুক হাতে তিনশ অনুচর বাহিনী নিয়ে গুরলি, কলফিল্ডের কুঠিতে জোর করে ঢুকে তাকে আর তার পুত্রকে ঘিরে ফেলে। গুরলি আর কলফিল্ডের মধ্যে হাতাহাতি হওয়ার সময় অন্যান্যরা কলফিল্ডের পুত্রকে বেত, কুড়ুল আর অন্যান্য হাতিয়ার দিয়ে পেটাতে থাকে। ইতিমধ্য গুরলি উঠে দাঁড়িয়ে কলফিল্ডের দিকে সামনে থেকে গুলি চালায় এবং ‘হুররা’ চিৎকারে বাংলোর মধ্যে ঢুকে এলিজাবেথকে গুলি করে এবং বাংলোর অধিকাংশ জিনিসপত্র লুঠ করে পালিয়ে যায়। টমাস কলফিল্ড তিন ঘন্টার মধ্যে মারা যায় এবং জন গুরলি এর পরে ডেনেদের উপনিবেশে আশ্রয় নেয় এবং এটি যেহেতু কোম্পানির আওতার বাইরে, তাই তাকে আর ধরা যায় নি (BL, IOR, O/5/7)।
১০০০ ব্যক্তিগত বেসরকারি সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে ইওরোপিয় নীলকরেরা তার প্রতিবেশী নীলকরদের কুঠি আক্রমন করছে, আশ্চর্যজনকভাবে এগুলি সেদিনের নিতান্তই সাধারণ ঘটনা ছিল। উদ্বেগের ব্যাপার হল দক্ষিণবঙ্গে সাদা নীলকরদের হাতে সাদা নীলকরদের আক্রমন হওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটেচলেছে। ১৮০৮-এর ৪ জুন সারনের জনৈক নীলকর রবার্ট স্কট ডগলাস তরোয়াল, লাঠি, অন্যান্য মারাত্মক অস্ত্রহাতে ১০০০ সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে প্রতিবেশী ম্যাথু মোরানের নীলকুঠি আক্রমন করে। বাংলো ভেঙে ঢোকার আগে নীল কুঠি ঘিরে নিয়ে ইয়োরোপীয় ম্যানেজার টমাস ক্লার্ককে পিটিয়ে অচৈতন্য করে, তাদের সমস্ত কিছু লুঠ করে এবং খাদ্য গুদামে আগুন ধরিয়ে দেয়। ডগলাস এবং তার দুই সঙ্গীর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে দাঙ্গা লাগানোর অভিযোগ দায়ের করা হয়। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ডগলাসের এক বছরের কারাদণ্ড এবং ১০০০ টাকা জরিমানা করা হয় (BL, IOR, O/5/9 and Calcutta Gazette, June 28, 1810)।
নীলকরদের ওপর নীলকরদের হিংসা রুখতে অকার্যকর স্থানীয় প্রশাসনের নিরামশ এবং দুষ্কর্ম বন্ধ না করতে পারার চরিত্র বুঝেই গুরলি আর ডগলাসের মত হিংস্র, আধিপত্যবাদী নীলকর দল অন্য ইওরোপিয় নীলকর আর তাদের কর্মচারীদের ওপর প্রবল দৈহিক হিংসা ছড়াতে থাকে। বহু নীলকর প্রশাসনের হাত বাঁধা চরিত্র বুঝে বিপুল হিংসা চাপিয়ে দিলেও আইন তাদের টিকিও ছুঁতে পারে না, কারন সে সব দুষ্কর্মগুলি নীলকরেরা লেপের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল, হয় স্থানীয় আইন রক্ষকদের হাত করে অথবা সরকারি নির্দেশ স্রেফ অমান্য করে। যশোর অঞ্চলের এইরকম হিংস্র দুর্ধর্ষ নীলকরের নাম ছিল এলান ডানলপ, সে তার প্রতিবেশী নীলকরদের মায়া দয়া না করেই পেটাত, ভৃত্যদের ওপর শারীরিক নিগ্রহ নামিয়ে আনত, অন্য নীলকরের নৌকো লুঠ করত, নৌকো জোর ফলিয়ে করে দখল নিত, বেআইনিভাবে বন্দী করত, চুরি-ডাকাতি করত ইত্যাদি ইত্যাদি। সে বিনা বাধায় বছরের পর বছর ‘স্বৈর এবং নিপীড়ক’ কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিয়েছিল তার ভারতীয় ভৃত্য কর্মচারীদের ওপরে, যে হিংসা ব্রিটিশ আইন রোধ করতে ব্যর্থ হয়। ১৮১৩য় তার কুঠির অন্যতম ব্যবস্থাপক তার এক চাষীকে ধরে এনে বন্দী করে রাখে — যখন দুজন দারোগাকে সেই রায়তকে মুক্ত করার জন্যে পাঠানো হলে ডানলপ দুজন সরকারি কর্মচারীর সামনেই বন্দী রায়তকে পেটাই করে এবং তাকে মুক্তি দিতে অস্বীকার করে (BL, IOR, O/5/20)।
১৮২৮-এ কোর্ট অব ডিরেক্টর্স নীলকরদের বিষয়ে একটি বিশেষ সমীক্ষা করার জন্যে নির্দেশ দেয়, যার মধ্যে থাকতে হবে ‘১৮১০ থেকে সব দেওয়ানি এবং ফৌজদারি আদালতে চলা সমস্ত মামলার বিস্তারিত বিবরণ, যেসব নীলকর অথবা তাদের মাইনে করা সশস্ত্র বাহিনী বাদী এবং আসামী হিসেবে আদালতে গিয়েছে (Court of Director’s Judicial Despatch to Bengal থেকে উদ্ধৃত, August 6, 1828, Papers Relating to the Settlement of Europeans in India, BL, IOR, V 3244)’। এই সমীক্ষায় বাঙলার ৩২টা জেলার (২২০০০০ বর্গ মাইল) ৪৭৩ ইওরোপিয় নীলকর এবং তাদের দুষ্কর্মের সহকারীদের যে সব বর্ণনা আছে সেগুলি সন্দেহজনকভাবে নীলকর অনুকূল। সমীক্ষায় বাংলা প্রশাসনের নানান ধরণের স্থানীয় আমলা নীলকরদের চরিত্র বিষয়ে লিখল ‘সম্মানিত এবং ন্যায়নিষ্ঠ’, ‘দয়ালু এবং বুঝদার’, এবং সাধারণভাবে তাদের ভাল জামাকাপড়, ধনী হওয়ার প্রক্রিয়া এবং শ্রমিকদের থেকে শ্রমের গুরুত্ব বিষয়ে শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে অসাধারণ সব ভাল কথাবার্তা বলা হয়েছে (Ibid., Appendix Nos. I1 and 111)। এই সমীক্ষার সত্যতা বিষয়ে কোর্ট অব ডিরেক্টর্স খুবই সন্দিহান ছিল। তারা জানে বিগত ত্রিশ বছরে তাদের কাছে নীলকরদের হিংসা বিষয়ে যে সব দিস্তে দিস্তে সমীক্ষা গিয়েছে, এই সমীক্ষা সে সবকে মিথ্যে প্রমান করছে (Court of Directors to the Govemor-General, April 10, 1832, ibid)। [ক্রমশ]