Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
প্রথম অধ্যায়
লিঙ্গ হিংসা
‘ইওরোপিয়ান মিসকন্ডাক্ট ইন ইন্ডিয়া ১৭৬৬-১৮২৪’ নথিতে সব থেকে ভয়াবহ, বর্বর লিঙ্গ হিংসার উদাহরণ প্রকাশ্যে এসেছিল উইলিয়াম ওরবি হান্টারের মামলাতে। ১৭৯৬-য় ত্রিহুতের নীলকর উইলিয়াম ওরবি হান্টারের বিরুদ্ধে অবর্ণ দাস মহিলা পুন্না, কুনুভেই আর আজানসিরকে বর্বর হত্যার মামলা রুজু হয়। এই তিন কমবয়সী মেয়ে হান্টারের রক্ষিতা ভগবান্না খোয়ারের সঙ্গী ছিল। মামলার প্রথম পর্বে কলকাতার সুপ্রিম কোর্টে হান্টারের বিরুদ্ধে মেয়েদের অঙ্গচ্ছেদনের অভিযোগ আনা হয়। সে মেয়েদের নাক, কান এবং চুল কেটে নেয় এবং তাদের জননাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে। একটি মেয়ের জিভও কাটা ছিল। প্রত্যেকটি মেয়ে যৌনরোগাক্রান্ত ছিল, মামলা শুরুর আগে তাদের মধ্যে একজন কুনুভি মারা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান থেকে সত্য ঘটনাক্রমে উপনীত হতে অসুবিধে হচ্ছিল। আমি দুজন প্রধান নায়ক নায়িকার পরস্পর বিরোধী দুটি সাক্ষ্য উপস্থিত করব মূল ঘটনাটির ব্যপ্তি বুঝতে –
হান্টার — ভগবান্না খোয়ারের (বিবি) আমার রক্ষিতা। সে আমার সঙ্গে থাকতে আসে সাত বছর আগে। ভগবান্না মাথাগরম মহিলা ছিল। সারাক্ষণ ঝগড়া করলেও আমি তার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করেছি। আমি তাকে কাপড়, টাকা, একটি পালকি দিয়েছিলাম; এছাড়া তাকে মাসিক বেতনও দিতাম। ১৯৭৫-এর জানুয়ারিতে বিবি পাটনার পথ থেকে কুড়িয়ে এক ন্যাংটো, নোংরা এবং অসহ্য গায়ের রংওয়ালা একটি মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে এল। যে দিন থেকে মেয়েটি(পুন্না) আমার বাড়িতে এসেছে, সেদিন থেকেই যখনই আমি শুই, তখনই সে আমার বিছানায় উঠে পতিতাবৃত্তি করে। এক বছর পরে ১৭৯৬-এর জানুয়ারিতে আরেকটি দাস কন্যা আজানসি আমার বাড়িতে এসে ওঠে। বাড়িতে ঢোকার ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই আমার সঙ্গে ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়। সে রোজ আমার ঘরে আসত, কখনও কখনও নগ্ন হয়েই আমায় উপগত হত। মেয়ে দুটি বিবির বর্বরতা থেকে বাঁচতে আমার নিরাপদ আশ্রয়ে মাঝেমধ্যেই থাকত। আমি যাতে মেয়েগুলিকে আমার ইচ্ছে মত ভোগ করতে পারি, সে জন্যে বিবি মেয়েগুলিকে আমার দরজায় দিনে তিন চারবার পাঠিয়েছে। মেয়েগুলি বিবির কোনও কিছু চুরি করলেই, বিবি তাদের ধাক্কা মেরে অসম্মান করতে আমার কাছে পাঠাত। ষোল মাস ধরে যে কোনও সময়, যে কোনও বাহানায় মেয়েগুলোর সঙ্গে উপগত হওয়ার সুযোগ থাকার পরে কী আর মেয়েগুলোর ওপর গায়ের জোর খাটানোর দরকার ছিল?
মে মাসের শেষ দিন বিবি আমায় জানাল পুন্না কিছু সোনা আর রূপো গয়না চুরি করছে। তার মনে হয়েছিল আগামী দিনে আরও কিছু জিনিসপত্র চুরি করতে পারে। যদিও দেশিয় প্রজারা দাসেদের ওপরে কী ধরণের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে না জেনেই, বিবির নির্দেশে আমি কামারকে লোহার জাল তৈরি করতে নির্দেশ দিলাম। পরের দিন পুরুষ মহলে থাকার সময় মহিলা মহলে তীব্র আওয়াজ শুনে গিয়ে দেখলাম বিবি তার ভৃত্যদের সঙ্গে নিয়ে মেয়েগুলির ওপর তীব্র অত্যাচার নামিয়ে এনেছে। এই সময়েই ময়েটির নাকে একটা ক্ষত তৈরি হয়। আমি তৎক্ষণাৎ বিবিকে বাড়ি থেকে বার করে দিই।
আমি আগেই বলেছি বিবি খুবই চড়া মেজাজের মহিলা ছিল। তার কাছে থাকা ভৃত্যদের বিন্দুমাত্র দয়া দেখাত না। বিবি আমায় গর্ব করে বলছিল, আমি যদি চাই তাহলে সে মেয়েগুলোকে তার মলমূত্রও খাওয়াতে পারে। একদিন আমি দেখি তার মহলে পাঁচজন ভৃত্য নগ্ন হয়ে শুয়ে আছে এবং এর বেশি আমি আর কিছু বলতে পারছি না, আমি দরজা বন্ধ করে চলে যাই। একদিন বিবি আমায় ডেকে দেখাল কীভাবে সে তার ভৃত্য দাসেদের সঙ্গে রাত কাটিয়েছে। আমি দেখলাম একটি দাসী আরেকটির ওপর কাপড়, আংটি আর পালকের তৈরি কোনও কিছু একটা বিশেষ যন্ত্র তৈরি করে, এটিকে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে শুয়ে আছে। আমি যেহেতু জেনানা মহলের প্রভু এবং কোনও মহিলা সেই অংশে ঢোকার সুযোগ পায় না, তাই আমিই একমাত্র এই সব ঘটনার প্রত্যক্ষ্যদর্শী ছিলাম। জেনানা মহলে মহিলাদের মধ্যে যে ধরণের প্রতিশোধপরায়নতা, হিংসা, ক্রোধ এবং আবেগ কাজ করত, সে সব নিয়ন্ত্রণ করা আমার আয়ত্ত্বের বাইরে চলেগিয়েছিল। অন্য মেয়েরা আমায় একটু বেশিই পছন্দ করত। এটা বিবির তীব্র নাপছন্দ ছিল। ফলে সে হতভাগ্য দাসীদের ওপর সে অকহতব্য অত্যাচার নামিয়ে আনত যাতে তারা কুরূপা হয় এবং আমি তাদের অপছন্দ করতে শুরু করি। সে মেয়েদের বারংবার, সুযোগ পেলেই পিটত।
আমি জানতাম পাটনায় বিবি তার দাসীদের বাঁশ পেটা করেছে। কুনুভির গায়ের ক্ষত থেকে যেহেতু খুবই খারাপ গন্ধ বেরত, সে তাকে কুঁয়োর মধ্যে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। সে ভৃত্যদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলে কুনুভি তার দাসী, সে তার ওপর যা ইচ্ছে খুশি সব কিছুই করতে পারে। কেউ যেন কুনুভিকে কুঁয়ো থেকে উদ্ধার করতে না যায়। যেই তাকে উদ্ধার করবে সে তাকে হত্যা করবে। অন্যরা কুনুভিকে কুঁয়ো থেকে উদ্ধার করলে, বিবি তিনটে মেয়েকে জঙ্গলে নির্বাসনে দেয়। আমার বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ আমি অস্বীকার করছি। বিবিই মেয়েদের ওপর খুবই হিংস্র এবং বর্বরোচিত আক্রমন চালিয়েছে। আমি নির্দোষ। এখন যেহেতু সে সমস্ত কুকর্মের দায় আমার ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে, আর কতদিন আমি তার সমস্ত কুকর্ম ক্ষমা করে তার বন্ধু হিসেবে নিজের পরিচয় দেব?
বিবি — ১৭৯৬-এর মে মাসে হান্টার সাহেব আমার এক দাসীকে (আজানসি) তার ঘরে বহুকাল বন্দী করে রেখে প্রতিদিন তাকে তীব্রভাবে ধর্ষণ করত। সম্মান বাঁচাতে আজানসি ঘর থেকে বেরিয়ে কুঁয়োয় ঝাঁপ দেয়। হান্টার তাকে তার সামনে ডেকে তার হাত পা লোহার শিকলিতে বেঁধে রাখে, নাক কেটে দেয়। পুন্না পালিয়ে যেতে চাইলে তাকেও বন্দী করে। পুন্না কুঁয়োতে ঝাঁপ দিতে চাইলে সে তারও নাক কেটে দেয়।
তিনটে দাসী সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে নিয়মিত হান্টারের যৌন সম্পর্ক ছিল। তাদের সে সুযোগ পেলেই অপমান করত। আমি যখন তার এই ব্যাভিচার বন্ধ করতে চেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার হুমকি দিতাম, সে তখনই আমায় চাবুক মারার হুমকি দিত। সাহেবের দাবি মেয়েগুলি তাকে যৌন সম্পর্ক তৈরি করতে উৎসাহিত করেছে। সে আমায় মেয়েদের চুল আর নাক কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়ে হুমকি দিত আমি যদি তার কথা না শুনি তাহলে সে আমার সঙ্গে সাত বছরের একটি বাচ্চার যৌন সংসর্গের কল্পিত অভিযোগ রটিয়ে আমার চরিত্র হনন করবে। ভৃত্যদের ওপর অত্যাচার করার জন্যে সাহেব সবসময় তার হাতে ছোট ছুরি রাখত। আমি তার কথা না শুনলেই সে একটি ঘরে আমায় নিয়ে ঘোড়ার চাবুক দিয়ে পেটত। শেষ অবদি আমি আমার ভৃত্য মগুলাউনিকে নির্দেশ দিই সাহেবের নির্দেশে দাসীদের নাক কেটে ফেলতে, এবং একই সঙ্গে আমি সাহেবের নামে অভিযোগ করার হুমকি দিলাম। সাহেব উত্তর দিল আমার অভিযোগ সে থোড়াই কেয়ার করে। আমি তোর অভিযোগ করা নিয়ে ভয় পাই না। ২৫ জন তোর ওপর নজর রেখেছে। তাদের এড়িয়ে তুই কীভাবে অভিযোগ করতে যাবি? [ক্রমশ]