Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
প্রথম অধ্যায়
লিঙ্গ হিংসা
হান্টার সারাক্ষণ সাধারণ মহিলাদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখে নিজের সম্মান নষ্ট করে এবং আমরা সারা দিন শুধুই ঝগড়া করতাম। সে যতক্ষণ বাড়িতে থাকত, আমায় ঘরে আটকে রাখত, শুধু সকালে আর রাতে খাবার খেতে বেরোতে দিত। শেষ অবদি একদিন আমাদের সক্কলকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল, আমি দাসীদের নিয়ে পাটনায় রওনা হলাম। রাস্তায় আহত কুনোভি সম্পূর্ণ ন্যাংটো হয়ে রাস্তার পাশের একটি কুঁয়োতপ্লায় গিয়ে কুঁয়োয় পড়ে যায়।
হান্টারকে সুপ্রিম কোর্টের মামলায় তলব করা হল। ১৭৯৬-এর ১৬ অক্টোবর, মামলা শুরু হওয়ার আগের দিন আবার নাটুকে পট পরিবর্তন। বিবি হান্টারকে চিঠি লিখে জানায় যে সে সমস্ত ঘটনার দোষ নিজের ঘাড়ে নিচ্ছে; তার ইচ্ছে, সে হান্টারের দাসী হয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়ে দেবে, তাকে সেই সুযোগটুকু দেওয়া হোক। মামলার দিন আবার উলটপুরাণ। বিবি আদালতকে জানায় ‘হান্টার সাড়ে সাত বছর ধরে আমার সাহেব ছিলেন। আমি যদি কোনও দোষ করে থাকি তাহলে সেও একই দোষে দোষী, আর সে যদি কোনও দোষ করে তাকে তাহলে আমাকেও একই দোষে দোষী সাব্যস্ত করুন।’ ১৭৯৬-এর ডিসেম্বরে হান্টার এবং বিবিকে দাসীদের বেআইনি বন্দী করে রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। হান্টারকে প্রায় সব কটা অত্যাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় আর বিবিকে তিনটে। বিচারপতি বলেন ‘দুই ভাগ্যহীনার ওপরে যে ধরণের তীব্র অত্যাচার করা হয়েছে — তারা সমস্ত অত্যাচার মাথা পেতে নিয়েছেও’ এবং তৃতীয় মেয়েটি কুনোভি ততদিনে মারা গিয়েছে। তিনি ইংলন্ডের ফৌজদারি আইনে তাদের বিচার করবেন এবং হতভাগ্যরা যাতে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায় সেটাও তিনি দেখবেন। সক্কলে একযোগে হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় হান্টার ১০০০ টাকা প্রত্যেক মেয়েকে দেবে এবং ১০০ টাকা রাজাকে জরিমানা দেবে। হান্টার সেই অর্থ দেওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিবিকে ছমাস জেলে রাখা হয় এবং ১ টাকা জরিমানা করা হয় (BL, IOR, O/5/4)।
সিদ্ধান্ত
আমলা নিয়োগের ক্ষেত্রে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এমন কিছু কর্মী মানুষ চেয়েছে যারা ‘চরিত্রে উত্তম, সৎ এবং ভদ্র’, যাদের সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দক্ষিণ এশীয়ায় আসার উদ্দেশ্যে জাহাজে ওঠার আগে প্রত্যেকটি কর্মী, আমলার সঙ্গে ক্কোম্পানির কর্তারা শর্তসাপেক্ষ চুক্তি সম্পাদন করত করত; তাদের চরিত্র নিয়ন্ত্রণ করতে জরিমানা তমসুক লিখিয়ে নেওয়া প্রথা ছিল (Ghosh, Social Conditin, p. 9)। কিন্তু আমি যাদের উপনিবেশের তৃতীয় শক্তি গণ্য করছি, যেমন নীলকর উইলিয়াম ওরবে হান্টার, তাদের সামলানোর কাজে ভারতবর্ষের মাটিতে প্রশাসন চালাতে আসা কোম্পানির আমলারা খুব একটা দক্ষতা অর্জন করে নি। এই তৃতীয় শক্তি শাসকও নয় বা শাসিতও নয়। হান্টারেরা ছিল মাঝামাঝি রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষ; এই তৃতীয় পক্ষের জন্যে উপনিবেশ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প অর্থাৎ ভারতবর্ষ শাসনের কাজ অসামান্যভাবে জটিল হয়্র উঠত।
‘ইওরোপিয়ান মিসকন্ডাক্ট ইন ইন্ডিয়া ১৭৬৬-১৮২৫’ নথি থেকে থেকে নানান ধরণের তথ্য উল্লেখ করে আমরা একটা সহজ সাধারণ তথ্য প্রমান করলাম — অসরকারি শ্বেতাঙ্গ প্রজারা যে বিপুল দুষ্কর্ম ভারতের প্রজাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল তার ভৌগোলিক ব্যপ্তি বিশাল ছিল এবং এই অবর্ণনীয় অত্যাচারগুলো বর্বরোচিতও ছিল। ভারতভূখণ্ড দখলের মানসিকতায় যখন কোম্পানি রাষ্ট্র তার ভৌগোলিক বিস্তৃতি বাড়াচ্ছে, সে সময় এই শ্বেতাঙ্গ অসরকারি মানুষেরা বিপুল আইনি সমস্যার দেওয়াল খাড়া করেছিল কোম্পানির প্রশাসকদের সামনে। ইওরোপিয়দের বর্বর হিংস্রতা, শ্বেতাঙ্গদের নৈতিক এবং কৃষ্টিগত উচ্চমন্যতার প্রশ্নটিকে বারবার সামনে তুলে আনছিল এবং ব্রিটেন যে স্বঘোষিত নৈতিক শাসক হয়ে ওঠার যে দাবি করে দক্ষিণ এশিয়ায় উপনিবেশ তৈরি করেছে, তাদের সেই দাবি নস্যাৎ করতেই যেন সাম্রাজ্যের তৃতীয় পক্ষরা কোমর বেঁধে যত রকমের অত্যাচারের আঙ্গিক আছে সব কটা চাপিয়ে দিচ্ছিল। সাম্রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা আর সুবিচার দেওয়ার যে সব আলঙ্কারিক তাত্ত্বিক ঘোষণা শোনা যাচ্ছিল তাকে নস্যাৎ করতেই যেন কলকাতা আর মফঃস্বলজুড়ে ঘুরে বেড়ানো ভবঘুরে, কোম্পানির সেরেস্তায় ব্যক্তিগত পঞ্জীকরণের তোয়াক্কা না করে বলপ্রয়োগে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করা মানুষ, চোরাইকারবারি, চোর, ডাকাত, ভিক্ষুক, চিটংবাজ, বাগিচা মালিক, নিষ্কর্মা-কুঁড়ে, জেল পালানো বন্দী, নাবিক, সেনা আর বাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়া সেনা উপনিবেশিক হাঙ্গামা এবং হিংসার ঢেকে রাখা মুখ খুলে দেয়। তৃতীয় দলটি ঔপনবেশিক প্রশাসকদের সামনে যে নৈতিক, আইনি এবং রাজনৈতিক হুমকি খাড়া করছিউল, সেই হিংসা আর অত্যাচার চাপানোর প্রক্রিয়া আমাদের বুঝতে সাহায্য করে শাসক এবং শাসিতের মধ্যে যে ভেদরেখা টানা ছিল সেটি স্বতঃসিদ্ধ যেমন নয়, তেমনি সহজে তাকে বজায় রাখাও যায় না। উপনিবেশের প্রথম সময়ে ব্রিটিশেরা একদেহী শাসক গোষ্ঠী ছিল না, এবং যে কোম্পানি রাষ্ট্র গড়ে উঠছিল শুধুই নানান ধরণের দেশিয়দের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করার জন্যে নয়, বরং অসরকারি এবং নিয়ম না মানা অন্যান্য ব্রিটিশদের ওপরেও। [ক্রমশ]