Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
দ্বিতীয় অধ্যায়
নাগরিক, প্রজা এবং আইনানুবর্তিতা – আইন রচনা এবং জাতিগত বিভিন্নতার আইনি নির্মাণ
১৮৩১-এর গ্রীষ্মে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আসন্ন রাজকীয় সনদ নবীকরণ বিতর্কে ওয়েস্টমিনিস্টারে হাউস অব কমনসে প্রস্তাব এনে সিলেক্ট কমিটির তৈরি করে ভারতে কোম্পানির কাজকর্ম বিষয়ে খোঁজখবর করার উদ্যম নেওয়া হয়। পার্লামেন্টের বিশেষ মাথাব্যথা ছিল, ভারতে সুবিচার দেওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানি জটিল ব্যবস্থাপনাকে সরল করা। কলকাতার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা হতাশ হয়ে লক্ষ্য করছিলেন ব্যবস্থাটা এতই অব্যবস্থাপূর্ণ এবং অনিশ্চিত ছিল যে ‘কোনও ব্যক্তির অধিকার বিষয়ে সন্দেহ আর বিভ্রান্তি বিষয়ে তোলা প্রশ্ন যতই গভীর হোক না কেন বিচার দেওয়ার আসনে বসা কেউ কোনও অভিমত দিত না কেন, দপ্তরে বা বাড়িতে, ব্যক্তি বা জনগণ অথবা আইনি দপ্তরে খুবই কম আমলা রয়েছে, যাদের ভারতীয় আইন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পরিষ্কার এবং সামগ্রিক ধারণা আছে, এবং সেটির প্রতিটি অংশ সম্বন্ধে স্পষ্ট মত দিতে পারে (Hansard’s, 3rd Series, vol. XVIII, p. 729)’।
কোম্পানির বিচার ব্যবস্থাকে জ্বালিয়ে মারছিল আইন এবং ল’কোর্টের দ্বৈত কাঠামো, ওভারল্যাপিং এবং অপ্রযুক্ত অধিনিয়ম এবং অপ্রশিক্ষিত এবং আইন বিষয়ক অনভিজ্ঞ আদালত আমলার মত বেশ কিছু অন্তর্নিহিত সমস্যা। কিন্তু এই সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছিল বাড়তে থাকা ইওরোপিয়দের হিংসা, অভিচার এবং তাকে আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার সার্বিক সরকারি ব্যর্থতা।
পরের বছর গভর্নর জেনারেলকে কোর্ট অব ডিরেক্টরেরা একটি কঠোর বার্তা দিয়ে মনে করিয়ে দিলেন, ‘দেশের অভ্যন্তরে যে সব ইওরোপিয়কে বাস করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে তাদের সুপথে আনতে হবে, বিশেষ করে তাদের শেখাতে হবে আইনের প্রতি আনুগত্যই সেই সব এলাকায় বাস করার অন্যতম অবিচ্ছেদ্য শর্ত’ (Despatch from the Court of Directors to the Governor-General, April 10, 1832, Papers Relating to the Settlement of Europeans in India, BL IOR, V 3244)। ভারতে বসবাসকারী ইওরোপিয়দের আইনের প্রতি ‘আনুগত্য’ শেখানোর এই ভাবনা ১৮৩৩-এর ১০ জুলাই টমাস মেকলে প্রকাশ করেন তার প্রখ্যাত পার্লামেন্টারি বক্তৃতায়। পার্লামেন্ট কক্ষে দাঁড়িয়ে মেকলে ভারতে ব্রিটিশ সরকারের ভবিষ্যত ভূমিকা বিষয়ে বললেন কীভাবে ‘নতুন ধরণের ব্রাহ্মণদের’ হাত থেকে ভারতীয়দের বাঁচাতে হবে — ‘ফলে দেশিয়দের পূর্বদেশগুলিতে ভাগ্যান্বেষণে যাওয়া [ইওরোপিয় প্রজাদের] স্বৈরাচার এবং লাম্পট্য থেকে রক্ষা করতে হিন্দুদের মতই ইওরোপিয়দের আইনের আওতায় আনতেই হবে… জাত বিভাজনের গভীর কুসংস্কার থেকে ভারত এতদিন যথেষ্টই ভুগেছে। সর্বশক্তিমান না করুন আমরা ইওরোপ থেকে নতুন ধরণের ব্রাহ্মণ সে দেশে পাঠিয়ে তাদের ওপর নতুন করে আরও একটা নবতম উচ্চজাতির বোঝা চাপিয়ে দিতে চাই না, যারা সারাদেশের জনগনকে পারিয়া হিসেবে গণ্য করার কর্তৃত্ব না পায় (Macaulay’s speech of July 10, 1833, in Hansard’s, 3rd Series, vol. XIX, p. 527)’।
মেকলের দৃষ্টিভঙ্গী ছিল ‘এই মানুষদের নিজেদের সরকার যতক্ষণনা নিশ্চিত করতে পারছি, ততক্ষণ অবশ্যই তাদের পরিচ্ছন্ন সরকার উপহার দেওয়া দরকার’ [A. C. Banerjee, Indian Constitutional Documents, 1757-1 947 (Calcutta: A. Mukherjee, 1961), p. 248)]। মেকলের ভাবনাতে ভারতীয় জনগণকে নিজেদের তৈরি সরকার নয়, হয়ত সম্ভাব্য পরিচ্ছন্ন সরকার নির্ভর আইনের শাসন উপহার দেওয়াই ছিল তার মত ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী আমলার দৃষ্টিভঙ্গী।
মেকলে উপমহাদেশে আসেন ‘একটি মহান এবং সব কটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানান কিছু ভাবনাকে এক আত্মাভূত করার’ [Minute of January 2, 1837, in C. D. Dharker, Lord Macaulay’s Legislative Minutes (New York: 0xford university Press, 1946)] বিশাল দায়িত্ব নিজের কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে। এই সময়টিতে কোম্পানির প্রশাসনে নানান ধরণের আইন কার্যকর ছিল যেমন আঞ্চলিক নিয়মাবলী, পার্লামেন্টের আইন, হিন্দু এবং ইসলামি আইন, ইংলিশ কমন ল এবং স্টাটুটারি আইন, সুবিচার, সমতা এবং বিবেকী আচরণের নীতিও আইন হিসেবে বিবেচ্য হত। তার ধারণা ছিল এধরণের গোলমেলে এবং অনির্দিষ্ট ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে আইনের সংহিতা তৈরি করা গেলে ভারতীয় প্রজাদের (এবং বিদেশিদের জন্যও) জন্যে উপযোগী সরল এবং একমাত্রিক আইন উপস্থপন করা সম্ভব। মেকলে ভাবলেন সংহিতা প্রকরণ তৈরি করার ব্যবস্থার নীতিমালাগুলি হল ‘uniformity when you can have it; diversity when you must have it; but in all cases certainity’ [T. B. Macaulay, Speeches and Poems with the Report and Notes on the Indian Penal Code (New York, 1867), p. 200]।
ঠিক এই সময় ইংলন্ডে ফৌজদারি আইন বিষয়ক রাজকীয় কমিশন, আইনের সংহিতা প্রণয়ন বিষয়ে কাজ করছিল [(L. Farmer, “Reconstructing the English Codification Debate: the Criminal Law Commissioners”, Law and History Review, 18, 2 (2000), 397426; M. Lobban, “How Benthamic was the Criminal Law Commission?,” Law and History Review, 18, 2 (2000), 427-432; and M. D . Dubber, “The Historical Analysis of Criminal Codes,” Law and History Review, 18, 2 (2000), 433-440)]। ইংলন্ডে সংহিতা তৈরির কাজ ব্যর্থ হলেও উপনিবেশে উপনিবেশিক সংহিতা ভারতের আইনি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে এবং সামগ্রিক সাম্রাজ্য ব্যবস্থাকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। উপনিবেশের ওপর উপনিবেশিক আইন সংহিতার প্রভাব আইন বিষয়ক ঐতিহাসিকেরা এতদিন অবহেলা করে খুব একটা আলোচনা করেন নি, যদিও আমাদের মাথায় রাখতে হবে সংহিতাকরণ একটা উপনিবেশিক এবং আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং এর সঙ্গে বিশ্বজোড়া আইনি পেশাদার যুক্ত ছিলেন। ভারতে বিধায়কেরা সে সময়ের আমেরিকিয় সংহিতা বিশেষ করে এডওয়ার্ড লিভিংস্টোনের লুইজিয়ানা কোড এবং ডুডলি ফিল্ডসএর নিউ ইয়র্ক সংহিতা মাথায় রেখে সাম্রাজ্য জুড়ে সংহিতা বানানোর কাজে উদ্যমী হলেন (Macaulay’s Minute of June 4, 1835, in Stokes, English Urilirarians, p. 221)। হোয়াইটিলি স্টোকস ‘দ্য এংলো ইন্ডিয়ান কোডস — সাবস্ট্যান্টিভ ল’ বইকে উৎসর্গ করলেন সেই সব ‘ব্রিটিশ রাজনীতিক, কূটনীতিকদের উদ্দেশ্যে যারা ভারতকে জ্ঞানপূর্ণ, পরিষ্কার, নির্ধারণযোগ্য আইন দেওয়ার কাজ শুরু করেছেন এবং বিশেষভাবে এই বইটা তাদেরও জন্যে কাজে লাগবে যারা জানতে চান লন্ডন এবং নিউইয়র্কে সংহিতাকরণ বিষয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলি [(W. Stokes, The Anglo-Indian Codes: Substantive Law (Oxford, 1887), p. x)]’।
ব্রিটিশ সংহিতাকরণ প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়লে, অনেকেই উৎসাহিত হয়ে ভাবতে শুরু করলেন এংলো-ইন্ডিয়ান কোড ‘ইংলন্ডেও প্রযুক্ত হতে পারে [(“Preface to the Second Edition,” C. D . Field, The Law of Evidence in British India (2nd 11 edn. Calcutta, 1873)]’। সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক অর্থনীতিকে হেঁটমুণ্ডঊর্ধ্বপদ করে দেওয়া হিসেবে তুলনা করে জেমস ফিটজেমস স্টিফেন লিখলেন, ‘”The Indian Penal Code is to the English criminal law what a manufactured article ready for use is to the materials out of which it is made’ (G. O. Trevelyan, The Life and Letters of Lord Macaulay (London: Lowe and Brydone, 12 1959), p. 387)। ১৮৭৭-এ পার্লামেন্ট স্টিফেনকে আমন্ত্রণ জানায় ব্রিটিশ আইনের সংহিতাকরণ বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা বলার জন্যে (তিনি অসফল হয়েছিলেন)। [ক্রমশ]