Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
দ্বিতীয় অধ্যায়
ভারতে বেন্থাম
উপনিবেশিক জ্ঞানচর্চা, ভারতবর্ষের ভূখণ্ডে আইনের সংহিতাকরণের যে উদ্যম নিয়েছিল, সে বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা শুরু করার জন্যে আমাদের আবশ্যিকভাবে জেরিমি বেন্থামের ভাবনাকে খুঁটি ধরতে হবে। মাথায় রাখতে হবে, সংহিতাকরণ নামক শব্দটি ইংরেজি ভাষায় সৃষ্টি করেছিলেন স্বয়ং বেন্থাম। তবে, তিনি উনবিংশ শতকের শুরুতে যখন সংহিতাকরণ নিয়ে লেখালিখি শুরু করবেন, সে সময় ইওরোপের মূল ভূখণ্ডে আইন সংহিতাকরণের কাজ বহু আগেই শুরু হয়েছে। বেন্থাম এই সংহিতার নাম দেবন দ্য প্যানোমিয়ন — যা নতুন। ব্রিটিশ কমন ল’এর কাঠামো থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে এসে প্যানোমিয়নকে তৈরি করা হল বৈশ্বয়িক এবং বৈজ্ঞানিক নীতিমালা অনুসারী, পদ্ধতিগতভাবে কাঠামোকৃত এবং আইনের বিস্তৃত সংহিতা হিসেবে। তিনি ‘বিচারপতিদের তৈরি আইন’এর কঠোর বিরোধী ছিলেন এবং মনে করতেন আইন হবে পরিষ্কার, নির্দিষ্ট এবং সাধারণের বোধগম্য (বেন্থামিয় ভাবনাকে নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। প্রাথমিক ভাবনা তৈরি করতে দেখুন [W. Twining (ed.), Bentham: Selected Writings of John Dinwiddy (Stanford: Stanford University Press, 2003)]। তার সমসাময়িক ভাবুক উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোনের কমন ল’কে কাঠামোগত করার উদ্যমের সমালোচনা করে বেন্থাম বলেন এটি ‘বিপুল বর্জ প্রসব করবে’ [(Philip Schofield, “Jeremy Bentham and Nineteenth-Century English Jurisprudence,” Joumal of Legal History, 12, 1 (1991), 58-88)]।
উপনিবেশিক ভারতে আইনি সংহিতা তৈরির উদ্যমটির মৌল প্রণোদনা ছিল প্রয়াত বেন্থামের ভারতের আইন-প্রদায়ক হয়ে ওঠার অপূর্ণ খোয়াবকে বাস্তবে রূপায়ন [(Jennifer Pitts questions Bentham’s imperial ambitions. See J. Pitts, A Turn ro Empire: The Rtse of Imperial Liberalism in Britain and France (Princeton: Princeton University Press, 2005)]। বেন্থাম যদিও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন নি, কিন্তু বেন্থামীয় তত্ত্ব সাম্রাজ্যিক প্রশাসনে আসীন অনুগামী উচ্চপদস্থ আমলা-প্রশাসক যেমন উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক, টমাস মেকলে সরকারিভাবে রূপায়িত করার উদ্যম গ্রহণ করলেন। ১৮৩৩এর জুলাইতে যখন মেকলে গর্বিতস্বরে বলবেন, ‘যেখানে বিশৃঙ্খলা ছিল, সেখানে আমরা শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করলাম’ — তিনি আদতে সেই সব উপনিবেশিক পূর্বসূরীর তত্ত্বকে নতুন করে উপস্থাপন করবেন, যাদের যুক্তি ছিল উপনিবেশপূর্ব সময়ের সাম্রাজ্যের একনায়ক শাসকেরা আইনের মাধ্যমে বিচার না করে, তাদের নিজেদের ইচ্ছা অনিচ্ছা চাপিয়ে দিতেন জনগণের ওপরে। তিনি স্পষ্ট বললেন চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে ভারতবর্ষকে উদ্ধার করেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য (Macaulay, Miscellaneous Wrirings, p. 138)। আইন নিয়ে মেট্রোপলিটনের প্রকল্প ছিল বেন্থামের তাত্ত্বিক অবস্থানকে ভিত্তিতে সংহিতা তৈরি করে ইংলন্ডকে স্তুপীকৃত কমন ল’ পরম্পরার গুরুভার থেকে উদ্ধার করা।
বেন্থামপন্থীদের ভাবনা ছিল কোম্পানির আইন শুধু অস্পষ্টই নয়, এই আইনে বিচার, বিচারকের ইচ্ছে এবং খেয়ালের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। মেকল লিখলেন, ‘যেটি প্রযুক্ত হচ্ছে, সেটি আইন নয়, অভদ্র কৌতুকপূর্ণ একটি সাম্যাবস্থা। ভারত থেকে ফিরে আসা এক দক্ষ বিচারককে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বিষয়ে কোনও জেলা বিচারালয় কী সিদ্ধান্ত নেয় … তিনি আমায় জানিয়েছিলেন এটা ভাগ্যের (লটারি) খেলা। তিনি নিজে কী কী সিদ্ধান্ত কীভাবে গ্রহণ করেছেন, সেই প্রক্রিয়াগুলি সম্বন্ধে তিনি সবিশেষ জ্ঞাত। কিন্তু এর বেশি তিনি কিছুই জানতেন না … সামগ্রিকভাবে সুবিচার চেওয়া একট চান্স, ঘটনাচক্রমাত্র। সব কিছু নির্ভর করে ব্যক্তি বিচারপতির ইচ্ছে অনিচ্ছের ওপরে’।
মেকলের দৃষ্টভঙ্গীতে বিচারকদের হাতে তৈরি আইন হল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘অভিশাপ আর কলঙ্ক’। এই ব্যবস্থা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না, বিশেষ করে ভারতবর্ষীয় জনগণের জন্যে, কারন তারা ভারত সরকারের স্বেচ্ছাচারী আইন দায়ী সরকারের অধীনে বাস করছে (Hansard’s, 3rd Series, vol. XIX, pp. 531-533)।
ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষই শুধু আইন বিষয়েই অজ্ঞ ছিলেন তাই নয়, কোম্পানির আইন দপ্তরের বিশাল সংখ্যক আমলার পুরোদস্তুর আইন শিক্ষা ছিল না, আইন ব্যবসায় প্রবেশ করার পূর্ব-অভিজ্ঞতা অথবা ব্রিটিশ বা ভারতীয় স্ট্যাটুটরি আইন সম্বন্ধেও তাদের সম্যক জ্ঞান ছিল না, প্রকাশিত আইনি সিদ্ধান্ত বা টিকাও তাদের হাতে ছিল না। তাছাড়া আমলারা ভারতবর্ষীয় ভাষা জানত না – বিশেষ করে মফস্বলের আইনি প্রক্রিয়ার মূল ভাষা ফারসি সম্পর্কে জ্ঞান ছিল না। রামমোহন রায় জানিয়েছিলেন কোম্পানির বিচার ব্যবস্থার দুটি প্রাথমিক খামতি – প্রথমটি ভাষার অন্তরায় দ্বিতীয়টি কোম্পানির আমলাদের আইনি অভিজ্ঞতার অভাব। তিনি কোম্পানির আমলাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বলেছিলেন আমলারাই হল ‘সুবিচার দেওয়ার রাস্তায় প্রাথমিক প্রতিবন্ধক’ (Ram Mohun Roy’s Communication with the Board of Control on the Judicial System of India, September 19, 1831, PP, 1831, vol. V, p. 727)।
টমাস মেকলের ভারতে আইনি কাজকর্ম নির্দিষ্ট হয়েছিল ১৮৩৩এর চার্টার এক্ট অনুযায়ী। এটি কাঠামোগত, নির্দিষ্ট এবং পদ্ধতিগত সংস্কার নিশ্চিত করল [(3&4 Will. IV c. 85 section 55. In A. C. Banejee (ed.), Indian constitutional Documents, 1757-1947, vol. I (Calcutta: A. Mukhejee & Co., 3rd edn., 1961), pp. 221-284)]। আঞ্চলিক আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে ভারতীয়দের জন্যে এক আইন প্রবর্তনের কাঠামো, লেজিসলেটিভ কাউন্সিল তৈরি করা হল (3&4 Will. IV c. 85 section 43. In ibid)। গভর্নর জেনারেলের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল এবং নবতম সৃষ্টি আইন সদস্য, ল’ মেম্বারদের নিয়ে ‘ভারতের জন্যে আইন’ প্রণয়ণের ব্যবস্থা করা হল। এই আইনের বলে বাংলা, বম্বে, মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিরমত স্থানীয় প্রশাসনগুলির আলাদ আলাদা আইন প্রণয়ণ করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হল যাতে একটি অঞ্চলের আইন অন্য অঞ্চলের আইনের সঙ্গে বিবাদে না যেতে পারে। পার্লামেন্টের আইন বলে ভারতের লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের প্রথম ল’ মেম্বার এবং ভারতের প্রথম ল’ কমিশনের প্রধান হিসেবে মেকলে বৃত হলেন; কমিশনের দায়িত্ব হল আইন পরীক্ষা, সংস্কার এবং আইনের সংহিতা তৈরি করা (3&4 Will. IV C. 85 section 55. In ibid)।
‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেকলেকে প্রকাশ্যে খুন করব’ — ১৮৩৬-এর কালা আইন
১৮৩৪-এর ১০ ডিসেম্বর মেকলের বাংলায় আবির্ভূত হওয়ার কিছু পরে কোর্ট অব ডায়রেক্টর্স ভারত সরকারকে নির্দেশ দেয় একটি সাময়িক আইন প্রতিপালিত করে শুধুমাত্র মৃত্যুদণ্ড বাদ দিয়ে সমস্ত ইওরোপিয় প্রজাকে কোম্পানির দেওয়ানি আর ফৌজদারি আদালতের আওতায় নিয়ে আসার কাঠামো ঠিক করতে। বাংলা তথা ভারতবর্ষজুড়ে ইওরোপিয় নাগরিকদের বসবাস করার জন্যে জারি করা লাইসেন্স প্রথা রদ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাথে সাথেই উপনিবেশে ইওরোপিয় প্রজার সংখ্যা বাড়ার সম্ভাব্যতা মাথায় রেখে দেশিয়দের আইনি নিরাপত্তা দেওয়ার কথা চিন্তা করতে থাকে উপনিবেশিক প্রশাসন। কোর্ট অব ডিরেক্টর্স হুঁশিয়ারি দিয়ে বলল ‘খুব ক্ষণিকের সুবিধে নেওয়ার মহা উৎসাহে, ক্ষমতার মদমত্ততায়, উচ্চতর জাতির প্রতিনিধি হিসেবে নিজের পরিচয় দেওয়ার গর্বে অন্ধ তারা, তাছাড়া ইওরোপিয় প্রজাদের ওপর জনমতের চাপ না থাকায়, জনগণের ওপর ভয়াবহ গর্বিত অত্যাচার নেমে আসার সম্ভাবনা যথেষ্ট’। এই প্রেক্ষিতে মেট্রোপলিটনের নির্দেশ ছিল ভারতীয়দের মতই ইওরোপিয় প্রজাকেও একই ধরণের নাগরিক অধিকার ভাগ করে নিতে হবে। তারা খুব পুরোনো একটা কাব্যিক কহবত তুলে বলল, ‘যেখানে ন্যায়বিচার সমানভাবে এবং সমান শর্তে সবার জন্য অবারিত নয় সেখানে সুরক্ষার সমতা থাকতে পারে না’ [(‘There can be no equality of protection where justice is not equally and on equal terms accessible to all’(Letter No. 44 from the Court of Directors to the Government of India, NAI, Home (Rtblic), Letters from Court of Directors (1834), No. 98)]।
ভারতবর্ষীয় আইনের সংহিতাকরণ প্রক্রিয়া খুবই উচ্চাশাময় প্রকল্প ছিল। শুধু যে উপনিবেশিক আইনবিদেরা বেন্থামের তাত্ত্বিক অবস্থান ‘একটি মহান এবং সম্পূর্ণ কাজ তার সমস্ত অংশে প্রতিসম এবং একটি প্রণোদনা দ্বারা পরিব্যাপ্ত’কে [(one great and entire work symmetrical in all its parts and Pervaded by one spirit (Minute of January 2, 1837, in Dharker, Lord Macaulay’s Legislarive Minutes)] বাস্তবে রূপায়িত করতে সমস্যায় পড়লেন তাই নয়, তাদের আরও বড় মাথাব্যথা হয়ে উঠল আইনি সংস্কারকর্ম বিষয়ে উপনিবেশের বসবাস করা ব্রিটিশদের তীব্র বিরাগ এবং বিক্ষোভ। সাম্রাজ্য বিজয়ীরা, বিজিত প্রজার কাছে আত্মসমর্পণ করবে, এই ধারণায় উপনীত হতে ইওরোপিয় প্রজাদের তীব্র সমস্যা ছিল [(Note by H.L. Johnson, Deputy Commissioner, Silhat, NAI, Exlra Supplement to the Gazette of India, July-December 1883)]। মেকলের সঙ্গে অসরকারি ইওরোপিয়দের মধ্যে প্রথম ঝামেলা লাগল নাগরিক এক্তিয়ার বিষয়ে। [ক্রমশ]
ঝরঝরে অনুবাদ। জরুরি কাজ। চলুক।
কৃতজ্ঞতা ভাই। ব্যক্তি ইওরোপিয়দের
হিংসা নিয়ে কাজ নেই বললেই চলে