Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
ভূমিকা
ভারতে আমাদের সাম্রাজ্যের মৌলিক ভিত্তিই প্রজাদের ন্যায়বিচার দেওয়া, মাথায় রাখতে হবে ভারতে ইংলন্ড সর্বোচ্চ সম্মান পায় ন্যায়বিচার কাঠামো তৈরি করার জন্যেই। ন্যায়বিচার দিতে অক্ষম হলে আমরা ভারতে একদিনও থাকতে পারব না — স্যর রবার্ট ফুলটন (J. T. Sunderland, India in Bondage: Her Right to Freedom (New York: L. Copeland, 1929), P. 105)
১৭৮৪র ১৫ জানুয়ারি উইলিয়াম জোনস কলকাতায় আইন, ভাষা এবং পরম্পরা চর্চার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করলেন এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল। বহু চিন্তকই মনে করেন প্রথম যুগের ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থায় পশ্চিম এবং পূর্বের কৃষ্টিগত যোগাযোগের দিকটি তিনি, তাঁর পূর্ব সময়ের গবেষকদের তুলনায় অনেক বেশি জাতিগত সহনশীলতায়, প্রখর দয়াশীলতায় এবং অসামান্য সদয়তায় প্রয়োগ করতেন এবং বোঝারও চেষ্টা করতেন। জোনসের বিশ্বখ্যাত গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র এক দশকের মধ্যেই নীলকর উইলিয়াম ওরবে হান্টারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে, তাঁর বাড়ির তিন পরিচারিকার নাক, কান ছিঁড়ে দেওয়া, চুল কেটে দেওয়া, যৌনাঙ্গ বিকৃত করা এবং লোহার শেকল দিয়ে হাত পা বেঁধে রাখার অভিযোগের মামলা দায়ের হল। হান্টারকে তুচ্ছ পরিমান আর্থিক জরিমানা করে সুপ্রিম কোর্ট রেহাই দিল; ব্যক্তি ব্রিটিশের চাপিয়ে দেওয়া হিংসার সুরাহা হল না (BL, IOR, O15/4)।
হান্টারের বিচার চলার সময় উপনিবেশজুড়ে ঘৃণ্য হিংস্রতার সমর্থনে নানান কিসিমের যে সব সমস্যামূলক বয়ান আমরা দেখলাম, তার তুলনায় অষ্টাদশ শতকের আধুনিক ইতিহাস চর্চাকে অত্যধিক নরমসরম, শুধুই শিশুতোষিক এবং এই ধরণের ব্যক্তি হিংসায় উপনিবেশিক ঘোমটা পরানোর উদ্যম ছাড়া অন্য কিছু মনে হওয়ার কারন নেই (W. Dalryrnple, White MughaL: Love and Betrayal in Eighteenth-Century India (Inndon: Viking, 2002); এবং M. Jasanoff, Edge of Empire: Lives, Culture and Conquest in the East (New York : Vintage, 2006)। তবে ডালরিম্পলের কথিকা মূলত ভালবাসা, ঘনিষ্ঠতা, মিথষ্ক্রিয়া, এমন কী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্রাসী এবং ধর্ষকের মনোভাবে ক্ষমতা বিস্তারকে বুঝতে সাহায্য করে)। উপনিবেশিক শাসক এবং প্রজাখণ্ডের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, প্রজা-শাসকের মিলেমিশে যাওয়ার যে সব ঐতিহাসিক বয়ান আমরা এত দিন বিভিন্ন গবেষণায় পড়ে এসেছি, জেনে এসেছি, বুঝেও এসেছি সেই প্রক্রিয়ার বিপরীতে হান্টারের এই অস্বাভাবিক, বিস্ময়কর মামলা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, ভারতবর্ষের ভূখণ্ডজুড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে পৌনপুনিক জাতিবাদী হিংসা নামিয়ে আনাই ছিল উপনিবেশিক হিংসামূলক শাসনব্যবস্থা রক্ষা করার মৌল উপাদান। এই বই আমাদের উপনিবেশিক গাঢ় অন্ধকারের হৃদয় চিরে বুঝত সাহায্য করে, কীভাবে সাধারণ মানুষের ওপর দৈনন্দিন জীবনে নামিয়ে আনা হিংসা নির্ভর করে অষ্টাদশ শতকের শেষ পাদ থেকে বিংশ শতকের শুরুর সময় অবদি ব্রিটিশ শক্তি ভারতবর্ষের বিশাল ভূখণ্ডে তার ক্ষমতা প্রদর্শন করে সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক বিস্তার ঘটিয়েছে। উপনিবেশিক অ-সাদা প্রজার ওপর ব্যক্তি ইওরোপিয়দের তীব্র শারীরিক হিংসা চাপিয়ে দেওয়া ছিল সাম্রাজ্য শাসনের অঙ্গীভূত চরিত্র। জনগণের ওপর সাম্রাজ্যের হিংসা চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা গবেষকেরা আড়ালে আবডালে জনান্তিকে স্বীকৃতি দিলেও, এই হিংসা নিয়ে ভারতীয় ইতিহাসবিদ্যা চর্চায় খুব বেশি কাজ হয় নি। ব্যক্তি ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেওয়া হিংসায় ভারতীয় প্রজাদের খুন হওয়া, তাদের অঙ্গচ্ছেদন এবং বৃহত্তর জনসমষ্টির ওপর সব ধরণের বিপুলতর হিংসা আর অত্যাচার চাপিয়ে দেওয়ার পরেও, প্রায় প্রত্যেকটি অত্যাচারের অভিযোগ থেকে আদালতে ছাড় পাওয়ার পর্বত প্রমান তথ্য মহাফেজখানার তাকগুলিজুড়ে টাল দিয়ে থাকলেও এই ব্যক্তি হিংসার বিষয়টি আজও সাম্রাজ্যের নিবিড় গোপন সত্য হিসেবে মুখ লুকিয়ে থেকেছে।
ইতিহাসপাঠে আমরা জেনেছি উপনিবেশিক ভূখণ্ডে বিশাল বিশাল হিংসা চাপানোর ভিত্তিতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিভূমি তৈরি হয়েছে, কিন্তু ব্যক্তি সাদা ইওরোপিয়দের, অসাদা দেশিয়িদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দৈনন্দিনের হিংসার উদাহরণের ঘোমটা উন্মোচনের বিশদ ঐতিহাসিক গবেষণা আজও হয় নি। আমার বইতে যুক্তি সাজিয়ে বলার চেষ্টা করেছি ব্রিটিশ ভারতে চাপিয়ে দেওয়া মহত্তর শাসন দেওয়ার দাবির বিপরীতে, পাঠ্য বইতে উল্লিখিত বড় হিংসা অর্থাৎ পলাশীর যুদ্ধ থেকে ১৮৫৭র পরে রাণীর রাজত্বের উত্থান থেকে শুরু করে জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যার মত একটার পর একটা বিপুল বড় বিপর্যয়কর অত্যাচার আর গণহত্যার বর্ণনায় সাম্রাজ্যের অত্যাচারী চরিত্র কিছুটা প্রকাশ পেলেও, এই ধরণের ইতিহাসের বয়ান আমাদের বোঝাতে চায় এই ব্যতিক্রমী বৃহৎ হিংসাই ছিল সাম্রাজ্যের মৌল ভিত্তি, এবং আমাদের মত অধিকাংশ গবেষক-পাঠকের প্রতীতি হয় এই বড় হিংসার ঘটনা বাস্তবিকই ব্যতিক্রম। অথচ আমরা বুঝতে চাই না বিশাল বড় বড় সরকারিভাবে চাপিয়ে দেওয়া হিংসক ঘটনাগুলোর মধ্যেকার সময়ে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট দৈনন্দিনের হাজারো অত্যাচার আর হিংসক ঘটনাই সাম্রাজ্যের মৌল চরিত্র খুলে ধরে। মাথায় রাখতে হবে সাম্রাজ্যের চাপিয়ে দেওয়া হিংসা ব্যতিক্রম ঘটনা ছিল না, তার হিংসক চরিত্র ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য পরিচালনার মৌল ভিত্তি ছিল। বিভিন্ন ভুলে যাওয়া বেসরকারি ব্যক্তি ইওরোপিয় চরিত্র যেমন বাগিচা মালিক, খুবই অস্বচ্ছল সাদা চামড়ার সাধারণ মানুষ, সাধারণ পলাতক সেনা, ভূখণ্ডে নেমে জনারণ্যে হারিয়ে যাওয়া মাল্লা, নাবিকদের চাপিয়ে দেওয়া অত্যাচারের উদাহরণ আমাদের বুঝতে সাহায্য করে হিংসা, আদতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রক্ষায় ক্ষণস্থায়ী বিষয় নয়, তার দেশগত, গুণগত চরিত্রই ছিল।
ব্রিটিশ আইনের ভূমিগত বিস্তারের মাধ্যমে উপনিবেশে সাম্রাজ্য গভীরে তার শেকড় ছড়িয়েছে এবং পেশাদারি আইন ব্যবসার শক্তিতে, আইনের তার দর্শন প্রসারের মাধ্যমে উপনিবেশ তার মত করে বৈধতা তৈরি করেছে। ভারতবর্ষে উপনিবেশিক প্রশাসকদের দাবি ছিল ব্রিটিশ সমদৃষ্টির বিচারব্যবস্থার কাঠামো তৈরিই উপনিবেশিক সরকারের ভিত্তিপ্রস্তর, স্বাধীনতার জামিনদার এবং সভ্যতা বিস্তারের মৌলিক মাধ্যম (এ বিষয়ে আফ্রিকিয় প্রেক্ষাপট বুঝতে দেখুন M. Chanock, Lazu, Custom and Social Order The Colonial Experience in Malawi (Cambridge: Cambridge University Press, 1985)। ব্রিটিশ আমলারা উপনুবেশিক আইন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে উপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামোই তৈরি করল না (১৭৯৩এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর মাধ্যমে প্রথম দিককার উপনিবেশিক রাষ্ট্র আইন তৈরি করে ভূমিরাজস্ব আদায় করতে শুরু করে), আইনের ভাষার মারপ্যাঁচের বৌদ্ধিক ব্যবহারকে ভিত্তি করেও উপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামো গঠন করার দিকে অগ্রসর হল (B. Cohn, Colonialism and Its Forms of Knowledge: The British in India (Princeton: Princeton University Press, 1996), pp. 57-75)। ব্রিটিশ প্রশাসকেরা বলল, ভারতবর্ষ, বহুকাল ধরেই প্রাচ্য স্বৈরাচারের অধীনে দাসত্ব করছে, সেই চিরকালীন দাসত্বের খাঁচা থেকে তার প্রজাদের মুক্তি দিতে উপনিবেশিক শাসন আইনকে কর্তৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। উপনিবেশের আগের সময় পর্যন্ত একচ্ছত্র অধিপতিরা প্রাচ্য ভূখণ্ডে নৈরাজ্যমূলক শাসন চালিয়েছে। তারা উপনিবেশপূর্ব সময়ের ব্যপ্ত নৈরাজ্য আর উপনিবেশে আইন নির্ভর শাসনের মধ্যেকার অসীম পার্থক্যটিকে বোঝাবে উপনিবেশিক সমদৃষ্টির আইন এবং আইনজাত সুবিচার প্রতিষ্ঠিত করেই [R. Travers, Ideology and Empire in Eighteenth-Centuy India (Cambridge: Cambridge University Press, 2007)]। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা বলল প্রাচ্য-স্বৈরাচার ছিল ব্যক্তি এবং ব্যক্তি নির্ভর শাসন ব্যবস্থা; তার বিপরীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, ভারতবর্ষের উপনিবেশে আইন এবং স্বাধীনতা নির্ভর শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছে। উপনিবেশের অঙ্গীকার ছিল, ভারতীয় উপনিবেশের প্রজাদের সাম্রাজ্যিক বিচার ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের অধীনে সমানাধিকার নির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা উপহার দেওয়া। তারা বলল এই সুবিচারের পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে ভারতবর্ষের সাম্রাজ্যের প্রজারা উপনিবেশিক প্রশাসনের অনুগত হবে এবং আখেরে সাম্রাজ্যের আয়ু দীর্ঘস্থায়িত্ব অর্জন করবে। উপনিবেশের প্রজাদের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা যে ধরণের বিচার ব্যবস্থা উপহার দিচ্ছে, সেই কাঠামো আখেরে তাদের উপকারে আসবে এবং পছন্দও হবে। তবে উপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি করার প্রক্রিয়ায় সে পূর্ব-আমলের বিচারদায়ী কাঠামোকে সমূলে উচ্ছেদ করার কথা যেমন প্রকাশ্যে বলল না, তেমনি এই কাজে সে জনগণের সম্মতিরও যে তোয়াক্কা করল না। [ক্রমশ]