Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
দ্বিতীয় অধ্যায়
বিলের বিরোধিতায় অসরকারি পক্ষের চিৎকারে বিল পক্ষীয়দের গলা নিভেগেল
উল্টোদিকে অসরকারি ব্রিটিশ সমাজ সরকারকে চাপ দেওয়ার জন্যে কোমর বাধল আদালতের বিচারে আরও বেশি ছাড় পাওয়ার লক্ষ্যে। উপনিবেশে বাস করা ব্রিটিশ প্রজাদের অভিযোগ, সরকার পক্ষ ইওরোপিয় প্রজাদের স্বার্থপরিপন্থী কাজ করছে [(Report from the Select Committee on Colonization and Settlement (India) with the Minuted of Evidence Taken Before Them (1858), BL, IOR, W805)]। কলকাতা এবং মফঃস্বলের ১১০০ ব্রিটিশ প্রজা ‘গভীর উদ্বেগ এবং শঙ্কা’য় প্রস্তাবিত অধিকার হরণ এবং সুযোগ সুবিধে নস্যাৎ করার সরকারি উদ্যমের বিরোধিতায় স্বাক্ষরিত আবেদন জমা দিল। অভিযোগ, সরকার তাদের জুরি ছাড়া আদালতে বাধ্যতামূলক মামলা চালানোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে ‘প্রতিটি ব্রিটিশার অবিচার এবং ভুল বিচারে নিশ্চিত নিরাপত্তা পাওয়ার অবিচ্ছেদ্য অধিকার’ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা বলল মফঃস্বলে তাদের ওপরে প্রচুর মিথ্যা প্রমান এবং মিথ্যা অভিযোগের মামলা চাপানো হচ্ছে। সব থেকে বড় কথা হল, ইওরোপিয়রা ভারতীয় বিচারকদের এক্তিয়ারে এলে, তাদের মামলাগুলো চরম ‘বৈরিতা, জাতি ধর্ম বিষয়ে কুসংস্কার’ এর মুখোমুখি হবে (Annexure 15 to Tindall’s Minute, Racial Distinctions: Main Corrrspondence, vol. I, NA)।
পিককের বিলটি লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে উঠলে, কলকাতার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আরথার বুলারের পক্ষ থেকে কাউন্সিলের বৈঠক শুরু হল একটি আপস সমাধান পেশ করার মাধ্যমে। বুলার বললেন অসরকারি ইওরোপিয় সমাজ যেহেতু ‘আমাদের ভারতীয় সম্পদের জীবন, উৎসাহ এবং সর্বাবিধ আশার প্রতিনিধিত্ব করে’ তাই তার প্রস্তাব ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজাদের মামলা নিচের দিকের আদালতে না তুলে ভারতীয় আমলাদের মাধ্যমে সেসন কোর্টেই শোনা হোক। বুলারের দৃষ্টিভঙ্গী হল — these lower courts would “place them in a worse position than had ever been contemplated by the blackest of previous Acts, and consign them to the tender mercies of a Moonszff [civil judge in lowest-level court]।
প্রস্তাবের সপক্ষে বুলার ‘সকলের জন্যে সম আইন তত্ত্বের’ সঙ্গে ‘বাস্তবিক অবস্থার’ তুল্যমূল্য আলোচনা পেশ করলেন। তিনি বললেন যদি আইনের চোখে ভারতীয় প্রজা আর ইওরোপিয় প্রজাকে সমভাবে দেখার চেষ্টা করা হলে ‘সমতা শব্দটাই লজ্জায় মুখ ঢাকবে’। তাঁর মতে ভারতভূমিতে যদিও ইওরোপিয়রা সংখ্যায় ‘খুবই কম কিন্তু, মহান সভ্য সমাজের এই সদস্যরা এতদিন উপযযুক্ত আইন এবং উত্তম প্রশাসনের ছাতার তলায় বাস করে এসেছে’। অন্যদিকে ‘বিপুল জনসংখ্যার ভারত খুব সম্প্রতি বর্বর যুগ পেরিয়ে এসেছে, বলেই তার জনগণ আইনের দৃষ্টিতে সমতার অধিকার বা দুর্নীতিমুক্ত বিচার পাওয়ার জন্যে উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছে’। এই দুই গোষ্ঠী, যাদের একটা মফঃস্বল আদালতকে ‘ভয়ের’ চোখে দেখে এবং অন্য দল যারা ‘তাদের পূর্বজদের স্বপ্নের আদালতের তুলনায় এই আদালতগুলিকে আরও উন্নতমানের বিচারের ব্যবস্থা হিসেবে দেখে’ দুটিকে যদি একই আদালতের এক্তিয়ারে ‘সমতার ঘোমটায়’ ফেলা হয় তাহলে এই ব্যবস্থা ‘চরম অসাম্য’ তৈরি করবে [(Sir Arthur Buller’s speech of March 9, 1857, NAI, Legislative Council Proceedings, 1857, vol. III)। তাঁর দাবি সমতা নয়, আলাদা ব্যবস্থার(In the landmark Plessy v. Frrguon case (1896), the US Supreme Court upheld the constitutionality of a Louisiana law mandating separate but equal accommodations for blacks and whites on intrastate railroads. This decision introduced into American jurisprudence the doctrine of “separate but equal” as the standard for legalizing racial segregation in public accommodations)]। ফলে বলা হল উপনিবেশ যে আলাদা ব্যবস্থা করেছে সেটি ন্যায্য এবং ঠিক।
পিককের বিল নিয়ে আলোচনা ১৮৫৭র স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপর্যকর সময়ে থমকে যায়। আবার ১৮৫৯-এ লেজিসলেটিভ কাউন্সিল নতুন করে বসলে দেখাগেল উপনিবেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, আইনগত এবং তাত্ত্বিক অবস্থান এবং পরিবেশের অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। মফঃস্বলের আদালত অস্বচ্ছ এবং অনুপযুক্ত, ইওরোপিয় প্রজাদের যুক্তি উড়িয়ে ভারতীয় দণ্ডসংহিতা আদালতগুলোয় প্রযুক্ত হওয়ার মুখে দাঁড়িয়েছিল। ক্ষমতার ভারকেন্দ্র কোম্পানির নির্দেশকদের কবল থেকে রাণীর হাতে চলে যাওয়ায় ভারতের সব কটা কোর্টই সাম্রাজ্যের কোর্ট হিসেবে চিহ্নিত হল, এবং একই সঙ্গে ব্রিটিশ প্রজাদের শুধুই ব্রিটিশ আদালতে বিচার পাওয়ার দাবি নস্যাৎ হয়ে গেল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নতুন করে রাণী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণায় সাম্রাজ্যের আরেক দফা বর্ণ, ধর্ম, এবং জাতি নির্বিশেষে আইনি এবং প্রশাসনিক সমতার প্রতিশ্রুতি শোনা গেল (With her Proclamation of 1858, Queen Victoria took direct control of Britain’s territories in India, commencing the period of “Crown Raj” and promising to rule without discriminating along the lines of race or religion)।
তবুও আইনি সাম্য এবং অভিন্ন ফৌজদারি বিচারের বিরুদ্ধাচরণ আগেরমতই জোরালো হয়ে আরও উচ্চগ্রামে পৌঁছল। ১৮৫৭র হিংসার ফল হিসেবে ভারতীয় জাতির বিরুদ্ধে বিমূর্ত ভয়মিশ্রিত ঘৃণা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল প্রতিরোধের আকারে এবং অসরকারি ব্রিটিশ সমাজ ক্রমশঃ ভারতীয়দের শত্রুতা, ট্রাম্পড-আপ চার্জেস এবং ভারতীয় বিচারকদের অধীনে থাকার ভয় আরও বেশি বেশি করে আরও তীব্রভাবে প্রকাশ করতে লাগল মনের মাধুরী মিশিয়ে। সাম্রাজ্য শুরু হওয়ার ১০০ বছর পরে সার্বিকভাবে তৈরি হওয়া ভয়ের পরিবেশের প্রভাবে সরকারি আমলা সমাজ এবং বেসরকারি ব্রিটিশ সমাজ কাছাকাছি এল, পরের দিকে যে গোষ্ঠীকে লর্ড নথব্রুক আখ্যা দেবেন ‘অভিশপ্ত নিগার পার্টি’ হিসেবে। মাথায় রাখতে হবে এই জোটটা কিন্তু তৈরি হওয়ার কারন হল সার্বিকভাবে ভয় আর ইওরেওপিয়দের গভীর জাতিবিদ্বেষী চরিত্র ভিত্তি করে (উদ্ধৃত হয়েছে Edwardes, Bound to Exile, p. 194)।
ল’মেম্বার পিকক দুবছর আগে দ্বিধাহীনচিত্তে বলেছিলেন ‘তিনি বুঝতে পারছেন না, কোন যুক্তিতে, কোনও দেশে, কেন একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে কোনও একটা আদালতে বিচারের এক্তিয়ারের বাইরে রাখা হবে’ তিনিও মত পাল্টে নতুন ‘তথ্য এবং বাস্তবতার’ কথা বলতে শুরু করলেন। পিকক সংশোধিত বিল পেশ করে কভেনান্টেড সরকারি আমলা এবং ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজাকে গ্রেফতার করার অধিকার, বেল দেওয়ার অধিকার, আর একমাত্র সেসন কোর্টেই ইওরোপিয় প্রজাদের বিরুদ্ধে মামলা করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করলন (NAI, Legislative Council Proceedings, 1859, vol. V)। কলকাতা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি চার্লস জ্যাকসন প্রস্তাব দিলেন ভারতীয় ম্যাজিস্ট্রেটেদের ব্রিটিশদের মামলা করার এক্তিয়ার থাকবে না(প্রাগুক্ত)। তুলনামুলক-সাম্য যুক্তি উপস্থিত করে জ্যাকসন বললেন পূর্বের তুলনায় ভারতীয়দের অনেক ভাল বিচারের ব্যবস্থা উপহার দেওয়া হয়েছে এবং ইওরোপিয়দের মফঃস্বল আদালতে এক্তিয়ারে আনার প্রস্তাব তাদের পক্ষে খুবই আপত্তিজনক এবং তাদের ভুগতে হবে। তিনি বললেন ‘নেটিভেরা খুব খারাপ অবস্থায় নেই, উল্টোভাবে বলতে গেলে নেটিভদের পূর্বতন সরকারের আদালত ব্যবস্থার তুলনায় এখনকার আদালত অবস্থা খুবই উত্তম। অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রজারা এখন আইন এবং নিচুস্তরের আদালতের এক্তিয়ারে আসছে এবং তাদের নিজেদের আইন এবং আদালত ছেড়ে দিতে হছে এবং এমন এক আদালত এবং আইনের এক্তিয়ারে তাদের আনা হচ্ছে যা খুবই নিচু মানের’। জ্যাকসন বললেন সমস্যার সমাধান তখনই সম্ভব যখন ‘ব্রিটিশ প্রজাদের নেটিভদেরস্তরে না নামিয়ে নেটিভদের ব্রিটিশ প্রজার স্তরে তুলে আনা যাবে (প্রাগুক্ত)’।
শেষ অবদি ১৮৬১তে দণ্ডসংহিতা কার্যকর হল, এবং ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজারা এতিদিন যে অতিরিক্ত অধিকার সুযোগসুবিধে পাচ্ছিল সেগুলি তো রইলই বরং অধিকারের মাত্রা আরও অনেকটাই বিস্তৃত হল। ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজাদের বিরুদ্ধে তদন্ত, গ্রেফতার করার এবং বেল দেওয়ার ভারতীয় ম্যাজিস্ট্রেটের এক্তিয়ার কেড়ে নেওয়া হল এবং তদের বিরুদ্ধে যে কোনও মামলা সুপ্রিম কোর্টে উপস্থাপন করার অধিকার দেওয়া হল। ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজাদের কোনও রকম মারাত্মক অপরাধ একমাত্র সুপ্রিম কোর্টে অভিযুক্ত হবে এবং সেগুলি তদন্ত করতে পারবে একমাত্র ইওরোপিয় ব্রিটিশ আমলাই – এর ফলে ব্রিটিশদের যে কোনও অপরাধের ছাড় মিলল কারন জেলার সর্বোচ্চ আইন আমলা ছিলেন ভারতীয় (Act XXV of 1861, section 26. Also see Hoproftv. Empem, Criminal Law Journal of India 9 (1913), 359)। ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজাদের ওপর অভিযোগ করার এক্তিয়ার ১৮৬৫-র পরের সময়ে সুপ্রিম কোর্টের যায়গায় তৈরি হওয়া ভারতীয় হাইকোর্টের অধীনে গেল (২.১ ছবি) [(Indian High Courts Act (1861), 28&29 Vict c. 315. In Bauerjee, Indian Constitutional Documents pp. 64-67)]। [ক্রমশ]