Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
দ্বিতীয় অধ্যায়
বিলের বিরোধিতায় অসরকারি পক্ষের চিৎকারে বিল পক্ষীয়দের গলা নিভেগেল
ভারতীয় সমালোচকেরা ‘আইনের এই বিপরীতমুখী চলনের’ তীব্র বিরোধিতা করতে বাধ্য হল (Report of the Calcuttta British Indian Association of September 21, 1859, Reports of Meetings of the British Indian Association Calcutta, June 1859-May 1862)। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েসন ‘এক্সেম্পশন ল’ নিয়ে দীর্ঘ এবং মর্মভেদী প্রতিবেদিন তৈরি করে বলল এই ধরণের আইন সংহিতা ‘বিচার এবং উপযুক্ত নীতি প্রণয়ন করতে সাহায্য করে না; আইনের চোখে অসাম্য বাড়াবে, সমাজ-স্বার্থ বিরোধী হবে; এর ফলে বিচার প্রশাসন নির্ভর করবে দেশ, বর্ণ, ধর্মের ওপর… যা কয়েক হাজার মানুষের স্বার্থবাহী, যে অবিচারের কোনও পরিমাপ করা সম্ভব না এবং এর প্রভাব পড়বে লাখো মানুষের জীবনে’ [(BL, IOR, Memorial from BriTish Indian Association of Dcember 31, 1860 (Calcutta, 1860)]। সমালোচনাগুলো প্রশাসকদের কানে পৌঁছল না। ১৮৬২-র ১ জানুয়ারিতে রেগুলেশন অঞ্চলগুলিতে সংহিতা কার্যকর হল এবং তারপরে প্রেসিডেন্সি শহরের বাইরে ক্রমশ কার্যকর হয়।
ইওরোপিয় ভবঘুরে – ব্রিটিশ ভারতে বন্য আর বিচরণ করা শ্বেত প্রজারা
১৮৬০-এর দশক অবদি হাতেগোনা ভারতীয় প্রজাকে উপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামো থাকবন্দীর ওপরের কাঠামোয় বসানোর চেষ্টাও ছিল না। ১৮৫৪-র পরে ভারতীয় প্রজাদের কভেনান্টেড [চুক্তিবদ্ধ] সিভিল সার্ভিসের প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হল। কিন্তু পরীক্ষা যেহেতু একমাত্র ইংলন্ডেই নেওয়া হত ফলে এই পরীক্ষা প্রস্তুতি খুবই সমস্যার ছিল।
ছবি ২.১ কলকাতা হাইকোর্ট ১৮৭৫–১৮৬১-র ইন্ডিয়ান হাইকোর্ট এক্টের বলে সুপ্রিম কোর্ট আর সদর আদালতের ক্ষমতা খর্ব করা হয়। উপনিবেশিক ভারতে হাইকোর্টের অরিজিনাল এবং এপিলেট ব্যবস্থা ছিল এবং একমাত্র কোর্ট অব রেকর্ডও ছিল। কলকাতা হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬২-তে এবং সুপ্রিম কোর্ট মফঃস্বলে থাকা ইওরোপিয়দের যে মামলা বিচার করত, সেগুলি এবার থেকে হাইকোর্টে বিচারের জন্যে পাঠানোর নির্দেশ জারি হল।
১৮৬৪তে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম ভারতীয় কভেনান্টেড সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করেন। ১৮৬৯ থেকে যারা কভেনান্টেড সিভিল সার্ভিসে ছিলেন তারা খুব বেশি হলে জাস্টিস অব পিস পদে যোগ দিতে পারতেন এবং ১৮৭৯-এর পর সব ধরণের সিভিল সার্ভিসের এক পঞ্চমাংশ ভারতীয়দের জন্যে সংরক্ষিত করা হল। এই সব প্রশাসনিক সংস্কার দুটো কারনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কেননা শাসকেরা জানে ফৌজদারি দন্ডসংহিতার আওতা যত বাড়তে থাকবে, যতই দেশিয় আমলা বাহিনী বাড়তে থাকবে ততই ইওরোপিয়দের বিচার ছাড়ের বিষয়টি বাঁচানোর সমস্যা বাড়বে। দ্বিতীয়ত বিচার বিভাগীয় ভারতীয় আমলারা জেলাগুলিতে এতদিন নজর না পড়া কিন্তু বাড়তে থাকা সমস্যা বিষয়ে নজর দিতে শুরু করল, যে সমস্যা সমাধানে তাদের হাত বাঁধা ছিল — সেই সমস্যাটা হল শ্বেতাঙ্গ ভবঘুরেদের সামলানো।
উপনিবশিক প্রশাসন বহু কাল ধরে ‘ইতর আর লম্পট’ ইওরোপিয় প্রজাদের কাজকর্মের খারাপ প্রভাব নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিল, যদিও এই ধরণের ইওরোপিয় সংখ্যা খুবই কম (বসুর The colonization of India by Europeans-এ চার্লস গ্রান্টের উদ্ধৃতি)। নিয়ন্ত্রণ উঠে যাওয়া সত্ত্বেও উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে — অবশ্যই ১৮১৩ নয় (সে সময় কোম্পানির একচ্ছত্র বাণিজ্যাধিকার শেষ হল) বা ১৮৩৩এও নয় (তখন লাইসেন্স ব্যবস্থা উঠে গেল) বা ১৮৩৭এও নয় (যখন ব্রিটিশ প্রজাদের ভারতে দীর্ঘস্থায়ী জমি লিজ নেওয়ার সুযোগ বাড়ল) খুব বেশি অসরকারি ইওরোপিয় ভারতে আসছিল না। ১৮৫৩-তে পার্লামেন্টে সমীক্ষা উপস্থাপন করে বলা হয় ৬৭৪৯ ব্রিটিশজাত ব্যক্তি বাংলায় থাকে যার মধ্যে অধিকাংশ কলকাতায় বাস করে; এর মধ্যে ২৭৬ গ্রামাঞ্চলে কৃষিকর্ম এবং উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত আছে (First Repon from the Seiecr Comnzittce on Colonization andSerrlentent (India) with the Minutes of Evidence Taken Before Them (1858) BL, IOR, W 805)।
১৮৫৮য় পার্লামেন্টে ইওরোপিয় কলোনাইজশন অর্থাৎ ভারতে ব্রিটিশদের স্থায়ী বসবাস করতে দেওয়ার অধিকার বিষয়ে দ্বিতীয়বারের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হয়। প্রত্যেকবারের মত এবারেও নজর নিবদ্ধ হয় অসরকারি ব্যক্তিদের বেআইনি কাজকর্ম এবং সরকারের পক্ষে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার ব্যর্থতায়। এই আলোচনায় বিশেষ করে উঠে আসে সরকারি দৃষ্টিতে কাম্য শ্বেতাঙ্গ বাসিন্দা বনাম অনভিপ্রেত বাসিন্দার মধ্যে পার্থক্য টানার বিষয়টি। মেজর জেনারেল জর্জ ত্রিমেনহেরে সিলেক্ট কমিটিকে জানালেন শ্রমিক নয়, কাম্য বাসিন্দা হোক পুঁজিপতিরা (প্রাগুক্ত)। তবে কাম্য বাসিন্দা আকর্ষণ করার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ভারত জুড়ে আমলারা লক্ষ্য করল অকাম্য, অবাঞ্ছিত শ্বেতাঙ্গ যেমন নিষ্কর্মা, ভিখিরি, সম্বলহীন, ছিঁচকে চোর, চাকরি চ্যুত মাল্লা, বেশ্যা, বেকার এবং অভাবগ্রস্ত মহিলা আর শিশুতে দেশ ভরে গেছে (চিত্র ২.২) [(দেখুন Arnold, “European Orphans and Vagrants”; Fischer-Tine, Low and Licentious Europeans; A. Ganachari, ‘”White Man’s Embarrassment’: European Vagrancy in 19th Century Bombay,” Economic and Political Weekly (June 22, 2002), 2477-2486; and Mizutani, “A ‘Scandal to the English Name and English Government.”)]।
গরীব, ভবঘুরে এবং অপরাধপ্রবণ শ্বেতাঙ্গ প্রজারা সাম্রাজ্যের সযত্নে তৈরি করা জাতিগত এবং পোষাক নির্ভর সীমান্ত ভেঙে খানখান করে দেয় তাদের বেমানান কাপড়চোপড়, চরম মাতলামি এবং প্রবল হিংসা চাপিয়ে দেওয়ার কাজকর্মের প্রাবল্যে। নির্লজ্জ ব্রিটিশ লোফারদের অসুবিধময় কাজকর্মে দৃশ্যত সমব্যাথী বম্বের পুলিশ আমলা আরথার ট্রেভার্স ক্রফোর্ড স্পষ্ট মনে করেন ‘বর্বর এবং মদ্যপ’ ভবঘুরেরা দুর্বৃত্ত (রাফিয়ান) হিসেবে জন্মেছে আর বেড়েও উঠেছে – ‘দুবৃত্তরা জীবন শুরু করে দুর্বৃত্ত হিসেবে, শেষও করে দুর্বৃত্ত হিসেবে; চোর, গাঁটকাটা বা গ্রামে অস্বচ্ছল অবস্থায় বেড়ে ওঠা বালকেরা প্রকাশ্য অসম্মান থেকে বাঁচতে পালিয়ে সমুদ্রে মাল্লা হওয়ার জন্যে যেন নামই লিখিয়ে রাখে; অথবা রেল ইঞ্জিনের কর্মী হওয়ার সুযোগ খোঁজে; আর চাকরিবাকরি পেলেও তাদের অবিলম্বে [চাকরি থেকে তাদের] তাড়িয়েও দেওয়া হয়; মদ্যপানেওর চির আকর্ষণ আর বড় শহরের ব্যসন তাদের দেহ মন ধ্বংস করে; তারা মরিয়া হয়ে শান্তির খোঁজে গ্রামের দিকে চলে যায়; সে শুনেছে ‘নিগারেরা’ খুবই দয়ালু হয় [(A. T. Crawford, Reminiscences of an Indian Police Official (London, 1894)]।
স্থানীয় সরকারের সঙ্গে যুক্ত থাকা আমলারা বহুবৈচিত্রময়ী বহু সংজ্ঞায়িত ভবঘুরেমি নিয়ন্ত্রণকে উপনিবেশিক প্রায়োগিক বাধ্যতা হিসেবে দেখতে শুরু করে অবিলম্বে। আশংকাজনক স্বরে পাঞ্জাব সরকার এই সমস্যা বৃদ্ধিকে ‘চরম ধরণের রাজনৈতিক এবং সামাজিক শয়তানি’ হিসবে অভিহিত করল [(W. Kirke, Assistant Secretary to the Government of Punjab, May 4, 1863, NAI, Home, Imgislative (A), September 1863, Nos. 7-9.)]। ভাগলপুরের কমিশনার এ মন্টি বললেন ভবঘুরেদের উপস্থিতি সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার পক্ষে হানি কারক, ‘আমাদের দেশের সহায়সম্বলহীন সাধারণ মানুষদের এ এদেশে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতে দেওয়া খুবই আপত্তিজনক ব্যাপার, তারা কেবল ভিক্ষা এবং ভীতি প্রদর্শন করে, সুযোগ থাকলেও অন্য উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করার কথা চিন্তাও করে না। এই অসম্মানজনক নিচু শ্রেণীর ব্রিটিশ চরিত্রের শ্বেতাঙ্গ প্রজাদের প্রায় সব ধরণের বাজার বা শহরে মদ্যপ এবং অশক্ত হিসেবে দেখা মেলে [(Money’s letter, included with Maine’s “Minute on Vagrancy,” June 11, 1868, NAI, 8 2 Home, Legislative (A), October 1868, Nos. 12-15)’]। সেনাবাহিনীর প্রধান ডবলিউ আর ম্যানসফিল্ড লিখেছেন তাদের হতভাগ্য দেশিয়রা ভারতে থাকা ব্রিটিশদের সম্মান নষ্ট করছে, তারা ভদ্রলোকেদের ‘লজ্জা আর অপমানে’ ফেলছে এবং তাদের সমস্যাগুলি যাতে আইন করে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেই দিকে আমাদের ঠেলে দিতে চাইছে। [ক্রমশ]