Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
দ্বিতীয় অধ্যায়
বিলের বিরোধিতায় অসরকারি পক্ষের চিৎকারে বিল পক্ষীয়দের গলা নিভেগেল
একই সময়ের আশেপাশে মাদ্রাজ সরকারও ইওরোপিয় ভবঘুরেমি বিষয়ে তদন্ত করত একটা কমিটি তৈরি করল। মাদ্রাজের কমিটিও একই ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহন করে, শ্রম বাজারের সঙ্গে এবং ১৮৫৭-র ঘটনায় ইওরোপিয় বাহিনীর একাংশ বিলয় এবং সেনাদের কর্মচ্যুতির সঙ্গে ভবঘুরেমি বাড়ার যোগসূত্র স্থাপন ক’রে। মাদ্রাজে দেখা যায় বহু ভবঘুরে অস্ট্রেলিয় স্বামী ছেড়ে ‘অস্বচ্ছলতায়, জলবায়ুর জন্যে, খাদ্য বাসস্থানের খোঁজে, আশাহীনতায় এবং …মদ্যের’ চাপে স্বেচ্ছায় কারাগারের জীবন বরণ করছে। মাদ্রাজের কমিটি কর্মাবাস এবং নির্বাসনের মেলানোমেশানো নিদান দেয় এবং যাতে ‘অস্বচ্ছল ইওরোপিয়, যাদের সমুদ্রতীরে কোনও নির্দিষ্ট কাজ থাকে না এবং মেয়াদউত্তীর্ণ বন্দী এবং টিকিট হাতে সমুদ্রপারে যাওয়া’ মানুষদের ভারতে আসা আইন করে বন্ধ করা যায় সে বিষয়ে সরকারকে উৎসাহী হতে অনুরোধ করে [(“Report on European Vagrancy,” Proceedings of the Madras Government (Public Department), NAI, Legislative (A), February 8, 1868, Nos. 1-2)]।
তবে ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল ইওরোপিয় আন্তঃআঞ্চলিক ভবঘুরেমির সমস্যা আঞ্চলিক আইন প্রণয়ন করে সমাধান করা যাবে না। ১৮৬৮তে ল’ মেম্বার হেনরি মেইন, ইওরোপিয় ভবঘুরেমির মত ‘সামগ্রিকভাবে ব্রিটিশ জাতির ওপর ছেয়ে যাওয়া’ ‘সুকঠিন রাজনৈতিক বিপদ’ থেকে রক্ষা পেতে একটি বিল উপস্থাপন করেন (Maine’s Minute of June 11, 1868, NAI, Home, Legislative (A), October 1868, Nos. 12-15)। পরের বছরেই ইওরোপিয়ান ভ্যাগরন্সি এক্ট এল, যে আইনে ভবঘুরেমিকে সংজ্ঞায়িত করে বলা হল, ‘ইওরোপজাত যে কোনও বক্তি যাকে ভিক্ষা চাইতে দেখা যায় অথবা কোনও কাজ ছাড়া ঘুরে বেড়ায় অথবা জীবনধারণের কোনও উপায় ছাড়া বেঁচে থাকে [(European Vagrancy Act (Act XXI of 1869)]’। এই আইনে কলকাতা বম্বে এবং মাদ্রাজ পুলিশকে অধিকার দেওয়া হল ‘দৃশ্যত’ কোনও ভবঘুরেকে সাধারণ তদন্তের জন্যে ম্যাজিস্ট্রেটের কাজে নিয়ে যাওয়ার এবং তাকে কোনও কাজের জায়গায় পাঠানোর। যদি কোনও ‘দৃশ্যত ভবঘুরে’ যদি পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা না করে তাহলে তাকে এক মাসের কয়েদ করা যাবে এবং কোনও ‘ইওরোপিয় বংশোদ্ভুত ব্যক্তি’র রোজগার করার সম্পূর্ণ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষা চায় বা হুমকি দিয়ে ভিক্ষা দাবি করে, শাস্তি দেওয়া যাবে। যে সব জাহাজের নাখোদা শাস্তি পাওয়া ‘জঘন্য অপরাধীদের’ ভারতে নিয়ে আসে, তাদের শাস্তি দেওয়া হবে এবং ইওরোপিয় ব্যক্তি, সঙ্গঠন এবং বেসরকারি ব্যক্তি যারা ইওরোপজাত ব্যক্তিদের ভারতে নিয়ে আসে এবং এক বছর পরে যদি দেখা যায় তাদের কর্মীরা ভবঘুরে হয়ে গেছে, তাহলে সেই সব মানুষদের ‘নির্বাসনের’ খরচ সেই সব সঙ্গঠন/ব্যক্তিকে বহন করতে হবে। ১৮৭৪এ ভ্যাগর্যান্সি এক্ট সংশোধিত হয়ে আরও বিস্তৃত হয়ে শুধু ইওরোপজাতদেরকে বাড়িয়ে করা হল ইওরোপ, আমেরিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, তাসমানিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং কেপ কলোনির বাসিন্দা এবং একইসঙ্গে তাদের পুত্র এবং তস্য পুত্র এবং যাদের দণ্ডসংহিতায় সব অধিকার হরণ করা হয়েছে সেই সব মানুষদের।
দেশিয় – জাতিভিত্তিক অধিকার এবং ব্রিটিশদের ব্যক্তিগত আইন
ইওরোপিয় ভ্যাগর্যান্সি এক্ট-এর পরিধি খুব সীমিত হলেও ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা কিছুটা বৃদ্ধি করে ওপরে ওপরে শ্রেণীকৃত করা একশ্রেণীর মফঃস্বলের গরীব, ভবঘুরে এবং কখোনো কখোনো দুর্বৃত্ত ইওরোপজাত ছোট সংখ্যার মানুষকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হল। কিন্তু এর ফলে মফঃস্বল থেকে ইওরোপিয় বা ব্রিটিশ ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত দুর্বৃত্তদের হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে মামলার জন্যে পাঠানোর বৃহত্তর সমস্যার সমাধান হল না (দেখুন Minutes of the Madras and Calcutta High Court Judges, and the Punjab Chief Court Judges, NAI, Home, Judicial (A), February 4, 187 1, Nos. 40-4 1; and NAI, Home, 96 Judicial (A), February 25, 1871, No. 4)। ১৮৬৮ থেকে ১৮৭০-এর মধ্যে প্রেসিডেন্সির নানান দূর এলাকা থেকে ইওরোপিয় ভ্যাগর্যান্সির ৪৩টা মামলা বম্বেতে পাঠানো হয়েছিল। প্রতিটা মামলায় ৫ থেকে ৩২ সাক্ষী উপস্থিত করতে এবং প্রত্যেককে দুই সপ্তাহ থেকে তিন মাস অবদি জেলবন্দী থাকতে হয়েছে। এই ব্যবস্থায় বিচার পাওয়ার সমস্যাটি ইওরোপিয় প্রজার হাতে লাঞ্ছিত কোনও ভারতীয় সাধারণ মানুষের আওতার বাইরে থেকে যায় (Petition from the Bombay Association, February 1, 1871, NAI, Legislative (A), June 97 1872, Nos. 141-346)।
উপনিবেশিক প্রশাসকদের নিরবিচ্ছিন্ন অভিযোগ ছিল, প্রশাসনের হাতে যে ধরণের আইন দেওয়া হয়েছে, সেগুলি সুবিচার দেওয়ার নীতি লঙ্ঘন করছে এবং সরকারকে রাজনৈতিক বিপদের সামনে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের বক্তব্য সাধারণ ইওরোপিয়রা দুষ্কর্ম করে আদালতে ছাড় পেয়ে গেলে উপনিবেশে শাসক জাতির সম্মান ধুলোয় লুটোয় (Maine’s Minute, NAI, Home, Legislative (A), August 1864, Nos. 31-33; and Note of 98 May 10, 1866, NAI, Home, Judicial (A), March 25, 1871, Nos. 29-30)। ১৮৭১ নগাদ ফৌজদারি মামলা পদ্ধতি সংস্কারের জন্যে তিনটে আলাদা আলাদা প্রস্তাব জমা পড়ে (S. C. Bayley, Secretary to the Government of India, to the local governments, December 99 30, 1871, NAI, Legislative (A), June 1872, Nos. 141-346)। প্রথমটির খসড়া করে উত্তরপশ্চিম প্রদেশ সরকার, তাদের প্রস্তাব ছিল জাস্টিস অব পিস এবং স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটকে যৌথভাবে মফঃস্বলের ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজার বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ দিতে হবে [(Government of the North-Western Provinces to the Government of India, August 23, 100 1870, NAI, Legislative (A), June 1872, Nos. 141-346)]। দ্বিতীয়টির খসড়া করেন ল’ মেম্বার ফিটজেমস স্টিফেন্স – তার নিদান ছিল একমাত্র সেসান জজের স্থানীয়ভাবে ক্ষমতা বৃদ্ধি করার (NAI, Legislative Council Proceedings, 1870, vol. XVI)। তৃতীয়টির খসড়াদার বাংলা সরকার। তাদের বক্তব্য হল ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজাদের স্থানীয় ফৌজদারি ট্রাইবুনালে অভিযুক্ত করা হোক। বাঙলার প্রস্তাবটি তৈরি হয়েছে এই ভাবনা থেকে যে, একমাত্র অবৈষম্যমূলক ফৌজদারি সংহিতা পদ্ধতিটির মাধ্যমে ‘ইওরোপিয়রা যেভাবে নিজেদের উচ্চমন্য এবং অহংকারী জাত হিসেবে উপস্থাপন করার প্ররোচনা বোধ করে সেটি রোধ করা যেতে পারে এবং বর্তমান চলতি আইন দিয়ে এই ধারণা আটকানো সম্ভব নয়; এই আইন প্রণয়ন হলে দেশের শাসনকর্তা এবং বেশি বেশি সুযোগ দাবি করা বিদেশিদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু দ্বন্দ্ব কমার সুযোগ তৈরি করে দেবে (S. C. Bayley, Officiating Secretary to the Government of Bengal in the Judicial Department, November 4, 1871, NAI, Home, Judicial (A), December 30, 1871, NOS. 35-37)’।
তিনটি প্রস্তাব বিবেচনার উদ্দেশ্যে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হল। কমিটি বলল হাইকোর্টে ইওরোপজাতদের বিচার এবং শাস্তি প্রদানের প্রক্রিয়া ‘খরুচে আর সমস্যাসঙ্কুল’ যার ফলে বাড়তে থাকা ইওরোপিয় অসরকারি জনগণের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হচ্ছে [(Legislative Council debates of January 30, 1872, NAI, Legislative (A), June 1872, Nos. 141-346. Preliminary Report of the Select Committee in the Supplement to the Gazette of India, January-June 1872 (February 3, 1872)]। ১৮৭২-এর আদমসুমারি সমীক্ষা অনুযায়ী সে সময় শুধু ভারতে সেনা সহ ইওরোপিয় জনগনের সংখ্যা ছিল ১,৪২,০০০ (Bose, Racism, Struggle for Equality and Indian Nationalism, p. 238)। তবে সিলেক্ট কমিটি মনে করেনি ভারতে সার্বিকভাবে আইনি সাম্য প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে। যে বিলটি লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে উপস্থাপিত হল, তাতে মফঃস্বলের ইওরোপিয় ব্রিটিশারদের ফৌজদারি অপরাধের বিচার করার অধিকার কিছুটা বিস্তৃত হল — মাথায় রাখতে হবে এই বিচার করার অধিকার একমাত্র ছিল ইওরোপিয় ম্যাজিস্ট্রেট এবং সেসন জাজদের হাতে। বাঙলার ইওরোপিয় অসরকারি মানুষদের সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোপনে আলোচনা করে বিলটির খসড়া তৈরি হয়। [ক্রমশ]