Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
দ্বিতীয় অধ্যায়
‘শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ’ — ইলবার্ট বিল সঙ্কট
উপনিবেশিক ভারতবর্ষে ফৌজদারি বিচার পদ্ধতির সংহিতাকরণের কাজটি আইনগতভাবে জাতিগত পার্থক্যের বিষয়টি কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠা করল। ১৮৩৩-এর পর থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঘোষিত নীতি ছিল অভিন্ন আইন এবং ট্রাইবুন্যাল পদ্ধতির প্রতিষ্ঠা দেওয়া, ১৮৭৭-এ দেখাগেল ভারতে তিনটে আলাদা আলাদা ফৌজদারি ব্যবস্থার সংহিতাকরণ হচ্ছে এবং তার প্রয়োগও ঘটছে — ফৌজদারি ব্যবস্থার সংহিতা (মফঃস্বলের আদালতের জন্যে), হাই কোর্ট ফৌজদারি ব্যবস্থাপনা আইন, এবং প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট আইন। ভারত সচিব বিভিন্ন আইন এবং ল কোর্টের অস্তিত্ব লক্ষ্য করে মন্তব্য করলেন, [এটি] ‘ভারতবর্ষকে সরল এবং অভিন্ন আইনি ব্যবস্থা দেওয়ার নিষ্পন্ন নীতির বিরোধী’ এবং তিনি ভারত সরকারকে নির্দেশ দিলেন শেষ বারের জন্যে বিস্তৃত সংহিতা পদ্ধতি তৈরি করার জন্যে [(Secretary of State’s Despatch (Legislative) No. 44, October 26, 1876, NAI, Home, Judicial (A), October 1878, Nos. 54-56)]।
১৮৮২-র সংশোধিত ফৌজদারি প্রক্রিয়ার চালু হওয়ার ১৪ দিন পরে ভারতবর্ষের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার দুটি চিঠি লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে পেশ করা হল [(এই সংহিতাটি প্রতি দশ বছর অন্তর সংশোধিত হয়েছে (The codes were regularly amended every ten years)]। প্রথমটি কলকাতার প্রেসিডেন্সির ম্যাজিস্ট্রেট এবং কভেনান্টেড সিভিল সার্ভেন্ট বিহারিলাল গুপ্তর লেখা। বিহারীলাল সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন মফঃস্বলে চাকরি করা ভারতীয় কভেনান্টেড সিভিল সার্ভেন্টরা, তাদের ইওরোপিয় অধস্তন আমলার তুলনায় অসরকারি ইওরোপিয়দের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে প্রায় হাত বাঁধা অবস্থায় ক্ষমতাহীন হয়ে থাকেন এবং তাদের ‘বিশৃংখল অবস্থা’র মুখোমুখি হতে হয়। জেলায় ভারতীয় ম্যাজিস্ট্রেট এবং ডিস্ট্রিক্ট জাজেরা মফঃস্বলের ব্রিটিশ প্রজাদের বিচার করতে পারেন না, অথচ তাদের নিচুস্তরের জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট এই মামলা চালাতে পারেন। আপার বেঙ্গলে যাওয়ার উদেশ্যে সেসন জাজ হয়ে পদন্নোতি চেয়ে বিহারীলাল বাংলা সরকারকে আইন পরিবর্তন করতে অনুরোধ করে লিখলেন ‘সেসন জাজ বা জেলার ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে আপনাদের যদি আমাদের মত আমলাদের ওপর বিশ্বাস এবং নির্ভরতা থাকে, তাহলে আমাদের ক্ষমতা ছেঁটে ফেলবেন না’ (NAI, Home, Judicial (A), September 1882, Nos. 219-239)। দ্বিতীয় চিঠিটি ছিল এশলে ইডেন বাংলার লেফটানেন্ট গভর্নরের। বিহারীলালের মতকে সমর্থন জানিয়ে ইডেন বললেন ভারতীয় কভেনান্টেড সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের জন্যে ‘সময় উপনীত হয়েছে’ জাতিভিত্তিক মামলা চালানোর তাদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে হটিয়ে দেওয়ার (H.A. Cockerell, Secretary to the Government of Bengal, to the Government of India (Home), NAI, Extra Supplement to the Gazette of India, July-December 1883)। ইডেন যুক্তি দিলেন এর ফলে প্রশাসনিকভাবে সুবিধে হবে কারন কভেনান্টেড আমলাদের এক পঞ্চমাংশই পদই ভারতীয়দের জন্যে সংরক্ষিত ছিল এবং এই বিপুল সংখ্যক যোগ্য বিচারককে ব্রিটিশজাত প্রজাদের বিচার করতে না দেওয়ার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারন নেই।
শুরুর দিকে স্থানীয় সরকারগুলো ইডেনের ডাকে মফস্বলে ভারতীয় বিচারক এবং ম্যাজিস্ট্রেটেদের ওপরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলি তুলে নিতে উৎসাহ দেখায় (Confidential Circular to Local Governments and Administrations, Nos. 7-586 to 594, April 28, 1882, NAI, Home, Judicial (A), September 1882,Nos. 219-239)। অনেকেই প্রস্তাব দেন ইওরোপিয় ব্রিটিশজাতদের বিচারের ক্ষমতা মফস্বলের সেসন জাজ এবং সিভিল সার্ভিস সেবা থেকে ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া আমলাদের অর্পণ করা হোক। কেউ কেউ বললেন যে সব ভারতীয় লন্ডনে কাটিয়েছেন তাদেরই একমাত্র ফৌজদারি মামলা করার এই সুযোগটা দেওয়া দরকার। অবধের ক্রিমন্যাল কমিশনের ওফিসিয়েটিং জাজ ডবলিউ ডুথোই বললেন যে সব ভারতীয় ইংলন্ডে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছে, তারাই একমাত্র ‘যদিও জন্ম থেকে তারা জাত এবং ধর্মের সংস্কারে ডুবে থাকলেও, ইওরোপ গিয়ে তারা সেই রোগ থেকে মুক্ত হতে পেরেছে এবং কম বেশি তারা ইওরোপিয় মানসিকতা এবং প্রথাগুলি জানবে’, কিন্তু যারা ভাইসরয়ের দ্বারা নিযুক্ত তারা ‘ধর্ম এবং জাতের কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ এবং ইওরোপিয় ভাবনাচিন্তা এবং অনুভূতি সম্বন্ধে অজ্ঞ (Duthoiut’s letter of May 19, 1882, ibid)’। স্থানীয় প্রশাসনের সম্মতিক্রমে ল’ মেম্বার কোর্টনি ইলবার্ট এমন একটা বিলের খসড়া তৈরি করলেন, যে খসড়ার মুখবন্ধে ‘আইনের স্ট্যাটুট বইগুলিতে থাকা প্রত্যেকটি আইনি ত্রুটি সম্পূর্ণভাবে এবং চিরতরে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দিল, যে আইনগুলি দাঁড়িয়েছিল জাতিবাদী বৈষম্য এবং প্রভাবশালী জাতির ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার ওপর নির্ভর করে [(to remove from the Statute Book, at once and completely, every judicial disqualification which is based merely on race distinctions and the supposed personal privilege of a dominant caste) (“Statement of Objects and Reasons,” January 30, 1883, in NAI, Extra Supplement to the Gazette of India, July-December 1883 and BL, IOR, L/P&J/5/40)’]।
স্থানীয় সরকারগুলিকে ইলবার্ট বিল পাঠানোর আগেই সেই বিল নিয়ে কলকাতার অসরকারি ইওরোপিয় সমাজের ক্ষোভ উথলে উঠেছে [(দেখুন E. Hirschmann, “White Mutiny”: The Ilbert Bill Crisis in India and Genesis of the Indian National Congress (New Delhi: Heritage, 1980), and Sinha, Colonial Masculinity)]। ১৮৮৩এর ২৮ ‘ইলবার্টের কলঙ্কজনক বিল’-এর প্রতিবাদে ফেব্রুয়ারি টাউন হলের জনসমাবেশে ৩০০০ বেশি ইওরোপিয় যোগ দিল (”Proceedings of a Public Meeting held in the Town Hall, Calcutta, on the 28th February 1883, in connection with the Criminal Procedure Code Amendment Bill,” PP, 1884, vol. LX,c. 3952)। নিজেদের সংখ্যালঘু নিপীড়িত বর্ণনা করে অসরকারি ইওরোপিয়রা বলল ‘বাঙালি বাবু’দের আর অসংবেদনীল উপনিবেশিক সরকারের চাপে তাদের স্বার্থ, অধিকার, সুবিধে ইত্যাদি হুমকির মুখে দাঁড়িয়েছে (প্রাগুক্ত)। লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের প্রাক্তন সদস্য, জে পিট কেনেডি বললেন, ভাইসরয় এবং তার পরামর্শদাতারা ‘মানুষের বেদনে সংবেদনহীন সর্বশক্তিমানদের মত উচ্চশৃঙ্গে বাস করেন’ এবং তারা আর ‘অসরকারি ইওরোপিয় জনগনের সঙ্গে মানসিকভাবে জুড়ে নেই’। কলকাতার ব্যারিস্টার এইচ এ ব্রানসনের অভিযোগ ছিল, ‘আমাদের শাসকেরা জনগণের থেকে এত দূরে থাকেন যে তারা ছুটি কাটাতে ২০০০ মাইল দূরে পাহাড়ে বাস করেন এবং তারা আমাদের মত সাধারণ মানুষের সত্যকারের চাহিদা সম্বন্ধে কিছুই জানেন না।’ কলকাতার ব্যবসায়ী জে জে জে কেসউইথের দাবি অসরকারি সমাজের কথা শুনত হবে, ‘সর্বশক্তিমান জানেন আমাদের ওপরে কী পরিমান কর চাপানো হয়েছে; সরকার আমাদের থেকে চাইতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না …অথচ আমাদের ওপরেই অপ্রয়োজনীয় সব আইন চাপিয়ে দেয়।(প্রাগুক্ত)’
এই সব বাগাড়ম্বর নির্ভর আলঙ্কারিক ভাষা প্রয়গ থেকে বোঝা যাচ্ছিল পাহাড়ে বাস করা ভাইসরয়ের সঙ্গে সমতলে থাকা অসরকারি সমাজ আর আমলাদের মধ্যে বাস্তবিক দূরত্বই শুধু বাড়ছিল না, নাকউঁচু কিছুই না জানা অভিজাতর সঙ্গে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা অভিজ্ঞ ব্যক্তিটির মানসিক দূরত্ব অপরিসীম ছিল। মাটিতে থাকা কেনেডি বললেন এবং তিনি জানেন ভারতে বিমূর্ত নীতির কোনও মূল্য নেই। কভেনান্টেড আমলাটি বই পড়ে শিক্ষিত, ‘এই প্রস্তাবটা উত্থাপিত হয়েছে মুর্খ সংবেদনশীলতা এবং অহংকারের ভিত্তিতে, এই কাজটি করেছেন নিজেদের গুরুত্বপূর্ণভাবা মানুষেরা (প্রাগুক্ত)।’
এই স্বনির্বাচিত ইন্ডিয়া হ্যান্ডসদের বক্তব্য আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কীভাবে জাতিবাদী বৈরিতা, মিথ্যা অভিযোগ এবং প্রাচীন জাতি পার্থক্য নির্ভর করে ভারতীয় বিচারকদের ব্রিটিশদের বিচার করার বিষয়টা আটকাতে চাইছিল। কেসউইথ বললেন, ‘তিন চার বছর ইংলন্ডে কাটালে কি নেটিভ বিচারক প্রকৃতিগভাবে আর চরিত্রগতভাবে ইওরোপিয় হয়ে যাবে, যাতে তারা ইওরোপিয়দের বিচার করতে পারে, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ চাপাতে পারে? ইথিওপিয় প্রজা আর চিতাবাঘ কী তাদের চামড়ার রং বদলাতে পারে? (প্রাগুক্ত)’। ব্রানসন বললেন, ‘স্বাধীনতা উৎসুক ব্যক্তি’কে বিচার করা যায় না, ‘বিশেষ করে যে দেশটির পরম্পরাই হল পরাধীন থাকা’ [তার প্রজার পক্ষে বিচার দেওয়া সম্ভব নয়]; ‘তুমি হঠাতই কোনও হিন্দুকে স্বাধীনতা বিষয়ে শিক্ষিত করতে পার না… ভারতেবর্ষের ইতিহাস দেখ। এটি এমন একটি দেশ যেটি ঐতিহাসিক সময় থেকে একের পর এক দেশের অধীনে থেকেছে (প্রাগুক্ত)’। [ক্রমশ]