Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
দ্বিতীয় অধ্যায়
সাদাত্বই সম্পত্তি — জাতি, আইন এবং সাম্রাজ্যবাদী পরিচয়ের রাজনীতি
উনবিংশ শতকের প্রথম পাদেও ‘ব্রিটিশ প্রজা’ হওয়ার সংজ্ঞা পার্লামেন্ট তৈরি করে নি। শুধু পার্লামেন্টারিয় আইনে বলা হয়েছিল হিন্দু বা মুসলমান ব্রিটিশ প্রজা হতে পারে না (যা নেতিবাচক সংজ্ঞা) [(9 Geo. IV, c. 33. In The Statutes of the United Kingdom of Great Britain and Ireland (London, 1807-1869)] অন্য আরেকটায় বলা হল যুক্ত রাজ্যের বসবাসকারী এবং তাদের উত্তরাধিকারীরা ব্রিটিশ প্রজা হিসেবে গণ্য হবে (ইতিবাচক সংজ্ঞা) [(7 Geo. IV, c. 37. In ibid. A brief legislative history of the East India Company’s power to govern British-born subjects in India is recited in Reg. V. Edward Reay, Bombay High Court Reports (Criminal),vol. VII, pp. 6 – 28)]। ১৮৬১-তে ‘ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজা’দের আইনি সুযোগ সুবিধে দেওয়ার জন্যে ফৌজদারি সংহিতা সংজ্ঞার পরিধি ছোট করা হলেও কারা সে সুবিধে পাওয়ার যোগ্য, সে প্রশ্ন সংহিতাতে পরিষ্কার করা হল না। ১৮৭২এ সংশোধিত সংহিতায় ‘ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজা’র ধারণা কিছুটা পরিষ্কার করা হল (1) মহামহিমা রাণীর – গ্রেট ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ডের ইউনাইটেড কিংডমে জন্মগ্রহণ করা, ইউরোপীয়, আমেরিকান, বা অস্ট্রেলিয়ান উপনিবেশ বা মালিকানাধীন, বা নিউজিল্যান্ডের উপনিবেশে, অথবা কেপ অফ গুড হোপ বা নাটালের কলোনিতে প্রাকৃতিককরণ করা বা বসবাস করা (naturalized, or domiciled) সমস্ত প্রজা (2) এই ধরনের ব্যক্তির বৈধ সম্মতির সন্তান বা নাতি-নাতনি (1) All subjects of Her Majesty, born, naturalized, or domiciled in the United Kingdom of Great Britain and Ireland or in any of the European, American, or Australian Colonies or possessions of Her Majesty, or in the Colony of New Zealand, or in the Colony of the Cape of Good Hope or Natal. (2) The children or grandchildren of any such person by legitimate consent (Act X of 1872, section 71)।
১৮৭২এর সংহিতার যুক্তি ছিল অপরাধের অভিযুক্ত বিদেশী ইউরোপীয় এবং আমেরিকিয়র বিচার করা উচিত তাদের অনুভূতি এবং স্বভাব সম্পর্কে ভালভাবে বুঝতে পারা আদালত, এবং সেই আদালতে কার্যকর বিচার পরিচালনার জন্য যোগ্য বিচারকের ‘European foreigners and Americans accused of offences should be tried by the Courts best acquainted with their feelings and disposition, and therefore more competent to administer effective justice’। কুইন-এম্প্রেস বনাম মস এবং অন্যান্য (১৮৯১) মামলায় এলাহাবাদ হাইকোর্ট বলল, ইওরোপিয় অর্থে ইওরোপে জন্মানো ব্যক্তি ‘the word ‘European’ in s. 451 meant a person born in Europe’ (Indian Law Reports-Allahabad Series, vol. XVI, p. 93 )।
কিন্তু প্রশ্ন হল, যারা ইওরোপিয় ব্রিটিশ নয়, অথচ বিদেশি ইওরোপিয়, আমেরিকিয় বা ভারতীয় তার ভাগ্য কী হবে? লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের মেম্বার হ্যারিসন প্রশ্ন ছিল, ধরা যাক মফস্বলে অভিযুক্ত হল মালয় বা চায়নাম্যান; এদের কোন জাতি বা উত্সের ধরা হবে? এদের ইংরেজ, হিন্দু বা মুসলমান ধরা হবে? ধরা যাক অভিযুক্ত হল আফ্রিকান নিগ্রো; তাকে কোন জাতি বা উত্স ধরা হবে? ‘Supposing an accused person in the Mofussil were a Malay or a Chinaman; what class of persons would be most nearly of the same race or origin? Would it be Englishmen, Hindoos, or Mahomedans? Supposing the accused were an African negro; who would be considered nearly of the same race or origin?’ ভারতের বিপুল বৈচিত্রের বৈভব তুলে ধরে অনেকে বললেন সংহিতা অনুসারে বাঙ্গালির কী বাঙ্গালি-সংখ্যাগরিষ্ঠ জুরি দাবি করতে পারে না? ভারতীয়দের নিজেদের জাতির মধ্যে থেকে জুরি দাবি করা ভাবনা নিয়ে বম্বে হাই কোর্টের বিচারপতি জন বাকনেল স্ট্রেট অঞ্চলের বসতিতে একটি ঘটনার উল্লেখ করেন, ‘জনৈক ডেন প্রজার মোটর বাইসাইকেল ভেঙ্গে জাপানি নাবিক মারা যায়; তাকে শিখ পুলিশ গ্রেফতার করে, মামলা করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নিগ্রো, মামলা চালায় আর্মেনিয় এবং জুরি ছিলেন দুই ব্রিটিশ, তার মধ্যে একজন রুশ ইহুদি আর হাইকোর্টে বিচারক ছিলেন শ্রীলঙ্কার বুরঘার; তাঁকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, কেননা তার অভিযোগ করার কিছুই ছিল না (অর্থাৎ তিনি এই পদ্ধতিতে স্বাভাবিক বিচারই পেয়েছিলেন — অনুবাদ) [(Bombay High Court Justice John Bucknell to William Vincent, August 18, 1921, NAI Racial Distincrions: Main Correspondence, File No. 105 (1922)]।’
এছাড়া আদালতে জাতি চরিত্র উপস্থাপন করার নিয়ে সমস্যা ছিল। জাতিচরিত্র প্রমান করার দায় কে নেবে, সেটা কীভাবে প্রমান করা যাবে? রবার্ট ফ্রেডরিক চার্লস ম্যান্ডেভিল ওরফে রবার্ট ফ্রেজার ওরফে ফারগুসন (১৮২১) জালিয়াতি মামলায় নিজামত আদালত বলল সে যে ব্রিটিশ প্রজা সেটা প্রমান করার দায় প্রতিবাদীর (Nizamut Adalat Reports, 1821, vol. 11, pp. 111-121)। ১৮৬১র প্রথম ফৌজদারি সংহিতা পদ্ধতিতে উল্লিখিত ছিল অভিযোক্তা যে ব্রিটিশ প্রজা, সেটা কমিটিং ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে বলাতে হবে এবং এর জন্যে সে যে বিশেষ পদ্ধতিতে বিচার পাওয়ার অধিকারী সেগুলোও তাকে জানাবে (Dawson Downing v. Emperor, Criminal Law Journal of India, 18 (192I), 986; and Ashley Clarke Hami v. Mrs. Peal, ibid., 21 (1924), 767)। কোনও ব্যক্তির ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রমানের দায় তার নিজের এবং ম্যাজিস্ট্রের ক্ষমতা ছিল তার জাতিপরিচয় স্বীকার বা অস্বীকার করার, কিন্তু এই প্রমান কীভাবে করা যাবে তার কোনও নির্দিষ্ট নির্দেশনামা ছিল না।
আইন যেহেতু খুবই অস্পষ্ট ছিল, তাই গ্রহণযোগ্য প্রমান কী হবে সে সমস্যার সমাধান করা হত আদালতে বিচার চলাকালীন সময়ে। কুইন বনাম টমাস ব্রাই (১৮৬৫) মামলায় কলকাতা হাইকোর্ট টমাস ব্রাইএর ইওরোপিয় প্রজার প্রমান হিসেবে গ্রহন করল — তার ব্যক্তিগত উপস্থিতি, তার পিতামাতার বিবাহ পঞ্জীকরণের শংসাপত্রে প্রমান করা হল সে ব্রিটিশ পিতামাতার সন্তান। বিচারপতি মামলার রায়ে বলেন ‘যে ব্যক্তি এই সুবিধে দাবি করতে চায়, তাকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রমান উপস্থিত করা দরকার। আদালত কোনও প্রমান ছাড়া তার দাবি স্বীকার করবে না (Sutherlatzd’s Weekly Reporter (Criminal), vol. I11 (Calcutta, 1865), p. 64)’। ১৮৬৭-তে মাদ্রাজ হাই কোর্ট রায় দেয় যদি তার জাতীয়তা এবং বৈধ জন্মপত্র থাকে মফঃস্বলের কোর্টে অভিযুক্তের ব্রিটিশ প্রজা হিসেবে দাবি স্বীকৃত হবে (Madras High Coun Reporter, vol. VI (Madras, 1861), p. 7)। ১৯১০-এ অবধ জুডিশিয়াল কমিশনার কোর্টে টমাস ব্রাডশ নিজের ব্রিটিশ প্রজাত্বের প্রমান দিল ‘তার মা, আয়ারল্যান্ডের রবার্ট ফারেলের কন্যা এবং ফারেলের নাতি’ হিসেবে (Thomas Bradshaw v. Emperor, Criminal Law Journal of India, 11 (1914), 723)।
সিদ্ধান্ত
উপনিবেশের আইনের সংহিতাকরণ করার উদ্দেশ্য ছিল আরও উত্তম শাসনযোগ্য সমাজ তৈরি করা। অসরকারি ইওরোপিয় প্রজারা যে সব সমস্যা খাড়া করেছিল, সে সব সমাধান করাও সংহিতাকরণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। মেকলে চেয়েছিলেন অভিন্নতা হবে সংহিতাকরণের অন্যতম চরিত্র — তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন এক ধরণের আইন এবং আদালত তৈরি হবে, যেখানে আইনের বৈচিত্র এবং বিভ্রান্তির শেষ হবে। যদিও মেকলে বলেছিলেন ‘we must place the European under the same power which legislates for the hindoo’ (Macaulay’s speech of July 10, 1833, in Hansard’s, 3rd Series, vol. XIX,527) কিন্তু ফৌজদারি সংহিতাকরণ পদ্ধতি সম আর অভিন্ন আইন এবং বিচার পদ্ধতি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। তার বদলে গৃহীত হল ইওরোপিয় ব্রিটিশ প্রজার জন্যে প্রচুর ছাড় এবং সুযোগসুবিধেওয়ালা জাতিভিত্তিক, অসাম্যমূলক আইনি ব্যবস্থা।
সম এবং অভিন্ন ফৌজদারি আইন এবং বিচার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সফলভাবে ব্যর্থ করল সংখ্যালঘিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গরা। তারা উপনিবেশের প্রজাদের সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে বিচার চায় নি বরং তারা উলম্ব, সাম্রাজ্যবাদী সম্পর্ক তৈরি করতে আগ্রহী ছিল। জাতিবাদ নির্ভর আইনের বিপরীতের মানুষেরা মনে করছিল আইনি সাম্যের প্রতিশ্রুতি ছিল উপনিবেশিক বিচার ব্যবস্থার তৈরির অন্যতম প্রধান দায়, অব্রিটিশরা সাম্রাজ্যের ক্ষমতা এবং সম্মান রক্ষায় সেই ধরণের আইনি ব্যবস্থা তৈরির জন্যে চাপ বাড়াচ্ছিল। লেজিসলেটিভ কাউন্সিল সদস্য টমাস বললেন, ‘বাগিচা মালিক দেশিয় ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে বিচার পেল কী পেলনা সেটা গৌণ বিবেচনা (Whether the planter gets justice or not at the hand of the Native Magistrate is rather a secondary consideration; the mere fact of his having, on some trifling charge, had to appear before and be tried by a Native Magistrate, of the same caste and family, perhaps, as one of his own writers or contractors, will so lower him to their own level in the eyes of his two or three hundred coolies, that he will not be able to command their respect any more) (NAI, Legislative Council Proceedings, 1883and 1884)’।
কোন বিশেষ পরিবেশে, কেন বিশেষ পদ্ধতিতে বিচার চাওয়া হচ্ছে সে যুক্তি সময়ে সময়ে পাল্টেছে। উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে মুক্তভাবে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশারদের সংবিধান সম্মত অধিকারের যুক্তির ভিত্তিতে আইনি প্রভেদ দাবি করা হয়েছে। এর পরের সময়ে বাজারে এল তুলনামূলক-সাম্যর যুক্তি — বলা হল ভারতের মত ঐতিহাসিক কৃষ্টি বিভক্ত সমাজে সাম্যের স্থান নেই। উনবিংশ শতকের শেষ পাদে বলা হল অন্যান্য দেশিয় সমাজের মত ব্রিটিশদের ব্যক্তিগত আইনের যুক্তিতে বিশেষাধিকার পাওয়া অধিকার। আইনি ছাড় পাওয়ার পক্ষে যে সব বাস্তব প্রণোদিত ঘটনাক্রম অনুসরণ করে যুক্তি উঠে এল, তাতে ধারণাগত বিপর্যয়/উৎক্রমণ ঘটল। সাম্য অসাম্য ‘সমতলীকরণে’ পরিণত হল। ‘সবার জন্যে সম আইন’ ‘বাস্তবতায় পরিবর্তিত’ হল। জাতিগত সুযোগসুবিধে সংজ্ঞায়িত হল ‘সুরক্ষাকবচ’রূপে। সম বিচার বিপুল অসাম্য এবং বিচারহীনতায় পরিণত হল [(Evidence of Charles Hardless, General Secretary of the Anglo-Indian and Domiciled European Association, submitted to the Racial Distinctions Committee, NAI Racial 168 Distincnbns: Evidence, File No. 105 (1922)]।
উনবিংশ শতকের শুরুতে ‘কালোদের জন্যে এক ধরণের আইন আর সাদাদের জন্যে অন্য আইন’ তত্ত্বে প্রশাসনিক মহলের সায় ছিল না (Legislative Council Member W. Bird’s Minute of August 26, 1844, NAI, Legislative Proceedings, October-December 1844, No. 4)। টমাস মেকলে এর বিরোধী ছিলেন; তার যুক্তি ছিল ভারতীয়রা বহুকাল স্বৈরাচারী বিচারহীনতার পরিবেশে কাটিয়েছে; বর্তমানে নতুন জাতিবাদিতা ভিত্তি করে দেশিয় জনগণের ওপর অত্যাচার নামিয়ে আনার প্রয়োজন তিনি দেখছেন না। সময়ের প্রক্ষিতে প্রশাসনিক আমলা এবং অসরকারি ইওরোপিয়দের মধ্যে সম্পর্ক মধুর হতে শুরু করে এবং আমলারা তাদের নৈতিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার চ্যুত হয়। বিপুল প্রতিবাদ এবং বিতর্কের আবহাওয়ায় তারা দাবি করল সম আইনের সময় আসে নি। কিন্তু উপনিবেশের পরিবেশে কখোনো কী এই পরিবেশ আসবে? আদৌ কী আসবে? [ক্রমশ]