Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
তৃতীয় অধ্যায় : ভারতীয় সাক্ষ্য/প্রমান আইন
নিজামত আদালতে চিকিৎসা বিষয়ক প্রমান
১৮৪০এর দশকের আগে ঠগিদের কাজকর্ম বিষয়ে আলোচনা, পেশাদার বিষ প্রয়োগকারীদের নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হওয়ার আগে বিষ প্রয়োগ সংক্রান্ত মামলা উপনবেশিক প্রশাসনে খুব একটা পাত্তা পায় নি (R. Singha, “Providential Circumstances : The Thuggee Campaign of the 1830s and Legal Innovation,” Modern Asian Studies, 27, 1 (1993), 83-146)। যদিও বিষ প্রয়োগের মামলায় মেডিকো-লিগাল প্রমানগুলি বিচারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরের সময়ে উঠে আসবে, উনবিংশ শতকের প্রথম অর্ধে, বিষ প্রয়োগের অভিযোগে খুব বেশি মামলা আদালতে আসতই না প্রায়। বিষ প্রয়োগ সংক্রান্ত মামলায় জুড়ে থাকা ব্রিটিশ আমলারা ভিক্টোরিয় ইংলন্ডের এই ধরণের ‘গোপন পাপ/অপকর্ম/অপরাধ’ মামলাগুলি মুগ্ধ এবং আতঙ্কিত চিত্তে নজরদারি করতেন [(I Burney, Bodies of Evidence: Medicine and the Politics of the English Inquest, 1826-1930 (Baltimore: Johns Hopkins University Press, 2000); and I. Burney, Poison, Detection and the Victorian Imagination (Manchester : Manchester University Press, 2007) (Official concern with poisoning in India coincided with the growing fascination with and fear of this “secret crime” in Victorian England)]।
উপনিবেশের শুরুর সময়ে বিষ প্রয়োগ সংক্রান্ত মামলায় মেডিকো-লিগাল প্রমানের গুরুত্ব বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে স্বীকৃত হয়েছে। মোটামুটি বলা যায়, চিকিৎসা বিষয়ক প্রমানের গুরুত্বের সঙ্গে একই গুরুত্বে অপেশাদারদের সাক্ষ্য প্রমান নেওয়া হয়েছে এবং পেশাদারদের সাক্ষ্য মামলা চলাকালীন এবং মামলার অনুমানযোগ্য গতিপথ নির্ধারণে খুব বেশি প্রভাব ফেলে নি। কোনও কোনও ঘটনায় এর মাধ্যমে অপরাধ প্রতিষ্ঠা করা অথবা অভিযুক্তের নির্দোষিতা প্রমান করা গেলেও, অধিকাংশ জায়গায় এই বিষয়টি পাত্তা না দেওয়া হয় নি। Vakeel of Government against Mussummaut Hooleea and Bhidea (1815) মামলায় মাসুম্মত হুলিয়া, স্বামীকে বিষ প্রয়োগ করার কথা কবুল করলেও, চিকিৎসা প্রমান নির্ভর করে আদালত তাকে বেকসুর খালাস দেয়। চিকিৎসক দল হুলিয়ার কাপড়ে ‘সন্দেহজনক হলুদ দাগ’ দেখতে পান এবং সেটি বিষ নয়, গন্ধক প্রমান হওয়ায় মৃতদেহটি নিয়ে কোনও কাটাছেঁড়া বা গভীর তদন্ত হয় না, হুলিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়(Nizamur Adalat Reports, vol. I , pp. 307-308)। ঠিক উল্টো ক্ষেত্রে Vakeel of Government against Mussummaut Sookhoo (1810) মামলায় চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রমান পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা হয়। মাসুমত হুলিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সে প্রেমিকের বাবাকে ধুতরার বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেছে। মামলা চলাকালীন একজন দেশিয় চিকিৎসক, সৈয়দ সুলামত আলি ধুতরার বিষের মাত্রা নিয়ে তদন্ত করে বলেন এই বিষ মৃত্যুর কারন প্রমানের জন্যে যথেষ্ট নয় বা এটা মূল প্রমান হতে পারে না। আইন দপ্তরের আমলারা আলির সাক্ষ্য প্রমানকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে ব্রিটিশ সিভিল সার্জেনের সাক্ষ্যে ধুতরাকে যথেষ্ট পরিমান বিষক্রিয়া করাবার যোগ্য ফল হিসেবে ধরে হুলিয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় (Ibid., pp. 2 16-2 18)।
ধর্ষণের মামলায় চিকিৎসা বিষয়ক প্রমানের খুব বড় ভূমিকা ছিল না, বিশেষ করে উপনিবেশের প্রথম পর্বে। ১৮৫০-এর দশকে শারীরিক তথ্য প্রমান বিচারের গতিপথ নির্ধারণের বড় ভূমিকা পালন করেছে, এবং চিকিৎসক তদন্তকালে শারীরিক প্রমান না পেলে ধর্ষণকারী বেকসুর ছাড়া পেয়ে যেত, ভিক্টিমের কোনও বয়ানই শোনা হত না। Government v. Azeez-Rahaman (1851) মামলায় অভিযুক্ত আজিজু রহমানের বাড়িতে রাতে এক পরিবারের তিনজন খেতে আসেন। সন্ধ্যেয় আমন্ত্রিত পরিবারের মা দেখেন ভেতরের বারান্দার বিছানায় পড়ে তার এক মেয়ে কাঁদছে। বাড়ি ফিরে গেলে বালিকাটি দাবি করে, আজিজু তাকে ধর্ষণ করেছে। বাচ্চাটির দেহে রক্তের দাগ দেখে তার মা স্থানীয় থানায় অভিযোগ জানায়। পরের দিন সাব-এসিস্ট্যান্ট সার্জন মেয়েটিকে পরীক্ষা করে সাক্ষ্য দেয় যে মেয়েটির ওপর খুব ‘সাম্প্রতিককালে বলাৎকার করা হয়েছে’। বিচারপতি এই চিকিৎসকের সাক্ষ্যকে ‘অত্যধিক গুরুত্ব’ দিয়ে অভিযুক্তকে শাস্তি দিলেন (Nizamur Adalar Reports, vol. I)।
ঠিক এর উল্টো উদাহরণটি হল Phelanee Bewah v. Fuqueerah Nusha (1852) মামলা। ৭ বছরের এক শিশু অভিযোগ করে, প্রতিবেশী তাকে ধর্ষণ করেছে। এগারো দিন পরে এক চিকিৎসক আমলা তার দেহ পরীক্ষা করে কোনও আক্রমনের চিহ্ন বা সতীচ্ছেদ্য ছিঁড়ে যাওয়া বা কোনও রস নির্গত হওয়ার প্রমান পায় না। আদালত কোনও রকম সদর্থক চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রমান না পাওয়ায় অভিযুক্তকে ছেড়ে দেয় (Nizamur Adalar Repom, vol. XI)। একই বছরে Government v. Azim Kaneegur, Moniroodin Sheikh, and Doogoo Sheikh (1852) মামলায় চৌদ্দ বছরের এক কন্যার অভিযোগ তিন আসামী তাকে গণধর্ষণ করেছে; এই অভিযোগের সূত্র যেহেতু মেয়েটির সাক্ষ্য এবং অন্য কোনও প্রমান না থাকা, বিচারপতি এই প্রত্যক্ষ্য প্রমান ছাড়া অভিযোগ বাতিল করে দিয়ে তিনজনকে মুক্তি দিলেন (Nizamut Adalat Reports, vol.XI)।
ধর্ষণের মামলায় চিকিৎসাগত প্রমানের গুরুত্ব বাড়তে থাকার একটা বড় কারন হল ব্রিটিশ আইনি পরম্পরা অনুযায়ী ধর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত মহিলাটির অভিযোগ বিশ্বাস না করা এবং সেই পরম্পরা মেনে উপনিবেশের আমলাদের উপনিবেশিত সমাজের মহিলাদের সাক্ষ্যর ওপর গুরুত্ব আরোপ না করা। কিন্তু ‘দুষ্কর্মের শারীরিক সাক্ষ্য’র ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া সত্ত্বেও, বলাৎকারের শিকার ভারতীয় মেয়েদের ডাক্তারি পরীক্ষার সামনে দাঁড়ানো বা মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা আর ইচ্ছের যে কাঠামোগত এবং কৃষ্টিগত দুস্তর বাধা, তাকে আদালত কখোনোই স্বীকৃতি দেয় নি। আমি অন্য জায়গায় উল্লেখ করে বলেছি এর ফলে সামগ্রিকভাবে উনবিংশ শতাব্দ জুড়ে অপরাধীর দোষী সব্যস্ত হওয়ার হার ক্রমশ কমেছে(Kolsky, The Body Evidencing the Crime)।
নিজামত আদালতের মহাফেজখানা সূত্রে যে তথ্য পাচ্ছি তাতে দেখা যাচ্ছে, খুনের অভিযোগে সব থেকে বেশি মামলা হয়েছে। অত্যন্ত প্রয়োজনের সময়েও খুনের মামলায় চিকিতসাগত প্রমান মামলার গতিপথ নির্ধারণে অনিশ্চিত ভূমিকা পালন করেছে। কোনও কোনও সময়ে প্রধান অপরাধীর অপরাধবোধ বা নির্দোষিতা ঘিরে মামলা আবর্তিত হত। কোনও কোনও সময় চিকিৎসাগত প্রমানকে গুরুত্ব না দিয়ে শাস্তি শোনানো হত। লাশপরীক্ষা, ক্ষত পরীক্ষা, হিংসা জমিত প্রকাশ্য ক্ষতের পেশাদারি এবং অপেশাদারি উভয় প্রমানই গৃহীত হত।
ইসলামি প্রামানিক নিয়মের অধীনে সাধারণভাবে মৃত, হত্যার হাতিয়ার এবং হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রমান করতে হত। নিজামত হত্যা মামলাগুলোয় চিকিৎসাজনিত প্রমানগুলি আসত মূলত জবানবন্দী, প্রত্যক্ষ্য সাক্ষ্য, এবং বিচার সংক্রান্ত তদন্ত সমীক্ষা আকারে। নিজামত আদালতে খুন সংক্রান্ত বিচার বিষয়ক তদন্ত সমীক্ষা তৈরি করার কাজ শুরু হয় ১৭৯৮ থেকে, কিন্তু মৃতদেহর ওপর কতগুলো তদন্ত সমীক্ষা চালানো হয়েছিল, সেই সংখ্যাটা উনবিংশ শতকের প্রথম পাদে খুব একটা প্রতীয়মান হয় না, নিজামত আদালতে সে বিষয়ে খুবই কম তথ্য আছে। এই সময়ে বিচার সংক্রান্ত তদন্ত সমীক্ষা সাক্ষ্য আকারে যতগুলো আদালতে গৃহীত হয়েছিল, সেগুলি পাঠ সূত্রে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়, এই তদন্তটি ব্যবহৃত হয়েছে আঘাত এবং তার সঙ্গে জুড়ে থাকা মৃত্যুর কারন খোঁজার বদলে প্রাথমিকভাবে শুধুই শরীরে প্রাথমিক হিংসার চিহ্নগুলি নির্দিষ্ট করতে। Vakeel of Government against Sonaram (1805) মামলায় বন্দীর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ ছিল ছোট কুড়ুলের বাঁটের আঘাতে। তদন্তের সমীক্ষায় বলা হল, ‘তার মাথার পিছনে বিশাল কালশিটের দাগ পড়েছে এবং গভীর ক্ষত রয়েছে’ এবং আদালত এই প্রমানকে সাধারণ প্রমান হিসেবে গণ্য করে বন্দীর বিরুদ্ধে বিশেষভাবে মামলা চালানোর অনুমতি দিল না (The inquest report, which stated that “she had received a severe contusion and wound on the back of the head,” was received by the court as an ordinary piece of evidence and was not accorded any special status)(Nizamut Adalar Report, vol. I, pp. 5-6)। [ক্রমশ]