Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
ভূমিকা
দেশিয় জনগণ আর মেট্রোপলিটনের প্রজাদের মধ্যে পার্থক্যকে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত এবং ব্যক্ত করার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও উপনিবেশিক বিশ্ব এই দুটিমাত্র পরিচয়েই সীমাবদ্ধ রইল না। উইলিয়াম অরবি হান্টারের মত মানুষেরা উপনিবেশের তৃতীয় পক্ষ হিসেবে, নতুন পরিচয় নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছিল; নীলকর অরবির মত সাদা চামড়ার অসরকারি মানুষদের পরিচিতি ছিল অদ্ভুত রকমের – তারা য্রমন শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শাসক নয়, তেমনি আবার ভারতীয় শাসিত প্রজাও নয় — এই দুই থাকবন্দীর মাঝে থাকা একদল মানুষ। এদের বেসরকারি/অসরকারি/তৃতীয়পক্ষ ইত্যাদি নামে চিহ্নিত করা হল। এরা সরকারিভাবে রাষ্ট্রের সেবা করে উপনিবেশিক কর্তৃত্ব সরাসরি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কাজে যেমন দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়, কিন্তু একই সঙ্গে সরকারের অংশ না হয়েও জনসমাজে পরোক্ষে প্রবল উপনিবেশিক কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার কাজটাও সুচারুরূপে মন দিয়ে করে চলে। ব্রিটিশ শাসন-ক্ষমতা নির্ভর করে হান্টারের মত নীলকরেরা, বেড়ে চলা উপনিবেশিক অর্থনীতিতে যেমন তাদের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ কায়ম করে, ব্রিটিশ রাষ্ট্রকাঠামোকে বিপুল অর্থনৈতিক লাভের সুযোগ করে দেয়; তেমনি উল্টোদিকেও উপনিবেশিক অর্থনীতিতে আরও শাঁড়াশি-পকড় তৈরি করার জন্যে উপনিবেশিক শাসক কর্তৃপক্ষ এই তৃতীয় পক্ষের ইওরোপিয়দের স্বার্থপূরণে বিস্তৃত উপনিবেশিক বাজার দখলদারির পরিবেশ তৈরি করে, বিশেষ আইনি সুযোগ আইনি সুবিধে দেয়, নিরাপত্তা বিধান করে, এবং তাদের শিল্প আর সেবাগুলিতে বেসরকারিভাবে নিরাপত্তা বিধানের সুযোগ করে দেয়। একইভাবে সাম্রাজ্যের সামাজিক এবং প্রাকৃতিক প্রান্তে অবস্থান করা এই সব ছায়াময় চরিত্র বহু সময় পরোক্ষে উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে আসছিল।
ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের প্রথম সময়ে শাসন স্থায়িত্ব নিয়ে উপনিবেশিক শাসকদের উদ্বেগের যথেষ্ট কারন ছিল। ১৭৬৫তে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সরকারের আইনি নিয়ন্ত্রণ থেকে ক্রমশ বেরিয়ে এসে সার্বভৌমত্ব অর্জনের সময়ে, প্রশাসনিক স্বৈরশাসন এবং সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার-অপব্যহারের প্রক্রিয়াটি লন্ডনের কোম্পানির পরিচালক-কর্তা আর শাসকদের মাথা ব্যথার কারন হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। এই স্বৈরাচারী প্রবণতাটি সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছবে লন্ডনে ওয়ারেন হেস্টিংসের মহাবিচারের মহাকাব্যে রচনার মাধ্যমে (N. B. Dirks, The Scandal of Empire: India and the Creation of Impend Britain (Cambridge, MA: Harvard University Press, 2006))। আমি এই বই-এর ছত্রে ছত্রে বলার চেষ্টা করেছি, ব্রিটিশ শাসনে সরকারি হিংসার বাইরে, বেসরকারিভাবে যে ব্যক্তিগত হিংসা এবং স্বৈরশাসন নামিয়ে আনা হয়েছিল সেটিযেমন চরমতম সত্য, তেমনি সেই হিংসা, উপনিবেশিক হিংসা নির্ভর শাসন কাঠামোর শেকড় ছড়ানোর একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলেও, ব্রিটিশ ভারতবর্ষীয় ইতিহাসচর্চায় এই ধরণের চাপিয়ে দেওয়ার হিংসা আর তার প্রভাব, আজও প্রায় অজানা বিষয় হয়েই থেকেছে। উপনিবেশে ঘটতে থাকা অসরকারি হিংসার ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভারতবর্ষীয় উপনিবেশে ব্রিটিশেরা শুধুই একদেহী শাসকবর্গ ছিল না। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটতে থাকলে, সাম্রাজ্যের প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া অসরকারি ব্রিটিশদের অনৈতিকতা, দুর্ব্যবহার এবং আইনের সামনে নতিস্বীকার না করার অবাধ্যতা শুধু যে উপনিবেশের জনগণকে সন্ত্রস্ত করে রাখত এমন নয়, উপনিবেশিক শাসকও বহু সময়ে উত্যক্ত হয়ে উঠত এই সব অবাধ্য তৃতীয় পক্ষের ওপর শৃংখলা চাপিয়ে দিতে না পারার এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার ব্যর্থতায়। মাথায় রাখতে হবে উপনিবেশিক ভারতবর্ষের ফৌজদারি আইন কাঠামো তৈরি হয়েছিল ভারতবর্ষীয়দের করা অপরাধ এবং দেশিয় অপরাধীর ওপর ওপনিবেশিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে সরকারি নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেই [Radhika Singha, A Despotism of Law Crime and Justice in Early Colonial India (Delhi: Oxford University Press, 1998); and A. Yang (ed.), Crime and Criminality in British India (Tucson: University of Arizona Press, 1985)]। কিন্তু সাম্রাজ্যজুড়ে যে অবাধ্য শ্বেত সন্ত্রাসের চাবুক চলছিল সেটা আরেকটা ‘সাম্রাজ্য কেলেঙ্কারি’ হয়ে দাঁড়ালেও ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসকদের সজ্ঞান উপস্থিতিতে এই তৃতীয় পক্ষীয় প্রবল হিংসার কর্তৃত্ব, উপনিবেশিক কর্তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের সাফল্যে বাধা হয়ে দাঁড়াল না। উইলিয়াম ওরবে হান্টারের অমানবিক অত্যাচারের ঘটনা উপনিবেশিক শাসকদের হতবুদ্ধি করে দিলেও, এই অসরকারি দুর্বিনীত মানুষদের নিয়ন্ত্রণের ছলে উপনিবেশিক শক্তি নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তার করে চলছিল।
দ্য ইংলিশ ইউটিলিটেরিয়ানস ইন ইন্ডিয়ায়, এরিক স্টোকস যুক্তি দিয়ে বলেছেন উপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের আইন সংস্কারের উদ্যমে বেন্থামপন্থীয় তত্ত্বই প্রাধান্য পেতে শুরু করে। কারন উপনিবেশিক শাসকেরা মনে করত, ‘অন্ধকারে ডুবে থাকা মানুষদের ন্যুনতম সভ্যতার স্তরে তুলে আনার কাজের প্রতিনিধি হয়ে ওঠার দায় তাদের কাঁধে ন্যস্ত ছিল [E. Stokes, The English Utilitarians and India (Oxford: Clarendon Press, 1959), p. 302]’। স্টোকস বলছেন, উনবিংশ শতকের ভারতীয় উপনিবেশিক আইন তৈরি হওয়ার বৌদ্ধিক এবং দার্শনিক ভিত্তি ছিল ‘ইউটিলিটারিয় তত্ত্ব’ অনুসরণ (Ibid., p. 234)। রাধিকা সিংহ উপনিবেশের শুরুর সময়ে অপরাধ আর বিচারের ইতিহাস আমাদের সামনে অন্য একটা দৃষ্টিভঙ্গী অবলম্বন করে উপস্থিত করেন। তিনি বলেন উপনিবেশিক ফৌজদারি আইনের বিকাশের ইতিহাসকে উপনিবেশিক রাষ্ট্র বিকাশের ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে পড়া এবং বোঝা দরকার (Singha, A Despotism of Law)। তার যুক্তিটিকে আমি এই গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে আরও একটু এগিয়ে গিয়ে বলতে পারছি, ভারতীয় আইন লেখা হয়েছে কোনও বিমূর্ত ব্রিটিশ রাজনৈতিক তত্ত্ব ভিত্তি করে নয়, অথবা ভারতীয় প্রজাদের আইনের শাসন নির্ভর রাষ্ট্র ব্যবস্থা উপহার দেওয়ার জন্যেও নয়। এই আইন তৈরি হয়েছিল একটু আগে যে উপনিবেশিক বিশৃঙ্খল তৃতীয় শক্তির কথা উল্লেখ করেছি, সেই তৃতীয় ইওরোপিয় শক্তি ভারতে উপনিবেশিক শাসকদের সামনে যে নৈতিক, আইনি এবং রাজনৈতিক উভয়সঙ্কট তৈরি করেছিল, তার সক্রিয় প্রতিক্রিয়ায়।
অসরকারি হিংসা বিচ্ছিন্নস্তরে সরকারিভাবে শাসন দেওয়ার সমস্যা সৃষ্টি করেছিল ঠিকই, কিন্তু উপনিবেশজুড়ে নিরবিচ্ছিন্ন সরব প্রকাশ্য হিংসার উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় উপনিবেশের প্রজাদের ওপর এই ধরণের প্রকাশ্য ব্যক্তি হিংসা চাপানোর উদ্যম সার্বিকভাবে উপনিবেশিক ক্ষমতা বিস্তারের সঙ্গী হয়ে ওঠে। সাম্রাজ্যের প্রতিশ্রুত আইন এবং বিচার দেওয়ার দাবিকে নস্যাৎ করে চলতে থাকা শ্বেত সন্ত্রাস স্পষ্টত নতুন করে মনে করিয়ে দেয় হিংসা নির্ভর উপনিবেশিক কাঠামোয়, আলোচ্য তৃতীয় পক্ষ কীভাবে বিশৃঙ্খলা এবং আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছিল। ভারতের বিভিন্ন বন্দর শহর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ভৌগোলিক এলাকায় উপনিবেশিক নিরাপত্তা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সাদা বিশৃঙ্খল আম জনতা, খুনি, ভবঘুরে, ইম্পোস্টার্স, চোর, ভিক্ষুক, বাগিচা মালিক, দলছুট সেনানী এবং পলাতক অভিযুক্তরা স্থানীয় ভারতবর্ষীয়দের ওপর এমন কী উপনিবেশিক সরকারের ওপরও হিংসা চাপিয়েছে। উপনিবেশিক ক্ষমতা হয় এই হিংসা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি, না হয় ব্যর্থ হয়েছে অথবা হয়ত এমনও হতে পারে, এই ধরণের হিংসা তারা নিয়ন্ত্রণ করতেই চায় নি। ব্রিটিশেরা নৈতিকভাবে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের দাবি জানিয়ে দেশিয় প্রজাদের ওপর উপনিবেশিক কাঠামো চাপিয়ে দিতে নানান মৌলিক শর্ত এবং ছুতো ব্যবহার করেছে গোটা উপনিবেশিক সময় জুড়েই। তাদের সামনে সমস্যা ছিল, এই বেসরকারি তৃতীয় পক্ষের চাপানো হিংসায় সে সব ভালত্বের মুখোশ পরা শ্রেষ্ঠত্বের দাবি নস্যাৎ হয়ে যেত। বহু ব্রিটিশ সিভিলিয়ান বিশ্বাস করত উপনিবেশের প্রজাদের শাসন করা এবং ঠিকঠাকভাবে আইন মোতাবেক বিচার দেওয়া তাদের মৌল কর্তব্য। স্বদেশিয়দের চাপিয়ে দেওয়া হিংসায় তারা বিব্রত হত।
ব্রিটিশ সময়ে দৈহিক হিংসার বেদনাজনক অভিজ্ঞতাকে ফিরে দেখতে চাওয়ার এই গবেষণা সাম্প্রতিক কালে সম্পাদিত বিপুল পরিমানে কৃষ্টি নির্ভর ঐতিহাসিক গবেষণার মূল প্রবণতাগুলি থেকে নিজেকে বিছিন্ন করে নেয়। আমরা আজ জানি, উপনিবেশবাদ শুধু মাত্র রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক কর্তৃত্ব প্রকল্প নয়, উপনিবেশিক শাসন হিংসকভাবে কৃষ্টি ক্ষেত্রে তার উপস্থিতি জানান দিয়েছে [E. Said, Culture and Imperialism (New York: Vintage, 1994); Cohn, Colonialism and Its Forms of Knowledge; and N. B. Dirks, Castes of Mind: Colonialism and the Making of Modem India (Princeton: Princeton University Press, 2001)]। উপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার হিংস্রতা নিয়ে বিপুল কলেবরে লেখালিখি, গবেষণা হয়ছে, সে সম্বন্ধে আজ আমরা অনেক কিছুই জানি, অথচ উপনিবেশিক শক্তির চাপিয়ে দেওয়া দৈহিক হিংসা সম্বন্ধে কিছুই প্রায় জানি না। উপনিবেশ মানেই হিংসা, এই তত্ত্ব নতুন না হলেও, দক্ষিণ এশিয়ায় উপনিবেশ পরিচালনায় যে বিপুল দৈহিক হিংসা নামিয়ে আনা হল, সে বিষয়ে আজও খুব বেশি জানি না আমরা। তাছাড়াও উপনিবেশবিদ্যা আলোচনায় হিংসা নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, উপনিবেশবাদ-বিরোধিতার গবেষণায় হিংসার প্রশ্ন কতটা উঠে এসেছে, সে বিষয়টি নিয়ে আমাদের প্রশ্ন তোলা রইল [উপনিবেশ-বিরোধী হিংসা নিয়ে চমৎকার পাঠ হল F. Fanon, The Wretched of the Eanh (reprint Manchester: Grove, 2005). এ বিষয়ে বিস্তৃত জানতে পড়ুন R. E. Young, Postcolonialism: An Historical Introduction (Oxford: Blackwell, 2001), pp. 293-307]। [ক্রমশ]