Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
তৃতীয় অধ্যায় : ভারতীয় সাক্ষ্য/প্রমান আইন
শ্বেত হিংসা, চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, এবং অসুরক্ষিত (ভালনারেবল) ভারতীয় দেহ
ব্রিটিশ আমলে ভারতীয়দের হত্যার অভিযোগ থেকে নিজেদের বাঁচাতে ‘রোগাক্রান্ত প্লিহা’র বাহানা দিত অপরাধী ব্রিটিশ প্রজারা। আইনি ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্তি পাওয়ার এই বাহানাটা ছিল সে যুগের জনপ্রিয় আদালত-লব্জ। হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ব্রিটিশদের উকিল, আদালতকে বোঝাবার চেষ্টা করত শারীরের মধ্যেকার রোগাক্রান্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বেহাল দশা তাদের মক্কেলের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। এই যুক্তিতে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ইওরোপিয়রা আদালতের কাছে মুক্তির দাবি জানাত। ১৮৮২তে জনৈক ফক্সের বিরুদ্ধে পাঙ্খাওয়ালা হত্যার অভিযোগ ওঠে। অভিযুক্তের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয় পাঙ্খাওয়ালা প্লীহাটি বড় ছিল তাই সাধারণ ধাক্কাতেই সে মারা গিয়েছে। তার যদি স্বাভাবিক প্লীহা হত তা হলে সে মারা যেত না। ফক্সকে এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২০০ টাকা জরিমানা করা হয় (Ibid)। তিন বছর পর জনৈক গ্লোভার ঢাকায় এক কুলিকে হত্যা করে। ইওরোপিয় চিকিৎসক মৃতদেহ পরীক্ষা করে রায় দেয় মাটিতে পড়ার পরে কুলি প্লীহা ফেটে মারা গিয়েছে। বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য দিল, গ্লোভার কুলিকে বেশ কয়েকবার জোরে লাথি মারলে সে একটি লোহার ডাণ্ডার ওপর পড়ে যায় এবং তারপরে মৃত্যু ঘটে। হত্যা অভিযোগ থেকে গ্লোভার ২০০ টাকা জরিমানা দিয়ে মুক্তি পায়। মামলা সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে দেশিয় সংবাদপত্র নববিভাকর মন্তব্য করল, ইওরোপিয় জুরিদের বলে দেওয়া দরকার ছিল, ‘(১) মৃতের প্লীহাটি ব্রিটিশদের বর্ণনার মত দুর্বল ছিল না; (২) প্লীহা এবং ধমনীগুলি ফেটে গিয়েছিল ব্রিটিশারের তীব্র পিটুনির আঘাত লাগায়’ (Navavibhakar, Februay 23, 1885, BL, IOR, L/R/5/11)
১৮৯৩-তে আরেক ব্রিটিশ প্রজা প্রাইভেট জন রিগবির বিরুদ্ধে পাঙ্খাওয়ালাকে হত্যা করার অভিযোগে মামলা করা হল। পাঙ্খাওয়ালাটি হয়ত পাখা টানতে টানতে ঘুমিয়ে পড়েছিল এবং সেই মুহূর্তে রিগবি তার বিছানা থেকে তার ওপর লাফ দিয়ে পড়ে তাকে ‘তীব্র পিটুনি দিতে থাকে’। আদালতে মৃতের দেহ পরীক্ষা সমীক্ষা জমা দেওয়া হল। সেই সমীক্ষায় বলা হল ‘মৃত্যু ঘটেছে প্লীহা ফেটে, এবং প্লিহা এতই দুর্বল ছিল যে মৃদু আঘাতেই এটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তবে দেহের বাইরে আঘাতের চিহ্ন ছিল না’। স্বেচ্ছাপ্রণোদিত আঘাত করার জন্যে রিগবিকে ১০০ টাকা জরিমানা করে, সেই অর্থ মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হল। মৃত্যুর যুক্তিটি ছিল আঘাতকারীর শক্তি প্রাবল্য নয়, বরং মৃতের শরীরে প্রত্যঙ্গের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা (৩.২ ছবিটি দেখুন)(BL IOR, L/PJ/6/360,File 2170)।
প্লীহা নিয়ে ইওরোপিয়দের আত্মপক্ষসমর্থনকে ভাইসরয় কার্জন ‘ভারতীয় ধ্রুপদী যুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করলেন। জনৈক ব্রিটিশ আমলার লাথির আঘাতে কুলির মৃত্যুতে ১০০ টাকা জরিমানার উদাহরণ টেনে ভাইসরয় কার্জন বললেন, ‘মৃতর অবশ্যই একটি বড় প্লীহা অথবা একটি অতিরিক্ত বড় কলিজা থাকতেই হবে; একই সঙ্গে লাথি মারাটাকে ‘পা দিয়ে ঠেলা’ হিসেবে বর্ণনা করা হবে – এই দুটি লব্জ এখন ভারতীয় ধ্রুপদীত্বে পরিণত হয়েছে’ (Curzon to Hamilton, November 5, 1902, BL, IOR, Mss Eur/Fl11/162)। এবারে অন্য অঙ্গে আঘাত পেয়েও বেচারা দুর্বল প্লীহাকে নষ্ট হতে দেখা গেল। ১৯০৩এ জনৈক ব্রিটিশ করবেটকে ভৃত্য হত্যায় চৌদ্দ দিনের জেলের দণ্ড দেওয়া হয়। করবেটের যুক্তি ছিল চাকরের মুখে আঘাত করায় তার প্লীহা ফেটেগেছে (Bengalee, February 27, 1903; Ananda Bazar Parnka, February 27, 1903; Basumati, March 7,1903; Bangavasi, March 7, 1903; Samay, March 13, 1903, BL, IOR, L/R/5/29)।

ছবি ৩.২ ভারতে কাজ করা জনৈক ব্রিটিশ চিকিৎসক ম্যালেরিয়া জনিত একটি শিশুর প্লীহার আকার দেখাচ্ছেন, ১৯২৯ (উনবিংশ শতকের শেষের দিকে ‘রোগাক্রান্ত প্লীহা যুক্তি’ দেখিয়ে ইওরোপিয় প্রজারা ভারতীয়দের হত্যা অভিযোগে একের পর এক মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছে।)
১৯০৩-এর আরেকটি কুখ্যাত মামলায়, কুম্বিরিগ্রাম চা বাগানের সহ-ম্যানেজার জনৈক বাইনের বিরুদ্ধে চা শ্রমিক হত্যার মামলা আনা হয় (NAI, Horne/Public (A)/April 1903/261-271; NAI, Horne/Public (A)/July 1903/51-65; BL, IOR, L/PJ/6/630, File 603; and BL, IOR, L/PJ/6/630, File 609)। আদালতে সওয়াল জবাব চলাকালীন সময়ে জানা যায় স্ত্রী এবং ভাইঝিকে নিয়ে চা বাগান থেকে পালিয়ে থাকা চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক, লালসু ধরা পড়ে। তাদের কুম্বিরিগ্রাম চা বাগানে আনা হলে বাইন, লাইসুকে একটি খুঁটিতে বেঁধে চামড়ার চাবুক দিয়ে পিটতে থাকে যতক্ষণনা সে অজ্ঞান হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণ পরে সে মারা যায়। অনিচ্ছাকৃত হত্যা আর পিটুনিতে মেরে ফেলার অভিযোগ আনা হলে বাইনের বিরুদ্ধে শিলচর সেসন কোর্টে। বাগিচা ম্যানেজারদের সামনে তাকে বিচারের জন্যে আদালতে পেশ করা হয়। লাইসুকে পিটিয়ে মেরেফেলার বহু প্রত্যক্ষ্যদর্শী শ্রমিকের বয়ান নথিকরণ করা সত্ত্বেও, বাইনের সমাজবন্ধু, চিকিৎসক শ্যান্ডলারের মন্তব্য মামলার রায়ে উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রভাব ফেলল। শ্যান্ডলার বলল, পরের সকালে লাইসুর পিঠে, কাঁধে, নিতম্বে, গোড়ালিতে এবং পায়ে যে দাগ পাওয়া গিয়েছে সেগুলি ক্যাডাভ্যাসাদ লিভিডিটির, যদিও লাইসু বাইরে থেকে দেখতে গাঁট্টাগোঁট্টা, সে ভেতর থেকে খুবই ক্ষয়ে যাওয়া মানুষ, এবং তার হৃদয় আর ফুসসুস দুটোই রোগাক্রান্ত। জুরিদের সিদ্ধান্ত হল বাইনকে লাইসুর মৃত্যুর জন্যে দায়ি করা যায় না, কারন সে তার রোগাক্রান্ত দেহ সম্বন্ধে অবগত ছিল না। আদালত বাইনের ওপর হত্যার অভিযোগ তুলে নিয়ে, সাধারণভাবে আঘাত করার দায়ে তাকে ছমাসের কারাদণ্ড দেয়।
বাইনের মামলার সংবাদে কলকাতায় এবং পরে সারা ভারতে বিপুল জনবিক্ষোভ দেখানো হয়। ভারতবর্ষীয় সংবাদপত্রগুলি বাইন মামলার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে থাকে — তারা বলল এটা একটা প্রতীকী মামলা – এই মামলার মতই, এর আগে একের পর এক মামলায় হত্যার অভিযোগে ধৃত ইওরোপিয়দের এই সব ছেঁদো যুক্তি দেখয়ে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বেঙ্গলির বাংলা সংস্করণ লিখল, If the white man has his ‘burden’ so has he his privileges. One of the latter is that when he is found guilty of causing the death of a poor Indian, he is either let off scot-free or is sentenced to simple imprisonment (Bengalee, February 28, 1903, BL, IOR, L/R/5/29)। পিপল এন্ড প্রতিভাষী তিক্ত স্বরে লিখল, The result of cases like that of Mr. Bain must make us abandon hope. The justicepf our Law Courts is not the sort of justice that people look for (People and Prativasi, September 3, 1903, ibid)। সর্বোদয় প্রকাশিকা হত্যাকাণ্ডগুলি থেকে ইওরোপিয়দের ছাড় পাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে খেদে লিখল সাম্প্রতিককালে ভারতীয় কেরানীদের হিসেবের খাতায় ১ টাকার ঘাটতি দেখা দিলেই তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হয় (Sumdaya Prakasika, March 11, 19?!,, BL, IOR, L/R/5/111)।
ভারত সরকার বাইনের শাস্তি বৃদ্ধি করলে, কলকাতার ব্রিটিশ বন্ধুরা ‘বাইন অর্থভাণ্ডার’ তৈরি করে। বাইনের ভাই জে আরথার বাইন, সরকারকে চিঠি লিখে তার দাদার শাস্তিবৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়ে লেখে ‘বাইরে থেকে সুস্থ কিন্তু ভিতর থেকে তীব্রভাবে অসুস্থ’ এক কুলিকে তার দাদা সাধারণভাবে আঘাত করেছেমাত্র (BL, IOR, L/PJ/6/630, File 609)। কলকাতা হাইকোর্ট এই মামলাটি নতুন করে শুরু করতে অস্বীকার করলে লর্ড কার্জনকে দুখ প্রকাশ করে এক চিঠিতে স্বরাষ্ট্র সচিব জানায় It is these things that make me so pessimistic about India’s future. We cannot ultimately hold the country with the assent of the better class of Natives if these miscarriages of justice are to be associated with our rule. Popular we can never be, but if we lose our reputation for justice, the foundation of our prestige is gone (BL, IOR, Mss Eur/F111/162)। [ক্রমশ]