Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
চতুর্থ অধ্যায়
‘বাগান মালিকদের আইন আর কুলিদের আইন এক নয়’ — আসাম চা বাগানগুলোয় আইন এবং হিংস্রতা
এই যুক্তিতে সীমান্তবর্তী এলাকায় অরাজকতা এবং তার জন্যে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি সত্ত্বেও ভারত সরকার বলল বালাধন চা বাগানে অপ্রিয়, বেআইনি এবং নিয়মবহির্ভূত কোনও ঘটনাই ঘটে নি। উল্টোদিকে পুলিশের অত্যাচারে কুলি/শ্রমিকদের স্বীকারোক্তি করতে বাধ্য করানো থেকে প্রমান হয় যে মণিপুরীদের দুর্ণীতিগ্রস্ত চরিত্র। লন্ডনে পাঠানো চূড়ান্ত সমীক্ষার শেষ বাক্যটি ছিল, ‘এই মামলাকে খুবই বিশেষ সমস্যা হিসেবে গণ্য করার কারন নেই’ (Government of India to the Secretary of State, June 5, 1894, ibid)।
বালাধান হত্যাকাণ্ড পরিষ্কারভাবে উপনিবেশিক ফৌজদারি বিচার দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং আসাম চা বাগানে হিংসার রাজনীতি বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সবার সামনে তুলে নিয়ে এল। উপনিবেশিক রাজত্বে ইওরোপিয় প্রজা খুন হচ্ছে, অথচ অভিযুক্তর শাস্তি না হওয়াই চূড়ান্তরকমের অস্বাভাবিক ঘটনা। আসামের চা বাগানগুলোয় শ্রমিক খাটানোর জন্যে নামিয়ে আনা তীব্র অত্যাচার আর হিংসার পরিবেশে একজনও ইওরোপিয়র হত্যাকাণ্ড খুবই বিরল ছিল। ককবার্নের সমাধান না হওয়া হত্যাকাণ্ড থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, এটা শুধুই স্থানীয় সেন্টিমেন্ট বা প্রতিশোধ স্পৃহা ছিল না, বিষয়টি আরও বড় ক্ষেত্র, আসামের চা বাগানে ব্যপ্ত তীব্র হিংসার পরিবেশের দিকে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে বাধ্য করে।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভূ-রাজনীতিতে আসাম ছিল স্রেফ একটা প্রান্তিক এলাকা। আসাম ভূখণ্ডে বিচারের বাণী পৌঁছনোর বিন্দুমাত্র আশা ছিল না (মানচিত্র ৪.১)। যে সাম্রাজ্যবাদী কাঠামো মেট্রোপলিটনিয় কেন্দ্রের সঙ্গে উপনিবেশিক প্রান্তের তীব্র ফারাক তৈরি করে, সেখানে আসামের মত সীমান্ত এলাকা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য চেতনার অতিদূরে অবস্থান করবে এটাই তো স্বাভাবিক। জনৈক লেখকের ভাষায়, আসাম ‘একটি বন্য – প্রায় অজানা — জঙ্গুলে এলাকা বিশেষ (Indian Planters’ Gazette and Sporting News, July7, 1885)’। আমি এই অধ্যায়ে আসামকে বেছে নিয়েছি এই কারনে, আসামের চা বাগানগুলোয় শ্বেতাঙ্গদের হাতে যে পদ্ধতিগত, বিস্তৃত এবং বিতর্কিত হিংস্রতা আর অত্যাচার নেমে এসেছিল, সেই সব ইত্যাচারের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে বুঝতে পারব, কীভাবে হিংসাকে প্রতিপালন করে চলে, সাম্রাজ্য নিজের শক্তি আর দুর্বলতা তৈরি করছিল।

মানচিত্র ৪/১/১৮৭৫-এর চিফ কমিশনারের প্রশাসনের অধীনে আসাম
লাভজনক চা ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য উপনিবেশিক রাষ্ট্রের চা বাগানের নিষ্ঠুর ইওরোপিয় মালিকদের তোয়াজে রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। যদিও ভারতবর্ষে তুলনামূলকভাবে প্রথম শ্রেণীর ব্রিটিশ, যারা দেশকে শাসন করছে বা সরাসরি শাসন ক্ষমতার সঙ্গে আছে, তাদের কর্মকাণ্ডে বিব্রত হত। তাছাড়া উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনকারীদের আন্দোলনের প্রধান নিশানা ছিল চা বাগান মালিকদের অত্যাচার, অনাচার, অতিচার। উনবিংশ শতকের শেষে বাগিচা মালিকদের হাতে থাকা হিংস্রতার চাবুক এবং বেশ কিছু বিখ্যাত মামলায় ইওরোপিয়দের বিপুল নির্মমতাকে রাষ্ট্রের পক্ষে শাস্তি দিতে অপারগ হওয়ার জন্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভারতবর্ষীয় প্রজাদের কাছে অবিচারের প্রতীক হয়ে ওঠে।
উপনিবেশিক আসামে ইওরোপিয় বাগিচা মালিকেরা চা বাগানের শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক বশ্যতা স্বীকার করিয়ে, চুক্তির শর্তগুলি প্রতিপালনের জন্যে নিজেদের হাতে চরম শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তুলে নিয়ে আসামের বিশেষ কয়েকটি এলাকায় বিপুল আধিপত্য বিস্তার করে (Inland ImigraiionAct I of 1882)। উপনিবেশিক চা বাগানের মালিকের দৃষ্টিতে দেখলে আসামের রাজনৈতিক ভিত, কৃষ্টিগত পরিবেশ, আইনের কাঠামো এবং তার প্রয়োগের মাধ্যমে তারা অত্যাচারমূলক কাজের মুক্তিক্ষেত্র খুঁজে নিয়েছিল। প্রশাসনিক আমলারা যদিও মনে করত উপনিবেশিক আইন ছিল স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক, এবং সভ্যতা বিস্তারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম, কিন্তু বাস্তবে চা বাগান সংক্রান্ত আইনটি শ্রমিকের ওপর পুঁজিবাদী নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার প্রধান শক্তি ছিল। এর ফলে বাগিচা মালিকেরা আইনের ঊর্ধ্বে থাকত এবং শ্রমিকেরা আইনের বিন্দুমাত্র সহায়তা পেত না।
উপনিবেশিক আসাম সংক্রান্ত অধিকাংশ ইতিহাসচর্চা চা বাগানগুলোয় ইওরোপিয়দের চাপিয়ে দেওয়া হিংসা এবং অত্যাচারমূলক সে সময়ের চালু অত্যাচারী শ্রম ব্যবস্থাকে মেনে নিয়েই ইতিহাস চর্চা করেছে। কিন্তু এই অধ্যায়ে আমরা সেই রাস্তা মাড়াই নি। এখানে আমরা বালাধান মামলাকে ভিত্তি করে করে বোঝার চেষ্টা করেছি, কীভাবে উপনিবেশিক আসামে বিভিন্ন সামাজিক শক্তি — যেমন বাগিচা মালিক, চা শ্রমিক, সংবাদমাধ্যম, মিশনারি — উপনিবেশিক বিচার দেওয়ার তাত্ত্বিক প্রতিশ্রুতি আর উপনিবেশিক ক্ষমতার সুবিচার প্রয়োগের মধ্যেকার টানাপোড়েন সমাধান করার চেষ্টা করেছে। সফেদ ইন্সাফ বা শ্বেত সুবিচার বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার ব্যর্থতায় আইন নামক বস্তুটি বহু সময়ে শাসক এবং তাদের সঙ্গে জুড়ে থাকা মানুষদের হাতে দমনের হাতিয়ার রূপে, এবং যারা উপনিবেশিক শক্তিকে যন্ত্রণার আকারে অনুভব করছে প্রাত্যহিক জীবনে, তাদের হাতে পালটা প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে উঠে এসেছে। যদিও আইনের শাসনের তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক কাঠামোর মূল চালিকা শক্তি ছিল সাম্রাজ্যিক আধিপত্যের, একই সঙ্গে এটি বাস্তবিকভাবেই রাষ্ট্রের কাছে আলঙ্করিকভাবে বিচার চাওয়ার হাতিয়ারও হয়ে ওঠে। [ক্রমশ]