Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
ভূমিকা
সম্প্রতিকালে হাতেগোণা কয়েকজন ব্রিটিশ উপনিবেশ চর্চার ঐতিহাসিক, সাম্রাজ্যবাদ এবং হিংসার আত্মিক যোগ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই গবেষণাগুলি যেমন প্যাক্স ব্রিটানিকা কথিত সদাশয়, কৃপালু, রক্তপাতহীন সাম্রাজ্য বিস্তারের দাবির অসারতা প্রমান ক’রেছে, তেমনি উপনিবেশিক ভূখণ্ডে হিংসার প্রকোপের প্রকাশকে খোলতাই করে পাঠকের চোখের সামনে হাট করে খুলে ধরেছে [অসামরিক বলপ্রয়োগ, হিংসার প্রকোপ নিয়ে দেখুন C. Elkins, Imperial Reckoning: The Untold Stoy of Britain’s Gulag in Kenya (New York: Henry Holt, 2004); J. McCulloch, Black Peril, White Vinue: Sexual Crime in Southern Rhodesia, 1902-1935 (Bloomington: Indiana University Press, 2000); S. Pierce and A. Rao (eds.), Discipline and the Other Body: Correction, Corporeality, Colonialism (Durham, NC: Duke University Press, 2006); and M. Wiener, An Empire on Trial: Race, Murder, and Justice under British Rule, 1870-1935 (Cambridge: Cambridge University Press, 2009)]। একই সঙ্গে বলা দরকার রক্ষণশীল ঐতিহাসিকেরা ব্রিটিশ উপনিবেশ বিস্তারে হিংসা চাপিয়ে দেওয়ার তথ্য হয় বাতিল করেছেন, না হয় পাশে সরিয়ে রেখে ইতিহাস রচনা করেছেন অম্লান বদনে [K. Windschuttle, The Fabrication of Aboriginal History (Paddington: Macleay Press, 2002)]। আবার কেউ কেউ উপনিবেশে নামিয়ে আনা ব্রিটিশ হিংসার যৌক্তিকতা প্রতিপাদন করেছেন দেশিয় মানুষদের ব্রিটিশ শাসকদের ওপর নামিয়ে আনা অত্যাচারের প্রতিক্রিয়া আলোচনায় [C. Herbert, War of No Pity: The Indian Mutiny and Victonan Trauma (Princeton: Princeton University Press, 2008); and R. Mukhejee, Awadh in Revolt 1857-1858: A Srudy of Popular Resisrance (Delhi: Oxford University Press, 1984)]। বলা দরকার ব্রিটিশ ভারতবর্ষ বিষয়ে আলোচনা করা অধিকাংশ ঐতিহাসিকই উপনিবেশিক সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে হিংসা প্রয়োগের বিষয়টাই পাশে সরিয়ে রেখে গবেষণা শুরু করেন এবং তাঁরা মনেই করেন না ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পরিচালনায় হিংসা বিষয় আলোচনাকে খুব বেশ গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ [ব্যতিক্রমীদের মধ্যে প্রধান J. Bailkin, “The Boot and the Spleen: When Was Murder Possible in British India?,” Comparative Studies of Society and Histoy, 48 (2006), 462493; and D. Ghosh, “Household Crimes and Domestic Order: Keeping the Peace in Colonial 27 Calcutta, c. 1770-1840,” Modem Asian Studies, 38, 3 (2004), 598-624)। সাম্প্রতিককালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যস্তুতি বিষয়ক এক বইতে দেখলাম দৈহিক হিংসার জন্যে মাত্র ৮ পাতা বরাদ্দ করা হয়েছে (E. M. Collingham, Imperial Bodies: The Physical Experience of the Raj, c. 1800-1947 (Cambridge: Cambridge Polity Press, 2001)]।
সাম্রাজ্য এবং হিংসা বিষয়ে সাম্প্রতিককালে প্রকাশ পাওয়া এক প্রবন্ধে জনৈক ঐতিহাসিক ঔপনিবশিক হিংসা বিষয়ে তথ্যের অভাবের কথা গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন [(J. McCulloch, “Empire and Violence, 1900-1930,” in P. Levine (ed.), Gender and Empire (Oxford: Oxford University Press, 2004), pp. 220-239)]। উপনিবেশে ভারতবর্ষীয়দের ওপরে হিংসা চাপানোর ইতিহাসচর্চায় অপ্রতুল তথ্যের যুক্তি যে ব্রিটিশ ভারতবর্ষের পক্ষে বিন্দুমাত্র খাটে না, সেটা শুধু মহাফেজখানাগুলোয় রাখা অত্যাচারের নথিপত্র থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়। ১৮৬০-এ টাইমসের সাংবাদিক উইলিয়াম হাওয়ার্ড রাসেল নাগরিকদের জন্যে লিখে জানিয়ছিলেন ১৮৫৭-র বিদ্রোহে ব্রিটিশেরা কী ধরণের ব্যপক, অবর্ণনীয় হিংসা নামিয়ে এনেছিল বিদ্রোহী ভারতবর্ষীয়দের ওপরে। রাসেল পাঠকদের লিখছেন, ‘আমাদের উপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি যে সেনাবাহিনীর শক্তি, এই তথ্যে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিমত নেই; আমি শুধু দেখছি আমরা সে সব প্রজাকে শাসন করি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা হচ্ছে শুধুমাত্রই সেনাবাহিনীর বল প্রয়োগ করে (W. H. Russell, My Indian Mutiny Diary [reprint of My Diary in India, in the Year 1858-59, 18601(London: Cassell, 1957), p. 29)]। পরের দিকের দশকগুলোয় বিভিন্ন উপনিবেশিক সরাইখানার দেওয়ালে অম্লানমুখ সাদা চামড়ার ভোক্তাদের উদ্দেশ্যে একটি আশ্চর্য বিজ্ঞাপন লেখা থাকত, ‘চাকরদের গায়ে হাত তোলা থেকে বিরত থাকতে ভদ্রলোকেদের প্রতি অনুরোধ করা হচ্ছে [M. Edwardes, Bound to Exile: The Victorians in India (London: Sidgwick and Jackson, 1969)]। উনবিংশ শতকের শেষের দিকে ভারতবর্ষ জোড়া দৈনিক সংবাদপত্রগুলো ভারতবর্ষীয়দের ওপর ব্রিটিশদের অত্যাচার আর দোষী ইওরোপিয়দের কলঙ্কজনকভাবে বেকসুর খালাস পাওয়ার খবর নিয়ম করে তাদের খবরকাগজের পাতায় ফলাও করে ছেপেছে। ১৮৯২-এর জুলাই মাসে বৃত্তান্ত চিন্তামণির সম্পাদক উপনিবেশ সূত্রে উপহার পাওয়া ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থা বিষয়ে লিখছেন, ‘অতীতে ব্রাহ্মণেরা যেমন দেশিয়দের ওপর অত্যাচার করত, ঠিক সেইভাবে ব্রিটিশেরা আজ ভারতবর্ষীয় প্রজাদের ওপর অত্যাচার নামিয়ে আনে। ব্রিটিশেরা যদি কোনও দুষ্কর্মও করে থাকে, তাহলে তাদের সেই কাজ শুধু ফৌজদারি মামলা তো দূরস্থান, বিন্দুমাত্রও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। অথচ অপরাধটি যদি অন্য পক্ষ করে তাহলে তাকে গুরুতর অপরাধী হিসেবে সোপার্দ করা হয় (Vrittanta Chintamony, July 15, 189 1, BL, IOR, LR/5/106)’।
ভারতবর্ষীয় সমাজে সাম্রাজ্যের প্রভাব বিষয়ে চলতি বৌদ্ধিক বিতর্কে এই বইটি অংশ নিয়ে, উপনিবেশিক সরকারের ভিত্তি প্রস্তর সুদৃঢ় হওয়ার প্রক্রিয়াগুলি বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করবে। বইটি রচনা করতে বিভিন্ন ঔপনিবশিক এবং উপনিবেশউত্তর তাত্ত্বিকের নানান কাজ থেকে দৃষ্টিভঙ্গী এবং বিতর্কের বিষয় আহরণ করলেও মাথায় রাখতে হবে এই বইএর মূল উপজীব্য কিন্তু শুধুই বিতর্ক তুলে ধরা নয়; অথবা ব্রিটিশরা কীভাবে ভারতীয় সাম্রাজ্যকে দেখতে চেয়েছে অথবা ভারতবর্ষীয়রা কীভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে দেখত চেয়েছে সেই বিতর্কও এই বইতে উল্লেখ করা হয় নি। বরং আমি দেখাতে চেয়েছি কীভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্থানিক অঞ্চলে বাস করা ব্যক্তি ইওরোপিয়রা দৈনন্দিন জীবনে ভারতবর্ষীয়দের ওপর অমানবিক অমেয় হিংসা চাপিয়ে এসেছে। বইতে আমি আরও বিশদে বলেছি উইলিয়াম ওরবে হান্টারের মত শ্বেতাঙ্গ মানুষদের ভারতীয়দের ওপরে নামিয়ে আনা তীব্র অত্যাচারের প্রাবল্যকে কোনওভাবেই উপনিবেশিক আইন ব্যবস্থা এবং উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা থেকে বিন্দুমাত্রও বিচ্ছিন্ন করা যায় না, কেননা উভয় ব্যবস্থাই তাদের মত ব্যক্তি ইওরোপিয়র এই হিংসক প্রবৃত্তিকে চাগাড় দিয়ে বাস্তবে রূপায়িত করতে সাহায্য করেছিল। হান্টারের মত মানুষ, আদর্শ উপনিবেশিক ইংরেজ ভদ্রলোক হিসেবে চিহ্নিত না হলেও, সে তার সেই আপাত বৈসাদৃশ্য এবং হিংসক নির্মমতাকে সঙ্গে করে সাম্রাজ্যের ক্ষমতা বিস্তারের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
জাতিবাদী ফৌজদারি মামলাগুলোয় আইন এবং আদালতের পক্ষে ইওরোপিয় অভিযুক্তদের শাস্তি দিতে না পারার ব্যর্থতা, ব্রিটিশ রাজত্বের সুষ্ঠু এবং নির্দিষ্ট আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং উপনিবেশিক প্রশাসনিক সুবিচারের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিটি বারংবার তার স্বরূপ উন্মোচন করেছে (উপনিবেশিক অস্ট্রেলিয়ায় জাতিবাদ এবং আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতা বিষয়ে জানতে দেখুন J. Evans, “Colonialism and the Rule of Law: The Case of South Australia,” in B. Godfrey and G. Dunstall (eds.), Crime and Empire 184&1940: Criminal Justice in Local and Global Context (Portland, OR: Willan Publishing, 2005), pp. 57-75)। উনবিংশ শতকের শেষের দিকে ভারতীয় সাংবাদিক এবং জাতীয়তাবাদী নেতাদের উচ্চকিত দাবি, পুস্তক প্রকাশ এবং রাস্তায় নেমে আন্দোলন শুধু এই অমানবিক শ্বেত হিংসার দিকে আমাদের চোখ ফেরাতে বাধ্য করে তাই নয়, একই সঙ্গে ফৌজদারি আদালতে কীভাবে এই মামলাগুলি বিচার হচ্ছে সেই বিষয়টাও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থায় এবং আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহনের সময় জাতিবাদ একটা বড়, আবশ্যিক এবং বিপুল প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছে। ভারতীয়দের হত্যাকাণ্ডের ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্রিটিশদের প্রতি আইন এবং বিচার ব্যবস্থা অনেক কম অপরাধের বোঝা চাপিয়েছে যার ফলে আদালত অধিকাংশ অভিযুক্তকে হয় কম সাজা দিয়েছে, না হয় কোনও সাজা ছাড়াই তাদের বেকসুর মুক্তি দিয়ে নতুন করে হিংসা চাপিয়ে দেওয়ার জন্যে পরোক্ষে উৎসাহিত করেছে। ঐতিহাসিক ডেভিড ক্যান্নাডাইনের প্রায়-বৈপ্লবিক দাবি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠায় জাতিবাদের ভূমিকা থেকে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন থাকবন্দীত্ব এবং বিভিন্ন স্তরের আমলাদের সামাজিক রাজনৈটিওক কাজকর্ম। তিনি মনে করতেন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ পুলিশ বিচারক আইনজীবী দেশিয় অভিজাত শ্রেণী নিয়মিত থাকবন্দীতে মিলে মিশে উপনিবেশিক কর্তৃত্বের জাতিবাদী ভিত্তিকে প্রশমিত করার চেষ্টা করেছে [D. Cannadine, Ornamentalism: How the British Sam Their Empire (Oxford: Oxford University Press, 2002)]। [ক্রমশ]