Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
চতুর্থ অধ্যায়
আইন, শ্রম, এবং অসমের ‘দ্বার-উন্মোচন’
উপনিবেশিক অসমে বন্ধুয়া শ্রমিকদের দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থাকে উপনিবেশপূর্ব সামাজিক এবং অর্থনৈতিক নিপীড়নের প্রেক্ষিতে দেখা জরুরি [(অসমে শ্রমিক অভিবাসনের পুশ-পুল ফ্যাক্টর বিষয়ে জানতে দেখুন J. C. Jha, Aspects of Indentured Inland Emigration to North-East India, 1859-1 918 (New Delhi : Indus Publishing 1996)]। উপনিবেশিক সময়ের প্রশাসন শাস্তিযোগ্য চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক ব্যবস্থার পক্ষে বলতে গিয়ে উপনিবেশিক লেখকেরা উপনিবেশপূর্ব সময়ে শ্রমিকদের ওপর জমিদারদের অত্যাচারের কথা নিয়মিত তুলেগিয়েছে এবং কম্বু কণ্ঠে বলার চেষ্টা করেছে ভারতবর্ষের বাগিচা শ্রমিকদের অবস্থা ইওরোপ-পূর্ব সময়ের জমিদারিতে খুব একটা ভাল ছিল না। একটা কথা সত্যি যে বেশ কিছু ভারতবর্ষীয় মধ্যসত্ত্বভোগী যেমন ব্যবস্থাপক, আড়কাঠি, রেলের নিম্নশ্রেণীর কর্মচারী এবং ‘কুলি-ক্যাচার’রা বাগান মালিকদের স্বার্থপূরণে শ্রমিক জোগাড় আর তাদের শৃংখলাবদ্ধ করার কাজ করত। উপনিবেশপূর্ব এবং উপনিবেশিক সময়ে শ্রম নীতির মিল অমিলের কাজ ইন্টারেস্টিং উদ্যম হতে পারে; কিন্তু এই বইতে আমরা শুধুই নতুন আইনি ব্যবস্থার প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করব। মাথায় রাখতে হবে, নতুন আইন বিমূর্ত সাম্য এবং অভিন্ন ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি প্রত্যেক পদক্ষেপে উল্লঙ্ঘন করেছে।
সমসাময়িক সমালোচকেরা চুক্তিবদ্ধ ব্যবস্থা এবং জরিমানামূলক দাসত্ব চুক্তি আর আমেরিকার দক্ষিণ অঞ্চলের বাগানগুলোয় দাসদের জীবনধারণের পরিবেশ এবং সেই অঞ্চলের দাস মালিকদের দাস ধরে রাখার শর্তগুলোর তাৎপর্যপূর্ণ তুলনা টেনে আলোচনা চালিয়েছিল। গাঙ্গুলি দেখেছিলেন ‘বিভিন্ন চা বাগানে শ্রমিকদের অবস্থা আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের বাগানগুলোর দাসেদের তুলনায় খুব একটা ভাল নয়, বরং দাস মুক্তির আগে নিগ্রো দাসেদের যে করুন অবস্থা ছিল তার থেকে খারাপ অবস্থায় ছিল চা বাগানের শ্রমিকেরা (Ganguli, Slavely, p. 1. 30)’। কৃষ্টদাস পাল ১৮৮২-র আইনের নিন্দা করে বলেন, যেভাবে নির্বিচারে, পালিয়ে যাওয়া শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সমন জারি না করে এবং পুলিশ সাহায্য ছাড়াই গ্রেফতার করার কর্তৃত্ব বাগান মালিকদের দেওয়া হয়েছে সেটা আদতে ‘ছদ্ম দাস আইন’এ পরিণত হয়েছে (Pal, Memories, p. 446)। বাগান মালিকদের বাগানের সংজ্ঞা এবং বাগান রক্ষার জন্যে আরও ‘স্বাধীনতা’র দাবি বিষয়ে ডিব্রুগড়ের দীর্ঘকালের সমাজ আন্দোলনের কর্মী রেভারেন্ড চার্লস ডাউনিং বলেন ‘স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করা’ খুবই মহান কাজ – এই প্রসঙ্গে আমার আমেরিকার একটি কনফেডারেট রাজ্যের কথা মনে পড়ছে যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিল দাসেদের বন্দী করে এবং ‘তাদের নিগারদের চাবুক মারার’ সুবিধার জন্যে (Dowding, “Assam Coolie Recruiting,” in Buckingham, Tea-Garden Coolies in Assam)।
ডাউনিং কুলি-ধরার খুবই সাধারণ পদ্ধতি — যেমন স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে পালিয়ে যাওয়া কুলিকে ধরে দিলে পুরস্কার দেওয়ার বর্ণনার সঙ্গে আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে পালিয়ে যাওয়া কুলিদের অবস্থা সরাসরি তুলনা করেছেন (BL, IOR, L/PJ/6/832, File 3639)। ভারতীয় আন্দোলনকারীরাও আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের দাস মালিকদের সঙ্গে চা বাগানের কর্মকাণ্ডকে নিন্দা করতে দুই ব্যবস্থার তুলনা টানত। সে সময় আঙ্কল টমস কেবিন ছিল শিক্ষিত বাঙ্গালির অন্যতম প্রিয় পাঠ্য এবং এটির বাংলা করেন বাবু চণ্ডী চরণ সেন। বিপিন চন্দ্র পাল লিখছেন, We had read of the inhumanities of the American planters perpetrated on the helpless’ Negro slaves…We readily compared the condition of tea garden labourers in Assam to that of Negro labour in America before the Emancipation (Pal, Memories, p. 446)।
উল্টোদিকে বাগিচা মালিকেরাও জাতি এবং দাসত্ব নিয়ে পাল্টা উত্তর দিত কিন্তু সে আলোচনা তারা সমালোচনার দৃষ্টিতে চালাত না। কলকাতার ব্যারিস্টার রিচার্ডের কন্যা ভেরোনিকা ওয়েস্টম্যাকটের জন্ম ভারতে কিন্তু শিক্ষা গ্রহণ করেন ইংলন্ডে। তিনি এক বাগান মালিকের স্ত্রীরূপে আবার ভারতে আসেন এবং ১৯৪৫ অবদি ভারতে থাকেন। তার পরে ম্যালেরিয়ার দাপটে ভারত ছাড়েন। স্মৃতিকথা উই অয়ার সারভাইভার বইতে তিনি ‘১৮৩০ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত — ব্রিটিশ রাজের সময়ের বাস্তবতাগুলি নিয়ে বিশদে লিখেছেন’। তার স্মৃতিকথা কথায় আর ছবিতে রয়েছে কলকাতায় ইওরোপিয়দের গৃহস্তি, বাংলার নদীপথের ছবি এবং মাটির বহু ওপর থেকে তোলা চা বাগানের ছবি, যার মধ্যে একটি ছিল ‘নিগ্রো পলাতকের খোঁজে’ (BL, IOR, Mss Eur C394)।


শ্রমিক জোগাড়ের প্রক্রিয়া দেখাশোনায়, কাজ করিয়ে নেওয়ার পদ্ধতির নজরদারিতে এবং চাবাগানের সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ে জানতে বুঝতে অসম সরকার প্রচুর প্রশাসনিক শক্তি আর সময় ব্যয় করেছে। বার্ষিক Reports on Labour Immigration into Assam সমীক্ষা সূত্রে আমরা শ্রমিকদের জোগাড় করা, তাদের জীবনযাপনের অবস্থা, এবং একই সঙ্গে অভিবাসন এবং বেআইনি সংগ্রহ/নিয়োগ, শ্রম শক্তির বয়স এবং লিঙ্গ বিন্যাস, চুক্তি আর মজুরি, পালিয়ে যাওয়া এবং অন্যান্য ফৌজদারি অপরাধ, জন্ম এবং মৃত্যুর হার, স্বাস্থ্য, রোগ, এবং পয়ঃপ্রণালীর অবস্থা, শ্রমিক আর কর্মচারদের মধ্যে সম্পর্ক এবং সাধারণভাবে কাজের ব্যবস্থা নিয়ে বিশদ বিবরণ পাই। এই সমীক্ষাগুলি শুধুই চা বাগানের জীবন এবং বেঁচে থাকা সম্বন্ধে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিষয়ে আমাদের অবগত করায় তাই নয়, এগুলি একই সঙ্গে আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে চা বাগানে ভয়াবহ এবং নির্দয় ব্যবস্থাটি সরকারের জ্ঞাতসারেই কর্মক্ষম ছিল বহু দশক ধরে (৪.২a এবং ৪.২b ছবি দেখুন)। [ক্রমশ]