ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
চতুর্থ অধ্যায়
বাগান মালিকদের হিংসা এবং ‘অবিচারের বাজার’
অসমের চিফ কমিশনার হেনরি কটনকে ঘিরে তুমূল বিতর্ক ধূমায়িত হয়ে ওঠা থেকে পরিষ্কার, উপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং বাগান মালিক গোষ্ঠীর মধ্যে জটিল এবং চলমান সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। দু’পক্ষের অস্পষ্ট এবং টানাপোড় নির্ভর চরিত্রের সম্পর্কটি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন সে সময়ের সেক্রেটারি অব স্টেট। তিনি ‘জঘন্য শ্বেতকায়’দের সম্বন্ধে লিখলেন — They have their merits, and in emergencies many of them could be relied on, but their intelligence is narrow, their standard low, and their prejudices invincible। তার ভাবনায় বাগান মালিকেরা রাজনৈতিক ক্ষমতায় বিশ্বাস রাখা উচিৎ ছিল, কিন্তু রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের সীমান্তে বাস করে তাদের অনিয়ন্ত্রিত স্বভাবের জন্যে প্রায় ‘আমাদের ভারত শাসন উচ্ছেদ হয়ে যেতে বসেছিল (Letter No.68, September 30, 1903, Curzon’s private papers, BL, IOR, Mss Eur/F111/162 (1903)’।
বাগান মালিকদের হিংসাত্মক কাণ্ডের বিরুদ্ধে কটনের মত বহু ইওরোপিয় উপনিবেশিক ভারত সরকারকে আর্জি জানাচ্ছিল, ব্রিটেনের যদি ভারতে সাম্রাজ্য বজায় রাখতে হয়, তাহলে সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে হুঁশিয়ারি হয়ে ওঠা বাগান মালিকদের নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন জরুরি
The tea industry and tea planters as a body have become so intolerant of Government control and interference that they regard a derogatory word as an insult and the official who utters it as an enemy…it will become a very serious element in the political situation if the non-official European community should from one cause or another find reason for encouraging itself to believe that officials who are confronted with facts damaging to an industry in which European interests are involved, may be induced to keep silence for fear of being overwhelmed by a storm of invective (Cotton’s Minute of October 8, 1901, BL, IOR, L/PJ/6/595, File 424)।
চা শিল্পের ভারতীয় সমালোচকেরা উপনিবেশের স্থায়িত্ব নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত ছিল না, বরং তারা রাষ্ট্রের পক্ষে সুবিচার এবং সমবিচার দেওয়ার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার শারীরিক ফল এবং রাজনৈতিক মানে নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। কটনের ভারত ছেড়ে যেতে বাধ্য হওয়ার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক ভারতীয় সংবাদপত্র ব্রিটিশ লিখল পুঁজিপতিদের ঘোমটা খুলে লিখল “The primary object of British rule in India is to benefit the European capitalist and merchant, even, if necessary, at the sacrifice of justice and humanity (Bengalee, March, 10, 1901)”।
অপরাধ, দ্বন্দ্ব এবং চাষীদের প্রতিরোধের রাজনীতি
বাগান মালিকদের শ্রমিকের ওপর হিংস্রতা নামিয়ে আনার ভাবনার জন্ম হয়েছিল প্রথমত বিপুল সমান্তরাল রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং দ্বিতীয়ত সাম্রাজ্যের প্রান্তে হাজারো শ্রমিকের ঘেরাটোপে বাস করার আপাত ক্ষমতাহীনতা থেকে। অনেক চাবাগানের মানসিকতা ছিল, তারা ‘হাজার শত্রুর বিপক্ষে একা লড়ছেন (Englishman, August 18, 1874)’। একই সঙ্গে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, শ্রমিকের পাল্টা হিংস্রতাও মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক জটিলতায় বিপুল প্রভাব ফেলেছিল। শ্রমিকদের অভিবাসন, ফৌজদারি মামলার অবিচারের পরিবেশ, এবং অসমিয়া কৃষকদের ওপর পুলিশি নিগ্রহের সরকারি সমীক্ষার তথ্য থেকে বাগানে হিংসার যে সংখাতত্ত্ব পাছি, সেই সব বয়ান থেকে আমরা চাষীদের দৈনন্দিন প্রতিরোধের রাজনীতি আর উপনিবেশিক বিচার দেওয়ার জবরদস্তিমূলক চরিত্র বিষয়ে পরিষ্কার ছবি সহজেই উঠে আসে। সূত্র পাওয়ার সীমাবদ্ধতা থাকায় আমি মূলত সরকারি তথ্যভাণ্ডার এবং বাগান মালিকদের ব্যক্তিগত কাগজপত্রকে ‘উল্টো দৃষ্টিভঙ্গী’তে [(A. L. Sroler, Capitalismand Confronzafionin Sumafra’s Plantation Belt, 1870-1979 (New Haven, CT: YALE University Press, 1985)] পড়েছি অথবা ‘against the grain’-এ (R. Guha, “The Prose of Counter-Insurgency,” in R. Guha and G. C. Spivak (eds.), Selected Subaltern Studies (New York: Columbia University Press, 1988), pp. 45-88) পাঠ করে বোঝার চেষ্টা করেছি কীভাবে চা শ্রমিকেরা এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাত করেতে পেরেছিল।
মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকপক্ষর মধ্যে চলতে থাকা একের পর এক মুখোমুখি সঙ্ঘর্ষ বাৎসরিক সমীক্ষায় উঠে আসত একদিকে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মালিকদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এবং একই সঙ্গে বাগান ব্যবস্থাপকদের নামিয়ে আনা দাঙ্গা, অত্যাচার এবং শ্রমিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ থেকে। সরকার সরাসরি স্বীকার করেছিল এই দুয়ের মধ্যে আনুপাতিক সম্পর্ক বর্তমান, কারন কুলিদের পক্ষ থেকে মালিকদের আক্রমনকে অধিকাংশ সময়ে সমীক্ষা লিখিয়েরা দেখছিল শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নামিয়ে আনা মালিকপক্ষের অবিচারের দৃষ্টিতে। যেমন ১৯০২-০৩-এর শ্রম সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, শ্রমিকদের দলগত হিংসাকে যদি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তাহলে সরকার বাগিচা মালিকদের আইনবহির্ভূত কাজগুলি নিয়ন্ত্রণ করুক — Discipline must be maintained on tea gardens, and unruliness which may lead to rioting must be strictly checked. But the occurrence of cases of this description throws upon the State some responsibility for preventing any such injustice as would give the coolies a substantial grievance (“Report on Labour Immigration into Assam for the years 1902-03,” BL, IOR, V/24/1223)। আমরা যদি সমীক্ষাগুলি এইভাবে পাঠ করি, তাহলে দেখতে পাব প্রত্যেক অপরাধের দুটি বাস্তবতা — ইওরোপিয় বাগিচা মালিকদের শ্রমিকদের ওপর আক্রমন নামিয়ে আনার প্রমান এবং তার পরে পরেই ভারতবর্ষীয় শ্রমিকদের প্রতিক্রিয়া। ১৮৯০-এর শ্রম সমীক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টই বলা হয়েছে a disturbance or rising on the part of the coolies generally indicates mismanagement or a want of touch between employers and laborers (“Report on Labour Immigration into Assam for the Year 1890,” ibid)। [ক্রমশ]