Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
চতুর্থ অধ্যায়
অপরাধ, দ্বন্দ্ব এবং চাষীদের প্রতিরোধের রাজনীতি
শাস্তিমূলক চুক্তির শর্ত এবং চা বাগানে শ্রমিকদের চরমতম নিয়ন্ত্রিত জীবনের দ্বৈত ধাক্কায় শ্রমিকদের স্থানীয় প্রশাসনে মালিকপক্ষের ফৌজদারি দুষ্কর্মগুলোর অভিযোগ দায়ের করা কঠিন ব্যাপার ছিল (Ganguli, Slavery, p. 39)। মালিকপক্ষের চাপানো অত্যাচারের বিন্দুমাত্রও সুরাহা না হওয়ার মনের মধ্যে চেপে রাখা তীব্র ক্ষোভে চা বাগানে প্রায় বন্দীদশা কাটানো শ্রমিকেরা অত্যাচারী বাগান মালিকদের ওপর হিংস্র প্রত্যাঘাত নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল। চা শ্রমিকেরা বাধ্যতামূলক শ্রম দেওয়ার চাপিয়ে দেওয়া শর্ত রুখতে চেষ্টা করেছিল অহিংস এবং হিংসা, উভয় ধরণের প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ (কাজ করতে না যাওয়া, ধর্মঘট, শারীরিকভাবে প্রতিরোধ) এবং অশক্তের নানান হাতিয়ার (এড়িয়ে যাওয়া, হুঁশিয়ারি, সম্পত্তি নাশ) ব্যবহার করেই। ১৮৮৬-তে কামরূপের এক চাবাগানে অতিরিক্ত কাজ করিয়ে নেওয়ার প্রতিবাদে ম্যানেজার, প্রযুক্তিবিদ, দেশিয় চিকিৎসককে ২৭ জন শ্রমিক শারীরিকভাবে নিগ্রহ করে (“Report on Labour Immigration into Assam for the Year 1886,” BL, IOR, V/24/1222)। যদিও প্রতি শ্রম সমীক্ষায় একের বেশি শ্রমিক প্রতিরোধের খবর পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু এই প্রতিরোধের রাজনৈতিক চরিত্রটিকে অস্বীকার করা হয়েছে বিংশ শতক পর্যন্ত। অবস্থা পাল্টান অসমের স্থানীয় কৃষক সংগ্রামে গান্ধী আর কংগ্রেস জুড়ে যাওয়ায়। এর পরে চা বাগানের শ্রমিক আন্দোলন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠবে [(J. Pouchepadass, Champaran and Gandhi: Planters, Peasants and Gandhian Politics (New Yotk: Oxford University Press, 1999)]।
উপনিবেশিক ইতিহাস চাবাগানে শ্রমিকদের ওপর ইওরোপিয় মালিকদের নামিয়ে আনা হিংসাকে স্বাভাবিক, যুক্তিযুক্ত শ্রমিক নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি হিসেবেদেখেছে, আর অন্য দিকে মালিকপক্ষের অত্যাচারে বিরুদ্ধে প্রশাসনিক, বিচার বিভাগীয় সুরাহা না পেয়ে কৃষক প্রত্যাঘাত সাধারণভাবে অনুপ্রাণিত এবং সিদ্ধান্তমূলক প্রতিক্রিয়া হিসেবে না দেখে বর্ণনা করা হয়েছে অবাধ্যতা, ধর্মান্ধতা বা উন্মাদনা হিসেবে। জর্জ বারকার তার মাথায় ছুরি ধরে দেহের ওপরে দাঁড়ানো এক শ্রমিকের বর্ণনা দিয়েছে ‘উন্মাদ’ হিসেবে —
He [the worker] had a dream, wherein, at the peril of offending his deities, he was ordered to kill the sahib…When asked in court to give some explanation for his dastardly behavior, and whether the sahib was cruel, he candidly confessed that the sahib was an exceptionally good master, treated all the coolies well, and they had no grounds for complaint in any way. This and many other stories of the fanatical vagaries of the coolies are in circulation throughout the country and are at the outset rather terrifying to newcomers (Barker, A Tea Planter’s Life, pp. 112-113)।
বারকার যে শ্রমিককে অযৌক্তিক, ভয়ানক এবং অর্ধচেতন কুলি হিসেবে দাগিয়ে দিচ্ছেন, সেই অসমের কুলি বা কৃষকের প্রত্যাঘাত বহু সময়েই পরিকল্পিত, সংগঠিত এবং যুক্তিগ্রাহ্য প্রণোদনার পাল্টা আঘাত ছিল। ইওরোপিয় বাগান মালিকদের ওপর আক্রমনের উদ্দেশ্য উল্লিখিত চারটি বিষয়ের মধ্যে একটি অবশ্যই থাকত — কুখ্যাতিওয়ালা ম্যানেজার; কাজ করতে অস্বীকার করা (মূলত রবিবার বা ছুটির দিন বা চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কাজ করাবার বিরুদ্ধে); প্রথমে আঘাত পেয়ে প্রত্যাঘাত; এবং মহিলা কর্মীর ওপর শারীরিক এবং যৌন উৎপীড়ন।
শ্রমিকেরা যৌথভাবে তাদের কাজের হাতিয়ার/উপকরণ — ছুরি, নিড়ানি বা ছোট কুঠার নিয়ে বাগানের ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে প্রথমে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিত, সেই হুঁশিয়ারিতে কাজ না হলে তারা বাধ্য হয়ে আক্রমন শানাত। কটনের ভাষায় প্রবণতাটা ছিল ‘to resent a blow by striking a blow in return, মার আসার আগেই এক ঘা কষিয়ে দেওয়া’, যার ফলে চা বাগানের নিপীড়নের পরিবেশে শ্রমিকেরা দলবদ্ধ হয়ে নানান ধরণের হাতিয়ার নিয়ে আক্রমন করত (Report on Labour Emigration into the Province of Assam for the Year 1899,” BL, IOR, v/24/1223)। বাগান মালিক জে এইচ উইলিয়ামস টি এস্টেটেস এন্ড দেয়ার ম্যানেজমেন্ট নামক স্মৃতিকথায় লিখছেন ‘ডালপালা ছাঁটা কাঁচি হাতে ১০০ জন শ্রমিকের কাছে ঘেরাও হয়ে থাকা খুবই ভীতিপ্রদ ব্যাপার ছিল (BL, IOR, Mss Eur 235/1)’। জর্জ বারকারও বলেছেন ‘রেগে থাকা কুলির হাতে ডালপালা ছাঁটা কাঁচির ৮ ইঞ্চি ধারালো ফলা যে কোনও সময়ে খুবই ভয়াবহ হাতিয়ার হয়ে উঠত’ (Barker, A Tea Planter’s Life, p. 130)।
অনেক সময় শ্রমিকেরা বাংলোকে বেছে নিত প্রতীকি আক্রমনস্থল হিসেবে — শ্রমিকেরা দল বেঁধে কাঠের বাংলো সহজেই পুড়িয়ে দিত, সরকারি সমীক্ষায় যাকে ‘আগুণ লাগাবার দুষ্কর্ম’ (“Report on Labour Immigration into Assam for the Year 1888,” BL, IOR, V/24/1222) হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে — অথবা মালিককে বাংলোয় বন্দী করে রাখত (৪.৫ ছবি দেখুন)। ১৮৮৪তে বোয়ালিয়া চা বাগানে, প্রকাশ্যে এক দল শ্রমিকের সামনে একটি বালককে প্রকাশ্যে ম্যানেজার বেত মারলে, তাকে তীব্রভাবে নিগ্রহ করা হয় এবং বহু ঘন্টা বাংলোয় আটকে রাখা হয়। ১২ জন শ্রমিককে ৩ মাস থেকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং ম্যানেজারকে ৫০ টাকা জরিমানা করা হয় (“Report on Labour Emigration into the Province of Assam for the Year 1890,” BL, IOR, V/24/1223; and “Report on Labour Emigration into the Province of Assam for the Year 1884,” BL., IOR, V/24/1222)।

৪.৫ ছবি Tea planter’s bungalow, Khorhaut Tea Estate, Assam, India, 1935
ইওরোপিয় বাগান মালিকদের ওপর শ্রমিকদের যৌথ আক্রমনগুলো মোটের ওপর পরিকল্পিত আক্রমন ছিল। প্রত্যাঘাতের সম্ভাব্য ফল পেতে যেহেতু খুবই চড়া দাম চোকাতে হয়েছে, তাই শ্রমিকেরা দীর্ঘ পরিকল্পনা করে আক্রমন করত। ১৮৯২এর ৬ ফেব্রুয়ারি বারহাল্লা চা বাগানের ম্যানেজার মজুরি দেওয়ার সময়, হল্লা করে কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্যে হরিলাস নামে এক শ্রমিককে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ জারি হয়। হরিলাস অন্যান্য সহশ্রমিককে ডেকে ম্যানেজার স্মিথকে আক্রমন করার নির্দেশ দিলে তার দলবল আধলা আর মাটির ঢেলা তুলে স্মিথ আর তার সহকারীর দিকে ছুঁড়তে থাকে (Report on Labour Immigration into Assam for the Year 1892,” BL, IOR, V/24/1223)। ১৮৮৩-এ বারামচাল চা বাগানে এক দল শ্রমিক মিলে ম্যানেজার আর তার সহকারীকে মজুরি দেওয়ার দিন আক্রমন করে সমস্ত নগদ অর্থ লুঠ করে পালিয়ে যায়। বহু দিন পালিয়ে থাকার পড়ে ধরা পড়লে দলের নেতা সহ ১৮ জনকে দীর্ঘকালের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় (“Report on Labour Immigration into Assam for the Year 1883,” BL, IOR, V V/24/1222)। ১৯০৩-এর মার্চে সেফানঝুরি চা বাগানের ম্যানেজার এ লেজুকের বিরুদ্ধে আক্রমনের অভিযোগে ৭ জন শ্রমিকের দাঙ্গা করার অভিযোগ আনা হয়। আক্রমণকারীদের একজন বসু, হাতে লাঠি নিয়ে ম্যানেজারকে আটকে ছুটির দাবি জানাতে থাকে। লেজুক তাকে বাংলোয় আসতে বলে। বসু অস্বীকার করলে ম্যানেজার লেজুক তার ঘাড় ধরে বলে ‘আমার সঙ্গে চল’। বসু ওডিয়ায় চিৎকার করে কিছু একটা বলে, সঙ্গে সঙ্গে ৫০/৬০জন ওডিয়া শ্রমিক লাঠি হাতে এসে পৌঁছয়। তাদের মধ্যে একজন হাত দিয়ে লেজুকের টুপি ফেলে দেয় আরেকজন দা হাতে নিয়ে তাকে আঘাত করতে গেলে একজন তাকে বাধা দিয়ে থামিয়ে দেয়। বিচারপতি বি বি নিউবোল্ড তার রায়ে বললেন, “The attack on the Manager appears to have been pre-organized and it seems highly likely that Basu behaved as he did with the deliberate intention of provoking the Manager to assault him and then give the other coolies who were waiting about armed with lathis an apparent justification for their action.” বাসুকে ন’মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় (BL, IOR, L/PJ/6/527, No. 27)। [ক্রমশ]