Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
চতুর্থ অধ্যায়
অপরাধ, দ্বন্দ্ব এবং চাষীদের প্রতিরোধের রাজনীতি
চা শ্রমিকেরা হিংসার বিরুদ্ধে সব সময় হিংসা দিয়ে প্রতিরোধ করত না। শ্রমিকেরা জানত বাগান কাঠামোটাই তাদের স্বার্থ বিরোধী। ফলে মাঝেমধে দেখা গেছে আইনকে সুচতুরভাবে ব্যবহার করতে। বোজরান চা বাগানে ম্যানেজারকে আক্রমন করার মামলা চলাকালীন ৩০০ শ্রমিক কাজ বন্ধ করে বাগান থেকে আদালতের উদ্দেশ্যে রওনা হয় (“Repon on Labour Immigration into Assam for the Year 1896,” BL, IOR, V/24/1223)। ৬ বছর পরে শিবসাগরের ডেপুটি কমিশনার লিখলেন, সদর ডিভিসনের বিভিন্ন বাগানে শ্রমিকেরা ‘নানান পদ্ধতি’ ব্যবহার করেছে, অভিযোগ দায়ের করার নাম করে মাঝেমধ্যেই একশ বা দুশ শ্রমিক চা বাগান থেকে বেরিয়ে আসছে (ঐ)। বহু ফৌজদারি মামলা চলাকালীন শ্রমিকেরা প্রকাশ্যে আদালতের সামনে সুবিচার চেয়ে, দায়িত্বপালিনের দাবি জানিয়ে, আইনভঙ্গ করে গণ ধর্মঘট পালন করেছে।
কখোনো চা শ্রমিকেরা ক্ষমতার প্রতিমূর্তির প্রতীককে আঘাত করে আইনভঙ্গ করত। ১৯১০-এ কুরমা চা বাগানের ম্যানেজারকে আক্রমন করার পরে শ্রমিকেরা ‘সাবডিভিসনাল দপ্তর আর পুলিশ দপ্তরের সামনে শক্তি প্রদর্শন করে দাবি করে বাগানে পুলিশ বাহিনী পাঠানোর (Repon on Immigrant Labour in the Assam Districts of Eastern Bengal and Assam for the Year ending June 30, 1911,” BL, IOR, V/24/1224)’। এই ধরণের আন্দোলন আমাদের মনে করয়ে দেয়, যদিও আদালত আর আইনি ব্যবস্থার পক্ষপাতিত্ব ঢলেছিল বাগান মালিকদের দিকে, কিন্তু আন্দোলনকারীরা মাঝেমধ্যে আইনকে তাদের মত করে নিজেদের স্বার্থে বাঁকিয়ে নিতে পেরেছিল। এই উদাহরণগুলো থেকে আমরা আন্দাজ করতে পারি, তারা আইনি বিষয়টা জানত বুঝত, অনেক সময় পদ্ধতিটির মুখোমুখিও হত এবং কোনও কোনও সময় বিচারকে নিজেদের দিকে টেনে আনতেও সক্ষম হয়েছে।
বাগান মালিকদের হিংসা এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদ
অসম চা বাগানে শ্রমিকদের নিয়মিত প্রত্যাঘাতের ঘটনা ঘটাকালীন সময় আসতে আসতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বাগানে চলতে থাকা হিংসা বন্ধে সংগঠিত হস্তক্ষেপ করতে শুরু করেছে। উনবিংশ শতকের শেষের দিকে চা বাগানে হিংসার ঘটনাগুলো জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে থাকে বাংলার সাংবাদিক, সমাজসংস্কারক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মীরা (N. Varma, “Coolie Strikes Back: Collective Protest and Action in the Colonial British Indian Tea Plantations of Assam, 1880-1920,” Indian Historical Review, 33 (2006) 259-287)। ১৮৭০এ সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের পক্ষ থেকে অসমে ধর্ম প্রচার করতে আসা রামকুমার বিদ্যারত্ন, সঞ্জীবনী পত্রিকায় নিয়মিত চা বাগান সংক্রান্ত কুখ্যাত মামলাগুলি প্রচার করতে থাকেন, শেষ পর্যন্ত এই প্রবন্ধগুলি মিলে তৈরি হয় কালজয়ী পুস্তক কুলিকাহিনী (১৮৮৮) [(J. C. Bagal, Hisroy of the Indian Association, 1876-1951 (Calcutta: Indian Association, 1953), p. 102)]। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বইটি উত্তুঙ্গ সাফল্য অর্জন করে। বইটির রাজনৈতিক প্রভাব আন্দাজ করে ইন্ডিয়ান এসোসিয়েসন দ্বারকানাথ গাঙ্গুলিকে অসমে পাঠায় সামগ্রিক বিষয়টি নিয়ে অন্তর্তদন্ত করতে। দ্বারকানাথও এক ঝাঁক প্রবন্ধ লেখেন সঞ্জীবনী আর বেঙ্গলিতে এবং প্রবন্ধগুলি নিয়ে তৈরি হয় Slavery in British Dominion নামক বইটি।
রামকুমার, দ্বারকানাথ এবং যে সব সংগঠনের তারা প্রতিনিধিত্ব করছিলেন তাদের সম্মিত উদ্যোগ অসমের চা বাগানের কুলিদের জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। কিন্তু এই মধ্যবিত্ত প্রথাগত নরম ভাষায় লেখা দলিল, চা বাগানের শ্রমিকেরা যে ধরণের অসহযোগ আন্দোলন বা হিংসক আন্দোলন করছিল, তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তবুও এই বাঙালি আন্দোলনকারীরা সরকারি সমীক্ষা থেকে খুঁটে খুঁটে অত্যাচারের বিশদ বর্ণনা এবং হিংসা চাপিয়ে দেওয়ার তথ্য জনগণের মধ্যে ছড়াতে থাকেন। একই সঙ্গে তারা ‘খ্রিষ্টিয় সরকারকে’ অনুরোধ করতে থাকেন গরীবদের বিচার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পালন করে হিংসা প্রতিরোধ করার আইন প্রয়োগ করতে। তারা ‘দুঃখজনক দারিদ্র এবং চরমতম অবক্ষয়’ ইত্যাদি নিয়ে জরুরি কথন উপস্থাপন করলেন। তাদের বৌদ্ধিক খাটুনি শুধু আগামী দিনের ব্রিটিশ রাজনৈতিক শাসনেই বিপুল প্রভাব ফেলবে না, ভারতের শ্রমিক সঙ্গঠন গড়ে ওঠার কাজে সরাসরি প্রভাব ফেলবে (Ganguli, Slavery, p. 18)।
শ্রমিকদের নিয়ে ওঠা ইস্যুগুলি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং ভারতের বৃহত্তর গরীব এবং খেটে খাওয়াদের ওপর প্রভাব নিয়ে জটিল বিতর্ক তৈরি করে। স্বাধীনতা আন্দোলন যে ক্রমশ জনআন্দোলনে রূপান্তরিত হচ্ছে শ্রেণীভিত্তিক এই প্রশ্নটি উঠে আসতে থাকলে জাতীয়তাবাদী নেতারা স্পষ্টতই অস্বস্তি বোধ করতেন। তবে উনবিংশ শতকে শ্রমিক ইস্যুতে জাতীয়তাবাদীরা মূলত মালিক শ্রেণীর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, এবং শ্রমিকদের পক্ষে আইন তৈরির আন্দোলনে খুব একটা সদর্থক ভূমিকা পালন করে নি। বাংলার জমিদারদের উদ্যোগে তৈরি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েসন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ঠিক আগের সময়ে গড়ে ওঠে এবং অতিরক্ষণশীল এবং জঘন্যভাবে জাতিবাদী এংলো ইন্ডিয়ান ডিফেন্স এসোসিয়েসনের সঙ্গে জোট করে ১৮৮৫-র চাষীদের পক্ষের টেনান্সি আইনের বিরোধিতা করে। বিপান চন্দ্র লিখছেন, সে সময়ের অধিকাংশ জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র শ্রমিক ইস্যুতে ‘হয় চুপ ছিল, না হয় শ্রমিক বিরোধী অবস্থান নেয়’(Candra, Rise and Growth, p. 357)। মুখোমুখি দ্বন্দ্ব সংঘাতে যাওয়া চা বাগানের শ্রমিক এবং বাগান মালিকদের ক্ষেত্রে তারা ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করে, শ্রমিক ইস্যুতে পালিত নীরবতাকে ভেঙে চা শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তার কারন উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে ভারতের ধনী গরীবদের যে ভঙ্গুর মিলন ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছিল, বাগানের সাদা মালিকদের আক্রমন করাগেলে সেই ভঙ্গুর ঐক্যটি অবিকৃত থাকে।
ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রথমে চা শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে খুব একটা ইছুক ছিল না। এক সময় সে মনে করত চাবাগানের শ্রমিকদের আন্দোলন জাতীয় নয় আঞ্চলিক ইস্যু। ১৮৮৬-তে কংগ্রেস সম্মেলনে চারজন অসম থেকে প্রতিনিধিত্ব করলেও কংগ্রেস, চা মালিকদের পাশবিক অত্যাচারের বিষয়ে প্রথাগত প্রস্তাব নেয় নি ১৮৯৬ পর্যন্ত (Guha, Planter-Raj, pp. 64-67)। ১৮৯৮-তে ইন্ডিয়ান এসোসিয়েসন ভারত সরকারের কাছে দীর্ঘ মেমোরিয়াল পাঠিয়ে অসমের চা বাগানে চলতে থাকা হিংসা নিয়ে তদন্ত করতে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশনের দাবি তোলে। যদিও চিঠির ভাষা অতি পিতৃতান্ত্রিক অর্থাৎ তারা সরকারকে অসহায় শ্রমিক বাঁচাবার কথা বলছিল — the ignorance of the laborers and their utter helplessness and inability to protect their interests — কিন্তু ইন্ডিয়ান এসোসিয়েসনের চিঠিতে ‘সুবিচারের দাবি’ উল্লেখ থাকাটা বৃহত্তর শ্বেত সন্ত্রাসের প্রশ্নটি উত্থাপন করে, অর্থাৎ তারা ভারতে the firm and impartial administration of justice প্রয়োগের দাবি জানায় (Bagal, Hisrory, Appendix E)। কংগ্রেস জনগণকে আন্দোলনে উৎসাহিত করতে কুলি বিষয়টি সামনে আনার উদ্যম নেয়। এবং কংগ্রেসের আন্দোলনের ফলেই অসমের শাস্তিযোগ্য চুক্তি আইনটি বাতিল হওয়া খুব কম সাফল্য ছিল না। [ক্রমশ]