Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
পঞ্চম অধ্যায়
উপনিবেশিক জাতিবাদ এবং ‘হঠাৎ’ মৃত্যু
দ্বিতীয়ত একের পর এক জাতিবাদী মামলায় আদালতের ইওরোপিয় অপরাধীদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হওয়া থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় যে উপনিবেশিক ভারতে, ব্যক্তি ব্রিটিশের যে কোনও ভারতীয়কে আঘাত করার স্বাভাবিক অধিকারের ধারণাটিকে রাষ্ট্র প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। আদালত শ্বেত সন্ত্রাস রুখতে শুধু ব্যর্থই হয় নি, বরং সে এই হিংসাকে প্রশ্রয় দিয়েছে। অমৃত বাজার পত্রিকা লিখল, ব্রিটিশেরা ভারতে — “take a delight in thus cruelly treating natives. The causes of this are to be found, first, in their natural hatred of, and hostility towards natives, and, secondly, in their immunity from punishment either by the State or by society when committing cruelties on native (Ananda Patrika Bazar, July 13, 1885, BL, IOR, L/R/5/11)। হিন্দু প্যাট্রিয়টে জনৈক বাঙালি চিঠি লিখে জানাচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত আইন এবং শ্বেতাঙ্গ বিচারক আর জুরিদের অপরাধ করা ব্রিটিশদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের দরুন ভারতীয়দের ওপরে হিংসা চাপিয়ে দিয়েও ছাড় পেয়ে যায় —
The fact is too notorious to need any demonstration that it is difficult to procure the conviction of a British-born subject in the Supreme Court, more especially when the witnesses are to be brought from a great distance in the Mofussil, subjected to the cross-examination of a Peterson or a Doyne, overawed and brow-beaten by the Judge, and appalled by the imposing appearance of the Court and its formidable array of barristers, constables, jurors, clerks and attorneys – a sight so novel and terrific to the rustic peasant of this country — the witnesses who are generally of this class, get confused and forget the facts they come to disclose. There is again the sympathy of the Judge and Jurors enlisted in favour of the offender. Besides, there are many legal fictions and technical absurdities which often help the escape of a criminal in the labyrinth of English law (Hindoo Patriot, August 22)।
উনবিংশ শতকজুড়ে বিভিন্ন শ্রেণী আর স্তরের থাকবন্দীতে নিবদ্ধ থেকে বিভিন্ন আদালতের ইওরোপিয় বিচারক এবং জুরিরা একজোট হয়ে ব্রিটিশ জাতিবাদ এবং আধিপত্যকে শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েছে। কোনও কোনও সময় অদ্ভুতভাবে এই জোটবদ্ধতা তৈরি হত। ১৯০৩এ সংগ্রমাগড় কয়লা খনির মালিক জনৈক মার্টিনকে বর্ধমান আদালতে পেশ করা হয় বিষ্ণু বাউরিকে খুনের দায়ে। মার্টিন আদালতকে বিশ্বাস করাতে চাইল যে তার রিভলভার থেকে অজান্তে গুলি বেরিয়ে বিষ্ণুকে আঘাত করেছে, এই ঘটনা ইচ্ছাকৃত নয়। মামলা চলাকালীন জনৈক সাংবাদিক জানালেন আদালতে মার্টিন তার স্ত্রী এবং বন্ধুদের ঘেরাটোপে বসেছিল এবং যেন মনে হচ্ছিল ‘মার্টিনের বিয়ের আসর বসেছে’ (Sri Sri’ Vishnu Priya-o-Ananda Bazar Patrika, April 8, 1903, BL, IOR, L/R/5/29)। প্রায় একই ঘটনা বলেছেন চট্টগ্রামের ম্যাজিস্ট্রেট হেনরি কটন। তার এজলাসে এক ইওরোপিয় চা-করের বিরুদ্ধে সাধারণ নিগ্রহের মামলা চলছিল। তিনি লিখছেন, ‘ব্যক্তিটি ঠাণ্ডা মাথায় আদালতে ঢুকে আমার পাশের আসনে বসে এবং আমি যখন তাকে সেখান থেকে উঠে তার নির্দিষ্ট আসনে বসার নির্দেশ দিলাম, সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল’ (H. Cotton, Indian and Home Memori’es (London : T. Fisher Unwin, 191l), p. 157)।
অনেক সময় অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে ইওরোপিয়রা পাগলের অভিনয় করত। ১৯০৩-এ সৌরদয় প্রকাশিকার একটি খবরের সূত্রে জানা গেল, তাঁর নির্দেশে পালকি বেহারারা তাড়াতাড়ি তাকে বয়ে নিয়ে না যাওয়ায় সাহেব আমলা তাদের গুলি করে। অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে যে নিজেকে অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা করে এবং তাকে ভারতবর্ষ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বম্বেতে পৌঁছে তার পাগলামি সেরে যায় এবং সে স্বাভাবিকভাবে ঘুরে বেড়াতে শুরু করে। ইংলন্ডে দুদিন এসাইলামে কাটিয়ে সুইজারল্যান্ড ঘুরতে গিয়ে তার প্রতি অবিচারে ক্ষোভ প্রকাশ করে সেক্রেটারি অব স্টেটকে চিঠি লেখে (Surodaya Rakasika, March 28, 1903, BL, IOR, L/R/5/111)।
উপনিবেশের বিচার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে বিপুল দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল বিচার দেওয়ার ব্যর্থতায়। মামলায় শাস্তি দেওয়ার নামে যে সব সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে আসতে শুরু করে, সে সব নিতান্তই একপেশে রায়। ফলে দেশে এবং বিদেশে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের পক্ষ থেকে অভিযোগের তীর এসে বিঁধছিল সরকারের গায়ে। দৈনন্দিনের অভিজ্ঞতা থেকে ঠিক মত বোঝা যাচ্ছিল না উনিবিংশ শতকের শেষের দিকে ইওরোপিয় হিংসা আদৌ বেড়েছে না কী ভারতীয় সংবাদপত্র জগত, উপনিবেশ বিরোধী জাতীয়তাবাদীদের এবং সাম্রাজ্যের বিরোধীদের সমালোচনা এবং প্রচারের ফলে ইওরোপিয় অত্যাচারের সংখ্যাটা বিশাল বড় বলে মনে হচ্ছে। তবে যে সব হিংসার ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা হচ্ছিল, অভিযোগ দায়ের হচ্ছিল আর সে সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে মামলা চলছিল তার সংখ্যা আদতে মূল হিংসার এক ভগ্নাংশের বেশি হবে না। জনৈক মন্তব্যকারী নাটকীয়ভাবে বললেন, — Who can say how many such cases occur in the Mofussil, but do not see the light of publicity, because it is the habit of the natives to cry with the doors shut (Sanyal, Repons of Crinrinal Cases (1896),p. 57)।
উনবিংশ শতকের শেষের দিকে প্রকাশিত বিভিন্ন শ্বেত হিংসার ঘটনা সংকলিত করে বইরূপে প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৮৭৬এর জুলাইতে কৃষ্টদাস পাল হিন্দু প্যাট্রিয়টে প্রকাশিত ইওরোপিয়দের বিরুদ্ধে রুজু করা ৪৮টা ফৌজদারি মামলার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিয়ে প্রকাশ করলেন illustrative of the manner in which justice is meted out to the European and the Native by English Courts in this country (Hindoo Patriot,July 31, 1876)। ১৮৯৩-তে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে রাম গোপাল সান্যাল প্রকাশ করলেন — The Record of Criminal Cases as Between Europeans and Natives for the Last Sixty years (R. G. Sanyal, Record of Criminal Cases as Between Europeans and Natives for the Last Sixty Years (Calcutta, 1893)। কাজটা করতে গিয়ে তিনি প্রায় ‘এক গাড়ি সংবাদপত্র সমীক্ষা’ করার পরিকল্পনা করলেন। এর আকার ছিল ১০ খণ্ডের সমান। সে সব থেকে বেছে সতর্কভাবে প্রথম সংস্করণে স্থান হল ৪৮টি ঘটনার। অর্থের অভাবে দ্বিতীয় সংস্করণে স্থান পেল আরও ১২০টি বাছাই মামলা। এর পরেও ভাইসরয় কার্জন মনে করলেন সান্যাল যে ‘গাড়ি ভর্তি’ প্রকাশিত সংবাদ দেখেছিলেন, সেটাও নাকি ভারতে ঘটে চলা ঘটনা এবং মামলার এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। সেক্রেটারি অব স্টেটকে ব্যক্তিগতস্তরে একটি চিঠিতে লিখলেন, — If the native press got a hold of all these cases, published them verbatim as they occurred, and made the obvious comments, they could render our position in a few years almost untenable in this country (Curzon to Secretary of State George Hamilton, June 17, 1903, BL, IOR, Mss Eur/F1111/62)। [ক্রমশ]