Colonial Justice in British India: White Violence and the Rule of Law Elizabeth Kolsky
ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশিক বিচার — শ্বেতাঙ্গ হিংসা এবং আইনের শাসন, এলিজাবেথ কলস্কি
অনুবাদকের ভূমিকা
উপনিবেশে হিংসা বুঝতে ইতিহাস আমাদের বুঝিয়েছে ইওরোপিয় ব্রিটিশ রাষ্ট্রের সেনা, পুলিশ, প্রশাসনিক যন্ত্র প্রণোদিত ভারতবর্ষের অ-সাদা উপনিবেশিক প্রজাদের ওপর নামিয়ে আনা হিংসা — যেমন জালিয়ানওয়ালাবাগ, বুড়িবালামের তীরে লড়াই ইত্যাদি। কিন্তু উপনিবেশে এর বাইরেও ইওরোপিয় হিংসার অস্তিত্বকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের দেখাচ্ছেন গবেষক এলিজাবেথ কোলস্কি। তিনি লিখছেন কিভাবে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য জুড়ে অ-সরকারি ব্রিটিশ/ইওরোপিওয়দের হিংস্রতা সংহত করার ভিত্তিতে সাম্রাজ্যের রথ চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ইতিহাসচর্চায় অনবরত অসরকারি ইওরোপিয় এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের পক্ষ থেকে উপনিবেশিক জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হিংসা প্রসঙ্গ খুব বেশি আলোচনায় উঠে আসে নি। অসরকারি ইওরোপিয়রা, বিশেষ করে নীলকর, গরীব ইওরোপিয়, সেনাবাহিনীর ক্যাডেট, পলাতক নাবিক, কফি বাগিচা মালিক-কর্মচারী ইত্যাদিদের ভারতবর্ষীয়দের ওপর হিংসার তরবারি নামিয়ে আনার তথ্য সত্যই অস্বাভাবিক এবং এই চাপানো প্রবল দৈনন্দিনের হিংসা মহামারীর মত ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা ভারতবর্ষীয় উপনিবেশজুড়ে।
এলিজাবেথ তাঁর বইতে বলছেন হিংসার শেকড় মূল উপনিবেশিক ব্রিটিশ আইনের দর্শনেই জড়িয়ে ছিল। জন লকের সম্পত্তির অধিকারের দর্শন ভিত্তি করে উপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের সম্পত্তির আইনের মৌলিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সম্পত্তি আইনের মোদ্দা বক্তব্য হল উপনিবেশে সাদা চামড়ার মানুষদের, কালো প্রজাদের থেকে নানাভাবে দখলদারি করে খেটেখুটে জমি চাষ করা আইনের চোখে বেআইনি নয়। কিন্তু দেশিয়রা যদি ইওরোপিয়দের দখল করা সম্পত্তির ওপর তাদের অর্জিত অধিকার দাবি করে তাহলে সে সব প্রতিবাদী মানুষদের ওপরে ব্যক্তি সাদার অত্যাচার নামিয়ে আনা বা তাদের পশুর মত হত্যা করা বেআইনি কাজ হিসেবে গণ্য হবে না।
এলিজাবেথ কোলস্কি বলছেন, উপনিবেশিক পণ্ডিতেরা মুঘল পূর্ব সময়কে বিচারহীন এবং একচেটিয়া হিংসামূলক শাসনের অন্ধকার যুগ হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে উপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশগুলোয় আদালত প্রতিষ্ঠা করে জনগণকে বিচার দেওয়ার দাবিকে শৌর্যমণ্ডিত করছেন। উপনিবেশে আদালত তৈরি করে সুবিচার দেওয়ার দাবি এবং উপনিবেশিক আইনের চোখে সব প্রজার সমতার দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কোলস্কি দ্বিধাহীনভাবে বলছেন উপনিবেশিক আইন প্রয়োগ করে হিংসাশ্রয়ী শাসনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে উপনিবেশগুলোয়।
সহিংস অত্যাচারই উপনিবেশিক কর্তৃত্ব চালাবার ভিত্তি। তিনি এই বইতে সাদা প্রজাদের অত্যাচারের মারাত্মক সব উদাহরণ তুলে এনেছেন। সে সব উদাহরণ কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে আলোচিত হলেও সার্বিকভাবে অসরকারি ব্যক্তি ইওরোপিয়দের অত্যাচারের বিস্তৃত বয়ান আমাদের অগোচরেই ছিল। সাদা ইওরোপিয় আর অসাদা উপনিবেশিক প্রজার মধ্যে সাম্রাজ্য সহযোগিতার রোমান্টিক বয়ান বহু প্রতিবাদী ঐতিহাসিক, গবেষকই আলোচনা করেছেন যেমন উইলিয়াম ডালরিম্পল, যেমন ব্লেয়ার বি ক্লিং, যেমন কপিল রাজ ইত্যাদি। ঠিক এর উল্টো পথে চলে, ইওরোপিয় আর দেশিয় প্রজার সামাজিক অধিকারের বৈষম্য এবং ইওরোপিয় প্রজাদের দেশিয় প্রজার ওপর হিংসা চাপানোর অনালোচ্য দিকটি কোলস্কি মারাত্মক জোর দিয়ে তুলে আনছেন, যে আলোচনা প্রথাবদ্ধ ইতিহাসে উঠে আসে না।
এতদিন সযত্নে লুকিয়ে রাখা উপনিবেশিক হিংসার দরজা খুলে দিচ্ছেন কোলস্কি।
অথচ কোলস্কির অসামান্য কলোনিয়াল জাস্টিস ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া — হোয়াইট ভায়োলেন্স এন্ড দ্য রুল অব ল’ বইতে ইওরোপমন্যতার চাষও করেছেন সূক্ষ্মভাবে। তার বক্তব্য উপনিবেশের প্রথম দিকে কোম্পানি ‘চরিত্রে উত্তম, সৎ এবং ভুল না করতে চাওয়া’ বাছাই করা আমলাদের উপনিবেশ শাসন করার কাজে মূলত বাংলা, মাদ্রাজ আর বম্বেতে পাঠাত। এই আমলারা উপনিবেশের তৃতীয় মুখ, অসরকারি ব্যবসায়ী, নীলকর, চা বাগান মালিক-আমলা-কর্মচারী, সেনা, মাল্লা, চোর ডাকাত খুনে শ্বেতাঙ্গদের হিংসা এবং সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলছেন অসরকারি ব্রিটিশ-ব্যক্তি হিংসায় সাম্রাজ্যের ভিত্তি টলোমলো হচ্ছে বুঝতে পেরেও, অমায়িক, বিচারদায়ী ব্রিটিশ আমলারা সেই সব শ্বেতাঙ্গ হিংসা, অভিচার, অসদাচরণ রুখতে পারেন নি।
কোলস্কি এই বইএর কয়েক জায়গায় বুঝে না বুঝে ২৫০ বছর আগেকার সাম্রাজ্যবাদী এডমণ্ড বার্কের স্বরে কথা বলছেন। পলাশীর পরে আমরা জানি কীভাবে ক্লাইভ আর হেস্টিংস এবং তার পরে ছিয়াত্তর বা তিরানব্বইতে বাংলা দুয়ে, বিভিন্ন এলাকায় লুঠ আর পীড়ন চালিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে, ইওরোপকে ধনী করেছে। উপনিবেশে কাজ করতে আসা আমলাদের এডমন্ড বার্ক প্রায় দেবশিশুই আখ্যা দিয়েছিলেন। তার মতে উপনিবেশিক কাঠামোর বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞ এই সব আমলাদের পূর্ব দেশের কুচুটে জনগণ ঘুষটুস দিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তুলছে। দুর্নীতিতে ডুবতে ব্রিটিশ আমলাদের খুব একটা ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু তারা উপনিবেশিক প্রজাদের চতুরতা, দুর্ণীতি, বেলেল্লাপনার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে।
আমরা উপনিবেশবিরোধী চর্চার মানুষেরা মনে করি বাংলা বা অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের কাছে ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রশাসকেরা দেবশিশু ছিল না। অসরকারি শ্বেতাঙ্গ যাদের কোলস্কি উপনিবেশের তৃতীয় মুখ আখ্যা দিচ্ছেন, তাদের চাপিয়ে দেওয়া হিংসা যে সাম্রাজ্য প্রসারের কাজে দেশিয় মানুষদের ভয় দেখিয়ে সন্ত্রস্ত করে রাখার অন্যতম উপাদান, এই তত্ত্বটা সাম্রাজ্যের প্রশাসনের নানান থাকবন্দীর পরিচালক বিলক্ষণ বুঝতেন। হিংসা নামিয়ে আনার যে সব কাজ সরকারি আমলা বা পদাধিকারীর পক্ষে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অনমনীয়তার জন্য বহু সময় করে ওঠা অসম্ভব ছিল – যেমন ব্যক্তিগতস্তরে বিপুল হিংসা নামিয়ে আনা, সেই অবর্ণনীয় অসরকারি হিংসা-দণ্ড ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এইসব অপ্রাতিষ্ঠানিক, ভবঘুরেদের মাধ্যমে উপনিবেশিক অসাদা প্রজাদের ওপরে নামিয়ে আনত। আরও বড় কথা হল, হিংসা নামানোর কাজে দায়ি ব্যক্তি ইওরোপিয়দের অধিকাংশ সময়েই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রেহাই দেওয়া হত। বিচার ব্যবস্থায় অসরকারি ইওরোপিয়দের হিংসা, দুর্নীতি দেখেও না দেখার ভান করত ইওরোপিয় শাসকবর্গ। আজ আমাদের কম্বুকণ্ঠে বলতে হবে ইওরোপিয় সাম্রাজ্যের বিচার দেওয়ার প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির দাবি, অসাদা প্রজাদের কাছে সাদা আমলাদের দায়বদ্ধতার ধারণা আদতে, সাদা প্রজাদের, উপনিবনেশিক প্রজাদের ওপর নামিয়ে আনা প্রবল হিংসাকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার ঘোমটা মাত্র। একমাত্র ইওরোপিয়দের ওপর ইওরোপিয়দের অত্যাচার কিছুটা বিচার পেত – দেশিয়দের ওপর ইওরোপিয় অত্যাচারের সুরাহাই হত না। অসরকারি ইওরোপিয়দের অত্যাচারের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা দেশিয়দের বিচার না দেওয়াই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরিকল্পিত নীতি – আমলাদের প্রশাসনিক যোগ্যতা অযোগ্যতা এখানে দেখা হত না।
এলিজাবেথ কোলস্কিই হোক অথবা স্বেন বেকার্ট, ব্যতিক্রমী ইওরোপিয়-আমেরিকিয় ঐতিহাসিকদের ইওরোপমন্যতার দিকে ঝুঁকে থাকাটাও প্রবল বাস্তব।
স্বীকৃতি
দশ বছরের গবেষণা আর লিখন প্রক্রিয়ার ফল এই বই। বিশেষ স্থান কাল এবং পাত্রের সমন্বয় ছাড়া বইটা বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব ছিল না।
আমি প্রথমেই বলব আমার পরিবারের ভালবাসা আর সাহায্যের কথা – বাবা-মা ক্যারল বং মার্টিন, বোন গ্রিচেন, রেবেকা আর দেওর টিম। কাকিমা উইকেড আমার বইএর প্রত্যেকটি পাতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন, ঠিক যেমন করে একজন প্রাক্তন সম্পাদক এবং আইনজ্ঞের দেখা উচিৎ; কমা সেমিকোলন ব্যবহারের খুঁতখুঁতানিই আমার খামতিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর জন্যে যথেষ্ট ছিল।
আমি ধন্যবাদ দেব বন্ধু, সহকর্মীদের, যারা আমায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গী, ভাবনা দিয়েছেন, নতুন বিষয় বুঝতে সাহায্য করেছেন। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন শমিতা আগা, ঈশলদে ব্রেইমার, ননিকা দত্ত, হ্যারল্ড ফিশার-টাইনে, দুর্বা ঘোষ, সুনীলা কালে, ক্যাটরিনা কারকাজিস, জিম মিলস, প্রভু মহাপাত্র, দার্দ নিউম্যান, ক্রিস্টিনা নোভাজকে, সুজনী রেড্ডি, শত্রদ্রু সেন, সুদীপ্ত সেন, রাধিকা সিংহ, সাহানা সিপ্পি। লেখা শেষ পর্বে পৌঁছনোর সময় ক্যাথারিন হল অনেকটা পথ দেখিয়েছেন। বেথানি, মস্কো আর দিল্লির গ্রীষ্মে কাজকর্ম ছেড়ে আমায় সময় দিয়েছেন। স্নাতক হয়ে বেরোনোর সময় থেকে একবগগা ভাবে লেগে থেকে বইএর পাণ্ডুলিপি শেষ করার দিন অবদি আমার ছায়াসঙ্গী ছিলেন জানকী বাখলে। আমি বিপুল বৌদ্ধিক ঝুঁকি নিয়েছিলাম। জানকী সে সময় প্রত্যেকটি শব্দ পড়ে আমায় উতসাহ না দিলে আমার পক্ষে এই বিপুল কাজে সহজভাবে এগিয়ে যাওয়া খুব সহজ হত না।
আমি আজ যা লিখছি তার প্রত্যেকটি অক্ষর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর বিভাগের দান। সেখানে আমায় পড়িয়েছেন পার্থ চ্যাটার্জী, আয়েশা জালাল, ফ্রান্সিস প্রিচেট, গৌরী বিশ্বনাথন, প্যাট্রিসিয়া উইলিয়ামস। বইএর ভূমিকায় তাঁদের কথা না বললেই নয়। আমার গুরুপ্রতীম নিকোলাস বি ডির্ক্স নিয়মিত পথ দেখিয়েছেন, অসামান্য উপদেশ দিয়েছেন এবং বইটা শেষ করার জন্যে অক্লান্তভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন।
ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকর্মীরা আমায় সারাক্ষণ সাহায্য করেছেন – বিশেষ করে হিব্বা আবুজিডেইরি, পল স্টিগির কথা উল্লেখ না করলেই নয়। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পাদনা এবং প্রকাশনা বিভাগের প্রত্যেকজন সদস্যের প্রতি ধন্যবাদ রইল – মেরিগোল্ড কল্যান্ড, জো ব্রিজি এবং সারা গ্রিনের নাম আলাদা করে উল্লেখ করলাম। কপি এডিটিংএ ক্রিস জ্যাকসনের কাজ বইটির চেহারায় প্রকাশ পেয়েছে। যে কোনও ভুলের দায়িত্ব একান্তই আমার।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়, দ্য ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন, দ্য ব্রিটিশ একাডেমি, দ্য কাউন্সিল অব আমেরিকান ওভারসিজ রিসার্চ সেন্টার্স, দ্য ফুলব্রাইট-হায়েস প্রোগ্রাম, প্যাট ইন্সটিটিউটের আর্থিক সাহায্যের ফলেই। ব্রিটিশ লাইব্রেরি, ইন্ডিয়ান ল ইন্সটিটিউট, দ্য লাহোর হাইকোর্ট লাইব্রেরি, দ্য কলম্বিয়া ল লাইব্রেরি, এবং ন্যাশনাল আরকাইভস অব ইন্ডিয়ার কর্মী, তাদের সংরক্ষিত নথি আমায় অসামান্য সাহায্য করেছে।
বইটি উৎসর্গ করছি আমার ভালবাসার মানুষটি আমার স্বামী যোসেফ প্রুন্টি, পুত্র ইশাইয়া এবং কন্যা ভিভিয়ানেকে। [ক্রমশ]