রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্কুলজীবন ছিল খুবই মর্মান্তিক। ক্লাস এইটেই তাঁকে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল। অথচ তাঁর সহপাঠী দাদা সোমেন্দ্রনাথ ও ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ পাস করে যাচ্ছিলেন প্রতি ক্লাসে। তাহলে এই সিদ্ধান্তে আসা অমূলক হবে না যে, রবীন্দ্রনাথের বহুচর্চিত বর্ণান্ধতা বাল্যেই তাঁর পড়াশোনার উপর প্রভাব ফেলেছিল। ফলত ঘটেছিল তাঁর স্কুল ড্রপআউটের মতো ঘটনা।
কবি জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন, “ক্রমশ নর্মাল স্কুলের স্মৃতিটা যেখানে ঝাপসা অবস্থা পার হইয়া স্ফুটতর হইয়া উঠিয়াছে সেখানে কোনো অংশেই তাহা লেশমাত্র মধুর নহে। ছেলেদের সঙ্গে যদি মিশিতে পারিতাম, তবে বিদ্যাশিক্ষার দুঃখ তেমন অসহ্য বোধ হইত না। কিন্তু সে কোনোমতেই ঘটে নাই। অধিকাংশ ছেলেরই সংস্রব এমনই অশুচি ও অপমানজনক ছিল যে, ছুটির সময় আমি চাকরকে লইয়া দোতলার রাস্তার দিকের এক জানালার কাছে একলা বসিয়া কাটাইয়া দিতাম। মনে মনে হিসাব করিতাম, এক বৎসর, দুই বৎসর, তিন বৎসর — আরও কত বৎসর এমন করিয়া কাটাইতে হইবে। শিক্ষকদের মধ্যে একজনে কথা আমার মনে আছে, তিনি এমন কুৎসিত ভাষা ব্যবহার করিতেন যে তাঁহার প্রতি অশ্রদ্ধাবশত তাঁহার কোনো প্রশ্নের উত্তর করিতাম না। সম্বৎসর তাঁহার ক্লাসে আমি সকল ছাত্রের শেষে নীরবে বসিয়া থাকিতাম।”
বর্ণান্ধতা (Color Vision Deficiency — CVD) একটি দৃষ্টিগত সীমাবদ্ধতা, যা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জন ও দৈনন্দিন জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি এনক্রোমা (EnChroma) নামক বর্ণান্ধদের জন্য বিশেষ চশমা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, একটি বিস্তৃত জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, বিদ্যালয়পর্যায়ে বর্ণান্ধ শিক্ষার্থীরা নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়, অথচ এ সমস্যাটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে শনাক্তই করা হয় না।
গবেষণার উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট
গবেষণাটি মূলত বর্ণান্ধতা শিক্ষাজীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে তা বোঝার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। ২০২০ সালের প্রথম দিকে প্রায় ১,০০০ বর্ণান্ধ ব্যক্তি এবং বর্ণান্ধ শিশুদের অভিভাবক এতে অংশ নেন। তাদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে শিক্ষাক্ষেত্রে সমস্যার প্রকৃতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধান ফলাফল
১. শিক্ষায় বিভ্রান্তি ও হতাশা
২. বর্ণান্ধতা নির্ণয়ের ঘাটতি
৩. সামাজিক ও মানসিক প্রভাব
বর্ণান্ধতার বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ
কয়েকটি সুপরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন বস্টন ইউনিভার্সিটি, নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটি, আলফ্রেড ইউনিভার্সিটি এবং ফ্রান্সিস ম্যারিয়ন ইউনিভার্সিটি, রঙকানা শিক্ষার্থীদের জন্য এনক্রোমা চশমা ধার দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা পাঠ্যসামগ্রী রঙকানা তথা বর্ণান্ধ শিক্ষার্থীর উপযোগী করে তুলতে পারেন।
জরিপের গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ
এনক্রোমার অবদান
এনক্রোমা সংস্থাটি “কালার অ্যাক্সেসিবিলিটি প্রোগ্রাম” চালু করেছে, যার মাধ্যমে বিদ্যালয়, জাদুঘর, গ্রন্থাগার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বর্ণান্ধদের জন্য চশমা সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব চশমা বিশেষ অপটিক্যাল ফিল্টারের মাধ্যমে রঙকে আরও স্পষ্ট ও জীবন্তভাবে দেখতে সাহায্য করে। সাম্প্রতিক গবেষণা এসব চশমার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে।
গবেষণার ফলাফলে প্রমাণিত যে বর্ণান্ধতা শিক্ষাজীবনে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। প্রাথমিক পর্যায়েই যদি শিক্ষার্থীদের বর্ণান্ধতা শনাক্ত করা যায় এবং পাঠ্যসামগ্রী মানানসই করা হয়, তবে শিক্ষার্থীরা সমান দক্ষতায় জ্ঞানার্জনে সক্ষম হবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয়, অভিভাবক, শিক্ষক এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন, “ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে যখন পড়িতেছিলাম তখন কেবলমাত্র ছাত্র হইয়া থাকিবার যে-হীনতা তাহা মিটাইবার একটি উপায় বাহির করিয়াছিলাম। আমাদের বারান্দার একটি বিশেষ কোণে আমিও একটি ক্লাস খুলিয়াছিলাম। রেলিংগুলা ছিল আমার ছাত্র। একটি কাঠি হাতে করিয়া চৌকি লইয়া তাহাদের সামনে বসিয়া মাস্টারি করিতাম। রেলিংগুলার মধ্যে কে ভালো ছেলে এবং কে মন্দ ছেলে, তাহা একেবারে স্থির করা ছিল। এমন-কি ভালো-মানুষ রেলিং ও দুষ্ট রেলিং, বুদ্ধিমান রেলিং ও বোকা রেলিঙের মুখশ্রীর প্রভেদ আমি যেন সুস্পষ্ট দেখিতে পাইতাম। দুষ্ট রেলিংগুলোর উপর ক্রমাগত আমার লাঠি পড়িয়া তাহাদের এমন দুর্দশা ঘটিয়াছিল যে, প্রাণ থাকিলে তাহারা প্রাণ বিসর্জন করিয়া শান্তিলাভ করিতে পারিত। লাঠির চোটে যতই তাহাদের বিকৃতি ঘটিত ততই তাহাদের উপর রাগ ক্রমশই বাড়িয়া উঠিত; কী করিলে যে তাহাদের যথেষ্ট শাস্তি হইতে পারে, তাহা যেন ভাবিয়া কুলাইতে পারিতাম না। আমার সেই নীরব ক্লাসটির উপর কী ভয়ংকর মাস্টারি যে করিয়াছি, তাহার সাক্ষ্য দিবার জন্য আজ কেহই বর্তমান নাই।” বালক রবীন্দ্রনাথের এই অন্ধ ক্রোধ, তাঁর বর্ণান্ধতাজনিত হীনম্মন্যতা থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল বলে মনে হয়।
প্রসঙ্গত রবীন্দ্রনাথের মতোই আমেরিকান লেখক মার্ক টোয়েনও বর্ণান্ধতার জন্যে ক্লাস সিক্সে (ফিফথ গ্রেড) স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন। তারপর তিনি অনেক ঘাটের জল খেয়ে হাস্যরসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী লেখক মার্ক টোয়েন-এ পরিণত হন। তাঁর আসল নাম ছিল স্যামুয়েল ল্যাংহর্ন ক্লিমেন্স।