২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ বামেদের ব্রিগেড সমাবেশ আক্ষরিক অর্থেই ‘দূরবীন দিয়ে খুঁজলেও পাওয়া যাবে না’ চালু এই প্রবাদটিকে মিথ্যে প্রমান করেছিল। কিন্তু ছুটির দিন বিকেলে যখন মানুষের ভিড় আলগা হচ্ছিল তখন থেকেই প্রশ্নটা চাগার দিয়ে উঠেছিল, ২ মে পর্যন্ত বাম নেতারা ওই ভিড়ের ছবিটা দেখতে পাবেন তো?
গত লোকসভা ভোটের আগে, ৩ ফেব্রুয়ারি বামেদের ব্রিগেডে মানুষের সমাগম দেখে বিরোধীরা চিন্তায় পড়েছিল। লাখো মানুষের সেই সমাবেশে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছিলেন বুদ্ধবাবু মাত্র কয়েক মিনিট উপস্থিতি থেকে, দেবলীনা হেমব্রেম তাঁর ঝোড়ো বক্তৃতায়। এর পরই বামেরা ঠিক কটি আসন পেতে চলেছে তা নিয়ে নতুন করে হিসেব কষতে বসেছিলেন অনেকেই। কিন্তু চার মাস পর অর্থাৎ ফলাফলের দিন ফাঁকা থলি হাতে দাঁড়াল বামেরা। স্মৃতি কি কেবলই দুখজাগানিয়া, কার্যত শেষ বিধানসভায় বামেদের ২৬ শতাংশ ভোটটা গিয়ে ঠেকেছিল ৭.৫২ শতাংশে। বাংলার রাজনীতিতে নতুন তত্ত্ব তৈরি হল বামের ভোট রামে।
২০১৯-এর পর ২০২১-এর বিধানসভা ভোট। ২৮ ফেব্রুয়ারি নতুন করে জেগে ওঠা বামেরা শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ ব্রিগেডে যে হারে লোক সমাগম ঘটিয়েছে তাতে কি তারা হাতে থাকা গত বিধানসভার ২৬ শতাংশ ভোটের কিছুটা ফিরিয়ে আনতে পারবে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই ব্রিগেডে বামেদের মৃত্যু ঘন্টা বাজিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকেও এক দশক অপেক্ষা করতে হয়েছিল। গত লোকসভায় বিজেপি ভাল ফল করেছে, তারাও এই বিধানসভার পর বাংলার মসনদে বসবে বলে ঠিক করে ফেলেছে, সেটাও কি তাহলে সম্ভব হচ্ছে?
বুঝতে হবে, ব্রিগেডে বিদ্যুৎ চমকে গর্জন হল মানেই যে ইভিএম-এ ততটা বর্ষণ হবে তা কিন্তু মোটেই নয়। যত মানুষ বামেদের ব্রিগেডে মুষ্ঠীবদ্ধ হাত আকাশে ছুড়লো তার একটা বড় অংশ যদি কাস্তে হাতুড়ি চিহ্ণের বোতাম টেপে তাহলে কি বাম ভোট সাত শতাংশে নেমে আসতে পারে? ভিড়ের যাবতীয় তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন না উঠলেও ব্রিগেডের ভিড় নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, এই তুমুল উৎসাহী জনতা কি শেষমেষ নিজের দলকেই ভোট দেয় না? এই প্রশ্নে প্রবীন রাজনীতিকদের কেউ কেউ বলছেন, ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী যখন ভোটপ্রচার করেছিলেন, তখন এর থেকেও বেশি ভিড় হয়েছিল। কিন্তু কংগ্রেস সেবার গো হারা হেরেছিল। সেই ঘটনার তুলনা টেনে আরেক দল জানাচ্ছেন, ১৯৯৩ সালে কংগ্রেসের ডাকা ব্রিগেড সমাবেশে ঠিক এমনই ভিড় হয়েছিল। কিন্তু সেবার ভোটের ফল কংগ্রেসকে দারুণ হতাশ করেছিল।
শক্তি প্রদর্শনের পরীক্ষা দিতে ডান, বাম সবাইকেই ব্রিগেড ভরাতে হয়, তাতে হয়ত ব্রিগেডের ঐতিহাসিক মূল্য বাড়ে কিন্তু শুধুমাত্র অসংখ্য মানুষের যোগদানেই ভোটবাক্স ভরে না। ভোটে জিততে নতুন করে সাধারণ মানুষের ভোট যেমন টানতে হয়, তার থেকেও বেশি দরকার পরে নিজেদের ভোটব্যাঙ্কটা ধরে রাখা। ২০২১-এর ভোটের কথায় গত লোকসভা ভোটে ও তার ফলাফলের কথা বারেবারেই এসে পড়ে। প্রায় সবারই মত; সেবার যে পদ্ম পাপড়ির দেখা মিলেছিল তার পিছনে ছিলেন বামেরাই। তারা নিজেরা একথা না মানলেও ঐতিহাসিকভাবে সত্য হয়ে গিয়েছে।
রাজ্য থেকে তৃণমূলকে হটাতে ২০১৬ সালের বিধানসভার নির্বাচনে জোট গড়েছিল বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস৷ তার পর ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে অনেক আলোচনার পরও জোট প্রক্রিয়া ভেস্তে যায় বাম ও কংগ্রেসের মধ্যে৷ তার পর এবার ফের দুই পক্ষ একজোট হয়ে লড়াইয়ে নেমেছে৷ কিন্তু জোট ঘোষণার পরেও প্রার্থী দেওয়া নিয়ে জট অব্যাহত, একের পর এক আসনে মুখোমুখি বাম-কংগ্রেস। মুর্শিদাবাদ এবং পুরুলিয়ায় বামেদের বিরুদ্ধে কংগ্রেস কিংবা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বামেরা প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জোটের জট নিয়ে ধারাবাহিক সমস্যা লেগে ছিল আরও বাড়বে। তার আগে আরেকটি প্রশ্ন পুরনো হলেও সঠিক, একদা প্রবল প্রতিপক্ষ এই মুহুর্তে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রায় শেষ লড়াইয়ে একই শত্রুর বিরুদ্ধে জোট বাঁধলেই কি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে মানুষ তাদের বিশ্বাস করে আস্থা রাখবে?
বাম ও কংগ্রেসের সামনে একটাই পথ ঘুরে দাঁড়ানো। সেই পথে মৃতপ্রায় বাম শিবিরে জেগেছে প্রাণের স্পন্দন। এমনই এক সন্ধিক্ষণে আব্বাস সিদ্দিকির সঙ্গে জোট। সিপিএম বলছে, বিজেপি এবং তৃণমূলকে হটাতে তাঁরা যে কোনও ধর্মনিরপেক্ষ, বাম গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে জোট করতে প্রস্তুত। তাঁদের মতে, বিজেপি হিন্দুদের পার্টি। আর তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যালঘু তোষণকারী। সাচ্চা ধর্মনিরপেক্ষ বামেদের সঙ্গী যেমন কংগ্রেস, দু’দলের নেতাদের চোখে আব্বাস সিদ্দিকির নেতৃত্বাধীন দল তাই সেকুলার!
আসলে সিপিএম মুখে বিজেপিকে যতই আক্রমণ করুক, এখনও তাদের মূল শত্রু সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কারণ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার জ্বালায় তারা সবথেকে বড় শত্রুর চেয়ে তৃণমূলের সরকার গঠনের রাস্তায় কাঁটা ছড়িয়ে দিতে মরিয়া। সেই কারণে তাঁরা আব্বাস সিদ্দিকির হাত ধরেছেন। ভাবছেন মুসলিম ভোটের কিছুটা টানতে পারলেই তৃণমূলের জেতার পথে চোনা ফেলে দেওয়া যাবে। আর কোনও রকমে ত্রিশঙ্কু হলে খুলে যাবে নেপোর দই মারার দরজা। কিন্তু ব্রিগেডের গর্জনে যেমন ভোট বাক্স ভরে না, তেমনি আলিমুদ্দিনের খাতা কলমের হিসেবে জনগণমনের অধিনায়কত্ব অর্জন করা যায় না।
বামেদের জনসমাবেশ বিরাট আকার ধারণ করলে অনেকেই ভয় পান, কারণ সেই ভিড়ের ঘনত্বে কোনও খাদ থাকে না।
বামেদের গর্জণে কেবল বর্ষণ নয় কুলও ছাপিয়ে যায় তাই তাদের ভাবনার সঙ্গে অন্য কারও তুলনা চলেনা।
শুধুমাত্র শক্তি প্রদর্শনের পরীক্ষা নয়, জন মনোবল ও দলের কর্মী-সমর্থকদের উতসাহী-উদ্যোগী করতেও ব্রিগেডের মতো
জনসমাবেশের দরকার পরে, তাতে অসংখ্য মানুষ যোগদানও করেন, কিন্তু তাদের ভোটে দলের বাক্স ভরে না এটা
একেবারেই ভুল ব্যাখ্যা। এই বিশ্লেষণ একেবারেই মানা সম্ভব নয়?
২৮ ফেব্রুয়ারি ব্রিগেডে যতজন বাম হয়েছেন ইভিএম-এ তারা গৈরিক হয়ে যাবেন নিশ্চিত। ২০১১ তেও দেখা গেছে লাল
থেকে ঘাস ফুল হতে। সম্প্রতি বেশ কিছু ঘাসফুলের রং পালটে গেরুয়া হয়ে গেছে। সিপিএম কোনওদিন ধর্মনিরপেক্ষ
বাম ছিলনা, আজ ওরা যে জামাটা পড়েছে তার নীচেও লুকানো আছে ভয়ঙ্কর ধান্দাবাজি।
সিপিএম-এর সমাগম বা গর্জনে কি আর আজ কোনও কাজ হবে? মানুষ ওদের এতটা দূরে তাড়িয়ে দিয়েছে যেখান থেকে
ফিরে আসতে অন্তত এক শতক লাগবে, ততদিন ওদের সাইনবোর্ড মাটিহয়ে যাবে। আর যারা ওদের সভায় এসে গর্জেছে
তারা গেরুয়ায় আছে,সবুজে আছে আবার লালেও থাকে।
রাজনৈতিক নীতি, আদর্শ যখন দেউলিয়া হয়ে যায়, তখন গর্তের ভিতর থেকে শুধুমাত্র আওয়াজ দিয়েই নিজেদের টিকে থাকা
জানান দিতে হয়। কিন্তু সে আওয়াজ কি মানুষ শুনতে পায়, সাড়া দেয়?