ঠিক ছ’দিন পর কর্ণাটকে বিধানসভা নির্বাচন। ভোটে জিতে এই রাজ্যে কারা ক্ষমতায় আসবে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১৩ মে, শনিবার পর্যন্ত। তার আগে চলছে বহু হিসেবনিকেশ — শাসক নাকি বিরোধীরাই বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে; এই নিয়ে। হিসেবনিকেশ যাই হোক ২২৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে পেতে হবে ১১৩টি আসন। প্রসঙ্গত, কর্ণাটকের বিগত কয়েকটি নির্বাচনে দেখা গিয়েছে প্রায় প্রতি পাঁচ বছরেই ক্ষমতার বদল হয়েছে। এমনকি ২০১৮ সালেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সে বছর কংগ্রেস জেডিএস জোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরও জোট সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে অপারেশান লোটাস বাহিনী মাঠে নামে এবং দল ভাঙাভাঙির খেলায় জোট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামীকে রাতারাতি ক্ষমতা হারাতে হয়। ২০১৯-এর জুলাই মাসে জোট সরকার পড়ে যায় এবং অপারেশান লোটাসে ক্ষমতাসীন হয় বিজেপি। উল্লেখ্য, ওই নির্বাচনে বিজেপি ৩৬.৩৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ১০৪টি আসন লাভ করেছিল। অন্যদিকে ৩৮.১৪ শতাংশ ভোট পেয়ে কংগ্রেস পেয়েছিল ৮০টি আসন এবং ১৮.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জেডিএস পেয়েছিল ৩৭টি আসন।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে লক্ষ্যনীয়; কর্ণাটক বিধানসভার অন্তত শেষ পাঁচটি নির্বাচনে মাত্র দু’বার কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, ১৯৯৯ এবং ২০১৩ সালে। অন্য তিনটিতে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে হয় জোট সরকার হয়েছে নয়তো দল ভাঙিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হয়েছে। এছাড়া ২০০৪ এবং ২০১৮ সালে কংগ্রেস জোট করে সরকার গঠন করেছিল কিন্তু দু’বারই কংগ্রেস পাঁচ বছর ক্ষমতায় টিকতে পারেনি। কিছুদিনের মধ্যেই সরকার ভেঙে যায়। ১০ মে কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভারতীয় জনতা পার্টি তাদের নির্বাচনী ইস্তেহার ‘প্রজা ধ্বনি’ এবং কংগ্রেস তাদের নির্বাচনী ইস্তেহার ‘সংকল্প পত্র’-তে একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আবার একে অপরের ঘোষণা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছে।
নির্বাচনী ইস্তেহারে বিজেপি দরিদ্রদের জন্য বছরে তিনবার বিনামূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার থেকে শুরু করে কৃষক, মহিলা এবং শিশুদের জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্পের উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে কংগ্রেস, প্রতিটি মহিলা পরিবারের প্রধানকে প্রতি মাসে ২০০ ইউনিট বিনামূল্যে বিদ্যুৎ থেকে প্রতি মাসে ২০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কেবল তাই নয়, কংগ্রেস তাদের ইস্তেহারে উল্লেখ করেছে যে, যদি কর্ণাটকে কংগ্রেস সরকার আসে, তাহলে তারা বজরং দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে। এছাড়াও তারা বজরং দল ও পিএফআউকে একই সারিতে বসিয়ে জানিয়েছে, বজরংদল, পিএএফআইয়ের মতো সংগঠনের বিরুদ্ধে তারা কড়া পদক্ষেপ নেবে। ইস্তাহারে কংগ্রেসের এই ঘোষণার কড়া সমালোচনা করে বিশ্বহিন্দু পরিষদ জানিয়েছে, তারা কংগ্রেসের এই ঘোষণাকে ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসাবে দেখছে এবং এর জবাব ভোটের ফলাফলেই দেওয়া হবে।
ফলাফলের আগে অবশ্য বেশ কয়েকটি সংস্থা কর্ণাটক নির্বাচন নিয়ে জনমত সমীক্ষা করেছে, সেই সমীক্ষাগুলির দিকে এক ঝলক নজর রাখলে দেখা যাবে কংগ্রেসই অধিকাংশ সমীক্ষায় এগিয়ে রয়েছে। একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, কংগ্রেস প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে ১০৬ থেকে ১১৬টি আসন পেতে পারে।ওই সমীক্ষাই জানাচ্ছে বিজেপি ৩৩.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ৭৯ থেকে ৮৯টি আসন এবং জেডিএস ১৮.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জেডিএস ২৪ থেকে ৩৪টি আসন পেতে পারে। ৭.৩ শতাংশ ভোট অন্যান্যরা পেতে পারে ৫টি আসন। অন্য একটি সমীক্ষা কংগ্রেসকে আরও এগিয়ে রেখে জানাচ্ছে, ৪২ শতাংশ ভোট পেয়ে কংগ্রেস জিততে পারে ১২৮ থেকে ১৩১টি আসন, ৩৩ থেকে ৩৬ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজেপি জিততে পারে ৬৬ থেকে ৬৯টি আসন এবং ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জেডিএস ২১ থেকে ২৫টি আসন জিততে পারে।
কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনের আগে করা অধিকাংশ সমীক্ষায় একটি বিষয় উঠে আসছে সেটি হল দুর্নীতি। যাকে ৬৮ শতাংশ ভোটার এই নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করছেন।মূল্যবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন ৪৭ শতাংশ ভোটার, ৩৪ শতাংশ ভোটার বেকারিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, ১৩ শতাংশ মহিলাদের নিরাপত্তা, পানীয় জল এবং বিদ্যুতের সমস্যা এবং ১২ শতাংশ স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা জানাচ্ছেন, এবার কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনের আগে যেভাবে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ঝড় উঠেছে তা বিগত কয়েক বছরে দেখা যায়নি। তাদের মতে, ২০১৯ সালের অপারেশান লোটাস করে কংগ্রেস-জেডিএস জোট সরকারকে ফেলে দেওয়া এবং বিধায়ক কেনা বেচা কর্নাটকের মানুষ ভালোভাবে নেননি। অন্যদিকে বিজেপির মধ্যে গোষ্ঠীকোন্দল, একাধিক হেভিওয়েট বিজেপি নেতার নামের সঙ্গে দুর্নীতির যোগ, ইয়েদুরিয়াপ্পাকে মুখ্যমন্ত্রীত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলিও সাধারণ মানুষ প্রকাশ না করলেও তারা ভালো চোখে দেখছেন না।তাই মনে হচ্ছে, এবারের নির্বাচন জিতে বিজেপির ফিরে আসা সহজ হবে না।বরং বিজেপির পক্ষে ক্ষমতায় ফেরাটা কিছুটা অসম্ভব।